Now Reading
তবু ভালোই চলছে দিন…খারাপ কি !



তবু ভালোই চলছে দিন…খারাপ কি !

আজগর সাহেব সরকারী চাকুরিজীবি ,বেশ বড় পোষ্টে ছিলেন। খুব কষ্ট করে জীবনের এই অবস্থান গড়েছেন। বিধবা মা সেলাই করে, ঘরে বসে বাচ্চাদের আরবী শিক্ষা দিয়ে রোজগার করতেন। সেই মায়ের ছায়ায় বড় হয়েছেন তিনি। কিন্তু চিরাচরিত একটি বিষয় হল, ” দুঃখের দিনে সুজন পাবেনা সুখের দিনে অভাব হবেনা ! ” তেমনি অবস্থা … তবু তার মধ্যেই সে জীবনের একটি মজবুত এবং সম্মানের অবস্থান তৈরী করেছেন। কিন্তু তাঁর যখন সুদিন তখন মৌমাছির ও অভাব হওয়ার কথা না। চারিদিকে ভন ভন করা মৌমাছি মানে আত্মীয় স্বজন। সবাই নিজে থেকে খুঁজে খুঁজে তাঁর সামনে হাজির হতে থাকলো ! অথচ এরা একদিন এই ছোট্ট আজগর ও তাঁর বিধবা মাকে অবজ্ঞা করে দূর দূর করেছে…! কিন্তু তবুও বেশ সুখেই ছিলেন আজগর সাহেব তাঁর মাকে নিয়ে। মায়ের যত্ন নিজ হাতেই করতেন কিন্তু বয়স প্রায় চল্লিশ হলেও বিয়ে করেননি তিনি। কারণ একটাই ! আজকালকার মেয়ে সংসারি হয়না আর হলেও বৃদ্ধ শ্বশুড় শ্বাশুড়িকে সহ্য করতে পারেনা ! সে আলাদা সংসার করতে চায়। যেখানে শুধু সে আর তার স্বামী থাকবে অন্য কোন ঝামেলা হবেনা। অথচ যাকে ঝামেলা মনে করে সেই মা ই খেয়ে না খেয়ে টাকা জমিয়ে যুদ্ধ করে কোলের সন্তানকে নিশ্চিত একটি জীবন গড়ে দেয় ! কিন্তু বয়সের সাথে সাথে তাঁরাই বোঝা হয়ে যায় !

যাই হোক। আত্মীয় স্বজন জোর করে তাদের চেনা পরিচিত এক উচ্চ শিক্ষিত সুন্দরী পাত্রীর সাথে বিয়ে করিয়ে দেয়। বিয়ের পরে আজগর সাহেবের ধারণা পাল্টে গেল। তাঁর স্ত্রীর আদিখ্যেতায় মুগ্ধ তিনি এবং তাঁর বৃদ্ধ মা। বেশ সুখেই দিন কাটতে লাগলো…। আজগর সাহেব স্ত্রীর ভরশায় বৃদ্ধ মাকে রেখে অফিসের কাজে কিছুদিনের জন্য শহরের বাইরে গেলেন। কিছুদিন পরে কাজ শেষে ফিরে আসেন। ফিরে এসে সবকিছুই স্বাভাবিক দেখে বেশ সন্তষ্ট তিনি। কন্তু কয়েকদিন ধরে খেয়াল করলেন, মা কেমন হঠাৎ করে দুর্বল এবং কম কথাবার্তা বলেন। মলিন চুপচাপ থাকতে দেখছেন, আর পুরোনো সাদা কালো একখানা ছবি আগলেই সময় পার করেন মা। মাকে জিজ্ঞেস করলে অনেক কথা যেন বলতে গিয়েও আটকে যায় মায়ের মুখে ! কেমন যেন নীরব আর ভীত সে। অনেক জিজ্ঞাসা করার পরে মা জবাব দিলেন, ” অনেক বয়স হয়েছে মরার ভয় কলিজায় বসে গেছে বাবা ! তুই সামলে থাকিস ভালো থাকিস !”বলে কেঁদে ফেলেন তিনি। আর কিছু বলতে চেয়েও চুপ হয়ে গেলেন। প্রথমে স্বাভাবিক মনে হলেও আজগরকে ভাবিয়ে তোলে বিষয়টি। সুস্থ স্বাভাবিক মা এত দ্রুত ভীত হয়ে গেলেন কেন! সে দিনরাত বোঝার চেষ্টা করেন কিন্তু কোন অস্বাভাবিকতাই নজরে পড়ে না। স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে বলে, ” মা স্বপ্নে বাবাকে দেখেছেন তাই কিছুদিন ধরে মন খারাপ, ও কিছু না ঠিক হয়ে যাবে।” আবারও আজগর সাহেব বিষয়টি মাথা নেড়ে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয় তবে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর ! কারণ অভাব , বিপদ, কষ্ট সব খুব কাছ থেকে দেখেছেন আর দেখেছেন শুধু মায়ের মুখ ! কিন্তু মায়ের সাথে তাঁর অনেক ভালো সম্পর্ক , বন্ধুরমতন সম্পর্ক তবে হঠাৎ করে মা এতটা ঝিমিয়ে চুপ হয়ে গেলেন কেন ? আবার কিছু যেন বলতে চেয়েও বললেন না শুধু কাঁদলেন ! আর স্বপ্নের কথা মা তো নিজেই বলতে পারতেন, আমি তাহলে বাবার জন্য মিলাদের ব্যবস্থা করতাম কিন্তু…

উনি বুঝে গেলেন মায়ের অব্যক্ত কথা !

তিনি আবারও অফিসের কাজে দুদিনের জন্য সিলেট গেলেন। মহা আনন্দে তাঁর স্ত্রী তাঁকে বিদায় দিয়ে পুরোনো প্রেমিককে ঘরে এনে নোংরা রঙ্গ তামাশায় মেতে উঠলো। আর এসব সহ্য করতে না পেরে চিৎকার দিয়ে বৃদ্ধা কাঁদতে লাগলেন, তখন অর্ধনগ্ন ছেলের বউ এসে তাঁর গলা টিপে ভয় দেখালো এবং মারতে লাগলো.. আর বলতে লাগলো, ” বুড়ি তুই জলদি মর ! আমি নিশ্চন্ত হই আর তোর ছেলেকে বুঝিয়ে বল আমার নামে সব লিখে দিতে নইলে তোর ছেলে আর তুই নারী নির্যাতন মামলায় ফেঁসে যাবি ! সারাদিন শুয়ে বসে ছেলের কামাই খাচ্ছিস লজ্জা নাই বুড়ি মর !”

অসুস্থ মা শরীরের ব্যথায় কাঁতরাতে থাকেন আর কাঁদতে থাকেন। কিছুক্ষনের মধ্যে আজগর সাহেব বাসায় পুলিশ নিয়ে হাজির ! এতক্ষন যা যা ঘটেছে তার সবই আজগর সাহেবের সেট করা লুকানো ক্যামেরায় বন্দী হয় ! আর তিনি সিলেটে যাওয়ার নাম করে বাড়ির আশে পাশেই ছিলেন ! আজগর সাহেব আর বিয়ে করেননি তবে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে ভালোই চলছে ওদের দিন।

তবু সবাই নিশ্চয়ই এক হয়না, আর সঙ্গী ছাড়া জীবন অর্থহীন। 🙂

About The Author
Fatematuz Zohora ( M. Tanya )
Little writer & poet...!
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment