ফটো স্টোরি

শাওনের গল্প

সোহেল সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় পায়চারী করছে, অপারেশন থিয়েটারে তার স্ত্রী প্রসব ব্যাথায় কাৎরাচ্ছে। গত বছরে বর্ষায় কোন এক মেঘলা দিনে সোহেল বিয়ে করেছিলো মমতা কে।

ডাক্তার এসে সোহেল কে বললো তার স্ত্রীর অবস্থা ভালো না সিজার করতে হবে। কথাটি শুনে সোহেল এর মস্তিষ্ক থেকে ঠান্ডা রক্ত ঘাড় বেয়ে নিচে নেমে গেলো।

এখন এতো টাকা পাবে কোথায়, আশেপাশে আত্মীয়স্বজন কেউ থাকেনা, এক রাজ্য চিন্তা মাথায় নিয়ে তবুও বেরিয়ে গেলো সোহেল হাসপাতাল থেকে।

ঘন্টা খানেক বাদে কপালে ঘাম নিয়ে ফিরে আসে হাসপাতালে, এসে রিসিপশনে গিয়ে বলে অনেক কষ্টে দুই হাজার টাকা যোগাড় করতে পেরেছে। রিসিপশনের ভদ্র মহিলা হেঁসে উঠে বলে “টাকা লাগবে না, আপনার ফুটফুটে একটা ছেলে হয়েছে, ৩০৮ নম্বর রুমে চলে যান।

সোহেলের মাথা থেকে যেন এক পাহাড় পরিমান চিন্তা সরে গেলো, মুখে ফুটে উঠে আনন্দের হাসি।

দ্রুত হেটে সোহেল চলে যায় ৩০৮ নাম্বার রুমে, গিয়ে দেখে মমতার পাশে একটা শুভ্র সুন্দর বাচ্চা শুয়ে কান্না করছে। সোহেল গিয়ে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে “বাবা আমার বাবা” বলে হেসে উঠে, সোহেলের চেহারার সেই আনন্দটা মনে হচ্ছিলো সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চাটিও বুঝতে পেরেছিলো, তাই কান্না থামিয়ে চুপ করে রইলো।

মমতার অবস্থা আশঙ্কাজনক। ডাক্তার এসে বললেন “আপনাকে না দেখতে পেয়ে আমরা শেষে বাধ্য হয়ে নরমাল ডেলিভারী করি। অনেক রক্ত খরন হয়েছে। পারলে ওনার জন্য এবি নেগেটিভ  রক্তের ব্যবস্থা করেন। সোহেল পরিচিত কয়েকজনকে কল করেও এবি নেগেটিভ রক্ত জোগাড় করতে পারেনি।

মমতার জ্ঞান ফিরছেনা, বাচ্চাটা খুদায় কান্নাকাটি করছে, ডাক্তার এসে ইনজেকশন পুশ করে সোহেল কে বলে কি ব্যাপার রক্ত না পেলে তো রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হবেনা। সোহেল অসহায় হয়ে চারপাশে খুঁজতে থাকে, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে অনেক কে অনুরোধ করে রক্ত দেয়ার জন্য। কিন্তু ওই গ্রুপের রক্ত পাওয়া খুব ই কঠিন।

সোহেল হাসপাতালে ফিরে গিয়ে মমতার পাশে বসে হাত ধরে কেঁদে কেঁদে বলে আমি মনে হয় তোমাকে বাঁচাতে পারবো না, আমাকে ক্ষমা করে দিও। সোহেল এর চোখের জল মমতার হাতে গড়িয়ে পড়ে, হঠাৎ করে মমতার জ্ঞান ফিরে আসে, কষ্ট করে উঠতে যেয়েও পারছেনা, রক্ত শূন্যতায় তার চোখ মুখ হলদেটে হয়ে উঠেছে।

মমতা সোহেল কে অনেক কাঁপাকাঁপা গলায় বলে আমার ছেলেকে দেখে রেখো!

আমি মনে হয় ওকে এক ফোটা দুধ ও খাইয়ে যেতে পারবো না, বড় হলে ওকে বুঝিয়ে বলবা, আমাকে যেন ক্ষমা করে দেয়!

এই বলে মমতা চোখ বন্ধ করে ফেলে, সোহেল দোড়ে গিয়ে ডাক্তারের কাছে বলে, ডাক্তার এসে দেখে মমতা মারা গেছে।

সোহেল বাচ্চাটির দিকে তাকাতে পারছেনা, এতটা দুর্ভাগ্য নিয়ে ও পৃথিবীতে এসেছে।

বিকেল বেলায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে বৃষ্টি নামলো, মানুষ মরার পরে প্রকৃতি কেমন যেন নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়। অন্ধকার হয়ে উঠে চারপাশ।

সোহেলের মা শাওন কে ফিডারে করে দুধ পান করাচ্ছেন। সোহেলের চাকুরীতে ফিরে যাবার সময় হয়েছে। “শাওন” নাম টি মমতা অনেক আগেই রেখে দিয়েছিলো। কি জানি হয়তো তার মনে হয়েছিলো জন্মের পর সন্তানের নাম রাখার সময়টুকু ও পাবেনা।

শাওন কে কোলে তুলে কপালে আদর করে সোহেল কাজে চলে যায়। শাওন তার দাদীমার কাছে বড় হতে থাকে, সোহেল আসে মাঝেমধ্যে।

গত মাসে সোহেল আরেকটা বিয়ে করে, শাওনের বয়স তখন ৬ মাস, তার লালনপালনের জন্য একজন “মা” খুব দরকার, সোহেলের মা প্রায় অসুস্থ থাকেন, যে কারনে বাধ্য হয়েই সোহেল কে আবার বিয়ে করতে হয়। কিছুদিন ভালোই কাটতে থাকে, কিন্তু সোহেলের পরের স্ত্রীর পেটে সন্তান আসার পর থেকেই চিত্র পাল্টাতে থাকে। শাওনের দিকে আগের মত খেয়াল রাখা হয়না। এতে করে সোহেলের মার সাথে তার স্ত্রীর মনমালিন্য শুরু হয়। এবং তা অনেক কঠিন পর্যায়ে চলে যায়। সোহেল কোন পথ খুঁজে না পেয়ে তার স্ত্রীকে তার কাছে নিয়ে যায়, ওইখানে বাসা ভাড়া করে থাকা আরম্ভ করে। শাওন আগের মত তার দাদী্মার কাছে বড় হতে থাকে।

পাড়ার সবাই শাওন কে অনেক স্নেহ করে, ওর মুখটাতে সবাই কিসের যেন মায়া খুঁজে পায়।

কিন্তু এই স্নেহ শাওনের মন কে শান্ত করেনা, শাওন এখন ৮ বছরের শিশু। সে গল্প শুনেছে তার “মা” তার জন্মের পরেই দুনিয়া ছেড়ে ওই আকাশে চলে গেছে।

আকাশে তাকিয়ে প্রায় শাওন তার মা কে ডাকে। আর সব শিশুর মত অবাধ্য হয়ে সারাদিন দুষ্টামি করে, দাদীমার হাতে মার ও খায়। সোহেল মাঝেমধ্যে খোঁজ খবর নেয়। সন্ধ্যায় গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। সবাই নিজের ঘরে ঘরে ডুকে যায়। দূর থেকে বাচ্চাদের পড়ার আওয়াজ ভেসে আসে…অ…আ..ক…খ…।

সাথে সাথে পাশের ঘরে কোন মা তার সন্তান কে বাবা বাবা বলে আদরের সুরে বুকে জড়িয়ে ধরে। শাওনের কানে সে সব শব্দ ভেসে আসতে থাকে প্রতিনিয়ত।

পাশে দাদীমা অসুস্থতায় কাৎরায়। জানালা দিয়ে আকাশে তাকিয়ে তারাগুলো কে দেখতে থাকে, ওর বিশ্বাস ওর “মা” ও ওকে দেখতে পান। একসময় ঘুম এসে যায় আর শাওন ডুবে যায় স্বপ্নের রাজ্যে। যে রাজ্যে তারাগুলোর সাথে তার “মা” কেও দেখতে পায় শাওন।

সমাপ্ত

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

গল্পটা বন্ধুত্বের

Joy Prokash Bosu

ছেলেবেলা

Musfiq Rahman

হিজড়ারা আজ আমাদের সমাজে অবহেলিত কেন..?? আমারা কি জানি বা জানতে চেষ্টা করেছি কখনো ..??

Arman Siddique

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy