সাহিত্য কথা

একটি রুপকথার গল্প

খুব ছোটবেলায় দাদার থেকে শোনা একটি গল্প।

একদেশে এক সুখী রাজা ছিলেন আর ছিলো তাঁর অপরুপ সুন্দরী , গুণবতী প্রাণপ্রিয় রাণী। রাণীর রুপ আর গুণের চর্চা পুরো রাজ্য জুড়ে ছিলো। তবে রাণী তাঁর সুশ্রী চেহারা সবসময় পর্দার আড়ালে রাখতেন। কারণ যে তাঁকে দেখতো সে আর চোখ ফেরাতে পারতো না। আর সুখী রাজা রাণীর ছিলো দুটি ফুটফুটে সন্তান। সুখী রাজার দেশে প্রজারাও বেশ সুখ শান্তিতে বসবাস করতো।

একদিন রাণীর খুব মন খারাপ। অনেকদিন হয়ে গেলো রানী বাবার বাড়ি যায়নি। রাণী বাবার বাড়ি যাবার আবদার করলো রাজার কাছে। কিন্তু রাজা তো রাণীকে ছাড়া একমুহূর্তও থাকতে পারেনা সে রাজিও হল না। সে বললো, “এইতো সেদিন নেমন্তন্নে সবাই এখানে এসেছিলেন। সবাই বেশ ভালো আছে। সেদিন সবার সাথে দেখাতো হয়েছেই, এখন যেতে দেব না ক’দিন পরে আমি যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেব ! ”
আরো কিছুদিন পরে যেতে বললেন রাজা। রাণী রাজাকেও সাথে যাবার অনুরোধ করলো কিন্তু রাজা রাজ্যের কাজে ব্যস্ত বলে সে যেতে পারবেনা জানালো। রাণী আবার মন খারাপ করে রাজার প্রতি অভিমান করে বসে রইলো। রাণীর অভিমান রাজা সইতে পারেনা। তাই সে রাজি হয়ে গেলেন। কিন্তু তাদের এই বিচ্ছেদ যে খুব লোমহর্ষক খুব বেদনার জন্ম দেবে তা কেউ বুঝতে পারেনি !
তারপর নির্দিষ্ট দিনে রাজা অনেক পাহারাদার এবং পালকী ঠিক করলেন রাণীর যাবার জন্য। রাণীর সাথে দুজন দাসীও ছিলো। অবশেষে তিনদিনের জন্য বিদায় নিয়ে চললেন কিন্ত সন্তানদের সাথে নিলেন না। অনেক দূরের পথ আর প্রচন্ড খরার দিন। বাচ্চাদের কষ্ট হবে ! তাছাড়া এইতো তিনদিন পরেই তো ফিরে আসবেন রানী।
রাণী বিদায় হয়ে গেলেন, তাঁর সুখের রাজ্য, সুখের সংসার, তাঁর প্রাণপ্রিয় রাজা আর ফুটফুটে বাচ্চাদের রেখে বিদায় হলেন চিরতরে ! তবে যাবার মুহূর্তে রাজা এবং রাণী অজানা কারণে কেঁদে বিদায় দিলেন একে অপর থেকে….!
যাত্রাপথে চলতে চলতে সবাই ক্ষুধা তৃষ্ণায় ক্লান্ত হয়ে পড়লো ! তখন সবাই পালকী রেখে একটু বিশ্রাম নিতে গাছতলায় বসলো। রাণীও বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। হঠাৎ অদূরে একটি পরিত্যক্ত দিঘী দেখতে পেলেন। স্বচ্ছ টলমলে জল দেখে রাণীর খুব লোভ হল সেই জলে পাঁ ভেজাতে, সেই স্বচ্ছ জল পান করতে। সে পেয়াদাদের বললেন, তাঁকে ঐ জলে কাছে নিয়ে যেতে ! নিয়ে গেলো তারা আর তাঁর সাথে দাসী দুজনও । রাণী তাদের সবাইকে দিঘীর পাশে অপেক্ষা করতে বলে দিঘীর জলে নামলেন। অসম্ভব সুন্দর মনোরম পরিবেশ আর দিঘীর লোভনীয় টলমলে জল। তিনি পানি পান করলেন এবং পাঁ ভিজিয়ে একটু আরাম করলেন। তারপর যখন উঠে আসবেন তখন হঠাৎ দেখলেন তাঁর পাঁয়ের কাছে কালো চুলের মতন কিছুতে পাঁ জড়িয়ে আটকে গেছে। রাণী অনেক চেষ্টা করেও পাঁ ছাড়াতে পারলেন না ! রাণীর পাঁ তুলতে সবাই চেষ্টা করলো কিন্তু কেউ পারলো না। যতই পাঁ ছাড়াতে চেষ্টা করছে ততোই পাঁ আরো আটকে যাচ্ছে। রীতিমত কান্নাকাটির রোল পড়ে গেল ! কয়েকজন পাহারাদার জলদি রাজাকে আনতে গেলো। খবর শুনে রাজা পাগলপ্রায় ছুটে আসলো। তিনদিন চেষ্টা করতে‌ লাগলো সবাই কিন্তু কেউই রাণীর পাঁয়ে জড়ানো চুল কেটে পাঁ তুলতে পারলোনা। আস্তে আস্তে রাণীকে জলের দিকে আরো টেনে নিয়ে যাচ্ছে যেন কোন শক্তি ! সবাই দেখছে কিন্তু কেউ কিছুই করতে পারছে না ! রাণী ক্লান্ত হয়ে রাজাকে জড়িয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়লেন। তখন রাণী স্বপ্নে দেখতে পেলেন যে, কেউ তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বলছে, ” এই জলে কেন পাঁ রেখেছিস ! আমাদের বিরক্ত কেন করলি ? জলে আলোড়ন করে আমাদের বিরক্ত করেছিস তুই ! তোকে এখন জলের গভীরে আমাদের অন্ধকার রাজ্যে আসতে হবে , আর কোনদিন তুই ফিরে যেতে পারবি না !”

রাণীর ঘুম ভেঙে গেলো। রাণী ভয়ে, রাজা আর সন্তানদের ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে অঝরে কাঁদতে লাগলেন রাজাকে জড়িয়ে। আর বিদায় নিয়ে অনিচ্ছা সত্বেও একটু এজটু দিঘীর জলে তলিয়ে গেলেন……শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত একে অপরের হাত ধরে রাখলেন..‌ কিন্তু একসময় আর রাণীকে খুঁজে পাওয়া গেলনা।
আর কোনদিন রাণী উঠে আসলেন না জল থেকে। আর রাজা রাজ্য ছেড়ে দিঘীর পাশে অপেক্ষা করতে করতে একদিন মৃত্যুবরণ করলেন। তারপর রাজাকে ঐ দিঘীর পাড়ে সমাধি করা হল। তাদের সন্তান একদিন বড় হয়ে রাজ্যের সব দায়িত্ব বুঝে নিলো। রাজ্যের সবাই আবার আগের মত সুখী হল কিন্তু রাজা আর রাণীকে আজও রাজ্যের মানুষ স্মরণ করে চোখের জল ফেলে…।

 

এরকম কত গল্প হয়তো ছোটবেলায় অনেকেই শুনেছি। আরো কিছু গল্প সামনে লিখব যদি ভালো লাগে পাঠকদের…।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

আজ আমার বিয়ে – পর্ব ৩য়

Rohit Khan fzs

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ৩য় এবং শেষ পর্ব

Rihanoor Islam Protik

আমি আর বাবা

Maksuda Akter

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: