Now Reading
এক অন্য জগতের ঈদ।



এক অন্য জগতের ঈদ।

জান্নাতের মন আজ অনেক খুশি। আর মাত্র একটা দিন, তারপরেই তো বাড়ি, বাবা মায়ের সাথে দেখা, ছোট ভাইয়ের সাথে দুষ্টুমি, ছোট বেলার স্কুলের সামনে বসা,পুরানো বন্ধুদের সাথে আড্ডা। ভাবতে ভাবতে যেনো জান্নাত ভাবে “কখন বাড়ি যাবো”।

আজ জান্নাতের পরীক্ষা শেষ। দুইটা টিউশন করে সে, তারাও তাকে ছুটি দিছে। তার মাসের বেতনটাও তাকে দিয়ে দিয়েছে। তাই তার মনটা অনেক খুশি। এই বেতনের টাকা দিয়ে সে তার মায়ের জন্য, বাবার জন্য, ভাইয়ের জন্য কেনাকাটা করবে। সকাল থেকেই তাই সে কর্মব্যস্ত নিত্য দিনের কাজ করা শেষ করে শপিং এ যাওয়ার জন্য।

দুপুর হলেই জান্নাত তাই তার কাছের বন্ধু ও রুম মেট তামিমকে বলে তার সাথে যাওয়ার জন্য। তার গন্তব্য নিউ মার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট আর এলিফ্যান্ট রোড।

পড়ন্ত দুপুরে তারা বের হয় আর প্রথমে তারা নিউ মার্কেট যায়।

আর অল্প কিছুদিন পরেই ঈদ। ঢাকা শহর কর্ম ব্যস্ত হলেও এই শহরের মানুষ ধর্মহীন নয়, তারা নিয়মিত রোজা রাখে। তবু এই তীব্র রোদের তাপে তাদের মধ্যে ঈদ নিয়ে আনন্দের পরিমান বিন্দু মাত্র কমে না। আর তাই সকলেই ব্যস্ত তাদের কাছের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য কেনাকাটায়। আর তাই ঢাকা শহরের এই সময়টাতে যেমন ভীড় থাকে দোকানে, তেমন ভীড় থাকে রাস্তাতে। এজন্য দুই বন্ধুর রাস্তার জ্যাম ঠেলে পৌছাতে অনেক সময় লেগে যায়।

যখন তারা নিউ মার্কেটে প্রবেশ করে সেখানে কেবল জনস্রোতের ভীড়। ছোট বেলায় পড়েছিলো আজব শহর ঢাকা শহর জান্নাতের সে কথা মনে পড়ে। এখানে যেমন ফুটপাতে দেখা যায় জীবনের চিত্র, সেরকম দেখা যায় অট্টালিকার উপর আনন্দের স্রোত। তবে এই কর্মব্যস্ত শহরে মধ্যবিত্তদের একমাত্র কেনাকাটার স্থান হচ্ছে আজিমপুর নিউ মার্কেট।

জান্নাত আর তার বন্ধু সেই জনস্রোতের ভীড়ের মধ্য থেকে তার ছোট ভাইয়ের জন্য একটা শার্ট আর একটা প্যান্ট কেনে। নিজের জন্য একটা পাঞ্জাবী কেনে সে। এরপর সে যায় এ্যলিফ্যান্ট রোডে। বাবার জন্য একটা পাঞ্জাবী, নিজের জন্য একজোড়া স্যান্ডেল আর মায়ের জন্য একটি শাড়ী। বেশ কিছুদিন তার স্যান্ডেলটা ছিড়ে গেছে। তাকে দেয়ার মতন তেমন কেউ নেয়। তার টিউশনের টাকাটাই একমাত্র স্বম্বল। এজন্যে সে এই ঈদে কেনাকাটা করার জন্য দুই মাসের টিউশনের টাকা জমিয়েছে। সকল কেনাকাটার শেষে তারা রাতে বাসায় পৌছায়।

তার মনে আনন্দের একটা স্রোত বয়ে যায়। তার কষ্টের টাকা দিয়ে সে তার কাছের মানুষের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাচ্ছে। চোখ থেকে জান্নাতের জল আসে। ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে সে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়ে।

সকাল সকাল ঘুম থেকে ওঠে সে। তামিমকে সে ডাকতে থাকে। তামিমের বাড়ি বাগেরহাট আর জান্নাতের বাড়ি খুলনাতে। দুজনের পথ একই দিক। আর তাই দুই বন্ধু একসাথে বাড়িতে যাবে। তামিমের পরীক্ষা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো কিন্তু বন্ধুর জন্যই তার অপেক্ষা। যায় হোক দ্রুত তারা সব কিছু গুছিয়ে নেয়। এরপর বেরিয়ে পড়ে।

প্রথমে তারা গুলশানে যায়। সেখান থেকে মাওয়া যাবে। যাবার সময় বাড়ির জন্য এক প্যাকেট মিষ্টি নেই জান্নাত। ঢাকার মিষ্টি, বাড়ির সবাই কত না খুশি হবে এটা পেয়ে।

আজ ঢাকা শহরে বাহির এলাকার লোকের ই বসবাস বেশি। আর এখন রোজার শেষ সময়, সকলে তাদের বাড়িতে প্রিয়জনে সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য যাচ্ছে। এজন্য একটি বাস ছাড়ছে তো আর একটি বাস এসে হাজির। সেটাও চোখের পলকেই ভরে যাচ্ছে। আর এই সুযোগ টা কাজে লাগাচ্ছে বাস মালিক সমিতি। নিত্য ভাড়ার টাকা দ্বিগুন বাড়িয়ে দিয়েছে তারা। মানুষ ঈদ আনন্দ ভাগাভাগির নেশায় যেনো অন্ধ হয়ে গেছে। কারো তাতে কিছু বলার নেই।

অনেক কষ্টে জান্নাত দুটি টিকিট পায় বিআরটিসি এর। তারপর দুই বন্ধু উঠে পড়ে বাসে। নির্দিষ্ট সময়ে বাস চলতে শুরু করে। বাস যখন কেরানীগঞ্জ ছেড়ে যায় জান্নাতের মনে হয় “এইতো আর কিছুক্ষনের মধ্যেই সে ঢাকা ছেড়ে দিচ্ছে। মাওয়াটা পার হলেই আর কিছুক্ষন, তারপর নিজের এলাকা, নিজের সিক্ত মনের ঠিকানা”।

মাওয়া ঘাট যেনো আজ ভীষণ ব্যস্ত হাজার হাজার মানুষকে এই বিপুল পদ্মা পাড়ি দেয়ার জন্য। অনেক কষ্টে ঠেলেঠুলে তার বন্ধু দুইটা স্পীড বোর্ডের টিকিট নিয়ে আসে। স্পীড বোর্ডেও দুর্নীতি, যেখানে ১০ জন নেয়ার কথা সেখানে আজ ঈদের সময় ১৪ জন। এর উপর আবার দ্বিগুন ভাড়া। যাই হোক দুই বন্ধু এ নিয়ে কিছু ভাবে না কারন তারা বাড়ি যাচ্ছে ঈদ করতে, মনের মধ্যে যেনো অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করছে।

মাওয়া পার হয়ে দুই বন্ধু তাদের পরিবারকে জানায় যে আর মাত্র কিছুক্ষন তারপরেই তারাই বাড়ি চলে আসছে। দুজন ভাবে বাসে গেলে অনেকে সময় লেগে যাবে, এজন্য তারা মাইক্রো বাসে যেতে রাজি হয়। বাসের ভাড়ার থেকে দ্বিগুন ভাড়া দিয়ে তারা মাইক্রোতে ওঠে। ৯ ছিটের মাইক্রোতে ১৩ জন বসে। যায় হোক অনেক কষ্টে চেপে চুপে তারা বসে।

প্রথম দিকে মাইক্রোটি অনেক আসতে আসতে চলতে থাকে। এভাবে তারা ভাঙা পার হয়, অনেকটা সময় চলে যায়, তারপর মাইক্রোটি হঠাৎ করে জোরে চলতে শুরু করে। যখন তাদের মাইক্রোটি গোপালগঞ্জ রোডে পৌছায় জান্নাতের মন যেনো লাফালাফি করতে থাকে, ভাবতে থাকে আর মাত্র কিছুক্ষন। কিন্তু মাইক্রো চালকটি যেনো একটু অনিয়ন্ত্রিত ভাবে চালাতে শুরু করে। কয়েকটা বাসকে ওভারটেক করে খুব দ্রুত। জান্নাত ভাবে মাইক্রো কেনো আরও দ্রুতো চলে না। দ্রুত চললে সে আরও দ্রুত পৌছাতে পারবে। যখন তারা ভাটিয়াপাড়া ক্রস করে তখন মাইক্রোটি যেনো আরও দ্রুত অনিয়ন্ত্রিত ভাবে চলতে শুরু করে। জান্নাত আর তামিম চারিদিকের দৃশ্য  দেখতে থাকে। হঠাৎ মাইক্রোটা একটি বাসকে টেক ওভার করতে যায়, কিন্তু বিপরীত দিক থেকে আসা অপর একটি বাসকে দেখে ড্রাইভার সাইড নিতে চাই। কিন্তু চালক গন্তব্যে পৌছাতে ব্যার্থ হয়। বেপরোয়াভাবে চালাতে গিয়ে চালক নিয়ন্ত্রন হারিয়ে রাস্তার পাশে একটি গাছে লাগিয়ে দেয়।

দুর্ঘটনায় মাইক্রোবাস চালক ঐ স্থানেই মারা যায়। চারিদিক থেকে মানুষ ছুটে আসে। তারা গাড়ীর ভিতর থেকে সকলকে বের করে। অনেকেই আহত হয়। আহতদের সকলকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

তামিমের মাথায় হাল্কা আঘাত লাগে। আর হাতে কিছুটা অংশ ছিলে যায়। তামিম জান্নাতকে খুজতে থাকে। নিহতদের লাশগুলো রাস্তার পাশে রেখে দেয়া হয়। তামিম সেখানে যায়। যখন সে জান্নাতের দেহটা দেখতে পায়, তখন চিৎকার করে ওঠে। সে বলে জান্নাতকে চোখ খুলতে, জানায় তারা বাড়ির কাছে চলে আসছে। কিন্তু তার বন্ধু যেনো হতাশ ভাঙ্গা মুখ নিয়ে পড়েই থাকে, সে আর চোখ খোলে না। আকাশটা যেনো তীব্র রোদের মধ্যে নিশ্চুপ হয়ে যায়, আশেপাশের সকল পাখি তাদের মধুর কন্ঠের ডাক থামিয়ে দেয়। সমান্তরাল রাস্তায় কেবলই যেনো মৃত্যুর জয়ধ্বনির চিৎকার চলতে থাকে।

জান্নাত অবশেষে বাড়ি পৌছায়। তবে সুস্থ শরীরে হাসিমুখে না, নিয়তির এক অনন্ত ধারায় অন্য পৃথিবীর যাত্রী হয়ে। সে আর তার বাবা মায়ের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে না, পারেনা ছোট ভাইয়ের সাথে দুষ্টুমি করতে। তার ঈদটা তাকে এক অন্য জগৎ এনে দেয়। আর সেখানে তার আনন্দ ভাগাভাগি করতে হয় তার কবরের সাথে। ঈদের নতুন জামা পড়ে সে আর তার বাবা মাকে সালাম করতে পারে না, তাকে কাফনের নতুন কাপড় পড়েই যেতে হয় ঈদ করতে নতুন দেশে। কষ্টের টাকায় কেনা নতুন কাপড় আর তার বাবা মাকে দিতে পারে না জান্নাত।

কাছের মানুষদের কাছে পাওয়ার যে মোহ আমরা ভুলতে পারিনা, আজ সে মোহকে কাটিয়ে জান্নাতকে একাকী থাকতে হয়, এক অন্ধকারের জগতে। ছোট ছোট আনন্দ যেনো আর কখনও প্রকাশিত হতে পারে না।

 

শুধু জান্নাতের নয়, এরকম ঘটনা নিত্য ঘটছে। আমরা ছোট খাটো আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে ভুলের বসত সকলের আনন্দকে দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দেয়।

 

সকলের ঈদ শুভ হোক, ঈদ মোবারক।

About The Author
Foysal Masud
Foysal Masud
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment