একাকিত্ব এবং পারিবারিক বন্ধন

Please log in or register to like posts.
News

আজকালকার যুব সমাজ, শিশু-কিশোর এমনকি বয়স্করাও “কিচ্ছু ভাল লাগেনা” নামক অসুখে অসুস্থ।  সবকিছু আছে তারপর ও কি যেন নাই?!

বাবার টাকা আছে, সিজিপিএটাও ঠিক আছে, হয়তো লয়াল বন্ধু-বান্ধব ও আছে তবুও কি যেন নাই! ফেসবুকের হাজার ফলোয়ার, ইন্সটা আপডেট অথবা সন্ধ্যায় পথশিশদের পড়ানোর পর মুখের মিস্টি হাসিটুকুও সহজেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে! কিন্তু কেন আমরা এই ভালো লাগেনা নামক মনোরোগকে প্রশ্রয় দেই? কারণ, দিন শেষে আমরা সকলে একটা নন-জাজমেন্টাল আশ্রয় খুঁজে বেড়াই। এমন একটা আশ্রয়ের কোল খুঁজে বেড়াই যেখানে মাথা রেখে মনের সব কথা অকপটে বলা যায় অথবা নির্ভয়ে স্বীকার করে নেয়া যায় দিনের যত কুকীর্তি। আর এই আশ্রয়টা দিতে সব চেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে একটা পরিবার। ছোটবেলা থেকে যদি একটা শিশু মা-বাবার সাথে সহজে মনের কথা শেয়ার করা শেখে তাহলে বড় হওয়ার পরও সে সুন্দর করে পারিবারিক যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। হ্যাঁ, অবশ্যই বয়সের সাথে সাথে কারো কারো ক্ষেত্রে কিছুটা রাখঢাক এসে পরে অথবা অন্তর্মুখী স্বভাবের আধিপত্য দেখা যায়। তবুও আপনার ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেটা বাসায় এসে ধাম করে দরজা বন্ধ করে দিলে, সময় নিয়ে তার সাথে কথা বলুন। আপনার মেয়েটা প্রতি রাতে  কেঁদে বালিশ ভেজায় কিনা সে খবর রাখার জন্য রাতে মাঝে মাঝে দরজায় কড়া নাড়ুন। চোখে পানি দেখলে প্রথমেই প্রশ্নে জর্জরিত না করে, শান্তভাবে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিন। স্নেহের মাধ্যমে তাকে নিরাপত্তাবোধের আশ্বাস দিন।

প্রতিদিন মোবাইল/ট্যাব  এ চোখ আটকে রাখা আপনার মেয়েটিকে শুরুতেই বকাঝকা না করে, ওর মনোযোগ ডাইভার্ট করার জন্য ওকে নানারকম কাজ দিয়ে ওর ফোকাস পরিবর্তন এর চেষ্টা করুন। এরপর ওর এক্সপ্রেশন দেখুন। ওর বন্ধু হোন। শাসন করুন কিন্তু অবশ্যই দূরত্ব সৃষ্টি না করে। দেখবেন, পাশের বাড়ির “মোখলেস”-কে  নয়, আপনাকেই সে সবকিছু বলবে!

আপনার বাবা-মায়ের মাঝে দ্বন্দ্ব হলে, কানে হেডফোন লাগিয়ে জোরে গান না শুনে, রান্না ঘরে যান, তাদের জন্য নাস্তা বানান। তাদের সাথে মজার ছলে কথা বলুন। এরপর কথার ছলে দ্বন্দ্ব নিরসনের চেষ্টা করুন। যাদের রাগ এ বরফ পানি ঢাললেও শীতল হয়না, তাদের রাগের কারণ বুঝতে চেষ্টা করুন। সময় নিন, সময় দিন।

আপনার শক্ত মনের, কঠিন মেজাজি বাবাও কিন্তু একাকিত্বে ভোগেন। কখনো কি জিজ্ঞেস করেছেন তাকে “আব্বু, তোমার শরীর কেমন? এতো চিন্তা কিসের তোমার? আমাকে কি বলা যায়?” হ্যাঁ, হয়তো সে ঝাড়ি দিয়ে বলতে পারে, “ন্যাকামো হচ্ছে নাহ!” কিন্তু পরেক্ষণে একটু হলেও তার এই ন্যাকামো ভালো লাগবে।

কখনো কি মায়ের প্রেসক্রিপশনটা খুলে দেখেছেন? উনিও কিন্তু ওষুধ খাওয়ার সময় মনে মনে চান আপনি ওনার প্রেস্ক্রিপশনটা দেখে অন্তত একবেলার ওষুধটা খাইয়ে দেন। জ্বি, উনি সত্যিই আপনার কাছ থেকে একটু কেয়ার আশা করেন। আপনি যখন কেয়ার করে ওনার এই ছোট্ট না বলা আশাগুলো পূরণ করবেন, উনিও তখন কেয়ার করে মনের গহীনের কিছু কথা আপনাকে বলবেন। হ্যাঁ, ঘরে প্লাজমা টিভি থাকার পরও উনি নিঃসঙ্গ। তাকে সাধ্যমতো সঙ্গ দিন। তার আশ্রয়ের একটা কূল হোন।

আপনার কমপ্লিকেটেড ভাই অফিস থেকে ফিরলে, দুইজনের জন্য কফি বানান। একসাথে কফি খান। নিজের কথাগুলো তাকে বলুন। তার সারাদিনের কথাগুলো ও মনোযোগ সহকারে শুনুন। উনি অন্তর্মুখী স্বভাবের হলে, ওনার প্রাইভেসী এর ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল থাকুন। দেখবেন, এই শ্রদ্ধাবোধকে সম্মান করে, উনি নিজে থেকেই আপনাকে আপন ভাববেন এবং বিশ্বাস করবেন। ঘটনাক্রমে, নিজের কমপ্লিকেটেড মাইন্ড এর টুইস্টেড চিন্তাগুলো আপনার কাছেই বলে শান্তি পাবেন।

ম্যারিড কাপলরা একে ওপরের পিকচার এ শুধু ট্যাগ না দিয়ে, নিজেদের মধ্যকার সম্পর্কের খুঁটিনাটি জানুন। বন্ধুত্বের সম্পর্ক সৃষ্টি করুন। সময় পেলে সঙ্গীকে নিয়ে ঘুরতে যান। মনে রাখবেন, কেউ কেউ গিফট আর ফুল এর চেয়ে বেশি ভালোবাসে আপনার সময়। ছুটির দিন বেলা ১২ টা পর্যন্ত ঘুমিয়ে না থেকে একসাথে রান্নাঘরে নতুন কোনো ডিশ রান্না করুন। বাচ্চাদেরকে নিয়ে একসাথে খেতে বসুন। ওদেরকে অল্প ডিশ শেয়ার করে খেতে শেখান। ওদের ছোট ছোট প্রশ্নের জবাব হাসিমুখে দিন। অতিরিক্ত প্রশ্নবাণে জর্জরিত হলে, নিজেদের বিরক্তির বিষয়টিও মজা করে বলুন। যৌথ পরিবার এ থাকলে আপনার “ছোটু” কে অন্য কাজিনদের সাথে শেয়ারিং করা সেখান। আর একক পরিবার হলে, আপনার ছোটুর ওয়েফার এ একটা কামড় বসিয়ে ওর এক্সপ্রেশন দেখুন। “আমার-তোমার” না শিখিয়ে ওকে বলতে সেখান “আমাদের”। তাহলে বড় হয়ে সে সবাইকে নিয়েই চিন্তা করবে। ছোটবেলায় কাজিনদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক থাকলে, বাচ্চাদের বাইরের সঙ্গ পাওয়ার ইচ্ছা কম থাকে যেটা এই যুগে কিছুটা হলেও ইতিবাচক। এছাড়া যখন সে বড় হবে তখন মনের কথা বলার জন্য অনেকগুলো জায়গা খুঁজে পাবে।

আর আপনার দাদাভাই এবং গ্রানি? তারাও কিন্তু একা বোধ করেন। তারা সব চেয়ে বেশি একা বোধ করে কখন জানেন? যখন অন্য ঘর থেকে আপনাদের খিলখিল হাসির শব্দ শুনতে পান তখন। তাদেরকেও আপনার খিলখিল হাসির ভাগিদার করুন। নতুন কোনো জামা-জুতা কিনলে তাদেরকে দেখান। আপনার হাসিমুখ তাদেরকে গর্বিত করে। হ্যাঁ, কারো প্রকাশভঙ্গি ইতিবাচক আবার কারো নেতিবাচক। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনি চাইলেই ভালো ব্যবহার দিয়ে বরফ গলাতে পারবেন! আপনাকে শুধু নিজের আত্মবিশ্বাস এর জায়গাটাকে দৃঢ় করে সে অনুযায়ী কাজ করে যেতে হবে। দাওয়াত এটেন্ড করার সময় তাদেরকে আপনার সঙ্গী করুন। তাদেরকেও সুন্দর করে গুছিয়ে নিয়ে যান এবং সবকিছু করুন হাসিমুখে। মনে রাখবেন, আপনার কপালের ভাঁজ তাদের দীর্ঘশ্বাসকে আরো ভারী করে তুলবে।

আচ্ছা, কখনো কি একঘরে করে দেয়া আপনার সেই কাজিন “আবিদ” কে দেখতে গিয়েছেন। জানি, যাননি।  কারণ, সে মাদকাসক্ত। কিন্তু কখনো কি তার এই মাদকাসক্ত হওয়ার জন্য নিজেকে দায়ী মনে করেছেন? “আশ্চর্যতো! আমি দায়ী কেন হবো? লেখিকার মাথাটা গেসে!” কিন্তু আপনিও কিন্তু ওর মাদক নেয়ার জন্য দায়ী। কিভাবে দায়ী? সো কোল্ড ফ্যামিলি স্টেটাস মেইনটেইন করতে গিয়ে আবিদকে কখনো নিজের কাছে ঘেঁষতে দেননি। তারপর যখন ছেলেটা এসএসসি তে জিপিএ ৪.৮৯ পেয়ে মনমরা হয়ে বসে রইলো, তখনও যাননি একটা ফুলের তোড়া নিয়ে ওকে দেখতে যেতে। আস্তে আস্তে যখন একাকিত্ব আর কুসঙ্গ  ছেলেটাকে মাদকাসক্ত করে তুললো, তখন অন্য সবার মতো আপনিও তাকে একঘরে করলেন!

হায়! আফসোস! আমাদের সব আছে কিন্তু “কিচ্ছু  ভাল লাগেনা!” কারণ, কত দায়ে যে আমরা দায়ী, নিজেরাও সেটা জানিনা।…

এই দায় পূরণের দায়বদ্ধতা মেনে যদি একটু পারিবারিক বন্ধনের পিছনে সময় আর শ্রম দেই তাহলে আর “কিচ্ছু ভাল লাগেনা” নামক অসুখ থাকবে না। আমরা সমাজ পরিবর্তন করতে চাই ভঙ্গুর পারিবারিক বন্ধন নিয়ে। তাই আমরা সমাজ পরিবর্তন করতে পারিনা। আগেতো পরিবারটাকে সুন্দর করি। তারপর সমাজটাকে সুন্দর করে গড়ে তুলবো। আর একাকিত্ব? একাকিত্বতের সময় কই হতাশ করার যদি সবকিছু করার সময় আন্তরিকভাবে উপভোগ করি?

চোখ বন্ধ করে, একটু ঠাণ্ডামাথায় চিন্তা করুন। একাকিত্ব আপনার চিন্তার একটি বহিঃপ্রকাশ। আপনার চিন্তাকে প্রোডাকটিভ করুন। কাজকর্মে চিন্তার প্রতিফলন ঘটান। কি বললেন? ওহ, আচ্ছা; ‘সুইসাইড’ নিয়েতো কিছু বলেনি। হুমমম…তাইতো, ‘সুইসাইড’ নিয়েতো কিছু বললাম না। কেন বলবো বলুনতো? এই ৭.৫ বিলিয়ন জনগোষ্ঠীর বিশ্বে ‘সুইসাইড’ একটা করার মতো কাজ? আর আমরা কি কাপুরুষ? নাহ, আমরা বীরের জাতি। পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় থাকলে সুইসাইড করার সময়ই পাবেন না! আচ্ছা, আপনি একাই দুনিয়ায় এসেছেন? ভাই/বোন, সবাই একাই দুনিয়ায় আসে। কিন্তু ক্ষনিকের এই যাত্রায় ৭.৫ বিলিয়ন মানুষ থেকে যাদের আপনার আপন মনে হবে, তারাই আপনার পরিবারের মতো! তাই, নিজেকে ভালোবাসুন। নিজের পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করুন। আর একাকিত্বকে দিন ফেয়ারওয়েল!

Reactions

1
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

1

Nobody liked ?