Now Reading
অনুসন্ধান (২য় পর্ব)



অনুসন্ধান (২য় পর্ব)

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

অনেক চেষ্টা করেও ঘুমের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেল না। চিন্তার গভীরতা এতটাই প্রবল ছিল যে সেটা ঘুমের দেয়ালকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দিয়েছিল। কোন ভাবেই ওই ঘটনাটা  মন থেকে সড়াতে পারছিলাম না। এতটাই বিস্মিত হয়েছিলাম যেন মনে হচ্ছিল আমি যদি কোন কার্টুন চরিত্র হতাম তাহলে অবশ্যই আমার মাথার উপর বিশাল আকৃতির একটা বিস্ময়সূচক ও হাজারটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখা যেত।

পরদিন সকাল থেকেই মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করছিল। যত সময় যাচ্ছিল ততই সেই অস্থিরতা বাড়ছিলো। আমি রাতের অপেক্ষায় ছিলাম কিন্তু সেদিন সময়কে মনে হয় একটু বেশিই অলসতায় পেয়েছিল, তাই তার বয়ে চলার গতি ছিল মন্থর। আসলে সময়ের জন্য অপেক্ষা করলে সে অপেক্ষা হয় অনন্তকালের, আর তাকে বেঁধে রাখতে চাইলে সে রূপ নেয় সাইক্লোনে। আমি তখনও মেয়েটার প্রতি কোন আকর্ষণ অনুভব করিনি। এত সহজে আমি কোন কিছুতেই আকৃষ্ট হই না। আমাকে শুধু টানছিল তার কথা গুলো, আর কিছু প্রশ্ন যার উত্তর জানা ছিল জরুরী। কেননা এগুলোর জন্য আমি স্থির হতে পারছিলাম না।

আস্তে আস্তে সমস্ত পৃথিবীকে আলিঙ্গন করল আধার আর আমার মনে জ্বলে উঠলো একটা আলোকছটা। কিন্তু সেটা ভাল করে জ্বলার আগেই ধপ করে নিভে গেল। ভাগ্যটা সেদিন ছিল বৈরি। পড়ানো শেষ করে বের হতেই বাঁধন ফোন করল। ও বলল “সবাই অপেক্ষা করছে, চলে আয়”। বলেই ফোন রেখে দিল। আমি জানতাম ওরা কোথায় আছে। প্রায় দিন পড়ানো শেষ করে আমরা আড্ডা দেই Exim Bank এর সামনের খালি জায়গাটায়। আমার বাসায় ফেরার রাস্তাও সেটাই। আমি ভাবলাম যে কোন একটা অজুহাত দেখিয়ে ৯ টার মধ্যেই সেখান থেকে চলে আসব। আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম বাঁধন, সালমান, রাকিবুল, রিমন আর তারিকুলকে। সালমান সাভার থাকে, এই সময়ে ওর এখানে আসবার কথা নয়। জিজ্ঞাসা করব তার আগেই বাঁধন আমার হাত টেনে ধরে বলল – চল।

– কোথায়?

– ভুলে গেছিস আজ না মিজানের জন্মদিন?

– ও হ্যাঁ। ভুলেই তো গেছিলাম।

– আচ্ছা চল এখন। কেক আনতে হবে। মিজানকে ৯ টায় আসতে বলছি। এর মধ্যে আমরা সব ঠিক করে ফেলব।

আমি কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু এটা নিশ্চিত ছিলাম যে আমার আর আজকে ওই মেয়েটার সাথে দেখা হবে না। যেটা সম্ভব হবে না সেই জিনিস নিয়ে আমি চিন্তায় পরে থাকি না। কারন এতে ফলাফল স্বরূপ মস্তিষ্কে কিছু চাপ আর মনে খানিকটা  হতাশা ছাড়া প্রাপ্তির খাতায় আর কিছুই জমা পরে না। তাই আর কিছু না বলে বাঁধনের সাথে পা বাড়ালাম। সব বন্ধুদের সাথে একত্রিত হওয়ার পর যত প্ল্যান তা বরাবরই আমার আর বাঁধনের করতে হয়; সেটা কোন অনুষ্ঠান হোক বা কোথাও ঘুরতে যাওয়া হোক। আর খাওয়া-দাওয়ার সমস্ত ভার মিজানের; আমার মনে হয় ও এই জিনিসটাই সবচেয়ে ভাল করতে পারে।  প্রতিবার যে কারো জন্মদিনে আমাদের সাথে আরও বন্ধুরা থাকে। কিন্তু এবার শুধু এই কয়েকজন। কেননা সবাই তাদের নিজেদের জীবন গড়তে দূরের পথে পাড়ি জমিয়েছে। আমাদের বন্ধুমহলে আরও ২ জন আছে, সান্ত্বনা আর সুমাইয়া। যে কোন বিশেষ দিনেই তারা আমাদের সাথে যোগ দেয়। এবার সান্ত্বনা মেডিকেল কলেজে থাকার কারনে আসতে পারে নি। আর সুমাইয়ার অবস্থান এখন নেটওয়ার্কের বাইরে। তাই আমরা যারা এই এলাকাতে থাকি শুধু তারাই আছি।

মজা আর আড্ডার পর্বের যবনিকা টেনে যখন বাসায় ফিরছিলাম তখন রাত ১০.৩০। অতএব সেই নারীর আমার জন্য অপেক্ষার পালা যে অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে সেটা পরিষ্কার। আমার আর রাকিবুলের বাসা একই দিকে। বাসায় ফিরতে আমরা যেখান থেকে পৃথক হই সে পর্যন্ত এসে কোন দিনই আমাদের কথার সমাপ্তি ঘটে না। সেদিনও তার অন্যথা ঘটলো না। তাই সেখানে বসে দুই কাপ চা এর সাথে এই কথা সেই কথায় কেটে গেল আরও আধ ঘণ্টা।

আমি আমাদের বাসার গলিতে ঢুকলাম। আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম সে এখানে নেই। তবুও ওই আধো অন্ধকার জায়গাটার দিকে একবার তাকালাম।  নিরাশ হয়ে অগ্রসর হলাম সামনে। হটাত করে মেয়েটার বাসার বারান্দায় চোখ পড়লো। আমি এই এলাকায় ৬ বছর ধরে আছি কিন্তু কখনও ওইদিকে আমার চোখ যায়নি। আজ হটাত স্বাভাবিকতার বিপরীত । আমি দেখলাম সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখেই ভেতরে চলে গেল। আমি আমার মত বাসার দিকে ফিরছিলাম। ওদের বাসার ঠিক নিচে আসতেই ঘটল আর একটা অবাক কাণ্ড যেটা ছিল আমার কল্পনারও বাইরে। অবশ্য তার সাথে কথা হবার পর থেকেই জীবনের সব অকল্পনীয় জিনিস গুলো ঘটে চলেছে। আচমকা উপর থেকে আমার মাথা বরাবর কে যেন পানি ঢেলে দিল। বিষয়টা কি হল বুঝে উঠার আগেই আরও একবার পুনরাবৃতি ঘটল সেটার। আমি পুরো কাক ভেজা হয়ে গেলাম। কে এই কাজটি করেছে সেটা না বুঝার কোন কারন নেই। তবুও একবার ২ তলার বারান্দার দিকে তাকালাম।  যাকে কল্পনা করেছি সে’ই। তার হাতে আরও এক জগ ভর্তি পানি। কি সাংঘাতিক! তার মানে তার ইচ্ছা আমাকে আরও একবার ভেজানোর। আমি তার দিকে রাগান্বিত হয়ে তাকাতেই সে থমকে গেছে। আমি কি করব বুঝতে পারছিলাম না। কিছু না বলে পেছন ফিরে চলতে শুরু করতেই সে ওই পানিটুকুও আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।

মেঘ বৃষ্টিহীন মাঝরাতে কেউ কাক ভেজা হয়ে বাসায় ফিরবে এটা বোধ করি বাসার অন্যান্য সদস্যরা কখনই চিন্তা করে না। আমার ক্ষেত্রেও তার বিপরীত ঘটল না। আমার ছোট ভাই সৌরভ বরাবরই একটু ড্রামাবাজ। দরজা খুলেই ভূত দেখার মত একটা চিৎকার দিয়ে ভেতরে চলে গেল। আমার বাবা মা ড্রয়িং রুমেই বসে ছিলেন। অনেকক্ষণের প্রশ্ন উত্তর পর্বের পর আমি তাদেরকে বুঝাতে সক্ষম হলাম জন্মদিন উপলক্ষে পানি ছুঁড়াছুঁড়ি খেলার নিদর্শনই আমার সর্বাঙ্গ বহন করছে। আমার মা তার সবচেয়ে পরিচিত ডায়লগ দিয়ে প্রশ্ন উত্তরের পর্ব শেষ করলেন। তিনি বললেন ওদের সাথে আর না মিশতে। আমি যে এত বড় হয়ে গেছি সেটা আমার মা কখনই ভাবেন না। সত্যি, মায়ের কাছে সন্তান সব সময়েই শিশু। আমি হ্যাঁ  সূচক মাথা নাড়িয়ে আমার ঘরে আসলাম। ভেজা শরীরে খাটের উপর বসে পুরো ঘটনাটা আবারও মনে করলাম। এতক্ষণ মেয়েটার উপর অসম্ভব রকম রেগে ছিলাম। কিন্তু এমন দুর্ধর্ষ কাজ কেউ করতে পারে সেটা ভাবতেই সমস্ত রাগ চলে গেল। পাগলের মত উচ্চস্বরে হাসলাম কিছুক্ষণ। আমি একটা ঘটনার কারনে গত ১ বছর ধরে ডাইরি লিখি না। কিন্তু সেদিন পুরনো ডাইরিটা খুজে বের করে শুধু লিখলাম

“অদ্ভুত!… হা! হা!! হা!!!…”

About The Author
Maruf Mahbub
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment