সাহিত্য কথা

অনুসন্ধান (৩য় পর্ব)

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

বছর খানেক আগে ডাইরিটার শেষ লেখার মাধ্যমে শেষ করেছিলাম জীবনের একটা পুরনো অধ্যায়ের। এখন কি আবারও নতুন একটা পাতায় নতুন করে লিখতে যাচ্ছি তেমনি কোন কাহিনী? ভয় হচ্ছিল কারণ আগের মত এটাও যদি অসমাপ্ত থেকে যায়? যদি জীবনের পাতা অলেখা থাকতেই আবারও ফুরিয়ে যায় শব্দ গুলো? অসমাপ্ত সকল কিছুতে অনেক ভয় আমার। কেননা, অপূর্ণতা না যোগায় বাঁচার অবলম্বন আর না’ই বা করে পুরোপুরি নিঃস্ব।

সে যা’ই হোক, সবকিছুর পরেও হৃদয়ের অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা অন্যরকম ভাললাগা কাজ করছিল। একটা মেয়ে আমাকে এভাবে ভাবে, আমি কখন বাইরে যাই, কখন ফিরি তার খেয়াল রাখে, এর থেকে ভাল লাগার আর কি হতে পারে? নিজেকে সিনেমার নায়কের চেয়ে কোন অংশে কম মনে হচ্ছিল না। একটা অস্থিরতা কাজ করছিল মনে, কিন্তু সে যে ভাল লাগারই সেটা বোঝাও কষ্টকর ছিল না।

পরদিন যথা সময়ে জায়গামত যেয়েও মেয়েটাকে পাওয়া গেল না। আমি চলে না এসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। যদিও সেদিন সে আসবে কিনা নিশ্চিত ছিলাম না। তবুও…। অপেক্ষার প্রহরগুলো অনেক বেরসিক হয়। যেন সময় একেবারেই থমকে দাঁড়ায়। আমার মতে অপেক্ষা করার মত বিরক্তিকর কাজ আর নেই। যদিও এই সময়ে এই জায়গায় মানুষের আনাগোনা একেবারেই কম। তবুও মনে হচ্ছিল আশেপাশের মানুষগুলো চলার পথে আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। প্রায় ২০ মিনিট পর তাকে দেখা গেল; আমার দিকেই আসছে। আমাকে দেখে সে তার চলার গতি স্বাভাবিকতার চেয়ে খানিকটা বাড়িয়ে দিল। আমি আগে থেকেই নিশ্চিত ছিলাম সে আমার উপর রেগে আছে, রেগে থাকাটাই স্বাভাবিক।  কেননা আমি এই ২০ মিনিট অপেক্ষা করেই হাঁপিয়ে গেছি, না জানি সে গতকাল কত সময় অপেক্ষা করেছে। তার রাগের মাত্রা কত ডিগ্রি সেটা জানতে বেশি সময় অপেক্ষা করতে হল না। কাছে এসেই সে কোন কথা না বলে আমার শার্টের কলার টেনে ধরল। এমন একটা ভাব যেন আমাকে এখনি শূন্যে নিক্ষেপ করতে পারে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সেদিন তার আচরণে আমি একটুও বিচলিত হলাম না। বরং ভাল লাগছিল। তাই নিজেকে ছাড়ানোর কোন চেষ্টাই ছিল না আমার। এমন একটা পরিস্থিতিতেও যে মানুষের ভাল লাগা কাজ করতে পারে সেটা ভেবেই যেন অবাক হলাম। সে শুরু করল তার কথার গোলা বর্ষণ। আমার শার্টের কলার টানতে টানতে সে বলল;

“ওই, কালকে তোকে কখন থাকতে বলেছিলাম, আসিস নি কেন? কোথায় ছিলি এত রাত পর্যন্ত? বল?”

আমি পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম এই ভেবে যে গতদিন তবু ‘তুমি’ পর্যন্ত ছিল। আজ সরাসরি তুই! আগামীতে কি বলবে কে জানে। আমি অনুতপ্ত আসামীর মত পুরো ঘটনাটার বর্ণনা দিলাম। শুনে সে বলল;

– বন্ধুর জন্মদিন তাহলে আগের দিন বলে দিলি না কেন?

– আমার মনে ছিল না।

দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল; “ কি মনে থাকে তর?”

আমি তার থেকে যথেষ্ট লম্বা হওয়ায় আমার কলার ধরার জন্য তাকে আমার অনেকটা কাছে সরে আসতে হয়েছে। আর উত্তেজনার বশে কথা বলতে বলতে সে দূরত্বটাও অনেক কমে এসেছিল। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিলাম আর প্রত্যক্ষ করছিলাম কথার ভঙ্গিতে কিভাবে তার ঠোঁট কেঁপে কেঁপে উঠে, সেই ঠোঁট একটু বেঁকে গেলেই কিভাবে শ্রোতাকে আকৃষ্ট করার জন্য গালে সৃষ্টি হয় টোলের। সে অসম্ভব রকমের সুন্দরী। তার পুরো মুখমণ্ডলে সদ্য জন্মানো একটা অবাধ্য ব্রণ ছাড়া আর কোন দাগ নেই। কিন্তু ডান পাশে থাকা ব্রণটি তার সৌন্দর্যকে একটুও না কমিয়ে বরং আরও বৃদ্ধি করেছে, সমস্ত চেহারাকে করেছে আরও নিষ্পাপ। সে যখন বুঝতে পারলো আমরা এতটা কাছাকাছি, তখন সে এক ঝটকায় আমার শার্টের কলার ছেড়ে দিল এবং স্বাভাবিক দূরত্বে দাঁড়ালো। এতক্ষণ যে মেয়েটি উচ্চশব্দে আমাকে শাসাচ্ছিল, সে’ই এখন মূর্তির মত নির্বাক হয়ে গেছে। লজ্জায় সে কোন কথা বলতে পারছিল না। তার দৃষ্টি ছিল নিচের দিকে। এ যেন সম্পূর্ণ দুটো ভিন্ন চরিত্র। তার নিস্তব্ধতায় নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল চারপাশ, যেন প্রকৃতিও তার অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য জানাচ্ছিল সমবেদনা।

কিছুক্ষণের মৌনতা ভেঙ্গে আমি জিজ্ঞাসা করলাম

– রাগ কমেছে আপনার?

সে মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক উত্তর দিল।

আমি প্রশ্ন করলাম

– আচ্ছা, আপনি আমার দিকে এত নজর রাখছেন কেন? কবে থেকেই বা রাখছেন?

– আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই। আমি তো কাউকে কোন কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।

– কৈফিয়ত চাইছি না। শুধু জানার ইচ্ছা।

– সব ইচ্ছাই কি পূর্ণতা পায়?

– তা হয়তো পায় না। কিন্তু যেটাকে ইচ্ছা করলেই পূর্ণতা দেয়া যায় তাকে পায়ে ঠেলাও তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাই না?

– তোমাকে বুদ্ধিমান বানানোর ভার তো আমি নিয়ে রাখিনি।

– তাহলে বোকা কেন বানাচ্ছেন?

আজ আসার আগে ভেবেছিলাম ও’কে ‘তুমি’ বলে ডাকবো। কিন্তু সে আমার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ায় সব গুলিয়ে ফেলেছি। শেষ প্রশ্নটা করার পর সে শুধু হাসল। কে যেন বলেছিল; কারও হাসিতে মৃত্যু লেখা থাকে, কেউ হাসির ফাঁদে যে কাউকে জড়িয়ে ফেলতে পারে। তার হাসিতে আমার অনুর্বর আত্মার মৃত্যু ঘটেছিল কিনা জানি না কিন্তু আমি যে আস্তে আস্তে তার ফাঁদে বন্দি হচ্ছিলাম সেটা নিশ্চিত। সে তখন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমি বললাম ; উত্তর দিচ্ছেন না যে? সে বললঃ

– যদি একটা মানুষ সম্পর্কে সব কিছু জানা শেষ হয়ে যায় তাহলে তার প্রতি আকর্ষণও  ফুরিয়ে যায়, আস্তে আস্তে সে মূল্যহীন হয়ে পরে। আমি মূল্যবান থাকতে চাই তোমার কাছে। না হয় এই অনুসন্ধানের আকর্ষণেই তুমি আমাকে মনে রাখবে, কাছে টানবে।

এর উত্তরে আমার কি বলা উচিৎ ছিল আমি জানি না। তাকে জোর করারও কোন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি নি। শুধু তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম; “তাহলে কি প্রশ্নগুলো বিনা উত্তরেই পরে থাকবে?”

সে বলল; অবশ্যই না। আমারও অনেক প্রশ্ন আছে তোমার কাছে। কিন্তু এখন সে প্রশ্নের সময় নয়। আস্তে আস্তে তোমাকে আবিষ্কার করে নেব নিজের মত করে। আচ্ছা তোমার নাম টা তো বললে না?

– সেটাও ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেই?

– ঠিক আছে। কিন্তু এখন একটা নাম তো চাই, তুমি একটা নাম দাও আমার।

হটাত করে কি নাম দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। যদি তার পছন্দ না হয়? আমার সব থেকে কাছের বন্ধু মাসুমকে তার প্রেমিকা রূপাই নামে ডাকতো। সে মাসুমকে বলেছিল তার ও একটা নাম দিতে। বর্তমানে প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যে রোমান্টিকতার একটা মুখ্য ভূমিকা পালন করে ছদ্ম নাম। আর সে নামের মধ্যেও থাকতে হয় মিল। যেমনঃ রোমিও- জুলিয়েট, শিরি- ফরহাদ। তেমনি রূপাই এর বিপরীতে সাজু ছাড়া অন্য কোন নাম ই যথাযত নয়। তাই মাসুমও তার প্রেমিকার নাম দিয়েছিল ‘সাজু’। মাত্র একবারই সে এই নামে ডাকতে পেরেছিল। আর এতেই তার প্রেমিকা ক্ষেপে গিয়েছিল। মেয়েটির মতে নামটা ছিল ‘বিশ্রী’। আর এমন নাম দেয়ার ফলাফল স্বরূপ তাদের সম্পর্কেরই ইতি টানতে হয়েছিল। যার মাথায় সাহিত্য ঢুকে নি, তার প্রেম হয়তো ততটা গভীর হয়না। আমার যদিও সম্পর্ক ভাঙার কোন ভয় ছিল না, তবুও নাম পছন্দ না হলে এই দুর্ধর্ষ মেয়েটি আমাকে দুই তিন টা ঘুষি মেরে আমার দাঁত ভেঙ্গে দিতে পারে আমি নিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে পরার আগেই আমি বললাম; “নাম রাখার জন্য আমাকে কিছু সময় দাও”। এই প্রথম আমি তাকে তুমি বললাম। সে যে খুশি হয়েছে সেটা তার মুখ দেখে অনুমেয়। সে বলল-‘কতটা সময়?’

– কয়েক বছর।

– আরও কিছু সময় নাও। এই যে ধর দুই তিন যুগ? হবে?

আমি মজা করে বললাম “এর মধ্যেই হয়ে যাবে”। সে বলল; “কালকে নাম বলবে, না হলে কি করি দেখবে। এখন যাই অনেক দেরি হয়ে গেছে”।

যদিও আমাদের পথ একই দিকে তবুও সে আমার জন্য অপেক্ষা না করেই চলে গেল। আমি তার পথের পাণে চেয়ে রইলাম। তার প্রতিটি পদক্ষেপেই ছিল আমার দৃষ্টি। মনে হচ্ছিল এমনই ধীর পদক্ষেপে সে প্রবেশ করছে আমার মনে, আমার শিরায়-উপশিরায় বা তার থেকেও অস্তিত্বের কাছাকাছি যদি আর কোন জায়গা থেকে থাকে তাহলে সেখানটাতেই।

(চলবে…)

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

সেই মেয়েটির প্রেম -৩য় পর্ব

Md.Biplab Hossain

হয়তো প্রেমের গল্প

Rohit Khan fzs

পুরানো তিমির [১৪তম পর্ব]

Ikram Jahir

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy