Now Reading
মানুষ, না উটপাখি?



মানুষ, না উটপাখি?

আমি অন্য সকলের মতো সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপ হাতে খবরের কাগজে চোখ দিতে পারি না। বাসায় দুটো পত্রিকা রাখা হয়। একটা বাংলা, একটা ইংরাজি। অন্য সকলেই পত্রিকা পড়ে। আমার মেয়ে, রুবি, ইংরেজি পড়ে। ওকে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে দেয়া হয়েছিলো। বাংলা কথা শুনে বুঝতে পারে, বলতেও পারে। শুধু লেখাগুলোর সাথে ওর এখনো তেমন একটা বন্ধুত্ব্ হয় নি। ইংরেজি পত্রিকা বাসায় ওর জন্যেই রাখা। রুমানা ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে চোখের সামনে বাংলা পত্রিকা ধরে বসে থাকে। আমি বুঝি না, এত কি পড়ার পায় ও। সবার হাতে চায়ের সাথে খবরের কাগজ থাকে, আমার শুধু কাপ। নাস্তার টেবিলে তেমন কোনো কথা হয় না। রুমানা মাঝে মাঝে মৃদু ধমক দেয়,
-‘এই সময়ে এসেও কেউ পত্রিকা না পড়ে, খবর না শুনে থাকতে পারে, তোমাকে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না।’
আমি কিছু বলি না, একটু হাসি শুধু।
নাস্তা শেষে রুবি বেরিয়ে যায়, স্কুলের জন্যে। ও নবম শ্রেণীতে পড়ে। একসময় রুমানা ওকে আনা-নেয়ার কাজটা করতো। একটু বড় হয়ে যাবার পর, এখন রুবি একাই যেতে পারে। স্কুল খুব দূরে নয়। মিনিট পনেরোর পথ।
ও বেরোবার পর রুমানা কখনোসখনো মীনাবাজারে যায়। খুঁটিনাটি বাজার ও-ই করে ওখানে। আমি চলে আসি অফিসে।
অফিস বলতে রিয়েলস্টেট কোম্পানি। অফিসে কাজ তেমন থাকে না। দেয়ালের সাথে সেঁটে থাকা বড়সড় সাইজের একটা টিভি চলতে থাকে অলসভাবে। তাতে বেশিরভাগ সময়ই চলে খেলা, নয়তো খবর। আমার পাশের ডেস্কে বসেন হামিদ সাহেব, উনি স্মার্ট ধরনের মানুষ। চব্বিশঘণ্টা নিজেকে সবজান্তা বানিয়ে রাখতে পছন্দ করেন। দেশের কোথায় কি হচ্ছে, দেশের বাইরে কোথায় কি হচ্ছে, কি হতে পারে, সেসব তার চেয়ে ভালো অন্তত এই অফিসে আর কেউ জানেন বলে আমার মনে হয় না। তেমন কাজ না থাকলে অফিসে সকালের আধঘণ্টা কাটান তিনি পত্রিকা পড়ে। দুপুরবেলা লাঞ্চের সময়টা কাটান খেতে খেতে খবর দেখে। আমি পারতপক্ষে এই সময়টাতে ডেস্কে থাকি না। ক্যান্টিনে চলে যাই। হামিদ সাহেব একা একা খবর দেখতে থাকুন, শুনতে থাকুন। অবশ্য উনি একা একা খবর শুনতে ভালোবাসেন না। তার পাশে একজন থাকতে হয়, যাকে নিয়ে খবর পর্যালোচনা করতে পারবেন। সেই একজনটা হলেন গনি মিয়া। ছোটোখাটো মানুষ। গম্ভীর ধরনের মুখ, কিন্তু কথা বলতে পারেন অস্বাভাবিক রকমের বেশি। হামিদ সাহেবের সাথে তাই তার আলাপটা বেশ ভালোই জমে ওঠে।
সন্ধ্যা ছ’টার মতো বাজে। বাসে করে বাড়ি ফিরছি। বাদুড়ঝোলা হয়ে প্রায় আধঘন্টার মতো দাঁড়িয়ে ছিলাম, তারপর বসার সুযোগ মিলেছে। এই সময়টা রুবির বাসায় ফেরার সময়। ক্লাস শেষে দু’ জায়গায় কোচিং শেষে ও ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরে। রুমানা ঠিক এই সময়টাতে ফোন করে। শুধু একটা কথা বলে ফোন কেটে দেয় ও। ‘রুবি বাসায় ফিরেছে।’ তারপরই খট করে নামিয়ে রাখে ফোনটা। আমার অবশ্য কিছু বলার থাকে না তখন। মেয়ের কন্ঠটা ফোনে অস্বাভাবিক মিষ্টি লাগে শুনতে। সব বাবার-ই কি না, কে জানে। ইচ্ছেটাকে লুকিয়ে রাখি। ও এত ক্লান্ত হয়ে এসেছে। একটু জিরোবে, ভাত খাবে, সারাদিন পর, কথা বলি না আর তাই।
বাসটা জ্যামে আটকে আছে। ঘড়িতে চোখ পড়তেই দেখি, সাড়া ছ’টার বেশি বাজে। এতক্ষনে রুবির চলে আসার কথা, রুমানার আমাকে ফোন করার কথা। ফোনটা পকেট থেকে বের করি, কোনো মিসড কল নেই। এই সময়টা ফোন না পেলে বুকের ভেতর ঢিবঢিব করে আমার। ফোন দিই।
-‘রুবি ফিরেছে বাসায়?’
-‘হ্যাঁ, ফিরলো। খাচ্ছে।’
-‘ফিরলো, মানে? আমাকে ফোন করবে না তুমি?’
-‘করতাম। মেয়েটার বেশি খিদে পেয়েছিলো।’
রুমানার কন্ঠ কৈফিয়তের মতো শোনায়। আমার রাগ তাতে কমে না।
-‘আশ্চর্য। এত ইরেসপন্সিবল কেন তুমি?’
ফোন কেটে দিই।
নেমে যাবো, তার একটু আগে একটা শোরগোল ওঠে বাসের ভেতর। ভেতরে আবছা আলো-অন্ধকার। লাইট ছিলো পাঁচটা, জ্বলে আছে দু’টা। অন্যগুলো নষ্ট, নাহয় ভাঙা। যা বোঝা গেলো, এই অন্ধকারের ভেতর কে যেন একটা মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে। পেছনের দিকে ছিলাম। একটু সামনে চলে আসি। মেয়েটা মহিলা সিটে বসে কাঁদছে। কালো মতো, মোটাসোটা এক ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার গা থেকে ভুরভুর করে সিগারেট আর কীসবের যেন গন্ধ আসছিল। আমি নাকে রুমাল দিয়ে নেমে পড়ি। এসব ঝামেলার ভেতর থাকার কোনো মানে হয়?
দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে রুমানার সাথে আমার তেমন ঝগড়া কখনো হয়েছে কি না, মনে পড়ে না। একটু রাগ হয়তো করি মাঝে মাঝে, তেমন বড় কিছু না। ঘন্টাখানেক কথা বলি না। তারপর ও নিজেই গুটিগুটি পায়ে আসে, বলে,
-‘চলো, খাবে।’
আমি চুপ করে থাকি। তারপর ও বলে,
-‘আচ্ছা, আমি স্যরি তো। অনেক অনেএএক স্যরি। চলো না খাই। খিদে লাগে তো।’
কখনো আমি ভুল করলেও স্যরিটা ও-ই বলে। রাগ করে থাকতে পারি না আর। খেতে যাই।
অথচ, আজ ওর সাথে ঝগড়া বেঁধে গেলো। সন্ধ্যেবেলায় রুবি ফেরার পরে কেন ফোন দেয় নি, সেটা নিয়ে। ও বললো,
-‘ কখনো একটু দেরি হতেই পারে। এটা নিয়ে এত রিয়্যাক্ট করার কি আছে?’
আমি আরো রেগে যাই।
-‘রিয়্যাক্ট করার কি আছে, না? বাইরে তো যেতে হয় না, বোঝো না তো কিছু।’
সে চুপ করে যায়। কিছু বলে না আর। খেতেও বলে না।
শুধু মধ্যরাতে বুকের পাশে ভারী কিছু অনুভব করে ঘুম ভেঙে যায়। রুমানা মাথাটা বুকের উপর রেখে বলে,
-‘স্যরি আমি। বুঝি নি, তুমি এত চিন্তা করো।’
আমার চোখ ভিজে আসে। হয়তো ঘুমুতে পারছে না সে। কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলি,’ঘুমাও’। চুপ করে থাকে। অন্ধকারে দেখতে পাই না- ঘুমিয়ে পড়ে হয়তো, হয়তো না।
কয়েকদিন ধরে অফিসের কাজে ঠিক মন বসাতে পারছিলাম না। কাজ খুব বেশি, তা নয়। কিন্তু মনোযোগ থাকাটা জরুরী। ইদানীং কি যেন হয়েছে, কোনোকিছুতে মন বসাতে পারি না। পরদিন সকালে অফিসে গিয়ে কয়েকটা ফাইল নিয়ে বসি। গতকালের, দেখা হয় নি এখনো। অফিসের পিয়ন এসে জানায়, স্যার দেখা করতে বলেছে। আশ্চর্য হবার মতো কিছু নেই। উনি ছোটোখাটো বিষয়েও আমাদের ডেকে পাঠান।
বসে আছি আফজাল সাহেবের সামনের চেয়ারটাতে। এসি রুমেও একটু একটু করে ঘামছি। আফজাল সাহেব প্রশ্ন করলেন,
-‘আপনার কি কোনো সমস্যা হচ্ছে এখানে?’
আমি চুপ করে থাকি।
-‘শুনলাম আপনি না কি কারো সাথে তেমন কথা বলেন না অফিসে, কখনো টিভি দেখেন না, খবরের কাগজও পড়েন না।’
-‘স্যার, আপনার কি মেয়ে আছে?’

হঠাতই প্রশ্ন করি।

একটু অবাক হলেন তিনি।
-‘হ্যাঁ, দুটো।’
আবার প্রশ্ন করি,
-‘স্ত্রী আছে?’
-‘হ্যাঁ, কিন্তু এসব কথা কেন?’।
-‘আপনি প্রতিদিন খবর দেখে, পেপার পড়ে এত নির্বিকার কিভাবে থাকতে পারেন স্যার? রাস্তাঘাটে, সবখানে মেয়েদের নির্যাতনের, ধর্ষনের খবরগুলো কি আপনার চোখ এড়িয়ে যায়? আপনার মেয়েদের জন্য, স্ত্রীর জন্য চিন্তা হয় না?’
একটু থেমে নিয়ে বলি,
-‘ আমার স্যার একটামাত্র মেয়ে। সারাদিন বাইরে ক্লাস করে, কোচিং করে। কোথায় যায়, কিভাবে যায় জানি না। ওর মা-কেও বাইরে যেতে হয়। তার উপর কাগজ খুললে, খবর দেখলেই ওসব। বুকের ভেতর চিন্তায় ধুকধুক করে স্যার। কাজে মন দিতে পারি না। সেদিন তো চোখের সামনে দেখলাম, বাসে এক মেয়েকে অপমান করছে।’
আফজাল সাহেব চুপ করে থাকেন, বেশ অনেকক্ষণ- মাথা নিচু করে। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
-‘উটপাখি দেখেছেন কখনো? ওদের স্বভাব জানেন?
আমি চুপ করে থাকি এবার।
-‘ওরা বিপদ দেখলে বালির ঢিপিতে মাথা গুঁজে থাকে, ভাবে, কেউ ওদের দেখতে পাচ্ছে না। শরীরটা তো ঢাকতে পারে না, বিপদও তাই আটকে থাকে না। বরং আরো সহজে কাবু করে।’
তারপর উনি প্রশ্ন করেন,
-‘আপনি-আমি তো মানুষ, তাই না? না উটপাখি?’
আমি উত্তর দিতে পারি না। মস্তিষ্কের ভেতর বেজে চলছে, ’আপনি তো মানুষ, না উটপাখি?’

About The Author
Pulak Mondal
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment