Now Reading
অনুসন্ধান (৪র্থ পর্ব) – শেষ পর্ব



অনুসন্ধান (৪র্থ পর্ব) – শেষ পর্ব

[গল্পটি সম্পূর্ন কাল্পনিক। কারো জীবনের সাথে মিলে গেলে তা কেবলই কাকতালীয় ] 

তার প্রতি যে আমি একটা প্রবল আকর্ষণ অনুভব করছিলাম এটা সত্যি। আর এটাও বুঝতে পারছিলাম এই আকর্ষণ শুধু ভাললাগার নয়। আমার কল্পনার জগতে তার ছিল নিত্য চলাচল। আস্তে আস্তে সে হয়ে উঠছিল আমার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কেউ যখন হৃদয়ের এত কাছে চলে আসে তখন মনে একটা ভয়ের উদয় হয়, একটা সূক্ষ্ম কিন্তু প্রখর ব্যাথা অনুভূত হয়; ভয়টা হারিয়ে ফেলার আর ব্যাথাটা তার যন্ত্রণার। আমি তাকে হারাতে চাচ্ছিলাম না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা ছিল আমার সর্বস্ব দিয়ে হলেও অন্তরের অন্তঃস্থলে তাকে আগলে রাখব, বিস্বাদ নীলিমার কোন স্পর্শ লাগতে দেবো না তার মনে, তার চোখে জমতে দেবো না কাল মেঘ। সে কে এই প্রশ্নটা বোধ হয় মন থেকে তখন উধাও হয়ে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল তার সাথে আমার জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক।

তার একটা নাম দেয়া প্রয়োজন ছিল। ‘নাম’ যদিও কেবল একটা সম্বোধন তবুও আমি চাচ্ছিলাম এমন একটা ‘বিশেষ্য’ যার মাধ্যমে তাকে সম্পূর্ণ বিশেষায়িত করা যায়। আমি মনে মনে যে নামটা ভেবে রেখেছিলাম সেটা তাকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে সামর্থ্য না হলেও সার্বিক বিবেচনায় সার্থকতার পাল্লাটাই হয়তো বেশি ভারী হবে।

আমার অনিদ্রায় কাটানো রাতটা ব্যর্থ হয়ে গেল যখন পর পর দুই দিন তার দেখা না পেলাম। প্রথম দিন তেমন কিছু মনে হয় নি। আমি তার জন্য আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাসায় ফিরে গেলাম। কিন্তু দ্বিতীয় দিনও যখন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো সেটা আমি আর স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারলাম না। মনের মধ্যে একটি শুন্য স্থানের সৃষ্টি হয়েছিল। এটা স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক সেটা নির্ধারণ করার ক্ষমতা আমার তখন ছিল না।

দ্বিতীয় দিন আমি তার বাসার বারান্দার দিকে তাকিয়েছিলাম অনেকক্ষণ। মনের মধ্যে একটি ক্ষীণ আশা ছিল তার দেখা পাব। কিন্তু ভাগ্য আমাকে নিরাশ করার প্রতিজ্ঞা করে বসে ছিল সেদিন। তার এই হঠাৎ অনুপস্থিতি আমাকে ভাবিয়ে তুলছিল। আমি কিছুই ভেবে বের করতে পারছিলাম না। আমার ধীর পদক্ষেপ আমাকে বাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু আমার মন ওই আধঃ আলোকিত জায়গাটাতেই পরে ছিল।

এর পরের দিনটা আমার একদমই ভাল কাটেনি। মনে প্রাণে চাচ্ছিলাম যাতে সেদিন তার সাথে দেখা হয়। সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ও তার বাসার বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু ফলাফল শুন্য।

সেদিন রাতে পড়ানো শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। রোড পার হবার জন্য দাঁড়িয়েছি ঠিক তখনি আমার পিঠে একটা হালকা স্পর্শ অনুভব করলাম। আমি পিছন ফিরতেই দেখলাম আমার বিসন্নতার কারণ হওয়া সেই রাজকুমারী আর তার চিরচেনা হাসি। আমার তখন কেমন লাগছিল তা বর্নমালায় ব্যাক্ত করার মত না। আমি জানি না এইটুকু সামান্য ঘটনায় কারো প্রেমে পড়া যায় কিনা। কিন্তু আমি নির্লজ্জের মত তার প্রেমেই পড়ে গিয়েছিলাম সেই মুহুর্তে। আমার গত তিন দিনের এত বিষণ্ণতা, হতাশা সব ডুবে মরেছিল তার হাসিতে। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম; কোথায় ছিলে এত দিন?

সে বলল; এত দিন কোথায়? মাত্র দুই দিন।

– আমার কাছে এই দুটি দিন, দুটি বছর ছিল।

– পড়াতে গিয়েছিলে? নাকি সিনেমা দেখতে?

– সিনেমা কেন দেখতে যাব?

– তাহলে ডায়লগ কেন দিচ্ছো?

এরপর কি বলবো আমি বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পর ও বলল; ‘চল’।

কোথায় যাব জানতে চাইলে তার কাছ থেকে যে কোন উত্তর পাবো না তা আমি নিশ্চিত। তাই কোন কথা না বাড়িয়েই তার সাথে চলা শুরু করলাম।

আমরা যেখানে পৌছালাম, সেটা একটা লেকের পাড়। আমাদের আড্ডা দেবার আর একটা জায়গা। রাতের এই সময়টাতে সেখানে মানুষের চলাচল এতটা নেই। ল্যাম্বপোস্টের আলোয় আমরা হাটছিলাম। নীরবতা ভেঙে সে বলল; “তুমি যে এই দুই দিন আমার জন্য অপেক্ষা করেছো আমি জানি। আমার বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিলে সেটাও খেয়াল করেছি। আমি ইচ্ছে করেই আসলে আসিনি এই দুই দিন। দেখতে চেয়েছি আমার ছোঁয়াচে পাগলামী তোমার মাথা কতটা খারাপ করতে পারে।”

– তারপর কি দেখলে?

– দেখলাম, আমি তোমাকে যতটা বোকা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি বোকা তুমি।

– কিভাবে?

– এই, তুমি এত বেশি বেশি প্রশ্ন কর কেন বলতো?

– আচ্ছা, করবো না প্রশ্ন। কিন্তু আমার মাথায় যে প্রশ্নগুলো ঘুরছে সেগুলোর কি হবে?

– সেগুলো প্রশ্নই থাক। আস্তে আস্তে খুজে নিও উত্তরগুলো।

এরপর কিছুক্ষনের নীরবতা আবারো। সে আর আমি পাশাপাশি লেকের পাড়ে এক ব্যাঞ্চে। সময় তখন রাত দশটার কাছাকাছি। আমি বললাম; “চল ফিরি।” সে কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালো। আমরা ফেরার রাস্তা ধরলাম। হঠাৎ সে বলল; “মনে আছে তোমার আর আমার একটা ফার্মেসীতে দেখা হয়েছিল? সেদিনই আমি তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম। তারপর আরো অনেক বার দেখেছি তোমাকে, অনেক জায়গায়। এই দেখতে দেখতেই কবে যে তোমাকে ভাল লেগে গেছে আমি জানি না। অনেকবার ভেবেছি কথা বলবো। কিন্তু পারি নি। ভয় আর দ্বিধাকে উপেক্ষা করতে আমার লেগে গেছে এক বছর চার মাস ছাব্বিশ দিন।”

আমি অবাক হয়ে ওর কথাগুলো শুনছিলাম। আমার বলার মত কিছুই ছিল না তখন। মেয়েটি তখন বলল; তোমাকে না আমার একটা নাম দিতে বলেছিলাম? কি নাম ভেবেছো?

– পরী।

– হা হা হা। আমি জানতাম, তোমার মাথায় এর চেয়ে ভাল নাম আর আসবে না।

– আমার জন্য কি নাম ভেবেছিলে?

– আমি তো কোন নাম ভাবিনি।

– কেন?

– আমার ইচ্ছা। তোমার কি তাতে।

আমি আর এই বিষয়ে কথা বাড়ালাম না। বললাম; আমি কি তোমার হাতটা ধরতে পারি?  সে হেসে বলল; “পরীকে ছুঁয়ে দেখতে চাও?” বলে সে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

আমি তার হাতে হাত রাখার পর সে বলল; ” আমি পরী নই, মানুষ”।

About The Author
Maruf Mahbub
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment