মানসিকতা

ঈদের ডায়েরী

দ হোক আর অন্য যে কোন অনুষ্ঠানই হোক, একজন ইনট্রোভার্ট টাইপের মানুষের পক্ষে নিজেকে নিয়ে মাতামাতি করা সম্ভব নয়। আমি যেহেতু হাইলি ইনট্রোভার্ট একজন মানুষ, তাই আমার কাছেও এসব উপলক্ষ্য বাহ্যিকভাবে খুব একটা ধরা দেয় না। তার মানে এই নয় যে আমি ঈদ উপভোগ করি না, আমিও অনেক আনন্দ পাই কিন্তু সেটা অনভিভূতিসাপেক্ষ।
এসব ভাবতে ভাবতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল।আরবি ক্যালেন্ডার অনুসারে ঈদের দিন শুরু।আমি পার্সোনালি ইনট্রোভার্ট হলেও আড্ডা জিনিসটা অনেক পছন্দ করি যদিও আড্ডা জমাতে পারি না।আড্ডা জিনিসটাকে তাই খুব দুরের ও সুখকর এক বস্তু বলে মনে হয়।তাই ভাবলাম, ছোট্ট একটা আড্ডা দিয়েই শুরু হোক এবারের ঈদ।
রাস্তার পাশে বসে আছি একাএকা।লোকজন যাওয়া আসা করছে কিন্তু সত্যি বলতে কাউকে আসলে তেমন ব্যস্ত বলে মনে হচ্ছে না।আমি অপেক্ষায় আছি কেউ আমাকে কল দেয় কি না।বন্ধুমহলে আমার গ্রহণযোগ্যতা টুকু যাচাই করে নিচ্ছি।কিন্তু না, কেউ কল দিচ্ছে না।প্রচন্ড মন খারাপ হল। কেউ একজন অন্তত আজকে সন্ধ্যার পর আমাকে একটা কল দিবে ভেবেছিলাম।রাগে দু’চারটা গালিও দিয়ে ফেললাম।শেষমেশ আমিই একজনকে কল দিলাম।জানতে পারলাম, তার মা অসুস্থ।ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। আধাঘন্টার মাঝেই সে যোগ দেবে আমার সাথে।ঠিক সেই মুহুর্তেই মনে হল, একটা বিষয়কে সবসময় আমরা নিজের দিক থেকে বিচার করি, কখনো অন্যদিক থেকে বিবেচনা করি না।আমাদের চিন্তাভাবনার ধরণটুকু বদলালেয় এসব ছোটখাটো ভিত্তিহীন মনোমালিন্যগুলো এড়ানো যায়।
চা এর সাথে আড্ডা চলল বেশ।কেউ কেউ সাথে সিগারেট। আমাদের বয়সী ছেলেদের আড্ডাগুলোর ধরণও যেন একই রকমের।এই টপিক,সেই টপিক।শেষমেশ টপিক হবে “মেয়ে/প্রেম”, সাথে বিশ্রী সব মন্তব্য।তবুও যাদের সাথে বসে আছি এরা কিছুটা আলাদা।আমার মনে চলে আসে, আগেকার লেখক-কবিদের কথা যাদের অনেকেরই একটা intellectual group থাকত।ইস! আমিও যদি হতে পারতাম সেরকম একটা গ্রুপের সদস্য।
রাত ১১ টা বাজে।বাড়ি ফিরছি।এত রাত বাইরে কাটায় না যখন বাসায় থাকি।তবুও জানি বাসায় কেউ এর জন্য বকবে না, আব্বাও কিছু বলবে না। সত্যি সত্যিই বয়স বেড়ে যাচ্ছে, বড় হয়ে যাচ্ছি, দায়িত্ব বেড়ে যাচ্ছে।একটা অজানা ভয় ঘিরে ধরে।
খাওয়া শেষ করে টেবিলে বসলাম।”সেই সময়” উপন্যাসটা খুললাম। আম্মু বলল, ‘কাল খুব ভোরেই উঠতে হবে। বই রেখে ঘুমাতে যা।’ ঈদের দিন বলে কথা।কিন্তু কেবলমাত্র এসব বই পড়তে দেখলেই আম্মু পড়তে নিষেধ করে।কোন মা-বাবাই ছেলেমেয়েদের এসব পড়া পছন্দ করে না।
খুব ভোরেই উঠলাম। তবুও ঈদের প্রথম জামায়াত ধরার জন্য আমাকে আর ভাইয়াকে দৌড়াতে হল, সাথে রাস্তার আরো অনেককে।শেষমুহুর্তে তাড়াহুড়ো করা সম্ভবত আমাদের জাতিগত অভ্যাস।নামায শেষ করে ফিরছি।রাস্তায় বাচ্চারা কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে,কেউ বেলুন ফুলাচ্ছে, কেউ এক ধরনের গাড়ি চালাচ্ছে(ক্যা ক্যা শব্দ করে)। শব্দটা বিরক্ত লাগছে। তবুও নিজের অজান্তেই হেসে ফেললাম। শব্দগুলো বাচ্চাগুলোদের কি মজাটাই না দিচ্ছে! এই তো কিছুদিন আগে আমিও ওগুলো খেলেছি। হিসেব কষতে লাগলাম।না, কিছুদিন নয়।প্রায় ১৩-১৪ বছর আগে আমি এসব খেলেছিলাম।১৩-১৪ বছর!নিজেই অবাক হয়ে যায়।আচ্ছা, সময় এত দ্রুত যায় কেন!
কুরবানি আছে দুটো খাশি। জবাই করা হল। আব্বা এব্যাপারে এক্সপার্ট না হলেও কাজ চালার মত পারে।প্রতিবছর রশিদ কাকা এসে তিনিই কাজটি করে দিয়ে যান। আমি আর ভাইয়া এ ব্যাপারে নিতান্তই আনাড়ি। হঠাৎ মনে হল, বড় হয়ে যাচ্ছি। এই দায়িত্বটাও আমাদের নিতে হবে। আমার বয়সী শতকরা প্রায় ৯০ জনই এ কাজটা পারে না, তাদেরকেও খুব শীঘ্রই এ দায়িত্ব নিতে হবে। আগামী দশ বছর পরে এখনকার চেয়ে বেশ কয়েকগুণ বেশি এক্সপার্ট (কসাই) ভাড়া করতে হবে।এত কসাও কি পাওয়া সম্ভব হবে। হয়তো বিকল্প কোন উপায় বের হবে। কিন্তু আমরা এই প্রজন্ম যে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ না শিখেই বড় হচ্ছি, এও তার একটা উদাহরণ।
কুরবানির কাজ শেষ। এখন কারো সাথে দেখা হলেই কিছু কমন প্রশ্ন “কয়টা কুরবানি ছিল?কত কেজি মাংস হল?ইত্যাদি ইত্যাদি…” যার বেশি হচ্ছে সে বাইরে প্রকাশ না করলেও মনে মনে একধরনের তৃপ্তি পাচ্ছে।
মাংস বিলি করার কাজটা বেশ ঝামেলাপূর্ণ যদিও এর একটা আলাদা গুরুত্ব আছে।আর পরিবারের সবার ছোট হওয়ায় এই ঝামেলার সিংহভাগই আমাকে পোহাতে হয়। নানীর বাড়িও যেতে হল আমাকে। একটু লাভও হল বটে। নানীর কাছ থেকে ১০০০ টাকা ঈদ বোনাস পাওয়া গেল। আমি ভালভাবেই জানি, নানী কিছুটা অর্থকষ্টে আছে। এর আগেও অনেক অনেক ঈদ বোনাস পেয়েছি। তিনি এবার না দিলেও পারতেন। যদি দায়িত্বের কথা বলি, তাহলে তিনি তা খুব ভালভাবেই পার করেছেন। এই বৃদ্ধ বয়সে এসবের তো প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটাও সত্য যে, আমি ঈদ বোনাস পেয়ে যেমন আনন্দিত,তেমনি নানী সেটা দিয়েই আনন্দিত। কি আশ্চর্য এক ধরনের মায়া! আমরা সবাই এই মায়ার বেড়াজালে আবদ্ধ।
একটু ফেসবুকে ঢু মারলাম। কাউকে মেসেজে বা ফোনে ঈদ শুভেচ্ছা জানানো হয় নি। যারা জানিয়েছে, তাদের রিপ্লাই দিলাম। টিভি অন করলাম। এত্তগুলা চ্যানেল, তবুও দেখার মত কিচ্ছু পেলাম না। খবর শুনতে লাগলাম। বর্ডারের পাশে মানবতা গড়াগড়ি খাচ্ছে, বনভাসীদের খবর আর নিউজে আসে না। কী-ই বা করতে পারি আমি। মার্টিন নেমলারের সেই কবিতাটার কথা মনে পড়ে গেল। কি জানি, হয়তো পরবর্তী ভুক্তভোগীটা আমিই হব। কেউ আসবে না আমাকে বাঁচাতে।
নদীর ধারে সূর্যাস্ত দেখা, আবারো আড্ডা, গল্প, বিচিত্র সব টপিক, কথার খেলা,গল্পে গল্পে একজন আরেকজনকে আঘাত দেবার পৈশাচিক আনন্দ, কোল্ড ড্রিংকস, সিগারেট (কারো কারো), স্নিগ্ধ বাতাস,রাতের অন্ধকার,…………..
এভাবেই
চলে গেল আরেকটি ঈদ
মানে আরেকটি বছর।
সময় যাচ্ছে, জীবনও চলমান।
আর একটি ভয়ংকর সত্য “বড় হয়ে যাচ্ছি”।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ধর্ষণ বনাম পারফেকশন

Rihanoor Islam Protik

ফেসবুক এবং আমাদের বিকৃত মানসিকতা!!

Ryan Rakib

সত্যিই ভালোবাসিতো ?

Sadia Meherin

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: