Now Reading
জীবনের গল্প



জীবনের গল্প

“জন্মের সাথে সাথেই মা মারা গেলেন। মায়ের আদর, মায়ের গন্ধ কিছুই পাইনি। নানীর কাছেই শৈশবের কিছু সময় কেটেছে। বাবা রিকশা চালাতেন। মাঝেমাঝে এসে আমাকে দেখে যেতেন। নানীর ছায়ায় একটু একটু বড় হতে লাগলাম কিন্তু হাঁটতে পারতাম না। নানী বহু কষ্ট করে কয়েকবার ডাক্তার দেখিয়েছিলেন বাবাও চেষ্টা করেছেন কিন্তু তেমন কোন ভালো ফল হয়নি। ডান পাঁ সম্পূর্ণই অকেঁজো। একটা লাঠি কিনে দিয়েছিলেন বাবা। সেটা ভর করে হাঁটতাম তাও খুব কষ্ট হত।নানী গ্রামের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ‌নানীর অক্লান্ত পরিশ্রমে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছিলাম। কিন্তু নানীও একদিন মারা গেলেন।

তারপর বাবা নিয়ে আসলেন তার কাছে, ওখানে আর কেউ রইলো না আমায় দেখার মত। তবে পড়াশুনা হলনা। বাবাই বা কি করতেন ! সারাদিন আমার পেছনে বসে থাকলে খাবে আর খাওয়াবে কি ! কোনরকম দু’বেলা খেয়ে দিন কাটতো। আর সারাদিন সামনের খোলা মাঠের কোণে বসে ছেলেদের ফুটবল খেলা দেখতাম। চলতে থাকে কোনরকম….।

একদিন বাবা সন্ধ্যারাতে নিজের রিকশায় করে এক সুন্দরী লাল শাড়ি পরিহিত মহিলাকে ঘরে নিয়ে ফিরলেন। বললেন এ তোর নতুন মা। তোকে অনেক আদর করবে, তোকে কষ্ট করে চুলার পাশে বসে আর ভাত সিদ্ধ করতে হবে না।

প্রথম প্রথম ভালো দেখাশুনা করত নতুন মা। কিন্তু সংসারে নতুন সন্তান আসার সাথে সাথেই রুপমতীর আসল রুপ বেরিয়ে পড়ল। খেতে দিত না। ঘরের সমস্ত বাসন ধুতে হত কাপড় কাঁচতে হত! বসেবসে সব কাজ করাতো সৎ মা। যদি করতে না পারতাম অথবা ভুল হত তবেই জুতাপেটা করত, চড় থাপ্পর আরও কত কি….!

শারীরিক অক্ষমতার কারণে অথবা অসুস্থ থাকলে সেদিন না খেয়ে থাকতাম ! বড় গলায় ডেকে বলতাম, ” ও মা মা খিদা লাগছে অনেক ! পান্তা দাও তাতেই হবে। সব পান্তাতো ফেলেই দেবে !” কখনও দয়া হত আবার কখনও বাবা এলেই শুধু খেতে পেতাম। তবে বাবার ধারে কাছে কখনও ভিড়তে দিত না। যদি সব বলে দেই বাবার কাছে ! মাঝে মাঝে খোলা আকাশের দিকে তাঁকিয়ে চিৎকার করে মাগো মাগো ডাকতাম… হায় নসিব নানীও চলে গেলেন ! বাবাও বেশ উদাসীন ছিলেন আমার প্রতি।

একদিন সুযোগ পেয়ে বাবাকে বলেছিলাম সৎ মায়ের সব অত্যাচারের কথা। কিন্তু কোন কাজে আসেনি ! বাবাকে রুপমতী অনেক আগেই বস করে রেখেছিলো বুঝতে পারিনি। বাবা বিশ্বাস করেনি আমার কথা উল্টো চড় মারল ! বাবা কাজে বেরিয়ে গেলে সৎ মা দরজা বন্ধ করে অনেক মেরেছিলো সেদিন…! রাতে প্রচন্ড জ্বর ওঠে ! কত আর সহ্য হয় ! ঠিক করলাম হাঁটতে নাহয় খুব কষ্ট হয় কিন্তু এক পাঁ আর দুটি হাত তো আছে ! গতরে খেটে খাব ভিক্ষা বা দয়ায় কেন বাঁচব !

নানী আদর করে মাঝেমাঝে হাতে টাকা গুঁজে দিতেন ! লুকিয়ে জমিয়েছিলাম সেগুলো স্কুলের টিফিন না খেয়ে।বাবাও আগে মাঝেমধ্যে কিছু চকলেট আবার কখনও টাকা দিতেন জমাতে ! জমিয়েছিলামও গোপনে। সিদ্ধান্ত নিলাম এগুলো নিয়েই পালাবো শহরে। কত কাজ একটা কিছু ঠিকই খুঁজে নেব।

বাবা যতই অবহেলা করুক তবু বাবাকে ছেড়ে যাবা সময় মন টানছিলোনা। বারবার চোখ ভিজে যাচ্ছিলো ! এই বাবাইতো ছিলো আর কে ছিলো আমার ? আর হয়ত কোনদিনই বাবাকে দেখা হবেনা ! বাবা, মা সমস্ত স্মৃতি মায়ার বন্ধন ছিড়ে চলে যাচ্ছি। বুকের ভেতর খুব হাহাকার হচ্ছিলো…আর পেছনে ফিরে তাঁকাচ্ছিলাম যেন মনে হচ্ছিলো মা বুঝি দাঁড়িয়ে আছেন আমাকে যেতে বাঁধ সাধছেন ! কিন্তু মাকে তো দেখিনি তবু কেমন যেন লাগছিলো…।

কাঁক ডাকা ভোরে অক্ষম পাঁ আর শরীরে জ্বর নিয়েই মনের জোরে পালিয়ে শহরের রেলস্টেশনে এসে পৌঁছলাম। তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি ক্ষুধা ও জ্বরের কষ্টে হাতের পোটলা বুকে চেঁপে নিস্তেজ ঘুমিয়ে পড়লাম। ওখানে এক কোণে ঠাঁই নিয়ে পড়ে থাকলাম। আস্তে আস্তে একটু সুস্থ হলাম খেয়াল করলাম এক চাচা আমার থেকে একটু দূরে জুতা পলিশ, সেলাই করে বেশ ভালোই কামাচ্ছেন ! এগিয়ে পাশে বসলাম কাজের কৌশল শিখতে। চাচাও আগ বাড়িয়ে অনেক প্রশ্ন করলেন তারপর সবকথা খুলে বললাম তাঁকে !

অল্প সময়েই ভালোই সম্পর্ক হল চাচার সাথে। আমাকে রোজ তাঁর পাশে বসিয়ে কাজ করতেন মাঝেমাঝে কিছু খেতেও দিতেন। তারপর চাচার পাশে অল্প কিছু পুঁজি দিয়ে আমিও কাজে লেগে গেলাম। চাচা তাঁর বাড়িতে নিতে চাইলেন কিন্তু যাইনি ! এই অক্ষম শরীরের বোঝা কাউকেই আর দেবনা ভেবেছিলাম…।

কোন রকম খেয়ে বাকী কিছু টাকা জমাতাম আর কিছু টাকা দিয়ে বই কিনে সুযোগ পেলেই পড়তাম স্টেশনের হালকা আলোতে। চলে যেত কোনমতে দিন…

একদিন চাচা এলেননা ! এক মাস কেটে গেলো চাচা এখনও এলেননা। ভাবলাম চাচার কোন বিপদ হল কিনা ! বাড়ির ঠিকানা জানতাম। কষ্ট করে চাচার খোঁজে গেলাম। শুনি চাচা হঠাৎ ক’দিনের তীব্র জ্বরে মারা গেছেন। তাঁর একটা মেয়ে রেখে গেছেন। মেয়েটি বাসাবাড়ির কাজ করে চলে কোনরকম।

রোজ একবার আসতাম মেয়েটির খোঁজ নিতে। তারপর আস্তে আস্তে কেমন একটা মায়ায় জড়িয়ে গেলাম মেয়েটির সাথে। মাঝেমাঝে কিছু টাকা জোর করে মেয়েটিকে দিয়ে আসতাম…! মেয়েটিও একসময় আর বাঁধা দিত না। মেয়েটিও যেন আমারই অপেক্ষায় থাকতো ! বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলাম দুজনে ! করেও ফেললাম বিয়ে…!

তারপর সুখে দুঃখে আত্মত্যাগে দু’যুগ পেরিয়ে গেছে আমাদের একসাথে ! আমাদের একমাত্র মেয়ে আলেয়া আজ সম্পূর্ণ সরকারী খরচে ডাক্তারি পড়ছে। স্রষ্টার অপার মহিমা ! তিনি আমার সন্তানকে আমার মতন অক্ষমতা দেননি ! একটা সময় মরে যেতে ইচ্ছে হত! মায়ের কাছে নানীর কাছে চলে যেতে মন চাইতো! কিন্তু এখন আরো অনেকদিন বাঁচতে ইচ্ছে হয়। একজন সৎ দয়ালু ডাক্তারের গর্বিত পিতা হয়ে বাঁচতে ইচ্ছে হয়।”

জীবনের গল্প ! সত্যিকারের গল্প।

About The Author
Fatematuz Zohora ( M. Tanya )
Little writer & poet...!
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment