Now Reading
বৃদ্ধাশ্রম কি শুধুই একটি আশ্রয়স্থল!



বৃদ্ধাশ্রম কি শুধুই একটি আশ্রয়স্থল!

সামাজিক গল্প:

ভুল

নিচু হয়ে ব্যাগ গুলো রাখতে গিয়ে সামনের রগ ওঠা শীর্ণ পা’দুটো চোখে পড়লো। ব্যাগের হাতলটায় নিজের হাত দিটোর দিকে একবার তাকালেন, “হাত বাড়িয়ে পা’দুটো একবার ছুঁয়ে নেবো?” ভাবনাটা আসলো বটে, তবে সঙ্গে সঙ্গেই চিন্তাটা কে মন থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করে দিলেন রাহাত সাহেব। “এসব ন্যাকামো ভালো দেখায়না,আশালতা কি ভাববে? ছিহ!”
ব্যাগ দুটো রেখে আস্তে করে পিছু ফিরে সোজা হয়ে দাড়ালেন,এক কদম, দু কদম করে গাড়ির দিকে এগুচ্ছেন, “একবার পিছু ফিরে তাকাবো কি? নাহ থাক্, গাড়িতে আশালতা কি ভাববে…!!”

দরজার হাতলটা আঙ্গুলে পিছলে গেলো,কাঁপা কাঁপা হাতে আবারো ধরলেন,তারপর সিটে বসেই গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে দিলেন। হুশ করে বৃদ্ধাশ্রমের সাইনবোর্ডটা পেরিয়ে এসে বড় রাস্তায় ওঠলো গাড়ি।
স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলে স্পিড-ব্রেকারে পায়ের চাপ একটু কমালেন। সচরাচর ত্রিশের ভেতরেই গাড়ি চালান,অথচ আজ এই এতটুকু আসতেই পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে রাহাত সাহেবের গাড়ি!

পাশ থেকে একটা হাত জড়িয়ে ধরলো রাহাত সাহেবকে, “আশা,এইবার তুমি খুশিতো?”

“হুম,থ্যাংকু রাহাত!”
“একদম মনের মতো হবে সব এখন থেকে,দেখো! ঠিক যেমনটা আমি স্বপ্ন দেখে এসেছিলাম।”

স্ত্রী’কে এতদিন পর মন খুলে হাসতে দেখছেন রাহাত সাহেব,”সবাইকে তো আমি একা একজনই সন্তুষ্ট করতে পারবোনা।যেকোনো একজনকে নাহয় একটু ত্যাগ স্বীকার করতেই হলো।” মনে মনে ভাবলেন,
“ওখানে তুমি ভালো থাকো,এখানে আশাও সুখী হোক।”
ভাবতে ভাবতে গাড়ি চালানোয় মন দিলেন।

__________

__________

গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই নড়ে ওঠলেন মানুষটি। শীর্ণ হাত দুটো দিয়ে ভারী ব্যাগ দুটো তুলে নিলেন,একটা ছেলে এগিয়ে আসছিলো,সাহায্য করার জন্যই বোধহয়,মাথা নেড়ে নিষেধ করে দিলেন।
চাবি আর রুম নম্বর গাড়িতেই দিয়েছিলো রাহাত,ভারী ব্যাগ দুটো নিয়ে ওদিকেই চললেন তিনি। দরজা খুলে ব্যাগ দুটো ভেতরে রাখলেন,পিছু পিছু আসা ছেলেটা এখনো দাড়িয়ে আছে। মিষ্টি হেসে ওর দিকে হাতের ইশারায় ডাকলেন মানুষটি।
ছেলেটা দৌড়ে ছুটে এলো,ভেতরে গিয়ে পার্স হাতড়ে একটা পাঁচ টাকার কয়েন খুজে এনে ওর হাতে দিলেন,তারপর ইশারায় ফিরে যেতে বলেই দরজাটা লাগিয়ে দিলেন।

ঘরের ভেতর আবছা অন্ধকারে,শীর্ণ মানুষটার চোখ দুটো থেকে দুফোঁটা লোনা পানি ঝরে পড়লো এতক্ষনে!!

___________

____________

শহরের নামিদামী একটি রেষ্টুরেন্ট। ভেতরে মানুষ গঁজগিজ করছে।বেশিরভাগই মধ্যবয়স্ক আর বয়োবৃদ্ধ।

আজ:★parent’s Day★
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথী:
“বিশিষ্ট শিল্পপতি রাহাত হোসাইন।”

বক্তৃতা,গান,নাচ সব কিছুর পর লাঞ্চ-ব্রেক। প্রধান অতিথি নিজের হাতে কয়েকজনকে খাবার পরিবেশন করবেন।
একে একে কয়েকজনকে দেয়ার পর শেষজনের কাছে এসে দাড়ালেন রাহাত সাহেব। চামচে একটুকরো মাংস তুলে দিলেন সামনে বাড়ানো প্লেটে। সাথে সাথেই মানুষটি বুভুক্ষের মতো খাওয়া শুরু করলো!

রাহাত সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন।

দাঁতবিহিন মাঁড়িতে চোয়ালের নড়াচড়া,
ভাজ পড়া চামড়া,
চোখে ভারী পাওয়ারের চশমা!
সবই একে একে দেখছেন তিনি, অতি পরিচিত কার মুখ যেনো বার বার এসেও আসছেনা!!

নিজের আসনে বসেও স্বস্থি পাচ্ছেননা রাহাত সাহেব। বার বার কোথায় যেনো হারিয়ে যাচ্ছেন! শেষে আর থাকতে না পেরে সাময়িক অসুবিধার কথা বলে বিদায় নিয়েই বেরিয়ে পড়লেন।

গাড়ি চলছে।
সামনে সবই কেমন ঝাপসা ঝাপসা দেখছেন রাহাত সাহেব। তবুও দু’মাস আগের ওই সাইনবোর্ডটা চিনতে ভুল হলোনা একটুও!

গাড়ি থামিয়ে,এসে দাড়ালেন দরজার সামনে।
ঠক্! ঠক্! ঠক্!
কাঁপা কাঁপা হাতে নক করলেন দরজায়।
“কে?” দরজা খুলতে খুলতে ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলেন কেউ একজন।

“আমি”
“তোমার খোকা..!!”

ঝট করে মাঝপথেই দরজার শব্দ বন্ধ হয়ে গেলো। আবছা অন্ধকারে,শীর্ণ হাত দুটো থমকে গেছে!!

দরজাটা কি খুলবে??
নাকি খোকার সাথে সেদিনের সেই অভিমানি রুদ্ধ কন্ঠস্মরের মতোই,দরজাটাও আজো রুদ্ধই থাকবে??

হয়তো খুলবে!!
“মা” তো!!
শত শত ভুলের পরেও খোকা তো সেই ‘আদরের খোকা’ই রয়ে যায়!!

About The Author
Maksuda Akter
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment