আবেগের আরেক নাম রিয়াল মাদ্রিদ

Please log in or register to like posts.
News

রিয়াল মাদ্রিদ!
নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা জার্সি পরিহিত দূর্বার কয়েকজন ফুটবল খেলোয়াড়ের ছবি।যারা কিনা প্রতিপক্ষকে তছনছ করে দিচ্ছে নিজেদের ফুটবল জাদুতে!শেষ মিনিট অব্ধি যারা ঠোঁট কামড়ে লড়ে যাচ্ছে নিজেদের দূর্গ রক্ষার জন্যে।আয়তাকার ফুটবল মাঠটাতে যারা একচ্ছত্র অধিপত্য বিস্তার করে পুরো বিশ্বকে মোহিত করে রেখেছে সাদা জাদুতে।ছোট্ট একটা দেশ বাংলাদেশে বসে সেই সুদূর স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের ক্লাবটির সুখে আমরা হাসি,কষ্টে কাঁদি!আনন্দ বেদনার এক অদ্ভূত শিহরণ বইয়ে যায় আমাদের ভেতর দিয়ে।
এর কোনো কিছুই কিন্তু একদিনে আসেনি।সব গল্পের যেমন একটা শুরুর গল্প থাকে তেমনি রিয়াল মাদ্রিদ সিএফ এরও একটা শুরুর গল্প রয়েছে।হাসি-কান্না,আবেগ-অনুভূতির মিশেলে গড়া ক্লাবটির শুরুর গল্পটা কেমন ছিলো?
সময়টা উনিশ শতকের শেষের দিকে।ইস্টিটিউশন লিবরে দে এনসেনাঞ্জা’র(The Free Educational Institution)ছাত্ররা তখন প্রথম পরিচিত হয়েছিলো চর্মগোলকের খেলাটির সাথে।তারা চিন্তা করলো একটা ফুটবল ক্লাব খুললে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ।১৮৯৭ সালে তারা খুলে ফেললো তাদের ফুটবল ক্লাব।নাম দিলো ‘Football Club Sky’.
তারা প্রতি রবিবার সকালে মঙ্কলাতে খেলতে যেতো।১৯০০ সালে এসে ফুটবল ক্লাব স্কাই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।একটার নাম ছিলো ‘New Foot-Ball De Madrid’ এবং অপরটি ‘Madrid Football Club’.
জুলিয়ান পালাসিওসকে করা হয় মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাবের প্রথম প্রেসিডেন্ট।
৬ই মার্চ,১৯০২।মাদ্রিদ ফুটবল ক্লাবকে অফিসিয়ালি প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।নতুন বোর্ড গঠন করে রিয়াল মাদ্রিদের প্রথম অফিসিয়াল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বার্সেলোনায় জন্মগ্রহণ করা কাতালান ব্যবসায়ী জুয়ান পাদ্রোস।পরবর্তীতে ১৯০৪ সালে জুয়ান পাদ্রোসের ভাই কার্লোস পাদ্রোস মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।১৯০৫ সালে তার অধীনেই মাদ্রিদের ট্রফি কেসে প্রথম ট্রফি যুক্ত হয়।প্রথম ট্রফিটা ছিলো কোপা দেল এয়নটামিয়েন্টো দে মাদ্রিদ যা বর্তমানে কোপা দেল রে নামে পরিচিত।১৯০৯ সালে মাদ্রিদের প্রতিষ্ঠাকালীন চারজন ফাউন্ডারের একজন অ্যাডোল্ফো মেলেন্ডেজ প্রেসিডেন্ট হয়ে আসলে মাদ্রিদ তার প্রথম অফিসিয়াল হোমগ্রাউন্ড পায়।১৯১০ সালে মাদ্রিদ শহরের ক্যালে ও’দোননেলের পাশে প্রতিষ্ঠিত “ক্যাম্পো দে ও’দোনলেল” ছিলো মাদ্রিদের প্রথম হোমগ্রাউন্ড। ১৯২৩ সাল পর্যন্ত এ মাঠটিই মাদ্রিদ তাদের হোমগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করে।১৯১২ সালে এর সংস্কার করা হলে এ মাঠে গ্যালারিতে বসতে পারতো মাত্র ২০৬ জন।বাকিরা সাইডলাইনের পাশে,গোলবারের পেছনে দাঁড়িয়ে খেলা দেখতো।এ স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজে সান্টিয়াগো বার্নাব্যু নিজে ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ করেছিলেন।১৯২০ সালে স্পেনের রাজা ত্রয়োদশ আল্ফোন্সো মাদ্রিদকে রয়াল তথা রাজকীয় টাইটেল ব্যবহারের অনুমতি দিলে মাদ্রিদের নামের সাথে যুক্ত হয় “রিয়াল।”যারই পরিপ্রেক্ষিতে মাদ্রিদ হয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদ।১৯২৩ সালে ২২,৫০০ লোক ধারণক্ষমতার “এস্তাদিও চামার্টিন” হয়ে যায় রিয়াল মাদ্রিদের হোমগ্রাউন্ড।১৯২৯ সালে স্পেনে “স্প্যানিশ ফুটবল লীগ” তথা লা-লীগা শুরু হলে প্রথম সিজনে রিয়াল মাদ্রিদ বার্সেলোনার চেয়ে মাত্র দুই পয়েন্টের ব্যাবধানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় হয়ে শেষ করে।১৯৩২ সালেই রিয়াল মাদ্রিদ জিতে নেয় তাদের ইতিহাসের প্রথম লা-লীগা টাইটেল।
এর পর স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হলে মাদ্রিদের স্টেডিয়ামের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়।পুরনো খেলোয়াড় ও সদস্যরাও দলচ্যুত হয়ে যায়।মাদ্রিদের জেতা সব ট্রফি চুরি হয়ে যায়।মোটামুটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় রিয়াল মাদ্রিদ।এই অবস্থায় মাদ্রিদের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পান মাদ্রিদেরই সাবেক খেলোয়াড় সান্টিয়াগো বার্নাব্যু ইয়েস্তে।১৯৪৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর প্রথম কাজই ছিলো স্টেডিয়াম সংস্কার।১৯৪৩ সালে সে প্রকল্প হাতে নিয়ে ১৯৪৭ সালের মাঝে শেষ করেন মাদ্রিদের নতুন স্টেডিয়াম ‘নুয়েভো এস্তাদিও চামার্টিন’ এর কাজ।তৎকালীন সময়ে এর ধারণক্ষমতা ছিলো ৭৫,১৫৪।পুরাতন প্লেয়ারদের ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দলে সাইন করান তৎকালীন সময়ের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় আলফ্রেডো ডি স্টেফানোকে।এছাড়া ফেরেঙ্ক পুসকাস,মিগুয়েল ম্যুনোজ,ভিসন্তে দেল বস্ক,মলায়োনি,সান্তা মারিয়া,অ্যামানসিও,পিরি,নেটজার,সান্তিলানা,জেন্
তো,জুয়ানিতোদের নিয়ে তৈরি করেন প্রথম লস গ্যালাক্টিকোজ।অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদেরই সাবেক অ্যামেচার খেলোয়াড় মিগুয়েল মালবো ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রিয়াল মাদ্রিদের ইউথ অ্যাকাডেমি ‘লা ফেব্রিকা’।
বিধ্বস্ত রিয়াল মাদ্রিদের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর গল্প শুরু হলো এখান থেকেই।শুরু হলো পুরো বিশ্ব শাসন করার গল্প।রিয়াল মাদ্রিদের সত্যিকারের ‘রিয়াল মাদ্রিদ’ হয়ে ওঠার গল্প।
১৯৫৫ সাল।নুয়েভো এস্তাদিও চামার্টিনের সংস্কার কাজ সবে মাত্র শেষ হয়েছে।নতুন করে আবার ঢেলে সাজানোর পর এ স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা হলো ১,২৫,০০০।মাদ্রিদের বোর্ড ডিরেক্টররা চিন্তা করলেন সান্টিয়াগো বার্নাব্যু ইয়েস্তের সম্মানার্থে স্টেডিয়ামের নামটাই বদলে ফেলবেন।তাদের কথামতো নুয়েভো এস্তাদিও চামার্টিনের নাম বদলে রাখা হলো ‘এস্তাদিও সান্টিয়াগো বার্নাব্যু’।
(পরবর্তীতে অবশ্য সান্টিয়াগো বার্নাব্যুর ধারণক্ষমতা কমানো হয় স্টেডিয়ামের অন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে।বর্তমানে এর ধারণক্ষমতা ৮৫,৪৫৪।)
অন্যদিকে ১৯৫৫ সালে ফ্রেঞ্চ ক্রীড়া সাংবাদিক ল’ইকুইপ ইউরোপ জুড়ে একটি টুর্ণামেন্ট শুরু করার প্রস্তাব রাখলে গ্যাব্রিয়েল হ্যানোট,সান্টিয়াগো বার্নাব্যু,বেড্রিগন্যান এবং গুস্তাভ সেবেসরা মিলে একটি প্রদর্শনীমূলক টুর্ণামেন্ট ইউরোপে তৈরি করেন।যেখানে পুরো ইউরোপের প্রথম সারির দলগুলো অংশ নেবে।এর নাম দেয়া হয় ইউরোপিয়ান কাপ।এই ইউরোপিয়ান কাপই আজকের চ্যাম্পিয়নস লীগ।এ টুর্ণামেন্ট শুরু হওয়ার পরই প্রথম পাঁচটি শিরোপাই জিতে নেয় রিয়াল মাদ্রিদ।১৯৫৬-৬০ পর্যন্ত পাঁচটি ইউরোপিয়ান কাপই যোগ হয়েছিলো রিয়াল মাদ্রিদের ট্রফি কেসে।সে দলে ছিলেন জেন্তোর মতো দুর্ধর্ষ উইঙ্গার।মিগুয়েল মুনোজের মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডার।জুয়ানিতো,দেল বস্কের মতো প্লেয়ার।অালফ্রে
ডো ডি স্টেফানোর মতো গোল স্কোরার! মোটামুটি পুরো ইউরোপ বিশ্বে তখন চলছিলো সাদার রাজত্ব।রিয়াল মাদ্রিদের সামনে পড়লে তখন বুক কাঁপতো না এমন দল খুব কমই ছিলো।সেই পাঁচটি ফাইনালের প্রত্যেকটিতে গোল করার অনন্য রেকর্ড ছিলো ডি স্টেফানোর।১৯৬০ সালে ফ্রাঙ্কফুর্টের বিপক্ষে তো স্টেফানো হ্যাট্রিকই করে বসেছিলেন।দলও জিতেছিলো ৭-৩ গোলের বিশাল ব্যাবধানে!
তবে ইতিমধ্যেই সদ্য অবসর নেয়া মাত্র ৩৬ বছর বয়সী মিগুয়েল মুনোজের হাতে তুলে দেয়া হয় লস ব্লাঙ্কোসদের দায়িত্ব।টানা চারটি চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতা দলকে এমন আনকোরার হাতে দায়িত্ব তুলে দেয়া হলো!অনেকেই ভ্রু কুঁচকেছিলেন এই দল তিনি কীভাবে সামলাবেন!সান্টিয়াগো বার্নাব্যু যে একজন পাকা জহুরী সেটার প্রমাণ দিতে মিগুয়েল ম্যুনোজ সময় নিলেন মাত্র ১ সিজন।প্রথম সিজনে এসেই এই ৩৬ বছর বয়সী কোচ মাদ্রিদকে জেতালেন ইউরোপিয়ান কাপ!টানা পাঁচবারের ইউরোপিয়ান কাপের দলে আগের চারটিতে ম্যুনোজ ছিলেন প্লেয়ার হিসেবে আর এর পরেরটিতে কোচ!বিশ শতকের ষাটের দশক।পুরো বিশ্ব তখন মাতোয়ারা ইংলিশ রক ব্যান্ড ‘The Beatles’ এর জাদুকরী সুরের মূর্ছনায়।বিটলসের ফ্যান্টাসটিক ফোর জন লেনন,জর্জ হ্যারিসন,পল ম্যাকার্টনি,রিঙ্গো স্টাররা তখন পুরো বিশ্বকে তাদের সুরের ঝংকারে বেঁধে রেখেছেন।তাঁদের ‘She loves you’ গানটি তখন পুরো বিশ্বে রাজত্ব করছিলো।এই গানের কোরাস ছিলো ‘Yeah Yeah Yeah!’
৬৬ সালে মাদ্রিদ যখন ষষ্ঠ চ্যাম্টিয়নস লীগ জিতেছিলো তখন চারজন স্প্যানিশ খেলোয়াড় স্প্যানিশ পত্রিকা মার্কায় দেয়া এক ছবির পোজে অবিকল বিটলসের ফ্যান্টাসটিক ফোরের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলো।সেই থেকে মাদ্রিদের সেই জেনারেশনের অদম্য সেই দলটিকে ডাকা হতো ‘Ye Ye Madrid.’
এই ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদ টানা পাঁচবার ইউরোপিয়ান কাপজয়ী দলের মতো ভয়ংকর না হলেও অত্যন্ত সমীহ জাগানো দল ছিলো।তারা ১৯৬০ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত টানা আটটি লা-লীগা ও একটি ইউরোপিয়ান কাপ জেতে।সেই দলের কোচ ছিলেন মিগুয়েল ম্যুনোজ।ম্যুনোজ ষাটের দশকেই রিয়াল মাদ্রিদকে নতুনভাবে সাজানোর দায়িত্ব নেন।কারণ আগের সর্বজয়ী দলের সদস্যরা ইতিমধ্যেই অনেকেই অবসর গ্রহণ করেছে।আবার কেউ দল ছেড়েছে।তাই ম্যুনোজ নজর দিলেন কম বয়সী প্লেয়ারদের দিয়ে দল সাজাবেন যারা অনেকদিন সার্ভিস দিতে পারবে।এই দল মুনোজকে এনে দিয়েছিলো আটটি লা-লীগা,দুইটি কোপা দেল রে আর একটি ইউরোপিয়ান কাপ।এই দলের ব্যাপ্তিকাল ধরা হয় ১৯৬১ থেকে মতান্তরে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত।১৯৭৪ সালে মিগুয়েল ম্যুনোজের বিদায়ের মাধ্যমে মাদ্রিদের একটি স্বর্ণালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।মিগুয়েল ম্যুনোজকে এখনো মাদ্রিদের ইতিহাসের সেরা কোচ হিসেবে গণ্য করা হয়।১৯৫৯ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত ১৫ বছর ছিলেন মাদ্রিদ বস।এর মাঝে জেনারেশনের পরিবর্তন হলেও জিতেছিলেন সর্বমোট ১৫ টি ট্রফি।যার মাঝে ছিলো ৯ টি লা-লীগা,১ টি ইউরোপিয়ান কাপ,৪ টি কোপা দেল রে এবং ১ টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ।ইতিমধ্যেই ১৯৭৮ সালে সান্টিয়াগো বার্নাব্যু ইয়েস্তের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অভিভাবক হারায় রিয়াল মাদ্রিদ উপর্যপুরি পুরো স্প্যানিশ ফুটবল।১৯৪৩ থেকে ১৯৭৮ শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৫ বছর ছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট।ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে এনেছিলেন রিয়াল মাদ্রিদকে।বানিয়েছিলেন ফুটবল বিশ্বের রাজা।তাঁর মৃত্যুতে পুরো ফুটবল বিশ্বে শোকের মাতম পড়ে যায়।১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনায় বিশ্বকাপে তিন দিনের শোকও পালিত হয়।
আশির দশকের শুরুতে রিয়াল মাদ্রিদের আরেকটি নতুন জেনারেশনের আবির্ভাব ঘটে।স্প্যানিশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট জুলিও সিজার ইগলেসিয়াস এ জেনারেশনের নাম দেন ‘লা কুইন্টা দেল বুয়েত্রে’।
এই নামটি নেয়া হয়েছিলো রিয়াল মাদ্রিদের তৎকালীন খেলোয়াড়দের ডাকনাম থেকে।তাঁরা হলেন এমিলো বুত্রাগুয়েনো,মার্টিন ভাজকেজ,মিগুয়েল পার্ডেজা,ম্যানুয়েল সানচেজ এবং মাইকেল।তাঁরা পাচজনই রিয়াল মাদ্রিদের ইউথ অ্যাকাডেমীর গ্রাজুয়েট ছিলেন।এদের পাশাপাশি ছিলেন মেক্সিকান স্ট্রাইকার হুগো সানচেজ,গোলকিপার ফ্রান্সিসকো বুয়ো,রাইট ব্যাক মিগুয়েল পোর্লানের মতো খেলোয়াড়েরা।এই জেনারেশন আশির দশক জুড়ে পুরো ইউরোপে ছড়ি ঘুরিয়েছিলো।জিতেছিলো দুইটি উয়েফা কাপ,টানা পাঁচটি লা লীগা।একটি কোপা দেল রে এবং তিনটি স্প্যানিশ সুপার কাপ!
১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো সাঞ্জ ফ্যাবিও ক্যাপেলোকে কোচ হিসেবে নিয়ে আসেন।তখন দলে ছিলো রাউল গঞ্জালেস,ফার্না
ন্দো হিয়েরো,ইভান জামোরানো,ফার্নান্দো রেদোন্দোর মতো খেলোয়াড়েরা।তার উপর নিয়ে আসা হয় ডেভর সুকার,রবার্তো কার্লোস,ক্ল্যারেন্স সিডর্ফ,প্রিড্যার্গ মিজাটোভিচদের মতো প্লেয়ারদের।এর ফলে রিয়াল মাদ্রিদ ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সপ্তম চ্যাম্পিয়নস লীগ টাইটেল অর্জন করলো।ইয়ুপ হেইঙ্কসের অধীনে তারা ফাইনালে জুভেন্টাসকে ১-০ গোলে হারিয়েছিলো।
জুলাই,২০০০।রিয়াল মাদ্রিদ সদ্যই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ক্লাব নির্বাচিত হয়েছে।প্রেসিডেন্ট হয়ে এলেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ।এসেই ঘোষণা দিলেন প্রতি সামারে একজন করে সুপারস্টার নিয়ে এসে গড়বেন লস গ্যালাক্টিকোজ।একে একে নিয়ে আসলেন লুইস ফিগো,জিনেদিন জিদান,রোনালদো নাজারিও ডি লিমা,রুড ভ্যান নিস্টলরয়,ডেভিড বেকহাম,ফ্যাবিও ক্যানাভারোর মতো সুপারস্টারদের।আর আগেই দলে রবার্তো কার্লোস,রাউল গঞ্জালেস,গুতি,ইকার ক্যাসিয়াসরা ছিলেন।ফুটবল বিশ্ব দেখলো আরেকটি লস গ্যালাক্টিকোজ।তবে এই দল প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য পায় নি।একটি চ্যাম্পিয়নস লীগ,একটি লা-লীগা জিতেছিলো।তখনই ঘটলো এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত।পেরেজ উচল জয়ী কোচ দেল বস্ককে স্যাক করলেন।ক্লাব ছাড়লেন ম্যাকেলেলে,ফার্নান্দো হিয়েরোসহ আরো বেশ কিছু খেলোয়াড়।এটিই মূলত মাদ্রিদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সাফল্য না পাওয়ার কারণ ছিলো।
তারপর ২০০৫-০৬ সিজনে কিছু প্রমিজিং সাইন করান পেরেজ।যাদের মধ্যে ছিলেন রবিনহো,জুলিও ব্যাপিস্টা,সার্জিও রামোস।কিন্তু তারপরও প্রত্যাশানুযায়ী সাফল্য না পাওয়ায় পদত্যাগ করেন পেরেজ।পেরেজের পদত্যাগের পর নতুন প্রেসিডেন্ট হন রামোন ক্যালদেরন।তিনি এসেই ফ্যাবিও ক্যাপেলোকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন।রিয়াল মাদ্রিদও চার বছর পর প্রথম লা-লীগা জিতে।কিন্তু এ সিজন শেষে ক্যাপেলোকেও স্যাক করা হয়।আবার শুরু হয় রিয়াল মাদ্রিদের দুঃসময়।
২০০৯ সালে পেরেজ আবারো প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাদ্রিদে ফিরে আসেন।ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে রেকর্ড ৯৪ মিলিয়ন দিয়ে নিয়ে আসেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে।সেই সাথে এসি মিলান থেকে কাকাকে।কোচ হিসেবে নিয়োগ দেন ইন্টারের ট্রেবল জয়ী কোচ জোসে মরিনহোকে।প্রথম সিজন ভালো না কাটলেও পরের সিজনেই রিয়াল মাদ্রিদকে রেকর্ড ১০০ পয়েন্ট নিয়ে লা-লীগা জেতান মরিনহো।সেই সিজনে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো লা-লীগায় দ্রুততম ১০০ গোলের রেকর্ডও করেন।রিয়াল মাদ্রিদ সেই সিজনে মোট গোল দিয়েছিলো ১২১ টি।গোল ডিফারেন্স ছিলো +৮৯।মোট ৩২ টি ম্যাচও জিতেছিলো রিয়াল মাদ্রিদ।কিন্তু মরিনহোকে মূলত নিয়ে আসা হয়েছিলো চ্যাম্পিয়নস লীগ জেতানোর জন্যে।কিন্তু তিন সিজনে সেটি করতে ব্যর্থ হওয়ায় আর দলীয় কোন্দলের কারণে তার পরের সিজনেই রিয়াল মাদ্রিদ ত্যাগ করতে হয় মরিনহোর।
২০১৩-১৪ সিজনে রিয়াল মাদ্রিদ কোচ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় কার্লো অ্যাঞ্চেলোত্তিকে।তাঁকে মেইন অবজেক্ট দেয়া হয়েছিলো ইউসিএল জেতানো।এসেই তিনি টটেনহ্যাম থেকে রেকর্ড ১০০ মিলিয়ন ফি দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে আসেন গ্যারেথ বেলকে।সেই সিজনে তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পেয়েছিলেন জিদানকে।রোনালদো,বেল,রামোস,মদ্রিচ,মারিয়াদের নিয়ে মাদ্রিদকে জেতান স্বপ্নের লা দেসিমা তথা দশম চ্যাম্পিয়নস লীগ।টানা ১২ বছর মাদ্রিদিস্তাদের এ ট্রফির জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিলো।এর সাথে এসেছিলো কোপা দেল রে।২০১৪-১৫ সিজন আবারো ট্রফিলেস কাটায় রিয়াল মাদ্রিদ।তাই ডন কার্লোকেও মাদ্রিদ ছাড়তে হয়।তারপর কোচ হিসেবে আসেন রাফা বেনিতেজ।বাজে পারফর্ম্যান্সের কারণে তাকেও বরখাস্ত করে দায়িত্ব দেয়া হয় মাদ্রিদেরই সাবেক খেলোয়াড় জিনেদিন জিদানকে।এসেই তিনি মাদ্রিদকে লা উনদেসিমা তথা এগারোতম চ্যাম্পিয়নস লীগ এবং উয়েফা সুপার কাপ জেতান।১৯০২ থেকে ২০১৭!সময়ের হিসেবে ১১৫ বছর।পৃথীবির অনেক কিছুই বদলেছে শুধু ‘মাদ্রিদিজম’ টাই বদলায়নি।যুগে যুগে সান্টিয়াগো বার্নাব্যুর মাঠ কাঁপিয়ে গেছেন রথী মহারথীরা।রিয়াল মাদ্রিদের ট্রফিকেসে যুক্ত হয়েছে ১২টি চ্যাম্পিয়নস লীগ,৩২টি লা-লীগা,১৯টি কোপা দেল রে,৯টি সুপারকোপা দে ইস্পানা,১টি কোপা দে লা লীগা,১টি কোপা ইভা ডুয়ার্তে,৩টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ,২টি উয়েফা কাপ,৩টি উয়েফা সুপার কাপ এবং ২টি ক্লাব বিশ্বকাপ।
তবে রিয়াল মাদ্রিদ মানে আমার কাছে ১২ টা চ্যাম্পিয়নস লীগ না কিংবা ৩২ টা লা-লীগা,শতাব্দীর সেরা ক্লাবও না।রিয়াল মাদ্রিদ মানে আমার কাছে আলফ্রেডো ডি স্টেফানো,সান্টিয়াগো বার্নাব্যু,মিগুয়েল ম্যুনোজদের গ্রেটনেস।রিয়াল মাদ্রিদ মানে আমার কাছে ইয়ে ইয়ে মাদ্রিদ।রিয়াল মাদ্রিদ মানে রবার্তো কার্লোস,রোনালদো
,রাউল,জিদান,বেকহাম,ফিগো,নিস্টলরয়দের একসাথে খেলতে দেখা।রিয়াল মাদ্রিদ মানে জিদানের সেই দুর্দান্ত ভলি,ইকার ক্যাসিয়াসের সুপারম্যানের মতো করে করা ফ্লাইং সব সেভ,রোনালদো লিমার অলস ভঙ্গিতে করা গোল,বেকহামের করা ফ্রি-কিক,গ্যারেথ বেলের উইং ধরে দেয়া সেই দৌড় কিংবা বারবার ত্রাণকর্তা হয়ে আসা উড়ন্ত সার্জিও রামোসের হেড!রিয়াল মাদ্রিদ মানে রাউলের ‘রাউল মাদ্রিদ’ হয়ে এক সত্ত্বায় পরিণত হওয়া।রক্তাক্ত চোখে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর খেলে যাওয়া কিংবা মাদ্রিদের হয়ে খেলার জন্য মার্সেলোর ব্রাজিল থেকে স্পেনে হেঁটে আসার ইচ্ছা।রিয়াল মাদ্রিদ মানে সবার একসাথে সান্টিয়াগো বার্নাব্যুতে ‘আলা মাদ্রিদ’ কোরাস তোলা কিংবা রাত্রি ২ টার দিকে পাড়া জাগিয়ে তোলা কারো চিৎকার।রিয়াল মাদ্রিদ মানে কখনো হাল না ছেড়ে দেয়া।শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত নিশ্চিত পরাজয় জেনেও দাঁতে দাঁত চেপে সাদা জার্সিটার জন্যে খেলে যাওয়া।
“Madridism is a feelings.”
–আলফ্রেডো ডি স্টেফানো।
আসলেই তাই।রিয়াল মাদ্রিদ একটি অনুভূতির নাম।রিয়াল মাদ্রিদ একটি সত্তা।কিন্তু তা বুঝবেন কিভাবে? আজ থেকে অনেক বছর পর যখন দেখবেন সান্টিয়াগো বার্নাব্যুতে কোন স্ট্রাইকার দুর্দান্ত এক গোল দিয়েছে তখন বুঝবেন ডি স্টোফানো,রাউল,রোনালদোরা আবার ফিরে এসেছে।যখন দেখবেন কোন উইঙ্গার দুর্দান্ত এক সলো রান দিয়েছে তখন বুঝবেন জেন্তো,বেলরা আবার ফিরে এসেছে।কিংবা মাঝমাঠে কারো বল কন্ট্রোলিং দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলে ধরে নেবেন মুনোজ,জিদান,মদ্রিচরা ফিরে এসেছে।যখন কেউ নিশ্চিত সব গোল সুপারম্যানের মতো বাঁচিয়ে দেবে তখন ভাববেন ইকার ফিরে এসেছে।আবার যখন কেউ দুর্দান্ত হেডে বিপক্ষ দলের অস্তরাত্মা কাঁপিয়ে দেবে তখন ভাববেন সার্জিও রামোস,ফার্নান্দো হিয়েরোরা আবার সান্টিয়াগো বার্নাব্যুতে ফিরে এসেছে।রিয়াল মাদ্রিদ একটি সত্তা।এ সত্তার কোনো বিনাশ নেই।মাদ্রিদিজমের এই ট্রেন ছুটতে থাকবে যুগ যুগ ধরে।
ডি স্টেফানোর এই উক্তিটাই সম্ভবত মাদ্রিদিজিম কি তা ব্যাখ্যা করার জন্যে যথেষ্ট!
” ঐ সাদা জার্সিটা রক্তে লাল হবে,ঘামে ভিজে যাবে,কাদায় কর্দমাক্ত হবে কিন্তু কখনো পরাজয়ের গ্লানি বহন করবে না। “

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?