অন্যান্য (U P) সাহিত্য কথা

সিডরে হারানো ছবি

ছবি, আমার কথা তোর মনে পড়েনা? এত সহজেই আমাকে কেমন করে ভুলে গেলি? ওই যে আমি আর তুই সারা দুপুর নদীতে মাছ মারতাম, চুরি করে ফজলু কাকার নৌকা নিয়ে নদীর মাঝপথে রওনা দিতাম। আমার প্রচন্ড ভয় করত, যদি স্রোতের ভিতর নৌকা পড়ে? তুই আমাকে সাহস দিতি। তোর চোখে ভয়ের লেশমাত্র দেখতে পেতামনা। সেখানে কি যেন এক উত্তেজনা চকচক করত। মনে হত এদিকে আসতে পেরে তুই ভীষন আনন্দিত। সেই সাথে রোমাঞ্চিত। আর আমি ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। তুই বলতি, ছেলেমানুষের এত ডর কিসের রে? আমি তো মেয়ে হয়েও ডরাইনা!!!

আমি কিছু বলতে পারতামনা। শুধু এটুকু আমার মুখ দিয়ে বের হত, “তুই বাসায় চল, নইলে বাবায় বকব”

তুই বলতি, “এখন গেলেও বকবো, একটু পরে গেলেও বকবো। বকা যখন খাওনিই লাগবো তখন আর একটু পরেই যাই। ততক্ষন তুই সুন্দর মত একটা গান শুনা।”

আমি গান গাইতে পারতামনা। গলা কেঁপে যেত। তুই নিজেই তখন শুরু করতি।

“সর্বনাশা পদ্মা নদী, তোর কাছে সুধাই……..”

তোর কন্ঠ যে কি দারুন লাগত বলে বোঝাতে পারবনা। সব ভয় এক নিমিষেই দূর হয়ে যেত আমার। মনে হত, গোটা নদীটাই যেন তার ঢেউয়ের শব্দ দিয়ে তোর সুরেলা গানের বাজনা বাজাচ্ছে।

ছবি, আমি স্বপ্নেও ভাবিনি, তোর প্রিয় নদী, নদীর জল তোকে এভাবে আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিবে। যে নদীকে তুই এতো ভালোবাসতি, যে নদীতে গোসল না করলে নাকি তুই পবিত্র হইতিনা! সেই নদীই হয়তো তর ভালোবাসার ঋণ শোধ করার জন্যই তোকে তাদের বুকে টেনে নিয়েছে।

১৪ নভেম্বর বিকেলবেলা।

তুই আমাকে বললি, “সাগর দেখ, কি নাকি একটা তুফান আইতাছে। বাব্য কইল, রেডিওতে বইলা দিতাছে এই তুফানে নাকি অনেক ক্ষতি করব।”

আমি তখনো বুঝিনি, তুই নিজেই আমাকে এমন সংবাদ দিয়ে নিজেই আমার হৃদয়ের মস্তবড় ক্ষতির কারন হবি।

সেদিন সারাটা বিকেল আবহাওয়া কেমন যেন গুমোট ছিল। আমি আর তুই বারান্দায় বসে লুডু খেলছিলাম। কিছুতেই তোকে হারাতে পারছিলামনা। তখন না বুঝলেও এখন বুঝি, আমাকে তোর কথা চিরদিনের জন্য মনে করিয়ে দিতেই এমন খেলা খেলেছিলি। গো-হারা হারার পর আমি বলেছিলাম, “আজ তো হারলাম, কাল দেখাইবো কত ধানে কত চাল।”

কিন্ত জানতামনা এই কাল আর কোনদিনই আসবেনা। জানিস ছবি, তুই যে আমার হৃদয়ের কতটুকু জায়গা জুড়ে ছিলি তা এখন বুঝতে পারছি। আমার মনে হচ্ছে গোটা পৃথিবীটাই যেন আমার কাছে ফাঁকা হয়ে গেছে। এখন নদীর কাছে গেলে নিজেকে ভীষন একা লাগেরে। ঢেউয়ের বাজনা কানে আসে, কিন্ত তোর সেই হৃদয়কাড়া কন্ঠের গান আর শুনতে পাইনা। তোর হয়ে তখন আমি গাইতে চেষ্ঠা করি, অন্তরের গভীর হতে যেন তোর কথা শুনতে পাই, তুই যেন বলছিস, “সাগর, আমারে ছাইড়া একা একা গান গাইতাছস?”

আর গাইতে পারিনারে।

সেদিন রাতে ঝড় একটু একটু বাড়ছিল। ক্রমে ক্রমে ঝড়ের তান্ডব এত বেশি হয়ে উঠল যে, ঘরে টেকা দায় হয়ে পরেছিল। ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে পানিও বাড়ছিল। বাঁশ-বেতের তৈরী দেওয়াল, ছনের চালাগুলো যেন উড়ি উড়ি করছিল বাতাসে।

তখন ঘর হতে সবাই বাইরে বের হয়ে পার্শ্ববর্তি মোটা মোটা গাছে উঠার চেষ্ঠা করছিল। যাতে পানি বাড়লেও কোন ভয় না থাকে, আর গাছ মোটা হবার কারনে যেন ঝড়েও ভেঙ্গে যাবার ভয় না থাকে।

আমি আর তুই একটা গাছের মগডালে ঊঠেছিলাম। তুই বারবার বলছিলি, “সাগর, শক্ত কইরা ধরিস, নয়তো পইড়া যাবি কিন্ত……..”

তারপর কিছুক্ষন। বিশাল একটা ঢেউ আর বাতাস দানবের মত এসে আমাদের গোটা গাছকে ঢেকে দিল।  ভাগ্যের কেমন পরিহাস! তোর হাতে ধরা ডালটাই ঢেউ আর বাতাসের তোড়ে ভেঙ্গে গাছ থেকে ছুটে গেল। চোখের সামনে তোকে হারিয়ে যেতে দেখলাম। কিন্ত কিছু করতে পারলামনা।

নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছিনা রে। কিইবা করার ছিল আমার বল? তোকে এভাবে যেতে দেখে আমি আমার নিচের শক্ত ডালটা পা দিয়ে চেপে ধরেছিলাম আর হাত দিয়ে ধরেছিলাম অন্য একটা ডাল।

ঝড়ের নগ্ন আতঙ্কে প্রচন্ড ঠান্ডাতেও ঘামছিলাম, নিজেকে কিছুতেই বাস্তব মনে হয়নি তখন। মনে হয়েছে স্বপ্ন দেখছি।

কতক্ষন পর ঝড় থেমেছে বলতে পারবনা। ঝড়ের দীর্ঘ মুহুর্তগুলো কিভাবে কেটেছে তাও বলতে পারবনা। শুধু এটুকু মনে আছে, ঢেউয়ের তোড় ধীরে ধীরে কমে আসছিল। আমি গাছের ডাল চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে রেখেছিলাম। নিচে নামার সাহস হচ্ছিলনা। চারপাশে তখন দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে চোখ দুটো মেলে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। যেন একটা কিয়ামত ঘটে গেছে আমাদের পটুয়াখালী ও বরগুনা সীমানার আশারচরের উপর দিয়ে। নিচে নেমে দেখি এক জায়গায় ফজলু কাকা বসে কাঁদছে। আরও অনেকেই কাঁদছে। বাবা-মা আমাকে দেখেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। জানিস ছবি, তোর মাও নাকি তোর সাথে ঢেউয়ের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। শুধু তোর বাবা আমাকে দেখছে আর বলছে, “বাবা সাগর, আমার মাইয়াডা কনে গেল? ওহ! আল্লাহরে! এ কোন খেলা দেখাইলা”

আমি কি বলে তোর বাবাকে শান্তনা দিব, নিজেই তো শান্তনা পাচ্ছিলামনা।

ছবি, আজ সরকারী কত লোক ত্রান নিয়ে এসেছে আমাদের মাঝে বিলিয়ে দেবার জন্য। আমাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও নাকি সরকার দিবে। কিন্ত “সিডর” নামক প্রলয়ংকারী ঝড়টা আমার হৃদয়ের যে মস্ত ক্ষতি করেছে তার ক্ষতিপুরন কে দিতে পারবে?

তুই নদীকে খুব ভালোবেসেছিলি, না হলে সবাইকে পাওয়া গেলেও তোকে পাওয়া গেলনা কেন? তোর মা, বড় দিদি, পাশের বাড়ীর রাশা ভাই, দীপু ভাই, রাকিব মামা….. সবার কবরে আমার ছোট্ট হাতের ছোঁয়া দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানালাম।

ছবি, তোকে কবরের মাধ্যমে শেষ শ্রদ্ধা বা ভালোবাসা না জানানোয় এখনও মনে হয় তুই আবার ফিরে আসবি। আমাকে আবার ডেকে বলবি, মাছ ধরতে যাবিনা???”

আমার অপেক্ষার আর শেষ হয়নারে। জানিনা শেষ হবে কিনা।

এই নদী, ঝড়, বাদল সব যেমন দুঃখ দিতে জানে, তেমনি হয়ত ভালবাসতেও জানে। আর যাকে ভালবাসে তাকে বুকে জড়িয়ে রাখে খুব নিবিড় করে।যেমন করে তোকেও রেখেছে।

…………………………….***………………………………

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

জরিনা বিবির জরির শাড়ি

Maksuda Akter

ম্যানস্ পার্লার!

Maksuda Akter

অশ্লীলতার শীর্ষে যে ইউটিউবার

TahseeNation (Tahsin N Rakib)

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy