Now Reading
অতৃপ্ত ভালোবাসা



অতৃপ্ত ভালোবাসা

*আরো কিছু শুনার ছিলো!

 

মোবাইলটা ভাইব্রেট করতেই নিশা বিরক্তমুখে সামিরের দিকে তাকালো। সামির নিশার রাগী চেহারা দেখে ফোনটা ধরবে নাকি ধরবেনা ভাবতে ভাবতেই নিশা সামিরের পাশ থেকে উঠে পাশের রুমে চলে গেল।
রিশা ফোন করেছে। ফোনটা ধরতেই সামির রিশার ব্যস্ত গলা শুনতে পেল।
– তুমি কি আজকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারবে?
সামির বিরক্ত গলায় বলল,
– আপনাকে কতবার বলেছি, আমাকে তুমি করে বলবেন না?
– স্যরি, আর বলবো না। আপনি একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারবেন?
– না।
– কেন, নিশা আপু কি আসতে দিবেনা?
সামিরের মনে হল কথা বলার সময় সে রিশার হাসি শুনতে পেল।
নিজেকে কোনরকমে সামলে বললো,
– নিশার ব্যাপার তো আপনার জানা দরকার নেই, তাই না?
– ওকে বাবা আর বলবো না।
– আমাকে আসতে হবে কেন?
– বাসা থেকে মা ফোন করেছিল, বাবার শরীরটা বেশি ভালো না। আমাকে দেখতে চেয়েছে।
– তো, আমাকে কেন যেতে হবে?বলেছি না, ঐ বাসার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই?
.
রিশা বিস্মিত গলায় বললো,
– বাবার এমন অবস্থা জেনেও আপনি একথা বলছেন? বাবা তো সবারই বাবা, তাই না! এখানে আমাদের বিয়েটাকে ইস্যু না করলে কি চলতো না?
রিশার কথা শুনে সামির বিব্রতভাবে বলল,
– আমি আসছি।
.
নিশাকে সামির ব্যাপারটা খুলে বলতেই নিশা গম্ভীর হয়ে গেল। আধা ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করেও তার মুখ থেকে কথা বের করা যাচ্ছেনা। সামির বিরক্ত হয়ে বারবার ঘড়ি দেখছে। রিশা মেয়েটার কি কোন কমন সেন্স নেই? জানে সামির আজ রাতে নিশার সঙ্গে থাকবে তবু ফোন করা চাই।
সামিরের ব্যস্ততা দেখে নিশা মুখ খুললো,
– তুমি কি বুঝতে পারছ, এই মেয়েটা আস্তে আস্তে তোমাকে নিজের কব্জায় নিয়ে যেতে চাচ্ছে?
– আসলে ওর বাবা অসুস্থ তো, তাই যেতে বলেছিল।
– ওটা যে স্রেফ একটা অযুহাত সেটা বুঝতে পারছ না? আজকে বাবার অসুখ কালকে নিজের পিরিয়ড এইসব বলেই তো তোমাকে লোভ দেখাবে, তাই না!
– এইসব কি বল? ও এতটা খারাপ না।
– ও! এখনি দরদ শুরু হয়ে গেছে! এতোই যখন ভালো তাহলে ডিভোর্সটা দিচ্ছে না কেন?
নিশার কথা শুনে সামির চুপ হয়ে গেল। রিশা মেয়েটা এই একটা ব্যাপারে যে কত কঠিন, সেটা যদি নিশাকে দেখাতে পারতো?
..
..
রিশার বাবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে সামির গম্ভীর হয়ে রিশাকে বলে,
– আমি এভাবে আর সম্পর্কটাকে চালিয়ে নিতে পারবো না।
রিশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
– তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দিন।
সামির উত্তেজিত গলায় বললো,
– আপনি জানেন, আমি নিজ থেকে আপনাকে ডিভোর্স দিলে বাবা আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে। আপনার দিক থেকে তো ডিভোর্স দিতে কোন সমস্যা নেই, তাই না?
রিশা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললো,
– প্রেমের জন্য নাহয় সিংহাসন ছেড়েই দিলেন!
কিছুক্ষণ চুপ করে আবার বলল,
– আমি আমার ফ্যামিলিকে কি করে বোঝাবো আপনিই আমার কাছে ডিভোর্স চেয়েছেন, আমি নিজ থেকে দেইনি?
সামির রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলল,
– আপনি আমাকে ছাড়তে চাননা কেন? বারবার শুধু বাবার বাড়ির দোহাই দিয়ে চলেছেন। অথচ আমাদের মধ্যে রিলেশনশিপটা যে যাচ্ছেনা সেটা তারা ভালো করেই জানে। এমনকি নিশার ব্যাপারটাও জানে। তাহলে আপনার প্রবলেমটা কোথায়??
.
রিশা আস্তে করে বললো,
– আই লাভ ইউ।
সামির চমকে উঠে বলল,
– হোয়াট!!!
– যেটা সত্যি সেটাই তো বললাম। আমাকে প্রথম যেদিন হুট করে আপনার ছবি দেখিয়ে বলল, এই ছেলেটার সঙ্গে আগামী সপ্তাহে তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে তখনই চমকে গিয়েছিলাম। কোনদিন প্রেম নিয়ে ভাবিনি তো, তাই বুঝতে পারিনি, কেউ আমাকে একটা ছবি দেখিয়ে বলবে এটা তোমার বর আর আমি সেটা সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেব। কিন্তু সেটাই ঘটে গিয়েছিল।
.
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রিশা আবার বলতে শুরু করলো,
– বাসর রাতে প্রথম গিয়ে না বুঝতে পারলাম, সব বিয়ে পুতুলের বিয়ে না! সবাই সব ভাগ্য নিয়ে জন্মায় না। আমারো সেই কপালটা নেই। কিন্তু আমি যে কখনো আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না সেটা খুব ভালো করেই জানি।
সামির শক্ত গলায় বললো,
– আমিও নিশাকে ছাড়তে পারবো না। ওকে পাওয়ার জন্য যদি কখনো আপনাকে খুন করতে হয় তবে তাই করবো।
রিশা সামান্য হেসে সায় দিয়ে বললো,
– সেটাই বোধহয় আমাদের সবার জন্য ভালো হবে।
..
চারমাস পর…..
..
অফিসে যাওয়ার পথে ভুল করে সামির একটা ফাইল রেখে এসেছে দেখে আবার বাসায় ব্যাক করল।
বারবার কলিং বেল বাজানোর পরও রিশা দরজা খুলছে না। বিরক্ত হয়ে রিশার মোবাইলে কল করতে যেয়ে সামির দেখল রিশার কাছ থেকে একটা মেসেজ এসেছে।
” তুমি তো আর আমাকে উইশ করবে না, তাই আমিই তোমাকে করলাম, হ্যাপি ম্যারিজ অ্যানিভার্সারি। ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন, আজকে আমাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী ছিল। রফিকের কাছে চাবি দিয়ে গেলাম। আমি চলে যাচ্ছি, যেখান থেকে এসেছিলাম সেখানে। বাবা মা হয়তো আমার কথা বুঝতে পারবে, তোমাকে কোন দায় নিতে হবেনা। আমি নিজ থেকেই তোমাকে ছাড়ে যাচ্ছি। আর একটা কথা শেষবারের মত শোনো, আই লাভ ইউ।”
..
মেসেজটা পড়ে সামির বিশ্বাস করতে পারছে না। সত্যিই তাহলে রিশা অবশেষে বুঝতে পেরেছে, সামিরকে কাছে টানার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই! নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে নিশার ছোট ভাই আদনানকে ফোন করল,
– রিশা কি তোমাদের বাসায়?
আদনান বিরক্ত গলায় বলল,
– আমাদের বাসা হবে কেন? এটা রিশারও বাসা। ভার্সিটিতে আসার সময় দেখলাম ওর মুখ শুকিয়ে গেছে। আপনি কি ওকে একটু সুখে থাকতে দেবেন না? বিয়ের আগে যদি জানতাম আমার বোনটাকে এমন…..
.
পুরোটা না শুনেই সামির ফোনটা কেটে দিল। যাদের সঙ্গে আর কোন সম্পর্কই নেই তাদের সঙ্গে ভদ্রতার খাতির দেখানোর কোন মানে হয়না।
বাসার পাশে মালির জন্য বানানো কোয়ার্টারে গিয়ে সামির রফিকের কাছ থেকে চাবি নিয়ে আসার সময় দেখলো সামনের ঝোপে একটা বস্তা পরে আছে। সামনে গিয়ে টের পেল ওটা রিশা। ওর চারপাশের পুরো জায়গা রক্তে ভিজে গেছে। সামিরের মাথায় কেবল ঘুরতে লাগলো, মানুষের শরীরে এত রক্ত হয়??
..
দুই বছর পর…
..
– হ্যালো সামির, তুমি কি আজকে একটু আমার এখানে আসতে পারবে?
– স্যরি নিশা, আজকে পারছি না।
নিশা হালকা হেসে বললো,
– কেন, তোমার বউ আসতে দেবে না?
– যদি আসতে দিতে না চাইতো তাহলেই হয়তো বেশি খুশি হতাম।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললো,
– তুমি তো জানোই ও একা একা কিছুই করতে পারে না। সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকি আবার কি দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
– আসলে আমি তোমাদেরকে একটা উপহার দিতে চেয়েছিলাম। এখন আসতে পারছ না যখন, তখন মুখেই বলে দেই, হ্যাপি ম্যারিজ অ্যানিভার্সারি। রিশাকে আমার পক্ষ থেকে উইশটা জানিয়ে দিও।
– হুম, বলব। বুঝতে পারবে কিনা জানিনা, তবু বলব।
..
..
কথা শেষ করে সামির রিশার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাল, খুব পবিত্র লাগছে রিশাকে। সামিরের খুব কষ্ট হচ্ছে। সামিরকে বলা ওর শেষ কথাটা ছিল, আই লাভ ইউ। এটাই হয়তো ওর জীবনের শেষ কথা হয়ে থাকবে। ডাক্তার তো বলেই দিয়েছে, ও আর কখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না।
কি অদ্ভুত! এত অপমানের পরও বাবা মায়ের সঙ্গে শেষবারের মত দেখা করে এসে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চাওয়ার সময় সে নিজের স্বামীর বাসাটাকেই শেষ ঠিকানা ভেবে নিয়েছিল।
.
সামির আস্তে করে বললো,
– মানুষের জীবনটা সত্যিই গল্পের চেয়ে বেশি কিছু। একদিন বাবা মাকে বলেও নিশাকে পাইনি, এখন তারা বারবার বলার পরও আমি আর নিশা কেউই বিয়ে করতে রাজি না। একসময় তুমি আমাকে চেয়েও পাওনি, আর এখন আমি লক্ষবার চেয়েও তোমাকে পাইনা।
.
বলতে বলতে সামিরের চোখে পানি চলে এলো। এই অভাগা চোখ এত অশ্রু কোত্থেকে পায় কে জানে! সামির চোখ মুছে ফেললো, ছেলেদের কাউকে চোখের পানি দেখাতে নেই।

About The Author
Maksuda Akter
Maksuda Akter
2 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment