অন্যান্য (U P) নারী শক্তি ও অধিকার

তবু ও জেগে থাকে অভিমান

“এক”
দিনের এই সময়টা রেবেকার সবচেয়ে প্রিয়। ঘুম থেকে উঠে স্বামী নেওয়াজের অফিসের কাপড় গুছিয়ে দিয়ে তাকে ঘুম থেকে তুলে বাথরুমে ঢুকিয়ে চলে যায় শাশুড়ির ঘরে। বছর দুয়েক ধরে দাদীর সাথে ঘুমুচ্ছে তিতলি। তিতলি রেবেকা আর নেওয়াজের একমাত্র মেয়ে। ভিকারুননেছা নুন স্কুলের ক্লাশ সিক্সের ছাত্রী তিতলি। ফজরের নামাজ শেষে এককাপ চা খাওয়া শাশুড়ির অনেক দিনের অভ্যেস। গরম চায়ের সাথে স্টোষ্ট বিস্কুট আর পানির গ্লাস নিয়ে রেবেকা যখন শাশুড়ির ঘরে যায়, তখান দেখতে পায় তিতলিকে ঘুম থেকে জাগানোর প্রানপন চেষ্টা করছেন শাশুড়ি।

কখনো ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতে চায়না। এই বয়সে আমরা ফজরের আজানের আগে খুম থেকে উঠেছি। তিতলি, এই তিতলি………..।

শাশুড়ির এই স্মৃতিচারন প্রতিদিনের। এই সময়টায় বাড়ির ছোট মেয়ে অর্থাৎ, নেওয়াজ, রিয়াজ ও রিপাতদের বোন কেয়ার ঘর থেকে শোনা যায় রাগ ভৈরবী প্রতিদিনের মতো আজও গানের রেয়াজ করছে কেয়া। রান্নাঘরে গিয়ে কেয়ার জন্য চা নিয়ে তার ঘরে যায় রেবেকা কেয়া আজ গাইছে: …।

ননদের পাশে রেবেকা। কেয়া রেবেকার দিকে তাকিয়ে হাসে। তারপর চোখ বন্ধ করে ডুবে যায় গানে। তম্ময় হয়ে কেয়ার গান শোনে রেবেকা। যৌথ পরিবারের কোলাহলময় এ বাড়িটা এসময় একেবারে নিরব হয়ে থাকে। এরপর প্রতিদিন যা ঘটার আজো তাই ঘটল।

 

রেবেকা স্বামীর ডাক শুনে চা এর কাপটা পেয়ালা দিয়ে ঢেকে রেখে দ্রুত নিজেদের ঘরের দিকে ছুটে যায় রেবেকা। সেভিং রেজারের খুঁজে পাচ্ছেনা নেওয়াজ। অথচ সব সাজিয়ে রাখা আছে বেসিনের পাশের ওয়াল র‌্যাকে। নেওয়াজকে রেজার দিয়ে যখন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছে রেবেকা, তখান বাথরুমে থেকে বলে ওঠেই নেওয়াজ রেবু, আমার সার্টের হাতাটা দেখলাম কুঁচকে গেছে। একটু ইস্ত্রি করে দাও।

 

স্বামী শার্ট ইস্ত্রি করে দিয়ে সোজা রান্নাঘরে চলে যায় রেবেকা। কিছুক্ষনের মধ্যে বাড়ির সবাই হাজির হবে ডাইনিং টেবিলে। সবার পছন্দ মতো নাস্তা বানাতে হবে। তিতলি এবং রিয়াজ-সীথির ছেলে শুভ’র স্কুলের টিফিন, নেওয়াজ, রিয়াজ, রিশাত, রীতি এবং লাভলির লাঞ্চবক্স রেডি করতে হবে। নেওয়াজ নাস্তার খায় লাল আটার রুটি আর সবজি। রিয়াজের পছন্দ পরোটা হালুয়া। রীতি তেলেভাজা খাবার একদম সহ্য করতে পারেনা। লাল আটার রুটি খেলে ওর গ্যাসের সমস্যা হয়। রিশাতের পছন্দ স্যান্ডউইচ আর ফলমূল। লাভলি খায় ফ্রুটস, কাহলা কফি আর টোষ্ট। তিতলির কোনো পছন্দ অপছন্দ নেই যা পায়, তাই খেয়ে নেয়। শুভর পছন্দ আরো ভিন্ন।

টিফিন এবং লাঞ্চ বক্সগুলো রেডিকরে দিয়ে ডাইনিং হলে পাঠিয়ে দেয় রেবেকা। একটু পর কফি এবং টি-পট নিয়ে ডাইনিং হলে যায় রেবেকা। এরি মধ্যে টেবিলে হাজির হয়েছে নেওয়াজ, রিয়াজ, কেয়া, শুভ এবং তিতলি । এখনো স্কুল ইউনিফর্ম পরেনি তিতলি।

তিতলির ইউনিফর্ম তো ইস্ত্রি করা নেই। অভিযোগের স্বরে বলে নেওয়াজ।
এখনই করে দিচ্ছি। কতদিন বলেছি এসব কাজ আগেরদিন করে রাখবে। অসন্তুষ্ট নেওয়াজ।
দ্রুত চলে যায় রেবেকা। রিয়াজের দিকে তাকায় নেওয়াজ। ঘরের পোশাকে নাস্তা খাচ্ছে দেখে অবাক .. যায় সে। কি ব্যাপার? অফিসে খাবিনা? জানতে চায় নেওয়াজ।
যাবো তো। আয়েস করে খাবার চিবুতে টিবুতে জবাব দেয় রিয়াজ।
তাইলে এখনো এ অবস্তায় আছিস কেনো? রিয়াজের পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চায় নেওয়াজ।
একটু পরে যাবো। আমাদের ডিজি সাহেব বিদেশে গেছে তো। আনন্দিত কন্ঠে তথ্যটা জানায় রিয়াজ বস অফিসে না থাকলে দেরি করে অফিসে যেতে হবে? আচ্ছা, তোর অধীনস্তরা কেউ এরকম ফাঁকা ফোকর পেয়ে দেরিতে অফিসে গেলে তুই কি করবি?

প্রথম দিন সতর্ক করব। তারপরও এরকম করলে বেতন কেটে রাখব।
প্রত্যেক মাসে তোর ক’দিনের বেতন কেটে রাখা উচিত বলতো?

এসময় ঝলমলে চেহারা ও সাজ-সজ্জায় ডাইনিং হলে আসে রিশাত এবং লাভলি। চেয়ার টেনে বসে পাশাপাশি। যার যার পছন্দের খাবার নেয়া ওরা। ফ্রুটস বাক্সেট থেকে একটা আপেল নেয় রিশাত।
কেয়া,, তাড়াতাড়ি নাস্তা শেষ করে আমাদের ঘরে একটু যা তো। বিনি একা শুয়ে আছে।

আমি পারবনা। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে কেয়া।
পারবেনা মানে? ঘরে বিনি একা শুয়ে আছে। আমরা অফিসে যাচ্ছি। আর তুমি ওর কাছে যেতে পারবেনা? বিনিকে তুমি ভালোবাসনা? ক্ষোভের সাথে জানতে চায় লাভলি।
-এর সাথে বিনিকে ভালোবাসা না বাসার কি সর্ম্পক আছে? অসহায় অভিভক্তিতে বলে কেয়া।
-সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি কাজে থাকি। আল্লাহ জানে, সারাদিন মেয়েটা কেমন থাকে। মেয়ের কথা ভেবে কেঁদে ফেলে লাভলি।
-আহা, সকাল সকাল তোরা কি শুরু করলি বলত? বিক্রিতকন্ঠে বলে নেওয়াজ।
-ঢং! চার কাপ নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যায় কেয়া।
নাস্তা শেষ না করেই চলে যায় লাভলি। তাকে অনুসরন করে রিশাত। রেবেকা এসে তিতি কে ঘরে নিয়ে যায়। স্কুল ইউনিফর্ম ইস্ত্রি করা হয়ে গেছে। এসময় টেবিলে আসে বীথি। রিয়াজের স্ত্রী। নিরবে একটা কাপে কালো কফি ঢেলে নেয়।
-কি ব্যাপার বীথি, তুমি অফিসে যেতে দেরি করছ কেন? জানতে চায় নেওয়াজ।
এসময় স্কুল ইউনিফর্ম পর তিতলিকে নিয়ে ডাইনিং হলে আসে রেবেকা। তার কোলে সদ্য ঘুম থেকে উঠা তিন বছরের বিনি।
– আমার অফিসের গাড়ি নষ্ট। কাল রাতে লাভলিকে বলেছিলাম, আমাকে অফিসে লিফ্ট দেওয়ার জন্য। ওরা আমাকে না নিয়েই চলে গেল। ক্ষুবকন্ঠ বীথির।
– ওরা হয়ত ভুলে গেছে। তোমার অফিস তো বাছেই। আজ তুমি রিকশায় যাও। পরামর্শ দেয় রেবেকা।
– নিয়াজের সাথে যাও। ওর গাড়ি তো আসবে।
– আমার গাড়িও আজ নষ্ট। ভাবি, আমাকে একটু দুধ চা দেবে? তুমি নিজের হাতে বানাবে কিন্তু রেবেকার কাছে আব্দার করে রিয়াজ।

“দুই”
ডিনারের পর বিনির জন্মদিনের অনুষ্ঠান নিয়ে কথাবার্তা হলো। হলো নানা পরিকল্পনা। আমন্ত্রিতদের তালিকা তৈরি করা হলো। আসমানী শুয়ে পড়েছে। আলোচনার মাঝখানে তোমরা যা ভালো বোঝো করো বলে শুতে চলে গেলেন শাশুড়ি। রেবেকা সবাই দু’দফা চা সার্ভ করল। এর মধ্যে সামান্য কারনে ঝগড়া শুরু করে দিলো রিশতি এবং লাভলি। রেবেকার মধ্যস্থতায় থামে ওদের ঝগড়া।

সাবার খোঁজ-খবর নিয়ে শোকর ঘরে যেতে যেতে রাত বারোটা বেজে যায় রেবেকার। বিছানায় বসে ল্যাপটপে কি একটা কাজ করছিল নেওয়াজ। বাথরুমে থেকে ফিরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে রেবেকা। মাথার খোপাটা ছেড়ে দেয় সে। পুরো পিটে ছাড়িয়ে পরে রেবেকার ঘনকালো চুল। স্ত্রীর দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নেওয়াজ। ল্যাপটপটা শাটডাউন করে।
– রিশাত আর লাভলিকে দেখে কেশ ভালো লাগে। দু’জনে একই অফিসে চাকরি করে। কাজ-কর্মে সমান সিরিয়াস। শত ব্যস্ততার মধ্যেও ফিটফাট হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে। সামান্য কারনেই ঝগড়া সামান্যতেই হাসি চমৎকার, তাইনা? রিশাত আর লাভলির প্রতি মমতায় আপ্লুত হয় নেওয়াজ।
চুলে চিরুনি চালাতে সংক্ষিপ্ত জবাব দেয় রেবেকা।
আমরা তিনভাই চাকরি করি। চাকরি করে বিথি আর লাভলিও কেয়া চলে যায় ভার্সিটিতে। সারাদিন তুমি নিশ্চয়ই তোমার খুব একঘেয়ে লাগে। কাটতে চায়না সময়। স্ত্রী প্রতি সহানুভুতিশীল অনুভূতি প্রকাশ করে নেওয়াজ।

স্বামীর এ কথার কোনো কথা দিতে পারেনা রেবেকা। এসব কথার কোনো জবাব দেওয়াও যায় না। কি বলবে রেবেকা? তুমি বলছ, সারাদিন একঘেয়ে লাঘে আমার। কাটতে চায়না সময়। কিন্তু নেওয়াজ, তুমি কি জানো, কাকডাক ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত নিজেকে নিয়ে একটু ভাববার, নিজের দিকে একটু ফিরে তাকাবার সময় পাইনা আমি? কিন্তু বাকি সব কাজ তো আমাকেই করতে হয়। পালন করতে হয় যাবতীয় দায়িত্ব। ঘুম থেকে উঠে শাশুড়িকে ঔষধ খাওয়ানো, তাকে চা দেওয়া, বাড়ি সবার পচন্দ অনুযায়ী সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার , বিকেলের নাস্তা, রাতের খাবারের আয়োজন করা। কে খেলো, না খেলো কার কি সমস্যা হলো তার খোঁজ-খবর রাখা। তোমার অফিসে যাওয়ার প্প্রস্তুতি, তিতলি শুভকে সময়মত স্কুলে পাঠানো, তাদেরকে স্কুল থেকে আনা, সবার জামা-কাপড় ঠিকাঠাক রাখা, বাড়িঘর মুছিয়ে রাখা, অতিথি আপ্যায়ন মেয়েকে পড়ানো, লাভলির শিশুকন্যা বিনিকে প্রতিপালন করা। ইলেকট্রিক বিল, গ্যাসবিল, টেলিফোন বিল শোধ করা- এসব কাজ করার পর আমার নিজের জন্য বরাদ্দ করার মতো সময় কি থাকে আমার?
ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠে দাঁড়ায়ে রেবেকা। ড্রয়ার খুলে তিতলির টার্ম পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড বের করে। এগিয়ে দেয় নেওয়াজের দিকে।
– এটাতে সই করে দাও।
কি ভেবে রিপোর্ট কার্ডে চোখ বুলাল নেওয়াজ। এমনটি সাধারনত করেনা সে। অভিভাবকের স্বাক্ষরের জায়গার সই করে ফেরত দিয়ে দেয় সে কার্ডটা। কিন্তু এবার কার্ডটা দেখে অগ্নিশর্মা হয়ে যায় নেওয়াজ।
– এরকম রেজাল্ট কেন হলো? নিশ্চয়ই তুমি ওর লেখাপড়ার দিকে ঠিকমতো খেয়াল রাখোনি?
– না, মানে কি বলেবে ভেবে পায়না রেবেকা।
– তুমি কি বলবে বুঝতে পেরেছি। বাড়ির কাজে ব্যস্ত থাকার জন্য তুমি তিতলির দিকে নজর দিতে পারোনি, এই তো?
– আমি কি তাই বলেছি নাকি?
– সব কথা বলতে হয়না রেবেকা। কাউকে কিছু বোঝানোর জন্য বডি ল্যাংগুয়েজই যথেষ্ট। একটা মাত্র মেয়ে। তার খেয়াল রাখতে পারোনা। কি এমন কাজ তোমার। সকালবেলা নাস্তার যোগড়ি করা আর দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা। এসব কাজে সাহায্য করার জন্য ফুলটাইম কাজের লোক আছে। অতিরিক্ত দায়িত্ব হলো শুভকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া আর স্কুল থেকে নিয়ে আসা। এই সামান্য কাজ করতেই টায়ার্ড হয়ে যাও? বীথি, লাভলি ওদেরকে দেখো। ওরা তো চাকরি করে। তারপরও শুব আর বিনির দিকে কত খেয়াল রাখে। চাকরি-বাকরি করলে সত্যিকারের পরিশ্রম বুঝতে পারতে। হাউজকিপিংয়ের মতো সামান্য কাজ তুমিনা, তমি আসলে…কঠিন আরো কিছু বলতে গিয়ে থেমে যায় নেওয়াজ।

স্বামীর কাথায় একটুও কান্না পায়না রেবেকার। শুধু যন্ত্রনার এক অসহ্য অনুভূতি যেনো জ্বলেপুড়ে ছারখার করে দেয় তার তলপেট, পাজর, হৃদপিন্ড নাক, কান, চোখ আর গলাকে। অসহনীয় যন্ত্রনায় চেপে আসে তার মাথা। অপ্রকৃতিস্থ এক অনুভূতি নিয়ে টলমলে পায়ে বেরিয়ে যায় সে সোবার ঘর থেকে। দোতলার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় রেবেকা। কতক্ষন দাঁড়িয়েছিল জানেনা সে ।সামনের রাস্তারয় দীর্ঘ স্বরে স্বল্পলয়ে ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনে একটু যেনো স্বাভাবিক হয় রেবেকা। ফিরে তাকায় বাড়ির সামনের রাস্তায়। একটা রুগ্ন কুকুরকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে চার -পাঁচটা কুকুর। এদের কেউ কেউ মাঝে মাঝে রাস্তায় আসছে। পেছনের পা দিয়ে রাস্তায় আঁড়ে কেটে আবার যোগ দিচ্ছে রুগ্ন কুকুরটাকে ঘিরে থাকা কুকুরদের দলে। কোনো কোনোটি আবার রুগ্ন কুকুরটাকে কামড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে একটা কুকুর লাইটপোস্টের কাছে গিয়ে পেছনের এক পা তুলে ধরে প্রস্রাব করল। ঘৃনায় বিকৃত হলো রেবেকার চেহারা । নিজের ঘরে দিকে যাওয়ার সময়ে শাশুড়ির ঘরে আলো দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে গেলো রেবেকা। এতরাতে এ ঘরে আলো জ্বলার কাথা না। একপা-দু’পা করে শাশুড়ি আর তিতলির ঘরের কাছে গেলো রেবেকা। এতরাতেও জেগে আছে দাদী আর নাতনী তিতলিকে নিজের বৈবাহিক জীবনের গল্প শোনাচ্ছেন শাশুড়ি।
– তোমার বাবা যখন জন্ম নিলো তখন আমার বয়স সতের। এরপর আট বছরের মধ্যে আরো তিন বাচ্চার মা। এতগুলো ছেলেমেয়ে বড়ো করা, তাদের সব চাহিদা পূরন করা, মেহমানদারি করা কি কষ্টের ব্যাপার ছিল। তখন তো গ্যাসের চুলা ছিলনা। ছিলনা ফ্রিজ। লাকড়ির চূলায় রান্না করার কষ্ট একনকার মেয়েরা তো বুঝতেই পারবেনা।
– আমার মাও তো কতো কষ্ট করে। ঘুমজড়িত কন্ঠে বলে তিতলি।
– তা করে। কিন্তু একন তো গ্যাসের চুলা আছে। ফ্রিজ আছে। আছে মাইক্রোঅভেন, পেশারকুকার, টি-মেকার, স্যান্ডউইচ মেকার, ব্লেন্ডার- কত কি। আমাদের তো সব কিচু নিজের হাতে করতে হতো।
– দিদা, আমি কখনো বিয়ে করবনা।
– কেনো?
– এত কষ্ট আমি করতে পারবনা। তোমার মতোও না, মা-র মতোও না।

নিজের জন্য না, তিতলির ভবিষ্যত ভাবনায় অস্থির হয়ে পড়ে রেবেকা। দেখালে হেলান দিয়ে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে সে। রেবেকার সামনে এসে দাঁড়ায় নেওয়াজ।
– বাড়ির বড়োবউ তুমি। এতরাতে ঝুট-ঝামেলা করোনা। রেবেকার হাত ধরে নেওয়াজ। তাকে টেনে নিয়ে চলে যায় সোবার ঘরের দিকে।

“তিন”
আজ বিনির জন্মদিন। বাড়িতে উৎসব চলছে। অতিথির সংখ্যা খুব বেশি না হলেও কম না। বাইরের গেষ্টদের মধ্যে রয়েছে লাভলির বাবার বাড়ির লোকজন পরিবারের লাভলি ও রিশাতের কয়েকজন বন্ধু, পাড়ার পরিচিত কয়েকটি পরিবার, কেয়ার তিন-চারজন বন্ধু। সবার খাবার আয়োজন করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে রেবেকা। রান্নঘরে কয়েকটি বড়োবড়ো পাত্রে অতিথিদের সার্ভ করার জন্য খাবার সাজাচ্ছে রেবেকা। তাকে সাহায্য করছে আসমানী। অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে বাড়ির চাদে। বোধহয় কেক কাটা হয়ে গেছে। সমস্বরে গেয়ে উঠল সবাই: হ্যাপি বার্থ ডে টু হউ……..।
– মাকে খাবার দিয়েছিস? আসমানীকে প্রশ্ন করে রেবেকা।
– জ্বী দিছি। বড়োভাবি, আপনে যানতো। সবাই কত হৈ চৈ করতেছে।
– বড়ো বাইস ডিশ দু’টো কোথায়? আসমানীর কথা গ্রাহ্যের মধ্যে না নিয়ে জানতে চায় রেবেকা।
ছাদে এখন ফটোসেশান চলছে। বিনিকে কোলে নিয়ে ছবি তুলল রিয়াজ এবং বীথি ছবি তুলছে কেয়া।
– বিনিকে নিয়ে বডোভাই আর ভাবির একটা ছবি হয়ে যাক। প্রস্তাব করে কেয়া।
– ডাক, তোর ভাবিকে ডাক। সোৎসাজে সাড়া দেয় নেওয়াজ।
– মা তো একন ছবি তুলতে পারবেনা। বিমষ কন্ঠে জানায় তিতলি।
– কেনো, কি হয়েছে তোমার আর? জানতে চায় নেওয়াজ।
– মা তো রান্নাঘরে কাজ করছে।

তাহলে আমি তিতলি আ বিনিকে নিয়ে ছবি উঠাই সমাধান বলে দেয় নেওয়াজ।
-সেই ভালো, বাজ শেষ কওে বড়োভাবি আর আসমানী বিনির সাথে ছবি তুলবে। বিসাতের এই কথাটা ভাল লাগলনা তিতলির। অনিচ্ছা সত্বেও মন ভার কওে আর বিনির সাথে ছবি তুলল সে। এরপর হইহুল্লড়ের মধ্যে এক সময় চলে গেল ছাদ থেকে। রান্না ঘরের কাজ মোচামুটি শেষ করে। আসমানীকে কয়েকটা ইন্সট্রাকশন দিয়ে নিজের ঘরে গেল রেবেকা। চোখেমুখে পানি দিয়ে একটু ফ্রেস চেয়ে পরনের কাপড়টা বদলে তারপর ছাদে যাবে সে। বিছানায় তিতলিকে দেখে অবাক হয়ে গেল রেবেকা।

– কি ব্যাপার তিতলি, শুয়ে আছিল সে? শরীর খারাপ লাগছে।
– না
– গাহলে ছাদে যা। সবাই কত হৈ চৈ করছে।
বাথরুমে গিয়ে মুখে ও গলায় পানি দিলো রেবেকা। ঘরে ফিরে দেখে বিছানায় চুপচাপ বসে আছে তিতলি। রেবেকা অবাক। মেয়ের পাশে বসে। হাত রাভে তিতলির কাধে। হঠাৎ কান্না শুরু করে দেয় তিতলি তুমি সবাইকে ভালবাসে কিন্তু কেউ তোমাকে ভালবাসে না, কেউনা।
তিতলির আচরনে হতবিহবল রেবেকা। বুঝতে পারে কি করবে সে এখন। কি বলবে সে তিতলিকে। অথিথিরা চলে গেছে। ছাদে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে নেওয়াজ রিশাত, রিয়াজ, লাভলি, বিথি ও বাড়ীর অন্যান্যরা। হঠাৎ নিরব হয়ে গেছে ছাদের অসমানী প্লেট, গ্লাস, ডিস, বাটি সবকিছু সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে।

অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। কিন্তু বড়োভাবি এলোনা কেন? বনে ওঠে বীথি।
– বড়োভাবির কি যেন হয়েছে। কেক কাটার সময় এলানা । বিনির ছবি তোলার জন্য ডাকা হলো তাও এলোনা।
– বড়ো বৌমা রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল। এত মানুষের জন্য আয়োজন। রেবেকার হয়ে জবাব দেন শাশুড়ী।
– কি এমন ব্যস্ততা যে একবার জন্য ও এদিকে অসবেনা? উচ্চকন্ঠে বলে নেওয়াজ
-ভাবিকে নিয়ে আলোচনা থাক। প্রসঙ্গ বদলাতে চায় রিশাত।
– না- না আলোচনা কেন করব না? বড়ভাবি আজ আমার মেয়েটাকে একবার কোলেও নেয়নি। ভাবিকে কি আমারা কম ভালবাসি। কথগুলো বসে কাঁদিতে শুরু করে লাভলি। অপ্রস্তুত নেওয়াজ ওঠে চলে যায় ছাদ থেকে।

তিতলিকে তার দাদীর ঘরে দিয়ে নিজের ঘরে এসেছে রেবেকা। অন্যরা এখনো ছাদে আছে কিনা বোঝার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনি ঘরে আসে নেওয়াজ।
-তোমার সমস্যাটা কি বলো তো? বিনির জম্মদিনের অনুষ্ঠান বয়কট করলে কেন? রেবেকাকে চার্জ করে নেওয়াজ।
-বয়কট? কি বলছ তুমি? সবার আপ্যায়নের ব্যবস্থা কিচেনে কাজ।
-পেয়েছ একটা অজুহাত। কোন প্রশ্ন করলেই ঘূরেফিরে কিচেনের কাজকে টেনে নিয়ে আসো। ঠিক আছে তুমি না হয় কিচেনে ব্যস্ত ছিলে। কিন্তু তিতলি ? ও কেন চলে এসেছিল ছাদ থেকে? তুমি কি ওকে ডেকে নিয়ে এসেছিলে?
– তোমার প্রশ্নটা আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা। আমি কেন ওকে অনুষ্ঠান থেকে ডেকে নিয়ে আসব? ওর মাথা ধরেছিল। আহত কন্ঠে বলে রেবেকা।
– দেখ রেবেকা মিথ্যাকথা তুমি বলতে পারনা। নিশ্চই এমন কিছু ঘটেছিল যার জন্য তোমরা মা মেয়ে অনুষ্ঠান বয়কট করেছ। সবার সামনে আমি মুখ দেখাতে পারছিলামনা। লাভলি কাঁদছে। কাঁদবেনা কেন? ওর মেয়ের জম্মদিনের অনুষ্ঠান নষ্ট হয়ে যাবে আর ও কাদবেনা? মেয়েটা চাকুরী করে। অফিসে যে কি পরিশ্রম করতে হয়। তোমরা হাউজওয়াইফরা তা চিন্তা ও করতে পারবে না। বেচারী লাভলি! মেয়ের জম্মদিন উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করল, আর তুমি আর তোমার মেয়ে
মিলে সেটবে ভুন্ডুল করে দিলে।
রেবেককাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল নেওয়াজ।
গভীর রাত। বারান্দায় এসে দাঁড়াই অপমানিত-বেদনাহত রেবেকা। কুকুরগুলোকে আজ রাস্তায় দেখা যাচ্ছেনা। চারিদিকে কেমন যেন একটা পরিবেশ। বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাবক রেবেকা।
-কেন যে এত কাজ করতে যাও।
কেয়ার কন্ঠস্বর শুনে তার দিকে তাকায় রেবেকা। ভাবি, আমি সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রি। সমাজের ধারা পাত প্রকৃতি সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারনা রাখি আমি। সারা পৃথিবীতে মানুষ আজ পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। নিজেকে ছাড়া মানুষ আজ যেন কিছুই ভাবতে পারেনা। সংসার ভাঙ্গার পালা আমাদের দেশেও শুরু হয়েছে। আর এনসময়ই তুমি টিকিয়ে রাখতে পারবেনা ভাবি। সংসারের সবাইকে তুমি সন্তষ্ট রাখতে পারবেনা।
-ক্লাসের পড়া বললে মনে হয়? ব্যাপারটা হালকা করার চেষ্টা করে রেবেকা।
– ভাবি তুমি ও তো উচ্চশিক্ষিত। কোন সংসারের কাজে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছ। মেঝোভাবি, ছোটভাবির মতো বাইরের কাজতো তমি করতে পারতে।
-ঘরের কাজ কি কাজ না? তাছাড়া যারা বাইরে কাজ করে ঘরে ফিরে তাদেরকেও তো সংসারিক দ্বায়িত্ব পালন করতে হয়।
– কিন্তু মেঝভাবি ছোটভাবি তো তা করেনা।
-ওরা ছোট আমি সব কিছু সামলাচ্ছি। এজন্য হয়ত ওরা সংসারে কজে কনসার্ন হয়না। অনেক রাত হয়েছে। ঘরে যাও।
চলে যেতে নেয় কেয়া। কি ভেবে মেয়েটাকে ডাকে রেবেকা। ফিরে আসে কেয়া রেবেকার কাছে। কেয়ার দু’হাতত নিজের হাতের মধ্যে নেয় রেবেকা।
-আমি তোমাদের সবাইকে খুব ভালবাসি কেয়া।
সবাইকে নিয়ে একসাথে হাসি-অনন্দে বেঁচে থাকতে আই। আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে রেবেকা।
– দুঃখ পাবে, অনেক দুঃখ পাবে তুমি ভাবি।
কেয়া চলে যায়। বারান্দার রেলিংয়ে ফিঠ বৈকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রেবেকা। ষোল বৎসর লো বিয়ে হয়েছে তার আর নেওয়াজের। নেওয়াজের বাবা মারা গেছেন বিশ বৎসর আগে। রেবেকার বিয়ের সময় রিয়াজ কলেজের ছাত্র। রিশাত পড়ে ক্লাস নাইনে। আর কেয়ার বয়স তখন ছয় বছর। স্বামী মারা যাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিল নেওয়াজের মা। বেশ কিছু অসুক দান বেধেছিল তার শরীরে। বিয়ের পর পুরো সংসারের দায়িত্ব চলে আসে রেবেকার উপর। ব্যাংকে একটা চাকুরী হয়েছিল তার। কিন্তু সংসারের কথা ভেবে ভার্সিটির পড়াশুনা, তাদের চাকুরীতে যোগদান সবকিছুতেই দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে রেবেকাকে। ছোট্ট কেয়াকে বড়ো করেছে রেবেকা। শেশবে পিতৃ মাতৃহীন রেবেকা নেওয়াজের মাকে নিজের মা বলেই গন্য করে। দেবর ননদের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়ে সংসারের উপভোগ করার চেষ্টা করছে সে।
শুভ আর বিনির দেখ ভাল করে সে তাদের মেয়েদের চেয়েও বেশি। এসব করতে গিয়ে নিজের মেয়ে তিতলিকে সে যথেষ্ট সময় দিতে পারেনা। এতকিছু করার পর এত বছর পর কি কথা এবং অসহায় মনে হচ্ছে রেবেকার। এসময় ঠান্ডা এক বাতাস বয়ে যায়। বারান্দা দিয়ে সামনের রাস্তার দিকে তাকায় রেবেকা। এবার একটা কুকুরের দেখা মেলে। কুকুরটা এগিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসছে। এরকম কয়েকবার করে রাস্তার মাঝখানে বসে পড়ে কুকুরটা গোঙ্গানীয় অদ্ভূত এক আওয়াজ তোলে সেটা।

“চার”
সাত আটদিন পরের কথা। ছোট্ট একটা খবরে তুলকালাম কান্ড ঘটে যায় বাড়ীতে। রাত্রিবেলা নিজেদের ঘরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে রিশাত এবং লাভলি।
– কাইকে কিছূ না বসে এরকম একটা কাজ করতে পারলে? খোভের সাখে বসে রিশাত।
– আমাদের বিনির কি হবে? কে দেখব ওকে?
– আসমানী দেখবে। লাভলিকে আশ্বস্থ করে রিশাত আসমানীর হাতে আমার মেয়েকে রেখে আমি অফিসে যেতে পারবেনা।
– তাহলে চাকুরীট ছেড়ে দাও। নির্লিপাত কন্ঠে পরামর্ম দেয় রিশাত।
আলোচনা চলছে রিয়াজ বীথির ঘরেও
শুভ যে কে স্কুলে নিয়ে যাবে। চিন্তিতস্থরে বলে বিথী।
– আমি নিয়ে যাবো। প্রয়োজন হলে অফিসে না হয় দেরিতে যাবো। সমাধান বলে রিয়াজ।
– প্রতিদিন দেরিতে অফিসে যাবে? ঠিক আছে। কিন্তু ওকে স্কুল থেকে নিয়ে আসবে কে?
– তুমি নিয়ে আসবে। সব কাজ আমরা শেয়ার করে নেবো।
– বোকার মতো কথা বলোনা। অফিস টাইমে আমার পক্ষে বাইরে বেরুনো সম্ভব না।
– হ্যাঁ, তাও তো ঠিক।
– বাড়ীর রান্না-রান্নার কি হবে।
– একটা বাবুর্চি রেখে দেবো।
– একজন বাবুর্চি রাথতে কক খরচ জানো? রিয়াজের নির্বোধের মতো কথা বার্তায় খেপে যা বিথী।

শাশুড়ির ঘরে চিন্তিত শাশুড়ি।
-তোমার মা বাসায় না থাকলে আমার খুব অসুবিধা হবে দাদু। তিতলিকে বলেন শাশূড়ি।
– কেনো চাচিরা তোমার দেখাশুনা করবে। দাদ কে বিকল্প ব্যবস্থা দেখায় তিতলি।
তাহলেই হয়েছে। হতাশঅ শাশুড়ির কন্ঠে।
বেডরুমে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আচড়াচ্ছে রেবেকা। বিছানায় শুয়ে একটা ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাচ্ছিল নেওয়াজ। ওঠে বসে সে।
-তোমার নাকি চাকুরি হয়েছে? জানতে চায় সে রেবেকার কাছে।
– হ্যাঁ
– কোথায়?
– একটা প্রাইভেট ব্যাংকে। পরীখালার বড়োমেয়ে লাকি আপাকে তো তুমি চেনো। লাকি আপার স্বামী চাকুরীটা যোগাড় করে দিয়েছে।
– বেতন কত দেবে?
– প্রথম ছয়মাস বিশ হাজার। তারপর চাকুরি কনফার্ম হলে ত্রিশ হাজারের মতো।
-চাকুরীটা নেওয়াজ আগে তুমি আমার মতামত জানতে চাইলে না?
– তোমার মতামত জানতে চাইলে তুমি নিষেধ করতে।
-ও তা কবে জয়েন করবে?
পরশু। প্রথমে এক সপ্তাহের ট্রেনিং। তারপর অফিস।
-অফিস কি ঢাকার বাইরে নাকি?
-না, ঢাকাতেই।
-বাড়ীর কি হবে ভেবেছ?
-বাড়ির আবার কি হবে।
-সবার জন্য খাবার যোগাড়, বিনিকে রাখা, শুভকে স্কুলে আনা-নেয়া। ম কে ঔষধ খাওয়ানো।
-এসব কোন ব্যাপার নাকি? আসমানীর সব সামাল দেবে।
-আসমানী কি সব সামাল দিতে পারবে?
-না পারলে যার যার সমস্যা তারা নিজেরাই সেসব সমাধঅন করবে।অ
-তুমি কিন্তু জেদ করছ
-কেন করবোনা? আমিও এম এ পাশ করেছি। আমি একটা চাকুরী করতে পারিনা।
-কিন্তু তুমি তো আগে থেকে চাকুরী করোনা?
-আগে থেকে করিনা জন্য কি এখন করতে পারবনা।
-মাত্র বিশ ত্রিশ হাজার টাকার জন্য ফ্যামিলির সবাইবে ফেলোনা রেবেকা। হালকা অনুনয় নেওয়াজের কন্ঠে।
নেওয়াজের এ কথার কোন জবাব না দিয়ে ঘরের বাইরে চলে যায় রেবেকা। ব্যলকুনিতে দাঁড়ায়। আকাশে ম্লান জ্যোৎন্সা। ঝিরিঝিরি বাতাসে বইছে।
রেবেকার ট্রেনিং শুরু হয়েছে তিন দিন হলো প্রতিদিন হলো। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ট্রেনিং। রেবেকা সকাল সাতটার মধ্যে বেরিয়ে যায় বাসা থেকে। ফেরে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে সংসারে তার তিনদিনের অনুপস্থিতে সবাইকে কাহিল করে ফেলে। আজও সকালে বেরিয়ে গেছে রেবেকা। আসমানী সবার জন্য রুটি নেয়সে। তাকিয়ে দেখে সবাইকে।
-কি ব্যাপার সবাই চুপচাপ বসে আছে কেনো? কারো উত্তরের অপেক্ষ না করে রুটি-সুজি মুখে দিয়ে তিতলিকেব নিয়ে চলে যায় নেওয়াজ।
-বিনিকে আজ কে দেখবে? রিশাতের কাছে জানতে চায় লাভলি।
-কেনো, আসমারী দেখবে।
-ওর কাছে বিনিকে রেখে যেতে পারবোনা আমি।
-লাভলি আজ তুমি অফিস বাদ দাও। বিনিকেও রাখতে পারবে আবার আমার শুভকে স্কুলে দিয়ে আসতে আর আনতে পারবে। লাভলি পরামর্শ দেয় বীথি।
-না-না লাভলি আজ অফিস কামাই দিতে পারবেনা জরুরী মিটিং আছে। লাভলির অবস্থা ব্যাখ্যা করে রিশাত। পরাশর্ম দেয় রিয়াজ।
-বলেছিলাম ওর নাকি আজ কি এসাইন্টমেন্ট জমা দিতে হবে।
-মেঝোভাবি, তুমি আজ একটু বসে যায়। তুমি অফিস কামাই করলে মনে হয়না তেমন কোন ক্ষতি হবে। তোমার যা চাকুরী-
লাভলির কথা জ্বলে ওঠে বিথি: কি মনে করো তুমি আমাকে লাভলি? আমার চাকরির কোন মূল্য নেই মর্যাদা নেই? তোমার চাকরি খুব খান্দানী চাকুরি আর আমারটা ছোট এটাই বুঝাতে চাইছ তো?
-ভাবি আমি কিন্তু ততটা ভেবে কথাটা বলিনি। আহত কন্ঠ লাভলির।
-কিসের এত অহংকার তোমার লাভলি? তুমি বুয়েটেপড়েছ, আমি ঢাকা ভার্সিটিতে পড়েছি-
একই ধরনের ঘটনা ঘটল রাতে শাশুড়ির ঘরে। মায়ের সাথে বাড়ির সমস্যা নিয়ে বলতে এসেছ রিশাত বীথি। কেয়া আসে থেকেই ছিল মায়ের ঘরে।
-আসমানীকে সেই কখন বললাম এককাপ চা দিতে এখন পর্যন্ত তার খবর নেই।
-চা খাবি তো লাভলিকে বলতি। বিরক্ত হয়ে বলেন শাশুড়ী।
-সে চা করবে কিভাবে? সারাদিন অফিস বাসায় ফিরে বিনিকে সামলতে হিমসিম খেয়ে যায়। লাভলির প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ বকরে রিশাত।
-ওবাবা ছোট ভাই বউয়ের জন্য এত দরদ? বৈসমারে কেয়া।
-মারব এক থাপ্পড়। মারমুখি ভঙ্গিতে বলে রিশাত বোধহয় উল্টা পাল্টা কিছু বলেছে।
হ্রাঁ বলেছি। তাতে তোমার কি? এক রেখো ভঙ্গিতে বলে রিশাত।
আমার কি মানে? মা দেখেছ- যেমন চোখে রাঙ্গিয়ে কথা বলে? সংসারে একটা কাজ করবেনা। অথচ উনি সবাইকে চোখ রাঙাবেন। চিৎকার করে উঠে রিয়াজ।
এসময় মার ঘরে আসে নেওয়াজ।
কি ব্যাপার মার ঘরে এত চেচামেচি কিসের? তোরা না সবাই মিলে বাড়িটাকে হেল বানিয়ে ফেলিলি। শাসনের স্বরে বলে নেওয়াজ।

“পাঁচ”
সপ্তাহ দুয়েক পরের কথা। নিয়মি অফিস করছে রেবেকা কেয়া , তিতলি আর শাশুড়ির কাছে কাছে বাড়ির সব সমস্যার কথা শুনলেও সেসব গায়ে না মাথার চেষ্টা করছে রেবেকা। সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য ডাইনিং হল ক্রস করার সময় বাচ্চারা ছাড়া বাড়ির সবাইকে টেবিলে দেখে অবাক হয়ে যায় রেবেকাভ এবাড়ির সকাল আটটার আগে কেউ নাস্তার টেবিলে আসে না। সবার দিকে চোখ বুলিয়ে নিরবে বাড়ির বাইরে চলে যেতে উদ্যদ হয় রেবেকা।

-বড়বউমা। শাশুড়ির ডাকে থামে রেবেকা একপা দু’পা করে এগিয়ে যায় শাশুড়ির কাছে। মায়ের পাসে মাথা নিচু করে বসে আছে নেওয়াজ। রেবেকা হাত ধরে নিজের পাশে বসায় শাশুড়ি।
-বউমা, ওরা সবাই তোমার প্রতি অবিচার করেছে অন্যায় করেছে। সংসারে যে কতরকম ঝামেলা ওরা তা বুঝতে পারিনি।
-তোমাকে আমাদের খুব দরকার বড়ভাবি। কাতর কন্ঠে বলে লাভলি।
-হুট করে চাকরি ছাড়া যায় না। ভাবি, দরকার হলে মাস খানেক সময় নাও। দর্বল গলায় পরামর্ম দেয় রিয়াজ।
-রেবেকা আমাদের সবার জন্য তুমি চাকুরিটা ছেড়ে দাও প্লিজ। পরাজিত কন্ঠে নেওয়াজ।
-বউমা, ওদের সবাইকে- আমাকে তুমি মাফ করে দাও। শাশুড়ির অনুরোধে বিচলিত বোধ করে রেবেকা। বিয়ের পর থেকে মায়ের ভালোবাসা সব পেয়েছে রেবেকা এই সহজ-সরল ভদ্রমহিলার কাছে। বিব্রত হয় রেবেকা রিয়াজ, রিশাত, বীথি, লাভলি এমনকি আসমানী আকুতিভরা দুষ্টিতে সসবার মধ্যে ভাবলেসহীন কেবল কেয়া। ভালোবাসার মানুষদের এই অনুরোধ, অকুতি আর নির্ভরতা কি জবাব দেবে বুঝতে পারেনা রেবেকা। উঠে দাঁঢ়ায় সে। এসময় ছুটে ডাইনিং হলে আসে তিতলি। জড়িয়ে ধরে মাকে।

-চাকুরিটা তুমি ছাড়বেনা মা। আমি তিতলি, তোমার মেয়ে বলছি চাকুরিটা তুমি ছাড়বেনা পৃথিবীর সবকিছু আমি সহ্য করতে পরি। কিন্তু তোমার অবহেলা অপমান আর অসম্মান আমি সইতে পারিনা।

কঠিন হাতে মাকে জড়িয়ে ধরে থাকে অসহায় আকুতি আর তিতলির প্রত্যয়দীপ্ত আহবান- এ দুচোখের মধ্যে কোনটাকে গ্রহণ করবে রেবেকা?।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

স্বপ্নের প্রহর।

Shad Bin Akram Niloy

ঢাকার যানজট

Badhon Bonik

অভাগীর মাতৃত্ব

Dhrubo Deb

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: