Now Reading
রাত্রি অন্ধকার!



রাত্রি অন্ধকার!

বাসটা শেষ স্টপেজে এসে থামতেই ঝপ করে বাম পা টা দিয়ে রাস্তায় নেমে এলো প্রদোষ। লক্ষীবাজারের এই আধো ছায়া আধো হলদে আলোর রাস্তাটায় একা একা উদ্দ্যেশ্যহীনভাবে হাটতে বেশ ভালোই লাগছে তার।

“ভালোই হলো এভাবে বের হয়ে এসে। অন্তত সকাল-বিকাল কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর করার মতো তো কেও থাকলোনা আর।” হাটতে হাটতে এসব সাত-পাঁচ ভাবছে প্রদোষ।

প্রদোষ বর্মন। নতুন মার সাথে এক ছাদের নিচে ছাব্বিশ বছর কাটিয়েও যার অভ্যেস করতে পারলোনা। কটাক্ষ করে নতুন মা আর প্রদোষের ঝগরা হয় বাবার সাথে!

সৎ মা মাত্রই নির্দোষ অথচ ঝগরাটে হবে!” সম্ভবত পুরো দেশটার শিকড়-বাকরের সাথেই এমন বিদঘুটে ব্যাপারটা আষ্টেপৃষ্টে জমে গেছে। প্রদোষের আর কি বলার থাকে, যেখানে নতুন মাও নিজেকে নির্দোষ দাবী করে এসেছেন সবসময়!

হাটতে হাটতে হুশ হলো সামনে প্রাচীরের বাঁধা পেয়ে। আহসান মঞ্জিল! এতদূর হেটে চলে এসেছি আমি! অবাক হয়ে ভাবলো প্রদোষ। চাঁদনী আলোয় প্রকান্ড আহসান মঞ্জিল অপূর্ব ঝিলিক দিচ্ছে। অপরূপ সৌন্দর্য্য! হা করে তাকিয়ে আছে প্রদোষ। হঠাৎ দেখে মঞ্জিলের গেইট খুলে কে যেনো বেরিয়ে এলো।

– “হ্যা ভাই এই ঘুটঘুটে অাঁধারে পথ-ঘাট কিছুই চিনতে পারছিনে! সদরঘাট যাওয়ার রাস্তা খানা কোথা বলোতো বাপু?” মূর্তিটার ভরাট পুরুষ কন্ঠ গমগম করে প্রশ্ন করলো প্রদোষের কাছে এসে।

– এত রাতে! আপনি আসলেন কোথা থেকে!

– “এই গিয়েছিলুম একটু ওইদিক হাটতে, হঠাৎ পথ হারিয়ে ফেললুম। এত জঙলা গাছ ছাঁটেনা কেনো ওরা বুঝিনাহ!” খেদ ঝরে পড়লো যেনো।
– তা ভাই সদরঘাট দেখিয়ে দাও, আমায় আবার ভোরের আগেই শীপ ধরতে হবেনে।”

-জ্বী! এত রাতে তো বাস পাবেননা। বড় রাস্তার মোড়ে গিয়ে সিএনজি পান কিনা দেখুন। তা নাহলে রাতটা কোনো আত্মীয়ের বাসায় কাটিয়ে সকালে নাহয়….
-বড় রাস্তা কোনদিক গ্যালে পাবোনে বাপু? প্রদোষ কথা শেষ করার আগেই লোকটা ধমকে ওঠলো প্রায়।

অবাক প্রদোষ হাত ইশারায় দিক দেখিয়ে দিতেই ধুতিটা তুলে নিয়ে হনহন করে ওদিকে চললো।
-অকৃতজ্ঞ একটা, ধন্যবাদ দিতেও শিখেনি!

মোড় ঘুরতেই চোখের আড়ালে চলে গেলো লোকটা। প্রদোষও একটা শ্বাস ফেললো। জায়গাটা আবারো স্তব্ধ হয়ে গেলো!
মঞ্জিলের গেইটের পাশেই দারোয়ানের একটা টুল।

-ব্যাটা হয়তো আশেপাশেই কোথাও আছে, এই ফাঁকে একটু বসে নেই।আসলে নাহয় গল্পে গল্পে রাতটা পার করা যাবে।”

বসে সারাদিনের কীর্তি কাহিনী সব মনে পড়ে গেলো একে একে। বাবার হুংকার,নতুন মার মায়াকান্না,প্রতিবেশীর ওঁকিঝুকি মারা সঅঅব!
কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানেনা প্রদোষ। ঝাকুনিতে ঘুম ভেঙে দেখে এক লোক সামনে দাড়িয়ে।

-কি মিয়া বাই, সাত সক্কালে ঘুরতে আইয়া পরছেন। দশটার আগে ত খুলবোনা! লাল দাঁতগুলো বের করে অকারন হাসলো লোকটা।

প্রদোষ বিরক্ত হলো একটু।
-আমি ঘুরতে আসি না ঘুমাতে আসি তোর কি শালা! মনে মনে লোকটার পিন্ডি চটকাতে চটকাতে প্রাচীরের গেইটের সামনে চলে এলো প্রদোষ।

প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা। সাত বছরের নিচের বাচ্চাদের ফ্রী। শনিবারে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রবেশ বিনামূল্যে।
বাহ! ভালোই তো!

দশটা বাজতেই টিকিটঘরের ঝাপি খুললো। দলে দলে দর্শনার্থী আসছে। প্রদোষও একটা টিকিট কেটে ঢুকে পরলো তাদের সাথে। ঘুরে ঘুরে দেখলো এক তলা দো তলা। তিন তলায় এসে প্রথম তৈলচিত্রটার সামনে থমকে দাড়ালো।

-ছবিটা কেমন চেনা চেনা লাগছে!
একই গোঁফ,একই পাতলা চুল,একই গোলগাল মুখ,একই রাগী চোখ! পড়নের ধূতিটা ও সেই রকমই লাগছে!

চোখ কঁচলে নিয়ে নিচের নামটা পড়লো প্রদোষ।
– “নওয়াব স্যার খাজা আহসানউল্লাহ। বাংলার চতূর্থ নবাব!

– “এও কি কোনোভাবে সম্ভব? ভেবে কূল কিনারা পেলোনা প্রদোষ।

– কি জানি কি হচ্ছে এসব। তাও ভালো রাতে ওটা পুরুষ ছিলো, নয়তো কোনো অপ্সরী হলে হয়তো ব্যাপারটা অন্যরকম হলেও হতে পারতো!!”

 

About The Author
Maksuda Akter
Maksuda Akter
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment