Now Reading
জীবন্ত স্মৃতির পাতা….



জীবন্ত স্মৃতির পাতা….

সেই ভয়াবহ রাতের কথা এখনো আমার মনে হলে ভয়ে কুঁকড়ে উঠি।এখনো বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে লাগলে আমি বিদ্যুতের মতোই চমকে উঠি!

আমার জীবনে এমন রাত হয়তো আর কখনোই আসবেনা কিন্তু আমার জীবনের গতিপথ পাল্টিয়ে দিয়েছিলো সেই নিষ্ঠুর রাত।
আমার এখনো মনে পড়ে বাবা যখন মাকে চুলের মুঠি ধরে হেচঁকা টানতে টানতে বাড়ির বাহিরে নিয়ে চললো!
“এই খানকি মাগি চল,আজ তোর শেষ দিন,তোকে আজ জীবন্তই পুঁতে ফেলবো”।
এই কথা বলতে বলতে টেনে মাকে নিয়ে গেলো বাবা।আমি শুধু চেয়ে চেয়েই দেখেছি কিছুই করতে পারিনি তখন,আর পাঁচ বছরের একটা বাচ্চার পক্ষে ওই নিশিকালো বৃষ্টির রাতে কি-ই বা করার ছিলো।আর তাছাড়া আমি বাবাকে ওই বয়সেই প্রচন্ড ভয় পেতাম।আমি কখনো এক মুহূর্তের জন্যেও দেখিনি বাবা আমাকে আদর করতে,নাতো মায়ের সঙ্গে একটু হেসে কথা বলতে।আমি কখনোই আমার বাবার আদর পাইনি তার মৃত্যু অবধি।
কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম না তখনো,মায়ের অপরাধটা কি ছিলো অথবা আমার মতো নেহাতই একটা ছোট্ট শিশুর অন্যায় টা বা কি ছিলো।
সেই রাতের পর থেকে আমি আর কখনোই মাকে দেখতে পাইনি।বাবা সত্যিই সত্যিই নাকি মাকে মেরে ফেলেছিলো।
এরপর থেকে আমি ভাবতাম এখন থেকে হয়তো বাবা আমাকে আদর করবেন!কিন্তু না,মায়ের মৃত্যুর কয়েকদিন পরেই বাবা আমাকে বাড়ির কাজের লোকের মাধ্যমে দূরের একটা হোস্টেলে রেখে আসেন।আমাকে যখন ওই বুড়োমত লোকটি নিয়ে যাচ্ছিলো,তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে স্পষ্টতই বাবাকে বলতে শুনলাম;”যা তাড়াতাড়ি নিয়ে যা এই জাউরাটাকে,আমি আর সহ্য করতে পারছিনা এই জারজকে”!
স্বয়ং বাবার মুখ থেকে সেদিন আমি এই কথাটা শুনেছিলাম,কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি কেনো বাবা আমার সম্পর্কে এমন কঠিন কথা বলেছিলেন।

বাবার মৃত্যুর পরে যখন আমি আবার বাড়িতে ফিরে আসলাম,তখন সব কিছু যেনো কেমন অদ্ভুত ঠেকলো আমার কাছে।
যেই লোকটি জীবনে কখনোই আমার মাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেয়নি,তাকে নিজ হাতে হত্যা পর্যন্ত করেছিলেন এবং কি একমাত্র সন্তান হিসেবে আমাকে একমুহূর্তের জন্যেও একটু আদর করেনি!
সেই লোকটি কি করে এতো বিশাল সম্পদ আমার জন্যে রেখে গিয়েছে!
আমি প্রায় সময় ভেবে কুল পেতাম না।কিন্ত একটা বিষয় আমার কাছে আরো বেশি অদ্ভুত লেগেছে,তা হলো বাবা নাকি অসিয়ত করে গিয়েছিলেন আমি যেনো উনার মৃত্যুর সময় উপস্থিত না থাকি এবং কি কখনো যেনো উনার কবরের পাশে পর্যন্ত না যাই!!
আমি বুঝতে পারতাম না কেনো বাবা আমার উপরে এতোটাই রুষ্ট ছিলেন!
কিন্তু আমি তো কখনো বাবা থাকা অবস্থায়ও বাবার সঙ্গে একটু কথা পর্যন্ত বলতে পারিনি।তাহলে কেনো বাবা আমার উপরে এমন কঠিন ভাবে রাগান্তিত ছিলেন।
আমার খুবই মন চাইতো বাবার কবরের পাশে গিয়ে একটু জিগ্যেস করি আমার অপরাধ কি?
কেনো আমাকে পিতৃস্নেহ থেকে চিরদিনের জন্য বন্ঞ্চিত করেছেন?
কিন্তু আমার কান্নাগুলো হাওয়াতেই মিলিয়ে যেতো নিষ্ঠুরভাবে।আমি নিদারুণ কষ্টে দিনগুলো কাটাতাম।

বাবার রেখে যাওয়া বিশাল অর্থ সম্পদ দেখাশোনা করেই আমার দিনগুলো কেটে যেতে থাকলো।আমি প্রায় সময়েই এখন আমার হতভাগ্য মায়ের ঘরে যাই।মায়ের জন্য আমার বুকের ভিতর দুমড়েমুচড়ে উঠে।
জানিনা আমার মাকে বাবা কোথায় মেরে পুঁতে রেখেছিলো,আদো কি আমার মায়ের কবর আছে!নাকি সত্যিই অজানা কোন জায়গা তে মাকে পুঁতে রেখে এসেছিলেন বাবা।
আমি এখনো আমার মায়ের নরম শীতল কোমল বুকের উষ্ণতা অনুভব করি।
মা যেনো প্রায় রাতেই আমার কাছে এসে বলে,”আমার সোনা ধন,আমার মানিক,আমার খোকা,আয় বাবা, আমার কাছে আয়;আহারে আমার সোনা মানিকটা কেমন শুকিয়ে গেছে”।
এরপর যখনই আমি ঘুম থেকে জাগ্রত হতাম কান্নায় আমার বুক ভিজে যেতো মায়ের জন্য।
আমি প্রায়ই রাতেই নির্ঘুম চোখে কাটাতাম যদি একবার হলেও মাকে একটু দেখতে পাই।
আমার আশায় নিতান্তই হতাশায় পরিনত হতো।
কিন্তু আমি এখনো জানতে পারিনি বাবা কেন আমাকে আর মাকে এতোটাই ঘৃণা করতো!!

একদিন যখন মায়ের ঘরে পুরোনো জিনিসপত্র ঘাঁটতে যাই,তখনই একটা ডায়েরি আমার চোখে পড়ে ।
ডায়েরিতে অস্পষ্ট আর ঝাপসা হাতের লেখায় একটা নাম চোখে পড়লো,নামটা দেখে আমি একেবারেই নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম;”আঞ্জুমান” এই নামটা তো আমার মায়েরাই!
হ্যাঁ আমার মায়ের নামই আঞ্জুমান।
আমি আস্তে আস্তে একটা একটা করে পুরোনো সেই ডায়েরির পাতা উল্টানো শুরু করলাম ।
আমার দুচোখ যেনো জলে টলমল করে উঠলো।আমার মায়ের ভুলবাল বানানে আঁকাবাঁকা ভাঙ্গা ভাঙ্গা লেখা।মনে হয়না আমার মা খুব বেশি লেখাপড়া করেছিলেন।হাতের লেখা দেখে মনে হলো বড়জোর সিক্স সেভেন পর্যন্ত পড়েছিলেন।আমি খুব মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি পাতা পড়তে লাগলাম।আমার কাছে এক একটা লাইন, শব্দ, যেনো মহামূল্যবান মনে হতে লাগলো।আচমকাই যেনো আকাশে বিদ্যুৎ খেলে গেলো,মনে হয় যেনো এখনই বৃষ্টি নামবে অঝোর ধারায়।
আমি যেনো নেহাতই এক অবুঝ শিশু হয়ে গেছি।সেই রাতে মুহুর্তের জন্যেও আমি দুচোখের পাতা এক করিনি।একটার পর একটা পাতা শুধু পড়ছি আর পড়ছি।

আমার দাদা ছিলেন অনেক বড় লোক আর দানশীল ব্যক্তি।আমার মায়ের দুকুলে কেউ ছিলোনা।দাদা গ্রাম থেকে মাকে নিয়ে এসে শহরে তার কাছে রাখেন ।মাকে দাদা খুবই আদর করতেন।আর বাবা ছিলেন দাদার একমাত্র সন্তান ।একদিন সুযোগ পেয়ে বাবা মাকে ধর্ষণ করেছিলেন আর ভয় দেখিয়েছেন যদি কখনো কারো কাছে এসব কথা বলে তাহলে জানে মেরে ফেলবে।
এরপর থেকে প্রতিরাতেই বাবা মাকে এই নারকীয় লালসার শিকার করতেন।আমার কিশোরী মা ভয়ে কাউকে বলতে পারতেন না।কিন্তু একসময় মা গর্ভবতী হয়ে পড়ে আর তখনই ব্যাপারটা পুরোপুরি জানাজানি হয়ে যায় ।
এই বিষয়টি নিয়ে দাদা খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন।কিন্তু বাবা একেবারেই অস্বীকার করেছিলেন বিষয়টি।
শেষপর্যন্ত কোন উপায় না দেখে দাদা বাবাকে বললেন ”তুই যদি ওর পেটের সন্তান আর ওকে স্বীকার না করিস,তাহলে তোকে আমি ত্যাজপুত্র ঘোষনা করতে বাধ্য হবো।”এই কথা শুনার পরে বাবা মাকে মেনে নিতে সম্মত হন।
কিন্তু দাদা বুঝতে পেরেছিলেন যে বাবা একসময় আমাদের ছুঁড়ে ফেলে দিবেন।তাই আমার জন্মের পরপরই দাদা সমস্ত সম্পত্তি টাকাপয়সা একমাত্র আমার নামেই উইল করে দেন।
দাদার মৃত্যুর পরেই মায়ের উপর বাবার নির্যাতনের মাত্রা আরো বেশি বেড়ে যায় ।প্রতিদিনই বাবা নতুন নতুন মেয়ে নিয়ে আসতেন আর মাকে প্রচন্ড মারধর করতেন।
আর বলতেন ”হারামজাদি তোকে আমি একদিন মেরেই ফেলবো,তোর কারণেই আমি সমস্ত সম্পত্তি থেকে বন্ঞ্চিত হয়েছি”!
প্রায় সময়ই বাবা মাকে মারতেন আর এমন কথা বলতেন।

সেইদিন ছিলো এক বৃষ্টির রাত বাবা মাতাল হয়ে বাড়ি তে এসে মাকে চুলের মুঠি ধরে মারধর করতে লাগলো আর মাকে টেনে হিছড়ে নিয়ে গেলো ।
এরপর থেকে আর কখনোই আমি মায়ের সেই নিষ্পাপ মুখটি দেখতে পাইনি।জানিনা সেইরাতে আমার হতভাগ্য দুখিনি মায়ের কি নিষ্ঠুর পরিণতি হয়েছিলো।জানিনা কি কষ্টটাই না পেয়েছিলো আমার মা টা।
আমার দুচোখ বেড়ে অশ্রু ঝরছে মায়ের জন্য।
এখনো বৃষ্টি হলেই আমি ভয়ে শিউরে উঠি,হৃদয় আমার দুমড়েমুছড়ে উঠে অজানা ভয়ে।
আমার নিষ্ঠুর বাবার জন্যে একরাশ ঘৃণা উতলে উঠে মনে।
মনে যেনো হয় যেনো বাবার পাপীষ্ঠ শরীরটা ছিন্নভিন্ন করে ফেলি।
আমার জনমদুখী মা টা কোথায় আছে,কেমন আছে এখনো আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।

ভালোবাসি মা! অনেক বেশি।

About The Author
Maksuda Akter
Maksuda Akter
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment