অন্যান্য (U P) সাহিত্য কথা

ক্ষনিকের ভালোবাসা…

– মা! দেখো এদিকটায় গন্ধ নিয়ে। কেমন মিষ্টি মিষ্টি বাতাস!
বারান্দার দরজাটা খুলতেই গন্ধটা আরো বেড়ে গেলো। মা টা যে কি! এত করে বলছি কিছুতেই আসছেনা। নতুন বাসায় এসেই বুঝি ঘরদোর গোঁছাতে লেগে যেতে হবে? মা টা এত্ত বেরসিক উফ!

-“এই অনিতা, ওপাশের জানলাটায় পর্দাটা লাগাও তো মা। নিজের রুম নিজেই গোছাও একটু।” পাশের রুম থেকে মা চিৎকার করে বললো।

বাবা সরকারী চাকুরী করেন। সেই সুবাদে মাস কয়েক পরেই নতুন নতুন জায়গায় নতুন নতুন বাসা। আমার একটাও বন্ধু নেই। এত জায়গা বদলালে থাকবে কি করে? বন্ধুদের তো আর সাথে করে নিয়ে আসতে পারিনা!

সারাদিনের গোছগাছের পর এলাকাটা দেখতে বের হলাম আমি আর মা। ছোট্ট ছিমছাম গ্রাম,ছোট কাঁচা রাস্তা,পর পর তিনটে রেললাইন।তেমাথায় ছোট্র স্টেশনঘর। বাবার অফিসটা এখানেই।

আমাদেরকে দেখে বাবা হাসলেন।
-অনিতা মা, কেমন লাগছে জায়গাটা?

-ভালো বাবা। আমার বারান্দার পাশে একটা জারুল গাছ আছে জানো? হলুদ ফুল ফুটে আছে পুরো গাছটায়!

বাবা হেসে মাথা নাড়লো।
– এজন্যই ওই রুমটা তোকে দিয়েছি।

বাবাকে কাজ করতে দিয়ে আমি আর মা বেরিয়ে এলাম। হাটতে হাটতে মার সাথে গল্প করছি।

-মা আমরা আরো কতবার বাসা বদলাবো? এখানেই থেকে যাইনা কেনো আমরা। গ্রামের অনেকগুলো বন্ধু হবে আমার। একসাথে স্কুলে যাবো,খেলবো। মজা হতো অনেক!

মা চট করে একবার আমার দিকে তাকালো। আদর করে বললো
-বোকা মেয়ে গ্রামের বন্ধুদের দিয়ে কি হবে তোর? বরং শহরেই থাকবো গিয়ে আমরা। পরের মাসে ঢাকায় পোষ্টিং হবে। তখন অনেক বন্ধু হবে কেমন?

মা টা যেনো কেমন! বন্ধু তো বন্ধুই, তাতে আবার গ্রাম, শহর কি!

হাটতে হাটতে মা এগিয়ে গিয়েছে অনেকটা। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হাটছি। হঠাৎ দেখি একটা পেয়ারা গাছের নিচে বসে আছে একটা থুরথুরে বুড়ি। হাতে হলুদ একটা পেঁয়ারা।

– ইশ! গ্রামের মানুষের কি মজা। যখন তখন গাছতলায় বসে পেঁয়ারা খেতে পারে। আর মা হলে এতক্ষনে তুলকালাম করে ফেলতো না ধুয়ে খেয়েছো কেনো? হাত ধোওনি কেনো? আরো কত কি!

বুড়িটার দিকে তাকিয়ে হাসলাম একটু। আমায় দেখে হাত নেড়ে ডাকলো সে। এগিয়ে যেতে গিয়েও পিছিয়ে এলাম,মা ডাকছে। সন্ধ্যা হয়ে এলো প্রায়। পড়তে বসতে হবে এখন।

হাত নেড়ে বিদায় নিয়ে দৌড়ে চলে এলাম। হাতমুখ ধুয়ে এসে বারান্দায় উঁকি দিয়ে দেখলাম। দূরে পেঁয়ারা গাছটা দেখা যাচ্ছে,তলাটায় আবছা আলো বুড়িটা নেই।

পড়া শেষ করতে করতে বাবা চলে এলো। খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তে বললেন মা। খেয়ে আমি আমার রুমে চলে এলাম।

বারান্দার দরজাটা খোলা রেখেই শুয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো। রুম ভর্তি জারুলের মিষ্টি গন্ধ! আস্তে করে ওঠে বারান্দায় এসে দাড়ালাম। আরে! জারুল তলায় ওটা কে দাড়িয়ে আছে? ওই বুড়িটা না? এত রাতে এখানে কি করছে!

ফিসফিস করে ডাকলাম,
-দাদুমনি! ওখানে কি করছেন এত রাতে!

উপর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসলো দাদুটা। হাত ইশারা করে চুপ থাকতে বলে জারুল গাছের ডাল বেয়ে সোজা ওঠে এলো বারান্দার একেবারে কাছের ডালটায়! আমি তো অবাক! গ্রামের এমন বুড়ো মানুষও গাছ বাইতে পারে আর আমি পারিনা।

হাত বাড়িয়ে একটা পেঁয়ারা এগিয়ে দিলো বুড়িটা। আমাকে খেতে বলছে! পেঁয়ারাটা নিলাম। সাথে সাথেই নেমে চলে গেলো। শুধু এটা দিতেই এতদূর কষ্ট করা! কি আশ্চর্য!!

 

সকালে মার ডাকাডাকিতে ঘুমটা ভেঙে গেলো। বারান্দার দরজাটা ভেজানো। টেবিলের ওপর ওই তো পেয়ারাটা। পেঁকে একদম টসটসা হয়ে আছে। জলদি লুকিয়ে ফেলি, মা যদি আবার বুড়িটাকে কিছু বলে বকা দেয়!

নাস্তা করে রেডী হয়ে মার সাথে বাইরে বেরিয়ে এলাম। আজ স্কুলে যাবো। বাবা গতকাল বলে রেখেছে, আমরা আসার আগেই সব ঠিকঠাক করে রেখেছিলেন।

নতুন ক্লাসে জবুথবু হয়ে বসে আছি। কি কঁচু যে পড়াচ্ছেন টিচার বুঝতেই পারছিনা! হঠাৎ জানলার পাশেই দেখি সেই দাদুমনি হাসিমুখে দাড়িয়ে!

ঢং ঢং ঘন্টি পড়তেই ছুটে বাইরে বেরিয়ে এলাম। ওইতো গাছতলায় বসে আছেন। কাপড়ের পুটলি খুলছেন একটা। কাছে গিয়ে দেখলাম ভেতরে একটা পাকা পেঁয়ারা! এই বুড়ি এত পেঁয়ারা খেতে ভালোবাসে!

আবিষ্কার করলাম বুড়িটার একটাও দাঁত নেই। কথা বলছিলাম ইশারায়, আমি যাই বলি সে শুধু হেসে মাথা নাড়ে।

স্কুল শেষে বাবা এসে নিয়ে যাবে বাসায়। বসে বসে অপেক্ষা করছি। অনেক্ষন পর দূরে বাবাকে দেখতে পেলাম। কেমন রাগী রাগী হয়ে আছে চেহারাটা! ভয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলামনা।

বাসার কাছে এসেই দেখি দুইটা গাড়িতে মালপত্র তোলা হচ্ছে। মা দাড়িয়ে আছে দিশেহারা ভাবে!

দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম।
-কি হয়েছে মা? আমরা কোথায় যাচ্ছি?

-চলে যাচ্ছি আমরা মামুনি। তোমার বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে।

-কেনো!

-জানিনা রে। কি নাকি ঝামেলা হয়েছে অফিসে।

আর কিছু বলার থাকেনা। বাসা বদল এখন আর নতুন কিছু নয় আমার কাছে। আর এজায়গায় তো এলামই কাল। কার কাছে কি বলার আছে?

একটা গাড়িতে বসে চলে এলাম আমরা স্টেশনে। ট্রেইন আসার অপেক্ষায় আছি। হঠাৎ মা কি যেনো বলে ওঠলেন।

-এই যাহ! এসব এলো কোথা থেকে!!

তাকিয়ে দেখি মায়ের হাতে একটা কাপড়ের পুটুলি। ভেতরে টসটসে হলুদ পাঁচটা পেঁয়ারা!

বাবা-মা দুজনেই অবাক। এক আমিই মুখ ফিরিয়ে চুপ করে থাকলাম।

-আর কেও না জানুক। আমিতো জানি এই ভালোবাসার দান কার!

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

বান্দরবান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা (প্রথম পর্ব)

Asif Hasan

প্রতিবিম্বঃ পর্ব ৪

Kazi Mohammad Arafat Rahaman

এমসিকিউ পদ্ধতি বাতিল পিইসি দিয়েই

MP Comrade

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy