সাহিত্য কথা

আন্ডারগ্রাউন্ডঃ পর্ব ১

আজকের সকালটা মারজানার কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হচ্ছে।  মেঘগুলো আপন খেয়ালে সরে যাচ্ছে একটু একটু করে।  লনের কবুতরগুলো প্রতিদিনের মত খাবার নিয়ে ঝগড়া করছে না।  শান্ত ভাবে মেঘগুলোর মত আপন খেয়ালে খেয়ে যাচ্ছে।  মারজানা কফিতে চুমুক দিতে দিতে আজকের পত্রিকা নিয়ে বারান্দায় রাখা ক্রাডলে বসে পড়লো।  স্বামীকে ছয় বছর আগে ডিভোর্স দেয়ার পর প্রতিটি সকাল এভাবেই শুরু হয় তার।  যদিও আজকের মত নিজের শান্ত মনটাকে বিগত কয়েক বছরে অনুভব করেনি সে।  কারন গতকাল তার হাত ধরেই সিম্পোক্স ট্রেড এর ১৫০ মিলিয়ন এর চুক্তি হয়েছে, যার জন্য চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার যার পর নাই খুশি হয়ে মারজানাকে ম্যানেজিং ডিরেক্টর এর পোস্টে প্রমোশন দিয়ে দিয়েছেন।  ৫ মাসের অবর্ণনীয় কস্টের পর সফলতার পুরষ্কার হিসেবে এমডি হয়ে নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে তার।

পত্রিকায় মন দিন মারজানা।  ফ্রন্ট পেইজে নিচের দিকে কালকের পোস্ট-ডিল ফাংশনের ছবিতে নিজের ছবি দেখে বেশ অবাকই হলো। সবাই তাকে দেখবে চিনবে জানবে, এতো দারুণ ব্যাপার। মনে পড়ে গেল কাল রাতের কথা আবার। রবার্ট বার বার মারজানাকে অভিবাদন জানাচ্ছিল।অফিস কলিগ এর পাশাপাশি ভাল বন্ধুও সে। এই প্রজেক্টে অনেক ক্ষেত্রেই সাহায্য করেছে রবার্ট। বেশ কিছুক্ষণ একসাথে ড্রিংকস ও করেছে তারা। এরপর বস জর্জ এলেন এসে হাত ধরে একপ্রকার টেনেই স্টেজে নিয়ে গেলেন মারজানাকে। এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ দেখলো সে। কত ক্যামেরা, কত মানুষ, কত অভিবাদন – এগুলো সে অর্জন করেছে। ভাবনার ছেদ পড়েছিল এলেন এর কথায়।

“সুধী দর্শক মণ্ডলী, আজকের এই পার্টির একমাত্র এবং শুধুমাত্র কারন হলো আমার মারজানা। তার অক্লান্ত পরিশ্রম আর মনোবল এর কারনে আজকে আমাদের কোম্পানী এত নতুন মাইলফলকে পা দিয়েছে। সিম্পোক্স ট্রেড , এই প্রথম এত বড় টাকার পরিমানের একটা ডিল হাতে পেয়েছে যা থেকে আমাদের দারুণ মুনাফা হবে। তাই আমি মারজানাকে এই মুহুর্ত থেকে সিম্পোক্স ট্রেড এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর এর পদটা অলংকৃত করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’’ – বলেই মারজানার দিকে ফিরে গালে একটু চুমু খেল। মারজানা বুঝে উঠতে পারেনি কি হচ্ছে। এই মুহুর্ত থেকে এমডি সে? এলেন এত বড় সম্মান দিল তাকে সবার সামনে? হতবিহ্বল করে দিয়েছে তাকে।

রাতে সে নিজেকে এলেন এর রুমে তার বাহুতে আবিষ্কার করলো। অবাক হতে চাইলো, কিন্তু মস্তিষ্ক বাধা দিল। নিজের ভেতরটা যেন বলছে – “কেন মারজানা? এলেনই কি তোমাকে এই কোম্পানীতে নিয়ে আসেনি? তোমার খুনে স্বামীর সাথে ডিভোর্স এর সময় এলেনই কি তার আইনজীবী বন্ধুকে দিয়ে সহায়তা করেনি? সে তোমাকে আজকের এই সম্মান এনে দেয়নি? বিনিময়ে তোমার সাথে একান্তে কিছু সময় কাটাতে চাওয়াটা খুব বেশি না মারজানা।আজকের রাতটা এলেনের নামে বিলিয়ে দাও”।নাহ, কিছু বলেনি মারজানা। সারারাত দুজন দুজনাকে ভালবেসেছে ওরা। ভোরের দিকে এলেন নিজে ড্রাইভ করে এনে বাসায় নামিয়ে দিয়ে গেছে।

পঞ্চাশোর্ধ এলেনকে দেখতে মোটেই বয়ষ্ক লাগেনা। তার চলাফেরা , কথা বলা, দাঁড়ানো, চাহুনি –প্রতিটা জিনিসই নজরকাড়া। এই বয়সেও দারুণ ভাবে ফিট সে। বাবার হাতে গড়া কোম্পানীকে নিজের শ্রম দিয়ে দেশের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে নিয়ে এসেছে সে। বিয়ে করেনি এলেন। বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করলে যুক্তি দেখায় – “বিয়েটা আমার কাছে পিছুটান বলে মনে হয়। আমি বাধাহীন হয়ে যেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারি, দায়িত্ব কাধে এসে গেলে সেটা অবশ্যই পারবোনা। আমি জীবনকে উপভোগ করতে চাই।’’

ওরা দুজনে গাড়িতে হেলান দিয়ে পাশাপাশি অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে ছিল। রাতের ঘটনার জন্য এলেন দুঃখপ্রকাশ করছিল। মারজানা বাধা দিয়ে বলেছে – “আমি ভালবাসার তৃষ্ণাতে ভুগছিলাম। আমি ভাল অনুভব করছি এখন কারন তুমি আমাকে সঙ্গ দিয়েছ’’।এলেন খুশি হয়ে মারজানার ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে গাড়িতে বসে পড়লো। এলেনের গাড়ি দৃষ্টিসীমার বাইরে যাবার পর মারজানা ঘরের দিকে হাটা শুরু করলো।

 

এইটুকু সময়ে কত ভাবনা ভাবা হয়ে গেল।কফিটা এখনো গরম। মানুষের মস্তিষ্ক কত দ্রুত কাজ করে, বিধাতাকে বাহবা দিতে দিতে ফোনকল এর আওয়াজ পেল সে। কে আর হবে? হয় এলেন, নাহলে রবার্ট। এই মুহুর্তে আর কারো কাছ থেকে ফোন আশা করছে না সে। পত্রিকা পাশে রেখে কফিতে চুমুক দিতে দিতে ফোন তুলতে গেল।

– হ্যালো কে বলছেন?

– আমি মিস রিশান বলছি, সেন্ট ফান্টেমার স্কুল থেকে।

মারজানা একটা বাচ্চা দত্তক নিয়েছিল । সেদিন টিভিতে এপোলো ইলেভেন দেখাচ্ছিল। বাচ্চাটার মা-বাবা চার্চের সামনের বাস্কেটে বাচ্চাটাকে ফেলে চলে গিয়েছে। মার্ক এর সাথে ডিভোর্স পেপার সাইন করার পর খুব বিদ্ধস্ত ছিল সে। রবার্ট তখন পরামর্শ দেয় একটা বাচ্চা দত্তক নেয়ার জন্য, এতে করে বাচ্চার সাথে সময় কাটালে মনের দিক থেকে ভাল থাকবে সে। রবার্টই তাকে চার্চে নিয়ে যায়। সিসটার একদম ছোট একটা বাচ্চা এনে দেয়। নাম রাখে নেইল । নেইল আর্মাস্ট্রং এর নামের সাথে মিলিয়ে রাখে। বাচ্চাটা পাশের শহরের একটা স্কুলে পড়ে, সেখানেই স্কুল হোস্টেলে থাকে। পড়াশোনা তেও ভাল।

– জ্বী বলুন।

– আজকে সকালে

– সকাল থেকে নেইলকে ওর রুমে পাওয়া যাচ্ছেনা।

– পাওয়া যাচ্ছেনা মানে? কি বলছেন এসব?

– গার্ড বললো কাল রাতে মার্ক নামে একজন আপনার স্বামীর পরিচয় দিয়ে এসে বাচ্চাটাকে নিয়ে গেছে।

 

হাত থেকে কফির মগটা পড়ে গেল মারজানার।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

জীবন যেখানে বন্দি (প্রথম পর্ব)

Pritom pallav

অনুসন্ধান (১ম পর্ব)

Maruf Mahbub

স্বপ্নের কাছেও স্বপ্ন

Abid Pritom

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy