Now Reading
পাপ ছাড়ে না বাপকেও কিংবা আকাশের কান্না



পাপ ছাড়ে না বাপকেও কিংবা আকাশের কান্না

হিলাটি বস্তির সামনে রাস্তায় শুয়ে শুয়ে অনেক কাঁদছিল আর জোরে জোরে বিলাপ করছিল। তার স্বামী তাকে অনেক মেরেছে, অনেক। কয়েক জায়গায় জখম হয়ে গিয়েছ। পথচারী কয়েকজন কান্না শুনে মহিলাটির কাছে গেলো। তাকে দেখে বললো, “এভাবে কেউ কাউকে মারে? ইশ! কী পাষন্ড! কোথায় আপনার স্বামী? তাকে পুলিশে দিবো।”

“হ, ওরে পুলিশে দেন। ঘরের মইদ্দেই আছে।”

এ কথা শুনে পথচারী লোকগুলো ঘরের দিকে হাঁটা দিল। তৎক্ষণাৎ মহিলাটি উঠে দৌড়ে গিয়ে একজনের পা জাপটে ধরে বলতে লাগলো, “না, উনারে পুলিশে দিবেন না। মাজে মইদ্দে মারলেও লোকটা অনেক ভালা। আমারে অনেক আদর করে। কাম করার পর মালিক ট্যাহা না দিলে ঘরে আইয়া হেই রাগ আমার উফরে ঝারে, মালিকরেতো কিছু কইবার পারে না! পুলিশে দিলে মালিকরে দেন।”

লোকগুলো তৎক্ষণাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। বিনা দোষে এতো মার খাওয়ার পরেও স্বামীর জন্য এতো ভালোবাসা!
একজন লোক ঘরে ঢুকে সেই স্বামীর হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে বলে মালিক পাঠায়ছে। পাষন্ড স্বামীটি টাকাটা হাতে নিয়েই দৌড়ে বউয়ের কাছে এসে তাকে দুহাত দিয়ে তুলতে তুলতে বলে, “ও বউ, তরে অনেক মারছি, না? থাইক, কান্দিস না। আয়, ডাক্তরের কাছে নিয়ে যাই। ওষুদ দিলেই ভালা হইয়া যাইবো।”

“না, ডাক্তরের কাছে নিয়া যাওন লাগবো না। আমরা বেদনা ভালা হইয়া গেছে। তুমি চাইল, আলু আর নুন কিইন্না আনো, যাও।”

দৃশ্যটা দেখে পথচারী লোকগুলোর চোখে পানি চলে আসে। এই বুঝি দুনিয়ার সবচেয়ে খাঁটি ভালোবাসা! মহিলাটি তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, “কইছিলাম না, উনি অনেক ভালা মানুষ? একটু তারছিড়া, এইডাই খালি সমস্যা। মেজাজ খারাপ হইলে কী থেহে কী কইরা হালায় কইতেয়ারে না।”

হঠাৎ একজন পথচারীর কল্পনায় কিছু দৃশ্য ভেসে উঠে। মাসকয়েক আগে অফিস থেকে ফিরে বউকে ঘরের সকল কাজ বাদ দিয়ে টিভিতে সিরিয়াল নিয়ে পড়ে থাকতে দেখে একটু কথা শুনিয়েছিল। এজন্যে বউ চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে বাপের বাড়ি চলে যায়। আর গিয়ে সবাইকে বলেছিল কেবল টিভি দেখেছিল বলে নাকি গায়ে হাত তুলেছে। পরে অনেক কষ্টে-সৃষ্টে শত ধকল সহ্য করে বউকে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল।
দিন পনের আগে একবার জ্বর হওয়ায় দুইদিন কোনো মতে সেবা করেই শরীর খারাপের কথা বলে বউ বাপের বাড়ি চলে যায়। এসেছিল একেবারে জ্বর ভালো হলে। প্রচন্ড দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লোকটির মনে মনে কেবল একটাই কথা উচ্চারিত হলো, “দুজনেই বউ কিন্তু আকাশ আর পাতাল!” আর এর সাথে সাথে তার আগের বউয়ের কথাও মনে পড়ে যায়। যে সবদিক থেকে ভালো হওয়া সত্ত্বেও কেবল সন্তান হয় না বলেই তালাকপ্রাপ্ত হয়েছিল । নতুন এই দজ্জাল বউ আনার পরেই আর কী লাভ হয়েছে! দুই বছর হতে চললো এখনো সন্তানের দেখা মিললো না।

কয়েকদিন বাদে সেই মহিলাটির পাষন্ড স্বামী তিনদিনের চুক্তিতে একটি কাজ পায়। ট্রাক থেকে বস্তা মাথায় করে নিয়ে গুদামে রাখতে হবে। প্রতি বস্তার জন্য পাঁচ টাকা। প্রতিদিন একশো বস্তা এভাবে ট্রাক থেকে গুদামে রাখতে হবে। তিন দিনের টাকা একবারে দিবে।
তিনদিনে তিনশো বস্তা গুদামে রাখার কাজ শেষ করে মালিকের কাছে গেলো টাকা নিতে। মালিক হাতে পাঁচশো টাকা ধরিয়ে দিলো। লোকটি আরো এক হাজার টাকার কথা জিজ্ঞেস করতেই মালিক কষে একটা থাপ্পর দিয়ে বললো, “প্রতি বস্তা কি তরে পনের টাকা করে দিমু?”

“ওস্তাদ, আমিতো পোনরো ট্যাহা করে চাই নাই। আগের দুই দিনের দুইশ বস্তার এক হাজার ট্যাহা চাইছি। সব ট্যাহাতো আইজ একসাতে দেওয়ার কতা আছিল।”

মালিক এবার আরো জোরে আরেকটা থাপ্পর দিয়ে বললো, “তুই কি কইবার চাস আগের দুইদিনের টেকা তরে দেই নাই? টেকা না নিয়াই তুই কাম করছস? যা, ভাগ এইখান থেকে। যতসব বাটপারের দল।”

লোকটি উদাস হয়ে গুদাম থেকে বেরিয়ে বস্তির দিকে হাঁটা দেয়। প্রচন্ড রোদ। দরদর করে ঘামছিল। সারাদিনের খাটুনি, দুইটা থাপ্পর, আর এক হাজার টাকা না দেওয়া- সব মিলিয়ে ওর মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে হাটতে হাটতে বস্তির সামনে আসে। ওর বউ বাইরে বসে মাটির চুলা বানাচ্ছিল। প্রতি চুলা পঞ্চাশ টাকা করে বিক্রি করে। হঠাৎ স্বামীকে ফিরতে দেখে সে। তবে তার হাটার ধরণ কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছিল। বউটি তার কাছে দৌড়ে গিয়ে বলে, “ওগো, তোমার কী হয়ছে? এমুন করে হাটতাছ কে? মালিকে কি আজকেও ট্যাহা দেয় নাই?”

পাষন্ড স্বামীটি তার বউকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পাশে পরে থাকা একটি মোটা খড়ি দিয়ে কাঁধ বরাবর জোরে একটা মারে। বউটি সেখানেই নিশ্চুপ হয়ে যায়। লোকটি আবার উদাসভাবে হাটতে হাটতে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। পথচারী কয়েকজন এভাবে মারার দৃশ্য দেখে বউটির নিশ্চুপ দেহের কাছে দৌঁড়ে যায়। একজন হাতের নাড় পরীক্ষা করে বুঝতে পারে সে আর নেই। কেউ একজন পুলিশে ফোন দেয়।

পুলিশ পাষন্ড খুনি স্বামীটিকে যখন গাড়িতে তুলতে যাচ্ছিল, তখন সে চিৎকার করে করে বলতে থাকে, “ও মনু! মনু! তুই কই? আমারে নিয়া যাইতাছেগা, তুই কিছু কসনা কেরে? তরে ছাড়া আমি থাকমু কেমনে? মনুরে মনু, তুই কই মনু? আমারে আটকা, নিয়া যাইতে দেইস না।”

ঠিক সেই সময়ই পাশের রাস্তা দিয়ে একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়িকে সাইরেন বাজিয়ে যেতে শোনা যায়। লোকে বলাবলি করছিল পাশেই কোথাও নাকি একটা গুদামে আগুন লেগেছে, ভয়াবহ আগুন!
রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশে হঠাৎই কোথা থেকে যেন ঘন কালো মেঘ এসে জমা হয়। কিছুক্ষণের মাঝেই শুরু হয়ে যায় প্রচন্ড বৃষ্টি। ফায়ার সার্ভিস যে আগুন নিভাতে ব্যর্থ হচ্ছিল তা বৃষ্টি এসে সফল করে দেয় আশাপাশের কোনো গুদামে আগুন ধরে যাওয়ার আগেই।
আচ্ছা, এ বৃষ্টি কি আসলেই বৃষ্টি নাকি অন্য কিছু? এ কি আকাশের কান্না হতে পারে না?

About The Author
Rihanoor Islam Protik
Rihanoor Islam Protik
আমি একজন প্রযুক্তি প্রেমী মানুষ। প্রযুক্তি নিয়ে পড়ে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। তবে লেখালেখিটা শখের বশে করি। আশ্চর্যের বিষয় হলো লিখতে গিয়ে আমি সকল কষ্ট ভুলে থাকতে পারি।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment