Now Reading
প্রবীণদের জায়গা দেখছি শুধুই বৃদ্ধাশ্রম!



প্রবীণদের জায়গা দেখছি শুধুই বৃদ্ধাশ্রম!

 

লেখালেখির হিসেবে আমি নিতান্তই কাঁচা বয়সী। দেখাদেখির বয়সটা দীর্ঘ না হলে লেখালেখিটা ঠিক পোক্ত হয়না আজকাল!

ছোট হাতে বড় কিছু লিখার চেষ্টা করলাম!
এই লেখা কারো মনে তিক্ততার সৃষ্টি করলে আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

পহেলা অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস।

শুরুতেই, ছোটবেলায় অর্থ না বুঝে মুখস্ত ইংরেজী রচনা বলার মতো করে কিছু কথা চলে এলো:

“প্রবীণরা দেশের জাতীয় সম্পদ। তারা না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ সমাধান গুলো খুজে পাওয়া দুষ্কর!……..
……………………………
…………………..পরিশেষে, প্রবীণদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে আমরা সকলেই বদ্ধ পরিকর। এ লক্ষ্যে সরকারী ও বেসরকারীভাবে সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ সম্পন্ন বহু বৃদ্ধাশ্রম(?) নির্মানের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।”

 

আমরা অনেক কথা ই বলি, পারিনা শুধু জায়গামতো থেমে একটু চিন্তা করতে।

প্রবীণদের যথাযোগ্য সম্মান দিতে হবে,

তাদেরও দেশ ও সমাজে বিরাট অবদান আছে,

তারা এক একজন শাখা প্রশাখা সমেত ছায়া,বাতাস,ফল,আলো দানকারী বিরাট বটবৃক্ষের মতো,

এসবের সবই যখন মানছি আমরা ওদের জন্য তবে আলাদা বাসস্থান কেনো!

কেনো আজ তাদের জন্য আমাকে আলাদা দিবস পালন করতে হচ্ছে!

 

আমরা কি আদৌও তাদের সম্মান দেই?
বছরের একটি দিন বৃদ্ধাশ্রম থেকে এক ডজন প্রবীণ-প্রবীণাকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে এসে কেক কেটে, ফুলের তোড়ায় গলা সাজিয়ে সবশেষে সংবাদ সম্মেলন করে জানান দিয়ে দিলাম, “এই দেখো কত জমজমাট করে আমি দিবসটি পালন করেছি।”

আপনার কি মনে হয়?
এটাই কি তাদের যথাযোগ্য সম্মান??
মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে তাই প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই আপাতত সীমা টানলাম।

 

নবীণদের কাছে সবাই ই আজকাল নতুন কিছু চায়!

নতুন কিছু করো,
নতুন করে ভাবো
নতুন রূপে গড়ো
নতুনের বেশে ঘুরো!

এখন কথা হলো, আসলেই যদি নবীণরা নতুন কিছু বলে কজন সেসব শুনার মতো সহনীয় মনোভাব রাখেন?

 

চলুন নতুন কিছু ভাবি:

 

প্রথমত,

প্রবীণরা সম্মানের পাত্র এই স্বীকৃতিটা বলে বলে কেনো নিতে হবে?

আমাদের প্রবীণরা যদি একটুখানি নরম হোন, আরো একটু আন্তরিক হোন, পরিবারের নবীণ সদস্যদের মতামতকে আরো একটু নরম হয়ে শুনেন, তারা কি তারপরেও তাদের স্বীদ্ধান্তে প্রবীণ সদস্যদের মূল্যায়ন না করে পারে??

কতক প্রবীণ সদস্যদের ব্যবহার প্রচন্ড আহত করে আশপাশের মানুষকে। তখন মনে হয়,
“ইশ! বড় মানুষগুলো এত অবুঝ আর বদমেজাজি ক্যান!”

দ্বিতীয়ত,

অহরহ বৃদ্ধাশ্রম গড়ে ওঠার পেছনে নবীণদের অসহনশীল মনোভাব অনেকাংশেই দায়ী!

তারা তাদের নিজস্ব ব্যাপারে প্রবীণদের মতামত দেয়াকে অযাচিত নাক গলানো হিসেবেই ভাবেন! অথচ ভাবেননা তাদের জায়গায় একসময় এই প্রবীণরাও ছিলেন, একই সমস্যায় তারাও পড়েছেন, এগুলোর সমাধানের পথ গুলোর ব্যাপারে তারাই তো ভালো ধারনা দিতে পারবেন। হতে পারে তখনকার সিচুয়েশান আর এখনকার নবীণদের সিচুয়েশান ভিত্তিক সমস্যা আলাদা কিন্তু “আলোচনায় সুন্দর সমাধান বের হয়” এটা তো জ্ঞানীজনরাও বলেন!

 

আমরা প্রবীণ দিবস পালন করি।
একটা দিন হইহল্লা করে কাটিয়ে দিনশেষে তাদেরকে আবারো বৃদ্ধাশ্রম নামক সেই অন্ধ কুঠুরীতেই ছেড়ে আসি!
এ কেমন সম্মান সূচক দিবস পালন করছি আমরা!!

 

জাতিসংঘ ৬০ বছর বয়সকে বার্ধক্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

এ হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬.১ শতাংশ প্রবীণ নর-নারী। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়েবে ১০.১ শতাংশে। উদ্বেগের বিষয় হলো বাংলাদেশে এর প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর হয়ে দেখা দিবে।

বৃদ্ধাশ্রম কি আসলেই এ সমস্যার সমাধান দেবে??

বাংলাদেশে শতকরা ২০ জন হয় একাকী থাকেন অথবা স্বামী-স্ত্রী এক সঙ্গে থাকেন। দরিদ্র প্রবীণদের সংখ্যা শতকরা ৩৭ জন।

বর্তমান সরকার প্রবীণদের জন্য বয়স্ক ভাতা চালু করেছে। এ কার্যক্রমের আওতায় ১৭ লাখ দরিদ্র প্রবীণ সাহায্য পাচ্ছে।

সহায় সম্বলহীন প্রবীণদের জন্য সরকার ৬টি বিভাগে ৬টি বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছে। বেসরকারি পর্যায়ে বৃদ্ধাশ্রম চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে বেসরকারি উদ্যোগে বেশ কিছু বৃদ্ধাশ্রম রয়েছে।

 

বৃদ্ধাশ্রম কেবল আজকের নয়।
পৃথিবীর প্রথম বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রাচীন চীনে। ঘরছাড়া অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের এই উদ্যোগ ছিল শান রাজবংশের। খ্রিষ্টপূর্ব ২২০০ শতকে পরিবার থেকে বিতারিত বৃদ্ধদের জন্য আলাদা এই আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করে ইতিহাসে আলাদা জায়গা দখল করে নিয়েছে এই শান রাজবংশ। পৃথিবীর প্রথম প্রতিষ্ঠিত সেই বৃদ্ধাশ্রমে ছিল বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের আরাম-আয়েশের সব রকম ব্যবস্থাই। ছিল খাদ্য ও বিনোদনব্যবস্থা। ইতিহাসবিদেরা এই বৃদ্ধাশ্রমকে প্রাচীন চীনে গড়ে ওঠা সভ্যতারই অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আমরা চোখ বন্ধ করে অন্যকে অনুসরন করি, তাদের ঐ কাজটার পেছনে উদ্দেশ্য, কারন কিংবা প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখিনা।

সহায় সম্বলহীন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য যে আশ্রমের সৃষ্টি, কালের পরিক্রমায় তাতে সহায় সম্পন্ন প্রবীণরাও ঠাই নিচ্ছেন!

নবীনদের একটুখানি ভালোবাসা, সহনশীলতা,
প্রবীনদের সামান্য নমনীয়তা,আন্তরিকতা গড়তে পারে সুন্দর-ভারসাম্যপূর্ণ পরিবার,সমাজ তথা দেশ।

তাহলেই ধ্বংস হবে বৃদ্ধাশ্রম নামক জীবন্ত জেলখানা, দূর হবে প্রবীণ দিবস নামক পরিহাস!!

About The Author
Maksuda Akter
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment