অন্যান্য (U P) সাহিত্য কথা

আমি আর বাবা

এই গল্পটা একান্তভাবেই আমার নিজের। কারো বিশ্বাস অবিশ্বাসে কিছুই করার নেই। গল্পের পুরোটাই আমার বাবাকে ঘিরে।
আমার বাবা জমাদার খায়রুল হক মুন্সী।
 সেই ৪৭’এর ভাঙনের সময় তার বাবা আহসান হক মুন্সীর হাত ধরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। প্রায় মাস তিনেক এ জেলা ও জেলা ঘুরাঘুরি করে শেষে পুরান ঢাকার লক্ষীবাজারের এই জায়গাটায় এসে তারা স্থির হোন। ভারতে তাদের বিশাল জমিজমা বিক্রি করে অর্থকরি এনে বসত ভিটে গড়ে তুলেন এই এখানেই।
বাবা বড় হলেন, বিয়ে থা করলেন। আমার জন্মের ঠিক তিন মাস আগে দাদা পরলোক গমন করেন।
এদেশে এসেও দাদা বিরাট কারবার পেতে বসেছিলেন। হুট করে সব পড়লো বাবার ঘাড়ে! বাবাও বেশ পাক্কা ব্যাবসায়ীর মতো দাদার কাজ বুঝে নিলেন অল্প দিনেই।
সারাদিন বাবার দেখা পেতামনা। খুব মন খারাপ লাগতো। মেয়েরা এমনিতেও বেশ বাবা ভক্ত হয়। আমিও তেমন। কেও কেও আবার রসিকতা করতো, বলতো,
 “বাব্বাহ!
এমন দহরম মহরম আর দেখিনি! বাবা ভক্ত মেয়ে নাকি মেয়ে ভক্ত বাবা!!”
আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি। স্কুল পেরিয়ে কলেজ, কলেজ পেরিয়ে ভার্সিটি। বাবা মেয়ের মধুর সম্পর্ক ঠিক ছোট্ট বেলার মতোই আছে আমাদের।
ভার্সিটির তৃতীয় বছরে নতুন একজন কে জীবনে স্থান দিলাম। ছেলেটির নাম শিহাব! এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলে আর এত কেয়ারিং ঠিক যেনো বাবার মতোই!
কথায় বলেনা? মেয়েরা ছেলে পছন্দ পছন্দ করে বাবার সাথে মিল দেখে। আমিও তাই করেছিলাম।
একদিন বাবার সাথে ওকে কথা বলিয়ে দিলাম, মূহুর্ত বাদেই দুজনের বেশ জমে গেলো!
পরের বছরই বাবা আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলেন। শিহাবের সাথে। নতুন সংসার, নতুন বাড়ি। তারপরও বাবার সাথে আমার দূরত্ব এতটুকুন কমলো না। পাশাপাশি মহল্লায় থাকি, বাবা রোজ সকাল-বিকাল দুবেলা করে আমার শ্বশুর বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে যায়। কখনো ভেতরে আসে কখনো বা হাটতে হাটতে ফোনে কল দেয়!
বছর ঘুরতেই আমাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে এলো। বাবা দেখতে এলো ওকে, গুলুমুলো বাবুটার নাম রাখলো বাবা নাফিসা। ডাকনাম দিলাম আমরা সুমো।
দিন যাচ্ছে আমাদের। এক রাতে ঘুম আসছেনা, শুয়ে এপাশ ওপাশ ছটফট করছি কেবল।
হটাৎ মনে হলো বাবা যেনো রাস্তা থেকে ডাক দিলো! রাত তখন দুটো বেজে দশ।
এত রাতে কেও নেই রাস্তায়।
-ঘুম আসছেনা তো, অস্থির মনে এসব হ্যালুসিনেশন হয় ই। ঘুমিয়ে পড়ো।”
     শিহাবের কথা ই মেনে নিলাম। অনেক চেষ্টার পর ঘুমালাম।
সাত সকালে মা’র ফোন এলো। বাবা হার্ট এ্যাটাক করেছেন। পাগলের মতো ছুটে গেলাম হসপিটালে। ততক্ষনে ময়নাতদন্ত শেষ, মেজর হার্ট এ্যাটাক।
মৃত্যুর সময় রাত দুটা থেকে আড়াইটার ভেতর!
বাবার হঠাৎ এমন চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছিলাম না কিছুতেই।
রাতে ঘুম আসেনা সহজে, খাওয়ায় রূচি নেই, এমনকি সুমোর যত্নও করছিলামনা ঠিকভাবে। এর মাঝেই একদিন ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। বিকেলে সিড়ির পাশের ছাদে সুমোকে  মাদুর বিছিয়ে বসে আছি, হঠাৎ দেখি ছাদের কার্নিসটার দিকে তাকিয়ে সুমো খিলখিল করে হাসছো!
অবাক হয়ে গেলাম। ওদিকটাতে কিচ্ছু নেই সুমো তবে হাসছে কেনো!
প্রায়দিনই সুমো এমন করছে। কখনো শুয়ে থেকে জানলার দিকে তাকিয়ে খিলখিল করে হাসছে আবার কখনোবা হামাগুড়ি দিয়ে অদৃশ্য কিসের পেছনে যেনো ছুটে বেড়ায় আর হাসে!
আমি কাওকেই দেখতে পাইনা, কিন্তু অনুভব করতে পারি বাবা আমাদের দেখছে! খুব কাছেই যেনো আছে, কানের পাশে গরম নিঃশ্বাস পাই যেনো আমি কখনো কখনো!
শিহাবকে বলবো বলবো ভেবেও বলিনা কিছু। এসব বিশ্বাস করানো কঠিন।
বাবা মারা যাওয়ার পর আস্তে আস্তে আবার সবাই যার যার কাজে মন দিয়েছি। সুমোও বড় হচ্ছে। প্রায় তিন মাসের মাথায় একদিন বাবাকে স্বপ্ন দেখলাম। হাত ইশারা করে দূরে কাকে যেনো দেখাচ্ছে! অস্পষ্ট চেহারা কাছে যেতে স্পষ্ট হলো, শিহাব! হঠাৎ দুম করে ও যেনো পড়ে গেলো নিচে! আমি চিৎকার করে জেগে ওঠলাম।
সে রাতে আর ঘুমোতে পারিনি। সারা রাত শিহাবকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলাম আমি। কেনো যেনো ওকে নিয়ে ভয় ভয় লাগছিলো!
পরদিন ওঠে নাস্তা রেডী করছি। শিহাব গোসল করে কাপড় নেড়ে দিচ্ছে বারান্দায়।  আমার শ্বশুর বাড়িটা একটু পুরনো ধাঁচের। লম্বা বারান্দা দুপাশে, মাঝখানে থাকার ঘরগুলো সারি করে দেয়া।
আমি যে ঘরে নাস্তা দিচ্ছি তারই ঝুল বারান্দায় কাপড় দিচ্ছে শিহাব। হঠাৎ ওকে টলে ওঠতে দেখে কেমন করে ওঠলো আমার ভেতরটা! পুরনো ঝুল বারান্দার রেলিং শিহাবের ভর রাখতে পারছেনা, ভেঙে পড়ে যাচ্ছে ওটা!
চিৎকার করে দৌড়ে গেলাম আমি, শিহাবও কোনোমতে সামলে নিয়ে পিলার ধরে ওঠে এলো ভেতরে। জড়িয়ে ধরলাম ওকে। স্বপ্নটার কথা তখনি মনে পড়ে গেলো,
    “বাবা কি সাবধান করে দিতে এসেছিলো আমাকে? জানে তো শিহাব,সুমো দুজনের একজনকে ছাড়াও আমি থাকতে পারবোনা!”
রাতে শিহাবকে বলেছিলাম স্বপ্নের কথাটা। বিশ্বাস করেনি, অবশ্য মুখের উপর হাসেওনি, ভদ্র ছেলে তো। আমাকে ইনসাল্ট করতে চায়নি। আমিও আর জোর করে বিশ্বাস করাতে চাইলামনা।
দু মাস ভালোয় ভালোয় গেলো। এক বিকেলে হালকা চোখটা লেগে এসেছে, বাবাকে আবার দেখলাম!
ভয়ানক স্বপ্ন। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে তার মাঝখানে আমাদের ছোট্ট সুমো চিৎকার করছে দু হাত বাড়িয়ে! বাবা দূরে দাড়িয়ে চোখের জল ফেলছেন নিরবে।
ঝট করে ঘুম ভেঙে সটান ওঠে বসলাম। চটপট একটা ব্যাগে আমার আর সুমোর কাপড় গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। সিএনজি নিয়ে রওনা দেয়ার আগে ভাবলাম দোতলায় আমার শ্বাশুরিকে একবার বলে আসি,তারপর ভাবলাম না থাক। এভাবে হুট করে বেরুতে দেবেনা কেও, কিন্তি আমার তো আর এক মিনিটও এবাড়িতে থাকা চলবেনা। আমার মেয়ের যে বড্ড বিপদ! বললেও কেও বিশ্বাস করবেনা আমায়।
সিএনজি নিয়ে মা’র ওখানে যাচ্ছি। পথে শিহাবকে কল দিয়ে বললাম,
“মাকে দেখতে যাচ্ছি। তুমিও অফিস থেকে চলে এসো কিন্তু।”
ও অবাক হলো একটু, কিছু বললো না।
হঠাৎ এমন করে আসতে দেখে মাও অবাক। খুশিও হলো। খুশির চোটে তক্ষুনি বাজারে ছুটলো, নাতনী কে আজ চিংড়ি খাওয়াবে মা!
বাড়িতে আমি আর সুমো। দুতলায় বাবার ঘরটায় এলাম। কিছুই সরানো হয়নি, বাবা থাকতে যেমন ছিলো তেমনি সব সাজানো! মাও কি আমার মতো বাবাকে অনুভব করে?
সুমো বিছানায় বসে খেলছে। নিচের ঘরে এলাম ওর গোছলের জামা আনার জন্য,এমন সময়ই বাড়ি কাঁপিয়ে বিষ্ফোরনের শব্দ হলো! মা বার বার করে বলে গিয়েছিলো “চুলায় দুধ বসিয়ে যাচ্ছি দেখিস।”
 সিলিন্ডারটার জয়েন্টে একটু লিক হয়ে ছিলো দুধের বলক এসে পড়ে গিয়েছে।
ওখান থেকেই গরম বাড়তে বাড়তে বিষ্ফোরন।
সুমো!
আমার ছোট্ট মেয়েটা  দুই তলায় বসে আছে। আগুন কাঠের দরজা পুড়িয়ে সিড়ির দিকে ছুটছে দ্রুত! হাঁচড়ে পাঁচড়ে সিড়ি দিয়ে ওঠার চেষ্টা করলাম। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে আসছে, অর্ধেক ওঠতেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেলাম।
মুখে ঠান্ডা পানির ঝাপটায় চোখ খুলে দেখি সামনে অনেক মানুষ!
মা, আমার শ্বাশুরী,শিহাব আর ওর কোলে আমার সুমো!
জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম এখনো হালকা ধোঁয়া ওঠছে। সব পুড়ে ছাঁই।
মা বললেন, কিছুই আর থাকলোনা রে। তোর বাবার ঘরটায় ঢুকেছিলাম একটা কিচ্ছু বাকি নেই সব পুড়া কাঠের গুলো হয়ে গেছে।”
কেনো জানিনা হাউমাউ করে কান্না বেরিয়ে এলো আমার। বাবা মারা যেতেও বোধহয় এত কান্না আসেনি যতটা না বাবার ঘরটা পুড়ে গেছে শুনে কাঁদলাম!
বাবা মারা যাওয়ার আগে ইনসিওরেন্স করিয়ে রেখেছিলেন। বাড়িটার সব ক্ষয়ক্ষতি ওরাই সারিয়ে দেবে।
আমি শ্বশুর বাড়িতে ফিরে এলাম। অদৃশ্য কারো অস্তিত্ব আর অনুভব করছিনা। সেদিনের আগুনে সব কিছুর সাথে বাবার প্রেতাত্মাটাও কি পুড়ে গিয়েছিলো??
জানিনা! শুধু জানি বাবা আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো, আর আমিও!

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ইয়োরু-সান নি তোদোকে অথবা রাত্রিনামা

রাফাত

মা

Mostaphizur Rahman

মুভি রিভিউঃ Dead Poets Society

Nur Mohammad

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: