Now Reading
অদৃশ্য অভিমান। বাবা আমায় ভালোবাসে না!



অদৃশ্য অভিমান। বাবা আমায় ভালোবাসে না!

সাত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠিয়ে স্কুলের জন্য তৈরি হওয়া খুবই কষ্টকর মনে হয় সুভংকর এর। তার উপর মা কল্পনা দেবীর তাড়াহুড়ো তো আরো বেদনাদায়ক!
– “আমার বাবুসোনা টা লক্ষী না? দেখবে আজকেও ঠিক সবার আগে বাস ধরতে পৌছে গেছি আমরা। একদম সামনের সিটটায় বসবো। কত্ত মজা হবে দেখো।”
-উফ মা! কতবার বলেছি আমাকে বাবুসোনা বলোনা কারো সামনে। ওরা রোজ হাসে যে দেখতে পাওনা!
– আচ্ছা বাবা বলবোনা। এখন ভালো বাবুটার মতো নাস্তাটা খেয়ে নাওতো।
-আবারো!
-ঠিক আছে, আর বলবোনা!
অপর পাশে চেয়ারে বসে চোখ কুঁচকে একবার মা ছেলের ন্যাকামো দেখে শুভদ্বীপ। দিনদিন এসব দেখতে দেখতে ত্যাক্ত হয়ে যাচ্ছে মনটা!
চেয়ার ঠেলে ওঠে পড়লো শুভদ্বীপ। আজ একটু জলদি যেতে হবে অফিসে,বিকেলে আবার লায়ন্স ক্লাবে একটা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে হবে। লায়ন্স ক্লাবের কথা ভাবতেই সুদিপ্তার কথা মনে পড়ে গেলো। কি একটা জরুরি খবর আছে ওকে দেয়ার মতো। তবে এমনি এমনি দেবেনা বিনিময়ে একবেলা খেতে হবে ওর সাথে! রহস্যময়ী মেয়ে একটা! ও কি ভেবেছে শুভদ্বীপ কিছুই বুঝেনা!
  ভাবতে ভাবতে এক চিলতে হাসি ফুটলো শুভদ্বীপের মুখে। তখনই কল্পনার কথা শুনে মেজাজটা খিঁচিয়ে ওঠলো,
-তুমি একবার সুভংকরকে ড্রপ করে দেবে? একই দিকে যাচ্ছো যখন…..
-আমার অত সময় নেই। একই দিকে গেলেই হলো?
এই না বলছিলে স্কুলবাস ধরতে হবে? কি করে পারো এসব ন্যাকামো করতে….!
-“শুভ!” কল্পনা গলা নামিয়ে ধমকে ওঠলো।
  “ছেলেটা রোজ বসে থাকে বাবা এসে নিয়ে যাবে স্কুল থেকে, তখন না পারো, সকালে তো দিয়ে আসতে পারো একবার! নিজের কারনেই কিন্তু ছেলের সাথে দূরত্ব বাড়াচ্ছো তুমি।”
– হয়েছে, আবার শুরু করে দাও এখন। এসব ন্যাকামো করে করে তুমিই বরং ছেলেটার মাথা খাচ্ছো…
হঠাৎ ফোনের রিংটা বেজে ওঠতে,কথা শেষ না করেই ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো শুভদ্বীপ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কল্পনাও সুভংকরের স্কুল ব্যাগটা গোছাতে লাগলো।
এসব খটমট ওদের নিত্যদিনের অভ্যেস। সুভংকরও বুঝে বাবা ওকে স্কুলে দিয়ে আসতে বা নিয়ে আসতে চায়না। কিন্তু কেনো জানেনা! জানেনা বলেই কেবলি মনে হয় বাবা ওকে একটুও ভালোবাসেনা। আর এই ভাবনা থেকেই মনটা ছোট হয়ে থাকে সবসময়। বাবার সামনে তাই নিজেকে গুঁটিয়ে রাখে একদম বোবার মতো!
স্কুল বাসে ওঠতেই কল্পনা দেবী আজ একটু অবাক হলো। বাচ্চাগুলো সব সীটে বসে বসে ছবি আঁকছে!
-কি ব্যাপার বাবু, এত কিসের ছবি আঁকা হচ্ছে সবার!
-আন্টি জানেননা, কাল আমাদের স্কুলের আর্ট প্রতিযোগীতা হবে! যা ফার্স্ট হবে তাকে অননেক বড় পুরষ্কার দেয়া হবে!!
ছোট একটা ছেলে জবাব দিলো। কল্পনা অবাক, কই সুভংকর তো ওকে কিছুই বলেনি! তাকিয়ে দেখে ছেলেটা মাথা নিচু করে আছে। চোখে পানি!
-কি হলো বাবাই? আমাকে বলিসনি কেনো?
-বাবা যে এসব পছন্দ করেনা! আবার বকবে তোমাকে!    টলোমলো চোখে জবাব দিলো সুভংকর।
স্তম্ভিত কল্পনা কি বলবে বুঝতে পারছেনা। আস্তে করে বললো,
-বাবা কিন্তু অনেক ভালোবাসে তোমায়। এমনি রাগ দেখায় বলে বুঝোনা!
তুমি ছবি আঁকবে, দেখো বাবা জানতে পারলে খুব খুশি হবে!
রাতে বাড়ি ফিরলোনা শুভদ্বীপ। কল্পনার ফোনটাও রিসিভ করলোনা। সারা রাত জেগে বসে থাকলো কল্পনা, সাথে সুভংকরও ঘুমে ঢুলে ঢুলে পড়ছে। সকাল দশটায় বাসায় ফিরলো ও। এসেই সোজা চলে গেলো গোসলে, কল্পনা বা সুভর দিকে ফিরেও তাকালো না!
নাস্তা করছে ওরা। শুভদ্বীপ পত্রিকা পড়ছে আর চা খাচ্ছে। বাসায় আসা অবধি একটা কথাও বলেনি ও!
   চা শেষ করে ওঠে দাড়াতেই কল্পনা কথা বলে ওঠলো,
 – আজ বিকেলে ফ্রী আছো তুমি?
থমকে দাড়ালো শুভদ্বীপ,
-কেনো!
– লায়ন্স ক্লাবে আমাদের নিয়ে যেয়ো। সুভংকরের আর্ট প্রতিযোগীতা আছে একটা…
-উফ কল্পনা! তোমার ওই পিকাসো কে নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করতে যেয়োনা ওখানে। বাহির থেকে ফরেনাররা আসবে ওই প্রতিযোগীতায়, ওটা তোমার এই পিকাসোর জন্য নয়!
– তুমিও থাকছো ওখানে?
কল্পনা একটু অবাক হলো, তোমার পত্রিকা নিউজেও দেখলাম আজ। বেশ বড় প্রতিযোগীতা হচ্ছে তাহলে!
– তবে আর বলছি কি! আমার মুখ হাসিওনা ওখানে গিয়ে আর, প্লিজ!
কথা ক’টি বলেই বেরিয়ে গেলো শুভদ্বীপ।
অনেক দিন পর আজ লায়ন্স ক্লাবে এলো কল্পনা। সেই যে বিয়ের পর পর শুভদ্বীপের সঙ্গে আসতে মাঝে মাঝে। তারপর তো সুভংকরের জন্ম হলো,সেই ই শেষবার।  কল্পনাকে দেখে সুভংকরের আর্ট টিচাট এগিয়ে এলো,
  – দিদি আপনি এসেছেন ভালো হয়েছে খুব। দেখবেন পুরষ্কারটা আমাদের সুভই জিতবে,ওর মাঝে পিকাসোর ছায়া দেখেছি আমি!
ওইযে দূরে শুভদ্বীপকে দেখা যাচ্ছে। ঘাড় ফিরাতেই হাত নাড়লো কল্পনা, শুভদ্বীপ এক নজর তাকিয়ে নজর ফিরিয়ে নিলো! কি আশ্চর্য!
কল্পনা অবাক হয়ে ভাবলো, একই জায়গা,
একই মানুষ,
তবু সময়ের ব্যাবধানে মানুষ কতটা বদলে যায়!!
চারদিকে দেশী আর ফরেনারে গিজগিজ করছে। নাচ, গানে একটা আস্ত উৎসব যেনো!
তারই এক ফাঁকে চিত্রাংকন চলছে। এক মনে ছবি আঁকছে সুভংকর। কল্পনা শুধু দূরে দাড়িয়ে ছেলের মুখটা দেখেই যাচ্ছে। কি এক অদৃশ্য সংকল্প ওই ছোট্ট মুখে!
প্রতিযোগীতা শেষ। মার্কিং চলছে, কিছুক্ষন বাদেই প্রতিযোগীর নাম ঘোষনা করা হবে। শুভদ্বীপ দূরে দাড়ানো কল্পনাকে একবার দেখলো। পাশে সুভংকর দাড়িয়ে আছে। মুখ ফিরিয়ে নিলো ও।
“অযথাই লোক হাসাতে এসেছে দুজন। ভাগ্যিস কারো সাথে পরিচর করিয়ে দেইনি! কেমন লজ্জাটা পেতাম!”
একে একে মাইকে এনাউন্স হচ্ছে বিজয়ীদের নাম। তৃতীয় বিজয়ী, দ্বিতীয় বিজয়ী পুরষ্কার নিয়ে এলো।
সবশেষে প্রথম বিজয়ীর নাম ঘোষিত হলো, সুভংকর ব্যানার্জি…….!
প্রচন্ড করতালিতে মুখরিত হচ্ছে চারপাশ। আনন্দের আতিশয্যে হাসি থামছেইনা শুভদ্বীপের। “আমার ছেলে! আমার ছেলেটা প্রথম হয়েছে!”
“কালই আমার পত্রিকার প্রথম পাতায় খবরটা ছাপাবো আমি!”
  একেকজন কে পাশ কাটিয়ে এগুচ্ছে আর মনে মনে আকর্ষনীয় ক্যাপশন বাছাই করছে শুভদ্বীপ। সম্পাদকের নিজের ছেলে বলে কথা!
পুরষ্কার হাতে  নিয়ে এদিকেই আসছে সুভংকর। কল্পনাকে এসে জড়িয়ে ধরলো। ওদের ঘিরে ধরলো করতালিরত জনগন। ভীর ঠেলে এগুতে পারছেনা আর শুভদ্বীপ। গলা ছেড়ে ডাকলো ছেলেকে…
-সুভংকর!!
মায়ের কোল থেকে মাথা তুলে একবার তাকালো সুভংকর। চোখে অশ্রুধারা টলমল করছে ওর, এক পলক তাকিয়েই মায়ের কোলে মুখ গুজলো আবার!
থমকে দাড়ালো শুভদ্বীপ।
এই ভীর ঠেলে এগিয়ে কি লাভ হবে আর?
অনেক আগেই তো ছেলের সাথে অদৃশ্য এক দেয়াল তুলে ফেলেছে শুভদ্বীপ নিজেই!!
About The Author
Maksuda Akter
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment