Now Reading
পুরানো তিমির [৩য় পর্ব]



পুরানো তিমির [৩য় পর্ব]

তারপর আর বেশি কিছু হয় নি।দিন যেতে যেতে সময়ের সাথে মাও প্রায় ভুলে গেছেন ব্যাপারটা।দিন

কয়েক পরে আগের মতই স্বাভাভিক জীবন যাপন করছি আমরা।আমি আগ বাড়িয়ে কখনো কথা তুলি

নি।নিজ থেকে চাইতাম কথাটা ডুবে যাক।মাও যেন কথাটা ভুলে যান একেবারে।কারণ

এই বিষয়ে মায়ের সাথে যত বেশি কথা বলব,মায়ের মনে তত বেশি কথাটা ঘুরতে থাকবে।বারবার মনে পড়বে।জানি না মাস খানেকের পরিচয়ে একটা মানুষ অন্য একটা মানুষের কতটা আপন হতে পারে! তবে এই কয়দিনে মায়ের যে অদ্ভুত আচরণ দেখলাম,তাতে আমি হতবাক।কোথাকার কোন মেয়ের জন্যে নাওয়া খাওয়া,ঘুম সব কিছুর কথা ভুলে গেছেন।চিন্তায় অস্থির হয়ে প্রেসার বাড়িয়ে ফেলেছেন অনেকক্ষাণি।পরে ডাক্তার এনে কড়া ঘুমের ঔষধ দিয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখলাম কিছুদিন।আদ্ভুত……পৃথিবীতে অবাক হওয়ার জন্যে কত কিছুই না ঘটে আমাদের চারপাশে।

কিছু কিছু মানুষের অসম্ভব ক্ষমতা থাকে মানুষকে আপন করে নেয়ার।এই ধরনের মানুষ খুব সহজেই মানুষের সাথে মিশতে পারে।মেয়াটারও মনে হয় এমন কিছু ক্ষমতা আছে।অল্পদিনেই মায়ের খুব আপন লোক বনে গেল।এর পেছনে খারাপ বা ভালো কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে এটা নিয়ে এখন আর ভাবি না।যে চলে গেছে তাকে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করে লাভ কি!

 

মানুষের স্বভাব হচ্ছে সে নতুন কিছু শুনতে পেলে পুরো ঘটনা জানতে চায়।কৌতুহলি হয়ে উঠে।আমি মনের ভিতর কখনো এমন কৌতুহল বোধ করি নি।এই বাংলাদেশের মেয়েরা প্রতিনিয়ত স্বামীর হাতে কেন নির্যাতিত হয় সেটা আর নতুন করে জানার মত কোন বিষয় নয়।ঘুরেফিরে সেই দু’চারটা ব্যাপার।স্বামী নেশাখোর,মাতাল কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অবিশ্বাস,সন্দেহ,পরকীয়া সংক্রান্ত কিছু অথবা যৌতুক,টাকা পয়সার ব্যাপার।এই তো।আর বাইরে আর কি? মেয়েটাও নিশ্চয় এই কারণ গুলোর মধ্যে যে কোন একটির সমস্যায় ভুগছে।

তবে,একটা বিষয় রহস্য থেকেই যায়।মেয়েটা হঠাৎ করে উদাও হবে কোথায়? হতে পারে তার স্বামীর অন্য জায়গায় পোস্টিং হয়েছে।অথবা অন্য কোথাও ভালো চাকরি পেয়ে আগের চাকরি ছেড়ে চলে গেছে।কিংবা অন্যকিছু।বাসা বদলের এমন হাজার কারণ থাকতে পারে।সেটা বিষয় নয়।আমার কাছে অবাক লাগে এই ভেবে যে,মেয়েটা যাওয়ার আগে মাকে একবার বলেও গেল না! যার সাথে এত ভাব জমে গেল,তাকে না জানিয়ে,শেষ বিদায় না নিয়ে এভাবে অদৃশ্য হয়ে গেল! কেন?

 

বেশ কয়েক মাস আমাদের বেশ ভালোই চলছে।আমি নিয়মিত অফিস করছি,বাড়ি যাচ্ছি,বাবা মাও বেশ সুস্থ আছেন।সবকিছু ঠিকঠাক।আতঙ্কে থাকার মত কিছুই নেই।সহজ ভাষায় বলতে গেলে আমরা এখন সুখী।

একদিন ভোর বেলা।এত সকালে আমি ঘুম থেকে উঠি না।সেদিন উঠলাম মায়ের ফোন পেয়ে।

“হ্যালো মা……কেমন আছ? এত সকালে…কোন সমস্যা হয়েছে?”

আমি একটু ভয় পেয়ে গেলাম।অসময়ে হঠাৎ মায়ের ফোন পেয়ে ভাবলাম কি না কি হল! মা অত্যন্ত সহজ গলায় বললেন,

“কিছু হয় নি।তুই ভালো আছিস? এখনো ঘুম থেকে উঠিস নি?অফিস নেই আজ?”

“আছে,এই তো কিছুক্ষণ পর উঠবো।“

তারপর কিছুক্ষণ নিরবতা।একটু পরে মা আমতা আমতা করে বললেন,“শুনেছিস আহাদ,আশা ফিরে এসেছে…!”

মায়ের কথা শুনে একটা শীতল প্রবাহ বয়ে গেল আমার মেরুদন্ড বরাবর।কিছুক্ষণ বিস্ময়ে মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না আমার।মায়ের গলা এখন পুরো কিশোরীদের মত।তাঁর খুশি,উচ্ছ্বাস,কথা বলার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তাঁর বয়স পনের কি ষোল বছর।

“কি রে আহাদ! চুপ করে আছিস কেন? কিছু বলছিস না যে?”

“এমনি।মেয়েটা ফিরে এসেছে ভালোই হল।তোমার চিন্তা দূর হল।“

কথা শেষ করে আমি হাসলাম।মিছে হাসি।মাকে খুশি করার জন্যে ভাব ধরলাম,মেয়েটা ফিরে আসাতে আমিও খুব খুশি হয়েছি।

মনে মনে আমি হতাশ।যতটা না হতাশ তাঁর চেয়ে বেশি রাগ উঠছে আমার।ইচ্ছে হচ্ছে মেয়েটাকে এখনি গিয়ে আবার এলাকা থেকে বের করে দিই।এতদিন আমরা কি সুন্দর সুখে ছিলাম।মেয়েটা আবার কোত্থেকে ফিরে এসে উটকো ঝামেলার মত জট পাকাল।মাকে নিয়ে আমার ভয় শুরু হচ্ছে আবার।মেয়েটা তার স্বামীর সাথে ঝগড়া করবে সারারাত আর মা এই নিয়ে রাত জাগবেন।বিষয়টা নিশ্চয় আমার জন্যে সুখকর নয়।

ফোনে কথা আর বাড়ালাম না।ঘটনার বিস্তারিত ফোনে শুনতে ভালো লাগছে না।বাড়ি গিয়ে মা’র কাছ থেকে সরাসরি শুনবো।বাবার শরীরের খবর জেনে ফোন রেখে দিলাম।

তার ঘন্টা খানেক পর,সিনিয়র অফিসার কে ফোন করে ছুটি নিয়ে রওনা দিলাম বাড়ির পথে।

 

বাড়ি ফিরে মার মুখে বিস্তারিত যা শুনলাম তা এই রকম___মেয়েটা গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল।যাওয়ার পথে গাড়ি দুর্ঘটনায় মেয়েটার স্বামীর একটা পা,আর হাতের কব্জি ভেঙ্গে গেছে।একটা ট্রাকের সাথে নাকি তাদের বাস মুখোমুখি সংঘর্ষে লেগেছিল।একমাস হাসপাতালে থাকতে হয়েছে তার স্বামীকে।বুঝতে পারছি দুর্ঘটনা বড় ধরনের ছিল।কিন্তু ঘটনা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।পুরো ঘটনায় শুধু মেয়েটার স্বামীর কথাই শুনলাম,এত বড় দুর্ঘটনায় মেয়েটার কিছুই হল না?

মাকে জিজ্ঞেস করলাম,”মা,মেয়েটার কিছু হয় নি?”

মা এক মুহূর্তের জন্যে চুপ মেরে গেলেন।তারপর বললেন,”ওর কিছু হয়েছে কি না তা তো বলে নি।“

“কপালে,হাতে বা অন্য কোথাও কাটা-ছেরা দাগ দেখনি?”

মা চুপ করে মনে করার চেষ্টা করলেন,“না,এমন কিছু তো চোখে পড়ে নি।“

“এত বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেল,অথচ মেয়েটার কিছু হয় নি,বিষয়টা কেমন না মা?”

“কেমন হতে যাবে কেন! হয়ত মেয়েটা বলতে ভুলে গেছে।আমিও তো জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি।“ মা রেগে গেলেন, “আর দুর্ঘটনায় গাড়ির সবাই তো আহত হয় না।“

“তা হয় না,ঠিক।কিন্তু সামান্য চোট তো পাওয়য়ার কথা।তার পাশের জনের পা ভেঙ্গে গেল আর সে সামান্য চোটও পেল না?”

“পেয়েছে নিশ্চয়।ওর স্বামী বেশি আঘাত পেয়েছে,সে কথা বলতে বলতে নিজের কথা বলতে ভুলে গেছে।“

 

আমি আর কথা বাড়াই নিই।মেয়েটাকে বেশি সন্দেহ করলে মা বড় ধরনের কষ্ট পাবেন।

তাই হিসাব নিকাশ সব কিছু মনের ভেতরই জমা রাখছি।কোথাও একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।সাথে মনের ভিতর কিছুটা ভয়ও ঘনীভূত হচ্ছে।এই মেয়েটার উদ্দেশ্য কি?

 

About The Author
Ikram Jahir
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment