অন্যান্য (U P) সাহিত্য কথা

পুরানো তিমির [৪র্থ পর্ব]

আজ খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছি।ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়।মর্নিং ওয়াক করা হয় না অনেকদিন।প্রথম প্রহরের সিগ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে ভালো লাগছে খুব।চারপাশ সতেজ আর চুপচাপ।রাস্তা-ঘাটে তেমন লোকজন নেই।আমি আর আমার মত মর্নিং ওয়াকে বের হওয়া গুটি কয়েক লোক এদিক সেদিক হাঁটছে।ফাঁকা রাস্তায় গা দুলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম।আরামের ঘুম বিসর্জন দিয়ে মর্নিং ওয়াক করতে বের হই নি।বরং এই বাড়িটার খোঁজেই আজ মর্নিং ওয়াকের আয়োজন।সাদা রঙের পাঁচতলা দালান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার ধার ঘেষে।সামনে উঠোনের মত ছোট একটু ফাঁকা জায়গা।

আশা নামের মেয়েটি এখানে থাকে?

বাড়িটা আবার ভালো করে দেখে নিলাম।হ্যাঁ,এটাই।মা এই বাড়ির কথাই বলেছেন।মেয়েটা থাকে নিচতলার রাস্তার পাশের প্ল্যাটটায়।কিছুক্ষণ বাড়িটার চারপাশে ঘুরঘুর করলাম।প্রায় আধ ঘণ্টার মত হবে।কাউকেই দেখলাম না।কোন মেয়ে মানুষ তো দূরের কথা,কোন পুরুষ মানুষও না।এই বাড়ির সবাই মনে এখনো ঘুমে নিথর হয়ে আছে।খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস কারো নেই হয়ত।

 

আমি আরও কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করলাম।অন্য সময় হলে একটা বাড়ির পাশে দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরাঘুরি করছি কেন___এই নিয়ে লোকজন নানা ধরনের সন্দেহ করত।কেউ কেউ এসে হয়ত জিজ্ঞেসও করত, “কি ভাই সাহেব,ধান্ধা কি?”

এই কাক ডাকা ভোরে সেই সন্দেহ করার মত মানুষ এখনো রাস্তায় বের হয় নি।পুরো শহর চুপচাপ।লোকজন নেই বললেই চলে।

ভাবলাম,অনেকক্ষণ তো হল।এবার ফিরে যাওয়া উচিত।বাসায় ফিরে দেখি মা নাস্তা তৈরি করছেন।আর বাবা জায়নামাজে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন।আমি নিশ্চুপে আমার ঘুরে ঢুকলাম।ভালো লাগছে না।নিজেকে খুব হতাশ লাগছে।ঘুম নষ্ট করে মর্নিং ওয়াক করে কোন লাভ হল না।ব্যর্থ মিশন।জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখছি।পূর্বের আকাশটা লাল টকটকে হয়ে ফেটে পড়ছে।সূর্যটা আকাশের গর্ভ ভেদ করে আস্তে আস্তে উঁকি দিচ্ছে পৃথিবীর প্রান্তরে।টুকরো টুকরো সোনালি মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে পড়ছে এদিক সেদিক।রাতের অন্ধকার কুয়াশার মত হাওয়ায় মিশে গিয়ে আবার আলোকিত হচ্ছে এই বিশ্ব।

একটানা অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি ভাবনায় ডুবে গেলাম।আশা নামের মেয়েটাকে আমি কখনো দেখি নি।আমি যে কয়দিন এখানে থাকি,সে কয়দিন সে মায়ের কাছে আসে না।মা বলেছেন মেয়েটা সময় অসময়ে চলে আসে।কখনো দুপুর,কখনো সন্ধ্যায়।ভারী চঞ্চল মেয়ে।

সেই চঞ্চল মেয়েটি আমি এখানে থাকলে আসে না কেন সেটাও এক রহস্য।যে এই বাড়িতে নিত্য আসা যাওয়া করে,ইচ্ছা করে না হোক,ভুল বশতও তো আমার সামনে সে পড়তে পারতো।আমি বাড়ি কখন আসি সে এসব খবর রাখে? না কি মা-ই তাকে কথায় কথায় বলে “আমার ছেলে আসবে।“

বললেও বলতে পারে।মানুষ কথার ছলে গল্প করতে করতে কত শত কথাই না বলে।আমি কোন সমীকরণ মেলাতে পারছি না।মেয়েটা কি আমি থাকলে লজ্জায় আসে না,না কি অন্য কোন কারণ?মেয়েটাকে আমার চঞ্চল মনে হয় না।মনে হয়,ধুরন্ধর চালাক চতুর মেয়ে।বাবা মার বয়স হয়েছে।এই বয়সের মানুষকে ভুলিয়ে ভালিয়ে অনেক কিছুই করা সম্ভব।কে জানে মেয়েটা মনে মনে কি ফন্দি আঁটছে।আমি সিদ্ধান্ত নিলাম,এখন থেকে মূল্যবান জিনিষপ্ত্র আর টাকা পয়সা বাড়িতে বেশি রাখবো না।এমনও হতে পারে মেয়েটা খুব ভালো,মনে কোন খারাপি নেই।তবুও সাবধান থাকা ভালো।সাবধানের মার নেই।

 

“কই রে আহাদ,নাস্তা করতে আয়”,মা টেবিলে নাস্তা রাখলেন।

আমি নাস্তা খেতে বসলাম।আমার খাওয়ার সময়,খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মা পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন।নিজের হাতে সবকিছু পাতে তুলে দেন।একমাত্র ছেলে হিসেবে এইটুকু আদর আমার প্রাপ্য।মায়ের মনে আদরের সীমা পরিমাপ করে বের করা যায় না।দুই তিনটা থাকলে না হয়,সে আদর ভাগ করে দেয়া যেত।এখন তো সবটুকুই আমার।

 

আজ মা আমার পাশে নাস্তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকেন নি।খাওয়ার মাঝখানে চলে গেলেন।এত বছরের পুরাতন অভ্যাস আজ হঠাৎ এভাবে ভাঙ্গাতে আমি একটু চমকালাম।পরক্ষণেই ভাবলাম,মা’র বয়স হয়েছে।আর কত? হয়ত এখন একটু শরীর খারাপ করছে।দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে পারছেন না।বিছানায় গিয়ে একটু শুয়ে থাকবেন।

 

আমি বসে বসে নাস্তা করছি।রকমারি খাবারের মধ্যে মা আজ বিশেষ খাবার হিসেবে পায়স রেঁধেছেন।মায়ের হাতের পায়স অনন্য।তুলনা খুঁজে পাওয়া যাবে না।আমার ফুফুদের মুখে শুনেছি, যৌবনে বাবা মায়ের উপর রাগ করলেই তিনি পায়স রাঁধতেন।সে পায়স খেয়ে বাবা আর রাগ ধরে রাখতে পারতেন না।মা’র প্রেমে পড়ে যেতেন।

হঠাৎ দেখলাম মা হাতে একটা বক্স নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।আমি তড়িঘড়ি করে জানতে চাইলাম, “কোথায় যাচ্ছ মা?”

মা বললেন, “আশাকে একটু পায়স দিয়ে আসি।“

“তুমি পাগল হয়েছ মা?ডাক্তার তোমাকে সিঁড়ি দিয়ে বেশি উঠা নামা করতে নিষেধ করেছেন।অকারণে এখন নিচে নামার কি দরকার?”

“অকারণে কোথায়?মেয়েটাকে পায়স দিতে যাচ্ছি।যাব আর আসবো।এক দুইবার সিঁড়ি চড়লে কিছু হয়না।“

মা কে আটকান কঠিন কাজ।হিংসায় আমার গা জ্বলে যাচ্ছে।কোথাকার কোন মেয়ে,তার জন্যে মা’র এত আদর?আমার থেকেও বেশি?এই মেয়ের জন্যেই কি মা আজ নাস্তা খাওয়ার সময় দাঁড়ালেন না?এত দিনের অভ্যাস পালটে ফেললেন?পায়স নিয়ে তো পরেও যেতে পারতেন।মায়ের কাছে মেয়েটার এত গুরুত্ব?রাগে আমার মাথা টগবগ করছে।আমার নিজের বোন,পরিবার, কিংবা আত্মীয় স্বজনের জন্যে এমন মায়া দেখালে না হয় মেনে নিতাম।পরের জন্যে এমন আদিখ্যেতা আমার ভালো লাগে না।

আমি শান্ত স্বরে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে যেও।আরেকটু পর যাও।এই সাত-সকালে যাওয়ার কোন মানে হয়! হয়ত ওরা এখনো ঘুম থেকেই উঠে নি।“

“বলেছে তোকে! আশা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে।তোদের মত এত অলস না!”

“তাই বলে এত সকালে যাবে! আর যেতে হবে কেন?মেয়েটা তো এখানে আসে।আসলে তখন দিও।“

“তুই বাসায় থাকলে ও আসে না।ওর লজ্জা করে।“

“ঠিক আছে যাবে।আরেকটু পরে যাও।“

“না না,এখনই……পায়স ঠান্ডা হয়ে যাবে।“

আমি আর রাগ সামলাতে পারলাম না।চিৎকার দিয়ে বলে ফেললাম, “পরের জন্যে তোমার এমন দরদ আমার ভালো লাগে না মা।কোথাকার কোন মেয়ে,কে জানে মনে মনে কি চাল চালছে! ওসব লজ্জা টজ্জা কিচ্ছু না……আমার সামনে আসলে মেয়েটার দুষ্ট বুদ্ধি ধরা খেয়ে যাবে এই ভয়ে আসে না।তোমাদের বয়স হয়েছে।এখন তোমাদের মন ভোলান সহজ….“

মা যেন মূর্ছা খেলেন।বজ্রাহত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ।

“কি বললি তুই! আশার মনে দুষ্ট বুদ্ধি?”

আচমকা হাতে ধরা পায়সের টিপিন বক্সটা মেঝেতে ছুড়ে মারলেন।পুরো মেঝে জুড়ে পায়স ছড়িয়ে পড়লো।আমি অবাক দৃষ্টতে মায়ের দিকে চেয়ে আছি।দুদিনের পরিচিত একটা মেয়ের জন্যে মা আমার সাথে এমন করলেন!আমি যেন কিছুই ভাবতে পারছি না।একেবারে বাকরূদ্ধ হয়ে গেলাম।

মা কেঁদে ফেললেন।আঁচলে মুখ ঢেকে নিজের ঘরে গিয়ে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলেন।

“খুশি থাক তুই,খুশি থাক!আমি যাব না আশার কাছে।হল তো?মেয়েটার মনে দুষ্ট বুদ্ধি?কি খারাপ তোর চিন্তাধারা……ছিঃ!”

 

হই-হুল্লোড়ের মাঝে এবার রুম থেকে বাবাও বেরিয়ে এলেন।এসে আমাকে খুব বিশ্রী ভাবে বকে গেলেন।

“মেয়েটার মাঝে তুই কি খারাপি দেখেছিস?কি দুষ্ট বুদ্ধি আছে ওর মনে?বল!সামান্য একটু পায়েস দিয়ে আসলে কি এমন ক্ষতি হয় শুনি!সামান্য একটা বিষয় নিয়ে বুড় মায়ের সাথে হৈ চৈ করতে একটুও লজ্জা করলো না তোর!অসভ্য…জানোয়ার…”

 

বাবার মুখের উপর আমি আর কোন কথা বললাম না।উনারা দুজনেই এখন খুব রেগে আছেন।কথা বাড়ানো ঠিক হবে না।শুধু এইটুকু বুঝে নিলাম,মেয়েটা শুধু মাকে নয়,বাবাকেও কাবু করে ফেলেছে।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

আত্মহত্যা

Sourav Talukder

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক গৌতম বুদ্ধের অহিংস বাণী

MP Comrade

আমি আর বাবা

Maksuda Akter

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy