Now Reading
পুরানো তিমির [৫ম পর্ব]



পুরানো তিমির [৫ম পর্ব]

বাসার পরিস্থিতি তেমন ভালো ঠেকছে না।বাবা মা দুজনই আমার সাথে রাগ করে বসে আছেন।কোন উপায় না পেয়ে বিকেলের দিকে শেফাকে ফোন দিলাম।শেফা ফোন ধরে বলল, “কিরে কেমন আছিস?”

আমি সহজ গলায় উওর দিলাম, “ভালো আছি।তুই কেমন?তোর মেয়েটা ভালো আছে?”

শেফা গম্ভীর গলায় বলল, “তুই আমাকে তুই তুই করে বলছিস কেন?আমি তোর বড় বোন।এক মাস,দু মাস না,দুই বছরের বড়।আমার বিয়ে হল,বাচ্চা হল,তাও তুই আমাকে তুই করে বলিস?নাম ধরে ডাকিস?এটা খুবই বাজে কাজ আহাদ।এই মুহূর্ত থেকে আমাকে আপু বলে ডাকবি।আপনি করে সম্মান দিয়ে কথা বলবি,বুচ্ছিস?”

আমি জোর করে একটু হাসলাম।হাসতে ইচ্ছা করছে না।তবু পরিস্থিতির সাথে মানাতে মুখে হাসি ফুটানোর বৃথা চেষ্টা।অন্য সময় হলে শেফার সাথে আরও কিছুক্ষণ দুষ্টামি করা যেত।সেই ছোটবেলা থেকেই তার প্রবল দাবি সে আমার থেকে বয়সে বড়,তাই তাকে আপু ডাকতে হবে।সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে।এখনও এসব নিয়ে দুষ্টামি চলে।আমি বারবার ওকে তুই তুকারি করে আরও বেশি খেপাই।কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন।ফাজলামো করতে ইচ্ছে করছে না।ফোনের ওপাশ থেকে শেফা প্রায় চেঁচিয়ে বলল, “কিরে কথা বলছিস না কেন?ফোন হাতে নিয়ে গাধার মত বসে আছিস!

আমি শান্ত স্বরে বললাম, “ঝগড়া করতে ইচ্ছে করছে না এখন।দুষ্টামি রাখতো…!”

শেফাও এবার খেই হারিয়ে ফেলল।একদম শান্ত,লক্ষ্মী মেয়েটির মত কোমল গলায় বলল, “তোর কি হয়েছে রে?গম্ভীর হয়ে আছিস।মন খারাপ?”

“না,মন ভালো আছে।তোকে কিছু কথা বলা দরকার।মন দিয়ে শোন।“

“প্রেম টেমের ব্যাপার তো? না কি কোথাও কোন মেয়ে পছন্দ হয়েছে?আমাকে এবার ওয়কালতি করতে হবে এই তো।আমি এসব পারব না।বকশিশ কত দিবি সেটা বল আগে।তোর বউ তো আমার ভাবী হবে না।তার কাছ থেকে কিছু চেয়ে নিতে পারব না।উল্টো আমাকে দিতে হবে।যা হাতানোর তোর কাছ থেকে হাতাব।“

কথা শেষ করে শেফা খিলখিল করে হেসে উঠলো।আমাকে পেলেই ও বড্ড বেশি কথা বলে।আমার সাথে এক ঘন্টায় ও যে পরিমাণ কথা বলে,পুরো এক সপ্তাহেও এত কথা বলে কি না সন্দেহ।আমাদের বয়সের পার্থক্যটা খুব কম বলে দুজনের মাঝে হাস্যরস একটু বেশি হয়।ছোট বেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছি।খেলার সাথীও বলা চলে।

“শেফা!সব সময় এমন হাসিঠাট্টা আমার একদম ভালো লাগে না।বললাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলব মন দিয়ে শোন।আর তুই কি সব বকবক শুরু করেছিস?”

রেগে যেত আমার ভালো লাগে নি।তবু না রেগে পারলাম না।তারপর শেফা আর একবারও দুষ্টামি করে নি।চুপচাপ সবকিছু শুনে গেছে।আমি ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যতটুকু সম্ভব ওকে বুঝিয়ে বললাম।সম্পূর্ণ ঘটনা শুনে তার চোখ ছানাবড়া হল।শেফা বিস্ময়ে হতবাক।চোখ কপালে তুলে বলল, “তুই এসব কি বলছিস?”

“যা সত্যি তাই বলছি।এখন কি করা যায় সেটা বল।আমি কিছু বুঝতে পারছি না।“

“আমিও তো কি বলব বুঝতে পারছি না।আগামাথা কিছুই তো মাথায় ঢুকছে না।আচ্ছা,আমি কাল সকালে আসছি।তখন দেখি পরিস্থিতি বুঝে কিছু একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।“

 

শেফার সাথে কথা শেষ করে আমি বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।বাড়িটার কাছাকাছি গিয়ে কিছু চোখে পড়ে কি না দেখলাম।রাস্তার পাশের প্ল্যাটের সব দরজা জানালা বন্ধ।ঘরে কেউ আছে কি নেই তাও বুঝতে পারছি না।

বাড়িটার সামনে আরেকটু দূর হাঁটলেই বাজারের মুখ।এক কোণে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান।কলেজ জীবনে বন্ধুদের সাথে এখানে বসে আড্ডা দেয়া হত,চা খাওয়া হত।তাই দোকানির সাথে আমার খুব ভাব।উনার নাম হারুন।আমি হারুন ভাইর সাথে বসে কিছুক্ষণ গল্প করলাম।সাধারণ খোঁজ খবর নেয়া এই আর কি।মনে মনে ভেবেছিলাম,ঐ মেয়েটার কথা কিছু বলব।ঝগড়া ঝাটি উনারা কিছু শুনেন কি না,কি সমস্যা এইসব।সাধারণত চায়ের দোকান গুলোতে এলাকার যাবতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা বেশি হয়।জিজ্ঞেস করব করব করেও করা হয় নি।হঠাৎ করে মেয়েটার খবর নিলে কে না কে কি মনে করে বসে,এই ভয়ে আর মুখ খুলি নি।ইদানিং তাদের ঝগড়া ঝাটির আওয়াজও শুনি না।শুনলে হয়ত হারুন ভাই কে বলতে পারতাম, “ভাই কাল রাতে ঐ বাড়িতে বেশ হৈ চৈ শুনলাম।বিষয় কি?”

তখন কেউ কিছু মনে করতো না।এখন অকারণে মেয়েটার কথা এখানে এভাবে জিজ্ঞেস করতে পারি না।এমন কিছু করলে মানুষের সন্দেহের মুখে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

 

মেয়েটা বলেছিল, তারা বাড়ি যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়েছিল।এখন কেন জানি মনে হচ্ছে মেয়েটার কথা সত্যি।হয়ত তার স্বামী অসুস্থ বলে কিছুদিন ঝামেলা বন্ধ আছে।নিজেকে বারবার বোকা বোকা মনে হচ্ছে।মনের ভিতর একবার এই কথা ঘুরে, পরক্ষণেই মনে পড়ে অন্য কথা।কেমন যেন একটা বিভ্রান্তির মধ্যে আটকা পড়েছি।

 

বাসায় ফেরার পথে বাড়িটার চারপাশে আরেকবার চক্কর দিলাম।বরাবরের মত এইবারও ফলাফল শূন্য।বাসায় ফিরে নিজের ঘরে বসে অনেককিছু মেলানোর চেষ্টা করলাম।দক্ষ গোয়েন্দাদের মত বিভিন্ন দিক থেকে বিষয়টা নিয়ে ভেবে ভিন্ন ভিন্ন ধারনা নেয়ার চেষ্টা করছি।ভাবতে ভাবতে কখন সন্ধ্যা হল খেয়ালই করি নি।রাত বাড়ছে।সাথে বাড়ছে কালো কালো আঁধার কণা।আমার চোখে এখন সবকিছু ঐ আঁধারের মতই রহস্যময়…

About The Author
Ikram Jahir
Ikram Jahir
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment