Now Reading
পুরানো তিমির [৬ষ্ঠ পর্ব]



পুরানো তিমির [৬ষ্ঠ পর্ব]

শেফা এসে পৌঁছালো খুব ভোরে।আমি ভেবেছিলাম সে এসেই হুলুস্থুল কান্ড বাঁধিয়ে দিবে।না,এমন কিছু করে নি।তার পরিকল্পনা সুন্দর করে সাজান।দক্ষ দাবা খেলোয়াড়ের মত প্রথম চাল টা চেলে দিল।বাসায় এসেই মায়ের সাথে খুব ভাব করার চেষ্টা করছে সে।অনেকদিন পরে মাকে দেখতে এসেছে,কত সুন্দর সুন্দর কথা বলছে সে।মাকে কোন কাজ করতে দিচ্ছে না আজ।সব কাজ শেফা নিজের হাতে করবে।নাস্তা বানানো,ঘর ঝাড়ু দেয়া,টুকিটাকি পায়-পরিষ্কারের কাজ……।মা ভীষণ খুশি।বহুদিন পর মেয়েকে হাতের নাগালে পেয়ে নতুন পুরানো হাজার গল্প শুরু করেছেন।শেফাও লক্ষ্মী শ্রোতার মত মন দিয়ে শুনছে।চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।কথার ফাঁকে ঐ মেয়েটির কথা উঠে আসে কি না,মা তাকে কিছু বলেন কি না,এমন একটা সুযোগের অপেক্ষা করছে সে।শেফা বাড়ি আসলে সাধারণত আমার সাথেই বেশি কথা বলে।মায়ের সাথে সাধারণ খোঁজ খবর নেয়ার বাইরে গল্প-স্বল্প খুব কম হয় তার।মেয়ে আজ মায়ের সাথে মন খুলে গল্প করছে,আমি জানি,এই খুশিতে মা আজ অনেক গোপন কথাই বলে দিবেন।

 

বেলা বারোটার দিকে আমি বাজারে গেলাম।যাওয়ার পথে রাস্তার দ্বারে বাড়িটার দিকে একবার উঁকি দিলাম।আজ মেয়েটার ঘরের দরজা খোলা,দখিনের জানালাটাও মনে খুলে রেখেছে।আমি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে কানা চোখে ঘরের ভিতর কাউকে দেখা যায় কি না,তা দেখছি।উঁকিঝুঁকি মারতে গিয়ে বিপদে পড়ে গেলাম।ঘরের ভিতর একজনের সাথে আমার চোখাচোখি হয়ে গেছে।মধ্যবয়সী লোক,চোখে চশমা,মাথায় চুল কম।ঘরের ভিতর,দরজার কাছে বসে প্রত্রিকা পড়ছিলেন।আমাকে উঁকি মারতে দেখেই চশমার ফাঁকে চোখ বাঁকা করে এগিয়ে এলেন।দরজার দিকে এগিয়ে আসছে লোকটা।খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছে।বুঝতে পারলাম,মেয়েটার স্বামী।সে বলেছিল,দুর্ঘটনায় তার স্বামীর পা ভেঙ্গে গেছে।এখনো বোধ হয় ভালো হয় নি।লোকটা দরজার কাছে এসে গলা নামিয়ে বলল, “কাউকে খুঁজছেন?”

আমি থতমত খেয়ে গেলাম।কি বলব বুঝতে পারছি না।নিজেকে কোন রকম সামলিয়ে নিয়ে বললাম, “জ্বি……এটা কি ওমর ফারুক সাহেবের বাসা? সুনামগঞ্জে বাড়ি,শুনেছি এখানে একটা ক্লিনিকে কাজ করেন।“

“আপনি ভুল ঠিকানায় এসেছেন।এখানে ওমর ফারুক নামের কেউ থাকেন না।“

“ও……আচ্ছা…” আমি মুচকি হাসলাম, “তাহলে মনে হয় আমাকে ভুল ঠিকানা দিয়েছে।আমি লোকটার কাছে কিছু টাকা পাই।“

“সে কি! চেনা জানা ছাড়া কাউকে ধার দিলেন কেন?কত টাকা?” লোকটা বিস্মিত হলেন।

“তেমন বেশি না,হাজার দশেক হবে।ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লোকটা আমার সাথে মেসে থাকতো।তখন বিশ্বাস করে দিয়েছিলাম।তারপর চাকরি নিয়ে উনি এখানে চলে এলেন।বলেছিলেন টাকা পাঠিয়ে দিবেন।এখনো দেন নি।তাই খোঁজ নিতে এলাম।“

লোকটা মাথা নাড়িয়ে আফসোস করলেন।আমি বললাম, “যাই ভাই,আপনাকে বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত।“

“না না! ঠিক আছে।বিরক্ত হব কেন?”

 

আমি রাস্তায় নেমে পড়লাম।নিজের কান্ড-কারখানা দেখে নিজেই অবাক হলাম।এতসব মিথ্যা কথা হুরহুর করে একটানা অনর্গল বলে দিলাম? এমন একটা অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পড়ে একটুও ঘাবড়ে গেলাম না! নিজের কনফিডেন্স দেখে নিজের কাছেই অবাক লাগছে।নিজেকে এখন একজন দক্ষ অভিনেতা বলে মনে হচ্ছে।

লোকটাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।অমায়িক ব্যবহার।কথাবার্তায় মনে হয়েছে স্বচ্ছ সাদা মনের মানুষ।এমন একটা মানুষ অকারণে বউয়ের সাথে ঝগড়া করবে এমনটা হতে পারে না।মনের ভিতর আমার কেমন যেন একটা সন্দেহ উশখুশ করছে।মেয়েটা মিথ্যা বলছে না তো? মা যে ভাবে কথায় কথায় লোকটা কে জানোয়ার বলে ডাকেন,তাতে তো মনে হয়,মেয়েটা তার স্বামীকে মায়ের কাছে খুব খারাপ করেই উপস্থাপন করেছে।

 

বাজারের মুখে হারুন ভাইয়ের দোকানে গিয়ে বসলাম।কথার ছলে ঐ মেয়েটা বা তার পরিবার সম্পর্কে কিছু জানার চেষ্টা করব আজ।কি নিয়ে কথা তোলা যায় বুঝতে পারছি না।অনেকক্ষণ আমতা আমতা করে শেষমেশ কথা শুরু করে দিলাম।হারুন ভাইর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বললাম, “ভাই…মা বলেছেন,রাস্তার পাশের বাড়িটা থেকে প্রায় রাতেই হৈ চৈ শোনা যায়।এ বিষয়ে আপনি কিছু জানেন?”

মানুষ একজন ফিসফিস করে কথা বললে অন্যজনকেও ফিসফিস করে কথা বলতে হয়,এটাই নিয়ম।হারুণ ভাই আমার দিকে ঝুঁকে এসে গলা নামিয়ে বললেন, “এখন তো শোনা যায় না।আগে যেত।সেখানে একজন ব্যাংকার থাকেন,নাম আজিজুর রহমান।প্রায় রাতেই বউয়ের সাথে ঝগড়া হত।মাঝেমাঝে বউয়ের গায়ে হাতও তুলেন।ইদানিং অবশ্য তেমন কোন সাড়া শব্দ শুনি না।“

“ঝগড়া কেন হয় বা হত কিছু জানেন?”

“তেমন কিছু জানি না।তবে লোকমুখে কিছু কথা শুনি।“

“কি শুনেন?”

“লোকটা আমার দোকানে মাঝেমাঝে চা খেতে আসেন।খুবই ভালো মানুষ।একদম শান্ত,সরল মনের।এই দুনিয়ায় ভালো মানুষের কপালে অনেক দুঃখ থাকে।চালাক চতুর না হলে এই দুনিয়ায় সুবিধা করে চলা যায় না,পিছিয়ে পড়তে হয়।এসব লোককে ঠকানো খুব সহজ।রাস্তা-ঘাট,অফিস আধালত,হাট বাজারে সবাই এদের ঠকায়।শুনেছি লোকটার বউ না কি এসব নিয়ে বকবক করে।এমন সহজ সরল হয়ে কেন চলে এসব নিয়ে চিল্লাচিল্লি করে।“

“লোকটা সরল মানুষ হলে বউ পিটায় কি ভাবে?”

“ভাই,শান্ত মানুষ খ্যাপে গেলে ভয়ংকর হয়ে উঠে।এরা রাগে না,মাগার রেগে গেলে একদম শেষ…!!বউ সারাক্ষণ বকবক করলে তো মাথা গরম হবেই।”

“তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন,বউটাই আসল দুষ্ট?”

“বউরেও দোষ দিয়ে লাভ কি ভাই?সব মেয়েই তো চায় সুখে থাকতে।লোকটা ঠিক মত বাজার সদাই পর্যন্ত করতে পারে না।ভালো জিনিসের সাথে দোকানিরা খারাপ জিনিস মিশিয়ে দেয়।লোকেরা তাকে যা বুঝায় সে তাই বুঝে।ভাবে,একটা ,মানুষ অকারণে তার ক্ষতি করবে কেন?দোকানিরা ভুলিয়ে ভালিয়ে খারাপ জিনিস তার কাছে ভালো বলে চালিয়ে দেয়,কম টাকার জিনিসে বেশি দাম নেয়।অফিসে সবার প্রমোশন হয়,শুধু উনার হয় না।এসব নিয়ে অতিষ্ঠ হয়ে বউটা একটু চ্যাঁচামেচি করে আর কি।কাউকে দোষ দেয়া যায় না।“

“ও…আচ্ছা।জটিল সমস্যা।“

 

হারুন ভাইয়ের কাছ থেকে আর বেশি কিছু জানতে পারি নি।তবে যে টুকু জেনেছি তাও কম নয়।আমার কাছে দিন দিন যেন বিষয়টা আরও গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে।যত ঘাটাঘাটি করছি ততই ঘোলা হয়ে যাচ্ছে সবকিছু।একটা মানুষ সহজ সরল বোকা টাইপের হলে তার কি সংসার করার অধিকার নেই?বোকা বলে কি তাকে সব জায়গায় ঠকতে হবে?মানুষ গুলো কেন তাকে ঠকাবে?সামান্য নিজের সুবিধার জন্যে আমরা প্রতিনিয়ত অন্যের ক্ষতি করে বসে আছি।কিন্তু কেন? এইসব মানুষের বিবেক কি একটুও নড়ে উঠে না?

আর মেয়েটাকেই বা দোষ দিয়ে লাভ কি?সেও তো অন্যসব মেয়ের মত সাজান একটা সংসার চায়।মাথা ঝিমঝিম করছে।সবকিছু কেমন পেঁচানো।আমি এত সব সমস্যায় পড়তে চাচ্ছি না।বাবা মাকে নিয়ে ঢাকায় চলে যাব।আমি আর এই বিষয়ে পা বাড়াতে চাই না।

About The Author
Ikram Jahir
Ikram Jahir
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment