নারী শক্তি ও অধিকার

সংসার না চাকুরী? এক গোলক ধাঁধায় নারী

কেস স্টাডি-১
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করে চাকুরীতে ঢুকেছেন সাদিয়া জামান (ছদ্ম নাম)। মাঝারী ধরনের চাকুরী। বেতন খুব বেশি নয়, আবার খুব কম ও নয়। বাসায় সন্তানও আছে।বয়স দেড় বছর। মা এর কাছে রেখে আসেন। ৮ ঘণ্টা অফিসের পরও ঢাকা শহরের জামে লেগে যায় আরও ৩ ঘণ্টা। বাসায় ফিরে যখন শুনেন সন্তানকে সারাদিন তেমন কিছুই খাওয়াতে পাড়েন নি মা। চাপা অভিমান হয় মার প্রতি। আবার মায়াও লাগে। মায়ের ও বয়স হয়েছে। যে সময় রেস্ট নেবার কথা, সে সময় কিনা নিজের সংসার ফেলে তার সন্তানের দেখা শুনা করছেন। বাচ্চাটাও দিন দিন খুব জিদ্দি হয়ে যাচ্ছে। অসুখ তো লেগেই আছে। বাঁধা কাজের লোক পাওয়া এখন তো এক প্রকার অসম্ভব। আজ কাল আর কিছুই ভালো লাগে না সাদিয়ার। অফিসে সারাটা দিন মন খারাপ থাকে। কলিগদের দেখলেও রাগ লাগে। অথচ হাসি খুশি সাদিয়া এমন ছিল না। মাঝে মাঝে মনে হয় চাকুরীটা ছেড়ে দেই। কিন্তু এত কষ্ট করে পড়ালেখা করে তবে কি লাভ হল? সবাই কি বলবে? ঐ সংসার ই যখন করব তাহলে এত সময় আর টাকা খরচ করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের কি দরকার ছিল ? আবার বাচ্চাটার শারীরিক- মানসিক বিকাশের কথা চিন্তা করলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। আরেক টা বাচ্চা নেওয়ার কথা তো ভাবাই যায় না। সমাধান টা যে কি ভেবে পান না ।

কেস স্টাডি-২
রুবি আক্তার একজন উচ্চশিক্ষিত গৃহিণী ।বাচ্চার বয়স ২ বছর। স্বামী ভালো চাকুরী করেন। বেতন মোটা মুটি ভালো। তবে এই দুর্মূল্যের বাজারে একা মানুষ টাকে সংসার চালিয়ে নিতে খুব কষ্ট হয়ে যায়। পরিবারের বড় ছেলে। গ্রামে অসুস্থ বাবা মা কে টাকা পাঠাতে হয়। তবে রুবির সকল চাহিদা পূরণ করেন যথাসাধ্য । হয়ত বিলাসী জীবন দিতে পাড়েন না। রুবির খুব কষ্ট হয়। মনে হয় যদি একটা চাকুরী করতে পারতেন , তবে স্বামীকে কিছুটা হলেও তো আর্থিক ভাবে সাহায্য করতে পারতেন। নিজের হাতেও কিছু টাকা থাকত। নিজের বাবা মাকে ও আর্থিক ভাবে সাহায্য করতে পারতেন। কিন্তু, পরিবারে এমন কেও নেই যে এসে বাচ্চাকে রাখতে পারবে। কাজের লোককেও তো বিশ্বাস করা যায় না। সোশিয়াল মিডিয়াতে যখন দেখেন বান্ধবীদের চাকুরী জীবন। বাচ্চাও আছে তাদের। তখন মনে হয়, ওরা তো পারছে, তাহলে আমি পারছি না কেন? কি হল এত শিক্ষার? দিন দিন হতাশ হয়ে পরছেন। কেমন জানি মোটা হয়ে যাচ্ছেন । নিজের যত্ন টাও নেওয়া হয় না ঠিক মত। তবে কি তিনি একজন ব্যর্থ মানুষ?

 

উপরের দুটি ঘটনা বর্তমানের খুব সাধারণ । যা উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে প্রায়ই দেখা যায়।এছাড়াও বর্তমানে নারীদের আরও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। যেসব নারীদের সরকারি বা বদলি চাকুরী তাদের কষ্টটা আরও দ্বিগুণ। আবার যারা ব্যাংক বা মাল্টি ন্যাশনাল চাকুরীতে অনেক চাপের মধ্যে কাজ করেন তারা ঘরে –বাইরে কাজ করতে করতে ক্লান্ত, ছুটির দিনগুলোতে রেস্ট নিবে নাকি সামাজিকতা রক্ষা করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। শারীরিক মানসিক দুই চাপে পিষ্ট। আবার, যাদের স্বামীর সাথে ভালো সম্পর্ক নেই। চাকুরী না করলে তারা এক ধরনের নিরাপত্তা হীনতায় ভুগেন। অনেক পরিবার আবার নারীর আর্থিক , মানসিক প্রয়োজনীয়তাকে উপেক্ষা করেন।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমানে নারীর মানসিক স্বাস্থ্য এক ভয়ঙ্কর ঝুঁকির মধ্যে আছে। কারণ উচ্চশিক্ষিত নারীর সংখ্যা বাড়ছে ,কিন্তু নারী সহায়ক কর্ম পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। আর নারীর মানসিক অবস্থার উপর যেহেতু সন্তানের মানসিক অবস্থা নির্ভরশীল সেহেতু তারাও আছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। কারণ যে নারীটি নিজেকে নিয়ে খুশি নয়, সে সন্তান কে হাসি খুশি জীবন ধারণ কিভাবে শিক্ষা দিবে। যিনি নিজে এক গোলক ধাঁধায় ঘুরছেন তিনি সন্তান লালন-পালনের মত জটিল কাজকে কিভাবে উপভোগ করবেন। তাই এখনি উচিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে নারীকে সাহায্য করা। তার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা । যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের জন্য খুবই প্রয়োজন।
সুতরাং, এই সমস্যা সমাধানে এখনি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে-

 

রাষ্ট্রের দায়িত্ব :
১। রাষ্ট্রের অনেক বড় একটি ভূমিকা পালন করতে হবে নারীর এই মানসিক সুস্থতার জন্য। প্রথমত নারী বান্ধব আইন তৈরি করতে হবে।

২। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় এলাকায় এলাকায় ডে-কেয়ার তৈরি করতে হবে। ডে কেয়ার পরিচালনার শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি গড়ার জন্য নির্ধারিত কোর্স বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সেই সাথে আইন করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি আলাদা কক্ষ রাখতে হবে যেখানে বাচ্চা রাখার প্রশিক্ষিত আয়া, বা কাজের ফাকে ব্রেস্ট ফিডিং করানর সুযোগ, বিশ্রাম করার সুযোগ ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকবে।

৩। নারী বান্ধব কিছু কর্মক্ষেত্রের সুযোগ রাখতে হবে। যেমন, ৮ ঘণ্টা চাকুরীর সাথে সাথে শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কিছু ৪,৫,৬ ঘণ্টা কাজ করা যায় এমন পদের ব্যবস্থা রাখা যায়। যেন নারী তার সন্তানকে সময় দেবার পাশাপাশি নিজের যোগ্যতার ও সদ্ব্যবহার করতে পারে।

৪। নারীর মানসিক সেবা, নতুন মা-বাবা, মা চাকুরীজীবী দের পরামর্শ সেবা চালু করতে হবে।

আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় এ সব কিছু খুব বেশি বেশি মনে হলেও সরকার কে এটা করতেই হবে। কারণ সুন্দর একটি দেশের জন্য প্রয়োজন সুস্থ স্বাভাবিক জনগোষ্ঠী। আর,দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী এবং পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে তোলার কারিগর নারীর মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা ছাড়া তা কখনই সম্ভব নয়।

 

পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব

১।আমাদের দেশের মানুষের উপর সমাজের প্রভাব অনেক বেশি। এজন্য সামাজিক ভাবে নারীর এ সমস্যা সমাধানে একত্রে কাজ করতে হবে।

২। চাকুরীজীবী নারীদের সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে সর্বাধিক সহায়তা করতে হবে। কারণ সে পরিবারের জন্যই রোজগার করছে। সে বাচ্চা, সংসারকে কতটুকু সময় দিতে পারছে না, সেটা হিসাব না করে বরং চেষ্টা করুন তার কাজ একটু সহজ করতে। হয়ত তার বাচ্চাটাকে একটু সময় দিন, তার ঘরের কাজে একটু সাহায্য করুন। আর এসব করা সম্ভব না হলে অত্যন্ত সুন্দর একটা পরামর্শ দিন।

৩। যেসকল নারী বাচ্চা-সংসারের জন্য তাদের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিচ্ছেন তাদের প্রশংসা করুন । তারা যে সন্তান লালন পালনের মত জটিল একটা কাজ সফলতার সাথে করছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়তে তাদের সবটা দিচ্ছেন সে জন্য তাকে সম্মানিত করুন। “এত পড়ালেখা করে কি লাভ হল?! ‘ এসব বলে তাকে মানসিক ভাবে অসুস্থ করে ফেলবেন না। মনে রাখবেন এখনকার বাচ্চা পালতে, তাদের পড়ালেখা করাতে ও উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন আছে।
তাদের নিজেদের মত করে খরচ করার জন্য সামর্থ্য অনুসারে কিছু হাত খরচ নির্ধারণ করুন। এটা কিন্তু নারীর মানসিক প্রশান্তির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

নিজের প্রতি নিজের দায়িত্ব:

১। সব শেষে নারীর নিজের প্রতি নিজের দায়িত্বটাই কিন্তু সবচেয়ে বেশি। নিজেকে ভালবাসুন। নিজের যত্ন নিন । ব্যায়াম করুন। জীবন কে উপভোগ করুন। চাকুরী আর সংসার যেটাই করুন, ভালোবাসার সাথে করুন। আর জীবনে যা পেয়েছেন তার জন্য সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিন।

 

২। অভিমান না করে, সুন্দর ভাবে পরিবারের সবার কাছে সাহায্য চান। পরিবারের পরামর্শ গুলো সহজ ভাবে নিন। নিজে একা সব না করে স্বামী, সন্তান, পরিবারের  অন্যান্য সদস্যদের মাঝে কাজ ভাগ করে দিন।

৩। গৃহিণী  যারা মনে করেন এত পড়ালেখা করেও মা-বাবা কে আর্থিক ভাবে সাহায্য করতে পারছি না, বা সমাজের জন্য তো কিছুই করতে পারছি না। তারা মনে রাখবেন টাকা-পয়সা দিয়েই সব হয় না। বাবা-মার নিয়মিত খোজ নিন, তাদেরকে ভালবাসুন।দেখবেন কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করার চাইতেও এটা অনেক বেশি প্রয়োজন তাদের। সমাজের বিভিন্ন ভালো কাজেও অংশ নিতে পাড়েন। যেমন- বন্যার্তদের সাহায্যে টাকা তুলেন, অসুস্থ আত্মীয়দের দেখতে যান, অনলাইনে ভালো কাজের জনমত গড়ে তুলেন। দেখবেন কাজ করে শেষ করতে পারছেন না।

৪। এছাড়াও গৃহিণীরা বিভিন্ন প্রফেশনাল কোর্স, মাস্টার্স কোর্স, বিভিন্ন ছোট খাট ট্রেনিং, ফ্রিল্যন্সিং, ছোট ব্যবসা, লেখা লেখি শুরু করে দিতে পাড়েন। এতে সময় ও ভালো কাটবে, আবার বাচ্চারা একটু বড় হয়ে ফুল টাইম আয়ও শুরু করে দিতে পারবেন।

৫। আর নারীদের কেই নারীর সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে হবে  । আপনার পাশের নারীটিকে বা পরিবারের চাকুরীজীবী বা গৃহিণী  নারীটিকে হিংসা না করে সাহায্য করুন। তাহলে নারীকে পুরুষ ও রাষ্ট্রের সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।

 

আসুন , সবাই মিলে মানুষ গড়ার কারিগর নারীকে সাহায্য করি। তবেই গড়ে উঠবে সুন্দর পরিবার,সমাজ ও দেশ।

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

পতিতার অধিকার চাই

Md.Biplab Hossain

নারীর ক্ষমতায়ন

Shakib Hassan

প্রতিপক্ষের মুখ বন্ধ করে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ৯টি উক্তি

MP Comrade

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy