Now Reading
রহস্য গল্প: কেওক্রাডংয়ের দেশে। ভুতের আবার খুন!



রহস্য গল্প: কেওক্রাডংয়ের দেশে। ভুতের আবার খুন!

ছোটখাটো ছিমছাম হোটেল কাম কুঁড়ে ঘরটায় ঢুকেই অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করলো মনে। এয়ারকুলারের মৃদু শব্দটা ছাড়া চারপাশ চুপচুপে নিরব! ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম আমি।
সকালটা হবে নিরব আলোয় আলোকিত, সন্ধ্যেটা নামবে ঝিঁঝিঁর ডাকের সাথে তাল মিলিয়ে ঝুপ করে,টুপ করে ওঠে পড়বে মস্ত থালার মতো একটা চাঁদ!
একজন লেখকের জীবনে আর কি চাই?
ওহো! একটু ভুল হলো।
 সাগরিকা পাশে থাকলে মন্দ হতোনা অবশ্য। মৃদু বাতাসে ওর আঁচল উড়ে যেতো পতপত করে, আমি সেই শব্দে গল্পের লাইন খুজে বেড়াতাম নিরবে!
অফিসের চাপ সামলাতে সামলাতে মনটা আকুপাকু করছিলো গত কয়টা মাস। তিনদিনের ছুটি পেতেই তাই দৌড়ে পালালাম ঢাকা থেকে। পুরোটা রাত বাসে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে সাত সকালে এসে পৌছুলাম বান্দরবান শহরে।
 তারপর সারাটা দিন চাঁন্দের গাড়ির লক্কর ঢক্কর সেরে বগা লেকের এই কুঁড়েতে এসে ঠাই নিয়ে তবেই শান্তি!
     দুদিন দুরাতের জন্য গুনতে হয়েছে হাজার খানেক টাকা! তাতে কি?
এমন প্রাকৃতিক শান্তির জন্য লাখ খানেক ঢালতেও আমার হাতে আটকাতো না।
ভরপেট খেয়ে অনেক দিন পর এমন নরম ঘুম দিলাম। বয়স কম তারপরও এই বয়সেই গ্যাস্ট্রিক বাঁধিয়ে বসেছি আমি, প্রতি রাতেই ব্যাথা ওঠে।
  তাইতো আমার বালিশের তলায় একপাতা করে সারজেল, রেনিটেড থাকাটা বিচিত্র কিছু নয় আজকাল। অথচ আজ রাতে ঘুমই ভাঙলোনা একবারের জন্যও!
এজন্যই বোধহয় ডাক্তাররা পথ্যের সাথে সাথে মানসিক ব্যাপারটায়ও জোর দেন!
খুব ভোরে গাইড নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বগা লেকের পথে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা। আজ একটু লেখালেখি করবো ভেবে জলদি শুয়ে পড়লাম।
মাঝ রাতে ঘুমটা ভেঙে গেলো!
বাইরে ক্রমাগত ঠুন ঠুন করে বিশ্রী একটা শব্দ হচ্ছে! এত রাতে এ কেমন বিরক্ত বাপু!!
ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে এসেই থমকে গেলাম আমি।
আকাশে মস্ত একটা রূপালি থালা, চারদিকে যেনো স্বর্গীয় সোনালি আভা ছড়িয়ে আছে!
ঠুন ঠুন ঠুন..!
একটু থেমেছিলো,এখন বিরক্তিকর শব্দটা আবার শুরু হলো।
    “এমন সৌন্দর্য্য ফেলে কোন বেরসিক করছে এই কাজ?” চোখ কুঁচকে সামনে তাকালাম। সবই আলোকিত কিন্তু পরিষ্কার নয়। মোলায়েম চাঁদের আলোয় সবটুকু ঢাকা।
কুঁড়ে থেকে চাদরটা এনে গায়ে জড়িয়ে সামনে এগুলাম। শব্দটার কোন বিরামই নেই। হচ্ছেটা কি এত রাতে!
সামনে এগুলাম। আস্তে আস্তে তীব্রতর হচ্ছে শব্দটা।
   “ওইতো, একটা বড় জারুল গাছ দেখা যাচ্ছে।
ঠুন ঠুন ঠুন…..
শব্দের তালে তালে নড়ছে গাছটাও!”
“এত রাতে গাছ কাটছে! চোরাকারবারি নয়তো?”
      ভাবনাটা মাথায় আসতেই দমে গেলাম একটু। পাহাড়ি এলাকার এসব চোরাকারবারিরা খুব ডেঞ্জারাস হয় শুনেছি!
     “দেখে ফেললে আবার প্রমান লুকোবার জন্য খুনখারাবি করে ফেলবেনা তো!”
সাহস সঞ্চয় করে আর একটু এগুলাম। গাছের গোড়ায় মানুষের অবয়বটা এখন স্পষ্ট প্রায়। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলাম,
– “এই কে ওখানে অত রাতে? কি হচ্ছেটা কি এখানে!”
শব্দটা থেমে গেলো। ছায়া টা হাতের কুঠার চালানো থামিয়ে আমার দিক পেছন ফিরে এক হাত কোমরে রেখে সোজা হয়ে দাড়িয়েছে!
 আবারো চিৎকার দেবো কিনা ভাবছি, পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে সাই করে ঘুরলাম। আমার কুঁড়ের ম্যানেজার ঘুসং চাকমা হেটে আসছে দ্রুত।
-“ছ্যার! কি করছিন কি আপনি? এত রাতে বাইরি আসিছেন কেনো?”
জবাব দিতে যাবো এমন সময় পেছনে উত্তপ্ত ধমক শুনতে পেলাম! জারুল তলায় এখন দুজনের মানুষের আবছা ছায়া! “পাশের লোকটা কোথা দিয়ে এলো দেখলামনা তো!”
“এ্য গনশা, তুলি লে যা এরে এহানথুন। সূয্যি আওয়ার আগি ফিনিশ করি দে। বড় বেশি বারিছে।”
      আমার পাশ থেকে ঘুসং জোর গলায় বলে ওঠলো ওদের লক্ষ্য করে। বিড়বিড় করে ওদের নিজস্ব ভাষায় কিছু বললো,গালি দিলো সম্ভবত।
আমার দিকে তাকালো ম্যানেজার। দুহাত কঁচলাচ্ছে, মুখে তেলতেলে শীতল হাসি একটা!
– “ছ্যার এই শীতে বেশিক্ষন থাকতি নেইকো, যান ঘুমানগে, আর অন্ধকারে কি দিখতে কি দিখিলেন কারোক বলিয়েননা।”
         লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে কি যেনো ঝিলিক মেরে ওঠতে দেখলাম আমি। অজানা একটা ভয় ঢুকি ঢুকি করছে ভেতরে। লোকটা কি কিছু ইঙ্গিত করতে চাইলো? খারাপ কিছু কি ঘটতে চলেছে…..!
পেছনে চিৎকার শুনতে পেলাম তখনই। একজন অন্যজনকে মাটিতে চেপে ধরে রেখেছে!
      চাঁদের আলোয় স্পষ্ট ঝিলিক মারতে দেখলাম ওপর দিকে তোলা দুহাত লম্বা চাপাতি টা! এক হাতে দুহাত চেপে ধরে রেখে,চাপাতি সহ হাতটা ঝপ করে নিচে নামিয়ে আনলো লোকটা!!
    মুখ ফসকে চিৎকারটা বেরিয়ে এলো আমার। ছুটতে শুরু করলাম…
চিৎকার করতে করতে কোনদিকে যাচ্ছিলাম জানিনা, একটা কুঁড়ের দরজায় সজোরে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েই কুঁকড়ে গেলাম আমি। তারপর আর কিছুই মনে নেই।
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি মস্তবড় একটা জাদরেল চেহারা ঝুকে আছে আমার উপর! গায়ে পুলিশের পোশাক!
বুকের একপাশে লিখা, ক্যাপ্টেন ইয়ান চাকমা!
আমাকে চোখ খুলতে দেখেই লোকটা কথা বলে ওঠলো,
– মশায় তো তাজ্জব করে দিলেন! তিন বছর আগের খুনিকে ধরিয়ে দিলেন,তাও সজ্ঞানে না অজ্ঞানে! কি করে করলেন বলুনতো?
সিআইডির কোন ডিপার্টমেন্টে আছেন?”
অবাক আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি। কি বলছে কিছুই বুঝতে পারছিনা!
আশপাশের অনেকজনের কথা থেকে যা বুঝলাম,
   “প্রায় তিন বছর আগে ঘুরতে এসে এক পর্যটক আততায়ীর হাতে খুন হয়। অনেক খুজেও পুলিশ কোনো হদিস করতে পারেনি। গত রাতে চিৎকার করতে করতে আমি পাশের পুলিশ ক্যাম্পে ঢুকে পড়েছিলাম।
বার বার করে খুন, ঘুসং, গনশা আরো কি কি নাকি বলছিলাম!
তা থেকেই ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে নতুন করে পুলিশের সন্দেহ হয়।
খানিক জেরা করতেই ঘুসং হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে! গত তিন বছর ধরে অজানা এক ঠুন ঠুন শব্দে লোকটার নার্ভ নাকি এমনিতেই শেষ! সে এসব থেকে মুক্তি চায়!
কিন্তু রহস্যের ব্যাপার হলো, ওর হাট ভাড়া নেয়া বাদে আমাদের আর কথাই হয়নি,তাছাড়া ঘুসং হলফ করে বলেছে গত রাতে সে বাইরে বের ই নাকি হয়নি! আমি তবে এত কিছু কি করে বললাম?
পরদিনই তল্পতল্পা গুটিয়ে প্রায় ভুতে তাড়া খাওয়া মানুষের মতো ঢাকায় পালিয়ে এলাম।
রহস্যটা রহস্যই রয়ে গেলো আমার কাছে!
থাকুক, ওটা নিয়ে আর ভাবতেও চাইনা আমি।
প্রকৃতি রহস্যময়।
সে তার চারপাশে ঘটনা ঘটায়,
 আবার অদৃশ্য একটা চাদরে তা জড়িয়ে রাখে!
 আমরা তো নগন্য সন্তান তার। প্রকৃতি নিজে না চাইলে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটন যে নগন্য মানুষের সাধ্যের বাইরে!
About The Author
Maksuda Akter
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment