Now Reading
পুরানো তিমির [৭ম পর্ব]



পুরানো তিমির [৭ম পর্ব]

বাড়ি ফিরে শেফার কাছে জানতে চাইলাম সে কি তথ্য উদ্ধার করতে পেরেছে।হতাশ কন্ঠে সে বলল,কোন তথ্যই সে উদ্ধার করতে পারে নি।মার সাথে তার আশা নামের মেয়েটা কে নিয়ে অনেক কথা হয়েছে।শেফা জিজ্ঞেস করেছিল, “মেয়েটাকে তার স্বামী মারে কেন?”

মা বললেন, “জানি না।“

শেফা বলল, “সে কি কথা?তুমি কখনো জানতে চাও নি?”

“চেয়েছি।মেয়েটা বলতে চায় না।ওসব কথা তুললে ও শুধু কাঁদে।“

 

বিকেলে বাজারে হারুন ভাইর মুখে যা শুনলাম,সব কিছুই শেফা কে বলেছি।দু’জনেই চিন্তিত আমরা।কিভাবে কি হচ্ছে ধরতে পারছি না।

আমরা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, বাবা মাকে ঢাকায় নিয়ে যাব।ঢাকায় নিতে হলে কম না হলেও দু’মাস সময় লাগবে।ভালো একটা বাসা খুঁজতে হবে,বাসার জন্যে কিছু আসবাবপত্র কিনতে হবে,আরও কত কাজ!

সিদ্ধান্ত হল,ঢাকায় না নেয়া পর্যন্ত বাবা মাকে শেফা তার কাছে নিয়ে রাখবে।

 

মা কে আমরা আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানালাম।বাবাও সামনে ছিলেন।আমাদের কথা শুনে মা কিছু না বলে বাবার দিকে তাকালেন।বাবা গম্ভীর।কিছুক্ষণ চুপচাপ কি যেন ভেবে নিলেন।তারপর বললেন, “আমরা তো এখানে ভালোই আছি।হঠাৎ আমাদেরকে তোর কাছে নিতে হবে কেন?”

আমি কিছু বললাম না।বাবার সামনে আমি বিশেষ জোর গলায় কথা বলতে পারি না।ভয় না কি সম্মান বোধ জানি না।বাবাদের কাছে মেয়েরা একটু বেশি আদর পায়।তাই শেফা বাবার সামনে ভালো ভাবেই আলাপ চালাতে পারে।আমার পাশে দাঁড়িয়ে শেফা বলল,”বাবা, তোমাদের বয়স হয়েছে।এই সময়ে কখন কি হয় বা কি দরকার হয় ঠিক নেই।আল্লাহ না করুক,কিছু একটা হয়ে গেলে তোমাদের তখন দেখবে কে?”

বাবা আগের চাইতে আরও গম্ভীর গলায় বললেন, “দেখো…আমরা এখানে বেশ ভালোই আছি।আমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না।আমাদের অসুবিধা হলে তো আমরা তোমাদের জানাতাম।তোমরা ছাড়া আর কাওকে বলার মত তো আমাদের কেউ নেই।“

শেফা বলল, “তারপরও বাবা…! তোমাদের এখানে একা রেখে যেতে আমাদের খারাপ লাগে।“

বাবা বললেন,”বেশ নিতে যখন চাও আমরা না হয় তোমাদের সাথে গেলাম।আমি হয়ত ঠিকি মানিয়ে নিব,কিন্তু তোমাদের মা এখান থেকে যেতে চাচ্ছে না।সে তোমাদের কাছে গিয়ে কতটা ভালো থাকবে জানি না।“

 

মা একেবারে মনমরা হয়ে গেলেন।তবে কিছু বললেন না।বাবা মুখফুটে সম্মতি দিয়ে দিয়েছেন।তিনি আর এর মাঝে প্রতিবাদ করতে পারেন না।তিনি শুধু গভীর করে একটা দম ফেললেন।আফসোসের গভীর নিঃশ্বাস।

আমি আর শেফা বেশ খুশি।ভেবেছিলাম,মা বেঁকে বসবেন।এত ভালোয় ভালোয় তারা রাজি হয়ে যাবেন ভাবি নি।রাতেই আমরা অনেকক্ষাণি গোছগাছ সেরে নিলাম।দরকারি জিনিসপত্র ভালো করে গুছিয়ে কাজ অনেকটা এগিয়ে রাখলাম।

 

রাত যখন গভীর হল,সেই দিন রাতে,সেই পুরানো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।বহুদিন,বহু সময় পর আশা আর তার স্বামীর মাঝে ঝগড়া বেঁধেছে।মা জেগে উঠলেন।সাথে বাবাও।মা অস্থির হয়ে এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছেন।বাবাও চিন্তিত।তবে তিনি এতটা অস্থির হন নি।বিছানার এক কোণায় হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে আছেন।আমি আর শেফা আমার ঘরে বসে ভাবছি কি করা যায়।

ঝগড়ার বেগ আরও বাড়লো।মেয়েটার কান্না শোনা যাচ্ছে।এমন সময় মা ছুটে এসে বললেন, “আহাদ……আহাদ,আশাকে মারছে।জলদি যা,জলদি যা ওকে বাঁচা।“

মা পাগলের মত হয়ে গেলেন।শেফা মাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছে।এমন পরিস্থিতি দেখে আমি হতভম্ভ হয়ে গেলাম।মা’র এমন অবস্থা দেখে শেফাও কেঁদে দিল।খুব ভয় পেয়ে গেছে সে।

শেফা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “যা না আহাদ,একবার দেখে আয়।মা কেমন করছেন।কি না কি হয়…আমার খুব ভয় করছে।“

“তোর মাথা ঠিক আছে?” আমি একটু রেগে গেলাম, “আমি সেখানে যাব কেন?”

“মাকে শান্ত করতে হলেও যেতে হবে একবার।মা কেমন যেন করছেন।“

আমি মাকে শান্ত করার জন্যে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।ততক্ষণে ঝগড়া প্রায় থেমে এসেছে।দরজা দিয়ে বের হতে যাব,এমন সময় মা এসে বললেন, “থাক আহাদ,যেতে হবে না।ঝগড়া শেষ।“

আমি কিছুক্ষণ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।কি করবো বুঝতে পারছি না।শেফা মাকে নিয়ে রুমে গেল।কড়া ঘুমের ঔষধ দিয়ে মাকে ঘুমিয়ে রাখলাম সারারাত।মা ঘুমালেন,কিন্তু আমি আর শেফা এক মুহূর্তের জন্যেও ঘুমাতে পারি নি সারারাত।মার আচরণ দিন দিন অদ্ভূত হয়ে যাচ্ছে।

 

সকালে যাওয়ার সময়,সব কিছু ঠিকঠাক করার পর মা বেঁকে বসলেন।তিনি যাবেন না।কাঁদতে কাঁদতে  বললেন, “আমি  চলে গেলে আশাকে মেরে ফেলবে।“

আমরা মাকে অনেক বুঝানোর চেষ্টা করলাম।শেফা বলল, “যা হবার তা হবেই।মেরে ফেললে তুমি কি কিছু করতে পারবে?কাল যে তাকে মেরেছে তুমি কি কিছু করতে পেরেছ?পারো নি।ওর কপালে যা আছে তাই হবে।চল তো মা।“

মা তবু শুনলেন না।বললেন, “আমি আশার সাথে দেখা না করে যাব না।“

 

অনেকটা বাধ্য হয়েই শেফাকে মেয়েটার বাড়িতে পাঠালাম ডেকে আনতে।শেফা সেই বাড়িতে ঢুকলো।আমি বাড়ির কাছাকাছি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।

কিছুক্ষণ পর শেফা বেরিয়ে আসলো।তবে একা।পেছনে তাকিয়ে দেখলাম,মেয়েটা তার সাথে আসে নি।আমি কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কি ব্যাপার,আসে নি?”

“বাসায় কেউ নেই।দরজায় তালা দেয়া।“

“আশপাশে কাউকে জিজ্ঞেস করিস নি?”

“করেছি।কেউ জানে না।কাউকে বলে যায় নি।পাশের বাসার একজন বলল,তারা না কি খুব ভোর বেলায়  বের হয়েছে।“

 

আশাকে পাওয়া যায় নি শুনে মা আরও হতাশ হলেন।অনেকটা জোর জবরদস্তি করেই মাকে গাড়িতে তুলতে হল।

About The Author
Ikram Jahir
Ikram Jahir
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment