অন্যান্য (U P) সাহিত্য কথা

পুরানো তিমির [৮ম পর্ব]

ঢাকায় ফিরে, বিশ দিনের মাথায় আমি ভালো মানের একটা বাসা ঠিক করলাম।সময় করে কিছু ভালো মানের আসবাব পত্র কিনে নিলাম।কিছু কেনাকাটা বাকি আছে।সেগুলো শেষ হলেই বাবা মাকে মোটামুটি সামনের মাসে ঢাকায় নিয়ে আসা যাবে।

 

সবকিছু ভালোই এগুচ্ছিল।একদিন বিকেলে শেফা ফোন করে বলল,মা’র অবস্থা ভালো না।তিনি আশার জন্যে খুব চিন্তিত।রাতে ঘুমের ঘোরে প্রলাপ বকেন।আমি বিশেষ চিন্তিত হলাম না।ধীরেধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলে মনের ভিতর কেন যেন একটা জোর পাচ্ছি।জানি না ঠিক হবে কি না।তবে মনের ভিতর আত্মবিশ্বাস ধরে রাখতে দোষ কি?

শেফাকে বললাম মাকে যেন ভালো মানের  ডাক্তার দেখায়।পরদিন সকালে শেফাকে ফোন করে জানতে পারলাম মাকে ডাক্তার দেখানো হয়েছে।শরীরের অবস্থা যে খুব বেশি ভালো এমনটা নয়।শেফা বলল,তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে ডাক্তার বলেছেন,”উনাকে যে ভাবেই হোক দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে হবে।প্রেশার ঠিক রাখা জুরুরী।রাতে যেন ভালো ঘুম হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।“

 

দিন কয়েক পরে শেফা জানালো মায়ের অবস্থা খুব বেশি খারাপ।ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি।একটা ক্লিনিকে ভর্তি করান হয়েছে।আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মায়ের কাছে গেলাম।আমি যখন পৌঁছাই মা তখন ঘুমাচ্ছিলেন।আমি মায়ের মাথার কাছে গিয়ে বসলাম।কিছুক্ষণ পর মা প্রলাপ বকতে শুরু করলেন……”আহাদ…বাবা আহাদ,আশাকে মেরে ফেলবে,জলদি যা,ওকে বাঁচা…”

আমি চুপচাপ মায়ের কপালে হাত রেখে বসে আছি।

আরও কিছুক্ষণ পর…”আশা…আশা,আমি কাল পায়স রাঁধব,চলে আসিস।“

তারপর আবার নিরবতা।ঘড়ির কাটায় কিছু পার হল।আবার প্রলাপ, “দরজাটা কেউ খুলতো,আশা এসেছে।মেয়েটা কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবে! কেউ গিয়ে দরজাটা খুল…”

 

আমি আর মায়ের কাছে বসে থাকতে পারলাম না।উঠে চলে এলাম বারান্দায়।বারান্দায় এসে দেখি,শেফা এক কোণায় বসে মুখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদছে।

“কি হয়েছে শেফা! কাঁদছিস কেন?”

আমি কাছে যেতে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, “আহাদ রে…মা তো মনে হয়……’

“কি সব যা তা বকছিস! ডাক্তার ঔষধ দিচ্ছেন।সব ঠিক হয়ে যাবে।“

আশার কান্না বন্ধ হচ্ছে না।মুখে হাত চেপে আরও কিছুক্ষণ কাঁদলো সে।তার কান্না দেখে আমারও কেমন চোখ ভার ভার লাগছে।আমার পক্ষে আর এখানে থাকা সম্ভব নয়।।আমি ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে নেমে এলাম পথে।বাইরে ভীষণ কড়া রোদ।গা পুড়ে যাচ্ছে।এমন মধ্য দুপুরে আমি সোজা হাটা দিলাম।আমিও যেন ঘোরে ডুবে যাচ্ছি।এমন কড়া রোদ আমার অনুভূতিতেই লাগছে না।কি করছি বা কি করব কিছুই ভেবে উঠতে পারছি না।

 

বাইরে খনিক ঘুরাঘুরি করে ক্লিনিকে ফিরে এলাম।এসে দেখি মা জেগে উঠেছেন।খাবার খাচ্ছেন।মাকে এখন বেশ সুস্থ লাগছে দেখে আমি একটু স্বস্তি পেলাম।মার পাশে বাবাও বসে আছেন।শেফা এখন আর কান্না করছে না।বেশ চঞ্চল হয়েছে।আমরা সবাই যখন মা সুস্থ হয়ে গেছে ভেবে খুশি,মা আমাকে ডেকে তখন বললেন, “আহাদ তোর অফিস নেই?এখানে কেন এসেছিস?”

“তোমাকে দেখতে এসেছি।“

“আমাকে দেখার কি আছে?সেদিনই না বাসা থেকে গেলি।এত ঘন ঘন দেখতে আসার কি আছে!”

“তুমি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলে মা।তাই তোমাকে দেখতে এলাম।“

“কে বলল আমি অসুস্থ?এসব এদের বাপ মেয়ের চালাকি সব।আমাকে খামোখা এখানে এনে শুইয়ে রেখেছে! তুই চলে যা।“

আমি একটু ধাক্কা খেলাম।মা আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছেন কেন বুঝতে পারছি না।হয়ত আমার উপর খুব রেগে আছেন।আমি মুখে হাসি টেনে বললাম, ‘কেন মা,আমি আসাতে তুমি খুশি হও নি?”

“না হই নি।তুই থাকলে আশা আসতে পারে না।ও লজ্জা পায়।মেয়েটা ভীষণ লাজুক।অনেকদিন তো আমার কাছে ছিলি,এবার কাজে যা,অফিস কর।আমি মেয়েটাকে অনেক দিন দেখি না।“

 

মায়ের কথা শুনে শেফা যেন মূর্ছা খেল।আঁচলে মুখ চেপে পাশের ঘরে চলে গেল সে।বাবাও উঠে চলে গেলেন নিঃশব্দে।আমি নির্বাক মুখে বোকার মত চেয়ে আছি।মা কেমন অদ্ভূত আচরণ করছেন।তবে কি শেফা যা বলেছে তাই ঠিক? মার কি সত্যি সত্যি মাথা খারাপ হচ্ছে!

 

চারদিকে অসহায়ের মত কোন উপায় না পেয়ে,সন্ধ্যা বেলায় বেরিয়ে পড়লাম আশার খোঁজে।মাকে শান্ত করতে হলে মেয়েটাকে খুব দরকার।আশার বাসায় গিয়ে দেখলাম দরজায় তালা দেয়া।আশপাশের মানুষকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তারা অনেকদিন বাসায় আসে নি।আমি মনে মনে ধারনা করলাম তারা তাদের গ্রামের বাড়িতে গেছে।গ্রামের বাড়ির ঠিকানা আমার জানা নেই।আশপাশের কেউই তাদের ঠিকানা জানে না।যে ভাবেই হোক ঠিকানাটা যোগার কতে হবে।মেয়েটা কে খুঁজে বের করতেই হবে।

 

অনেক রাত পর্যন্ত আমি বাইরে ছিলাম।ঠিকানাটা যোগার করার অনেক চেষ্টা করেছি।পারি নি।শেষমেশ ব্যর্থ সৈনিকের মত ক্লিনিকে ফিরে এলাম।মা তখনও জেগে ছিলেন।বাবা বারান্দায় বসে আছেন শেফার দুই বছরের বাচ্চা কে কোলে নিয়ে।আমি ঢুকতেই মা বললেন,”তুই এখনো যাস নি!”

“তুমি আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছ মা?আমার চেয়েও ঐ মেয়েটা তোমার কাছে বেশি আপন হয়ে গেল?”

“তাড়িয়ে দিচ্ছি কোথায়?অনেক দিন তো আমার কাছে ছিলি।কিছুদিন অফিস করে আবার আসবি।এখন চলে যা।আশা প্রতিদিন দরজায় এসে,তুই আছিস জেনে ফিরে যায়।আসতে পারে না লজ্জায়।“

“মেয়েটা এখানে আবার কখন এলো?আমরা কেউ তো তাকে দেখি নি।“

“তোরা দেখবি কোত্থেকে?ও রোজই আসে।“

 

পরক্ষপণেই আমার মনে পড়লো,আমি  তো মেয়েটাকে চিনি না।কখনো দেখিও নি।সে এখানে আসলেও আমি বুঝতে পারব না।আমি শেফা কে বাবার কাছে পাঠালাম।বাবা মেয়েটা কে চিনে,মেয়েটা এখানে আসলে বাবা নিশ্চয় জানবেন।

শেফা বাবার কাছ থেকে ফিরে এসে জানালো,বাবাও মেয়েটাকে এখানে আসতে দেখেন নি।

ডাক্তার কে বিষয়টা জানালাম।তিনি বললেন মার হেলুসিনেশন হচ্ছে।

শেফা আরও ভয় পেয়ে গেল।আমার হাত চেপে ধরে বলল,”আহাদ…মার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে যাবে না তো!”

“আরে দূর…এসব কি বলছিস?চিন্তায় থাকলে সবারই এমন কম বেশি হয়।“

 

শেফাকে সান্ত্বনা দিয়ে আমি ঘুমাতে গেলাম।কিন্তু আমি যেন নিজেই সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছি না।চোখের পাতায় এক ফোঁটা ঘুমও আসছে না।মার কি সত্যিই হেলুসিনেশন হচ্ছে? না কি মেয়েটি মায়ের সাথে গোপনে যোগাযোগ রাখছে! মেয়েটার উদ্দেশ্য কি!

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

সাইকো গল্প: কথোপকথন

Maksuda Akter

গোধূলি লগন । পর্ব – ০১

saiful antur

কেন এই পতিতালয় ?

Md.Biplab Hossain

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy