Now Reading
মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা



মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা

রাণী সপ্তম ক্লিওপেট্রা ছিলেন মিশরের সর্বশেষ রাণী এবং ফারাওদের শেষ সদস্য। তিনি ছিলেন রূপেগুনে অনন্যা । তাঁর রূপের আলোচনা শুধু যে মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিলো তা কিন্তু না।  তাঁর সৌন্দর্যের আলোচনা ছিলপুরো আফ্রিকা আর ইউরোপ জুড়ে। ক্লিওপেট্রা’র পুরো নাম “সপ্তম ক্লিওপেট্রা ফিলোপাটর”। মিশরীয় হলেও  তিনি ছিলেন গ্রীক বংশভূত প্রাচীন মিশরের টলেমি বংশের সদস্য। গ্রেট আলেক্সান্ড্রিয়া’র মৃত্যুর পরে তারেক সেনাপতি রাজ্যের দায়ীত্বভারগ্রহণ করেন এবং টলেমি বংশ স্থাপন করেন। তিনি খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ৬৯-৭০ সালে মিশরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।তার মাতার নাম “পঞ্চম ক্লিওপেট্রা” এবং তার পিতা ছিলেন “দ্বাদশ টলেমি অলেটেস”। খ্রীষ্টপূর্বাব্দ ৫১ সালে তার পিতা দ্বাদশ টলেমি অলেটেস’র স্বাভাবিক মৃত্যুর পরে মাত্র ১৮ বছর বয়সী সুন্দরী ও সুশিক্ষিত ক্লিওপেট্রা  এবং তার ১১বছর বয়সী ভাই  “১৩তম টলেমি” রাজ্য পরিচালোনার দায়ীত্ব পান। তার রাজ্য চলাকালীন সময়ে মিসরেপ্রাচীন মিশরীয় ভাষার পাশাপাশি  গ্রীক ভাষারও প্রচলন লক্ষ করা যায়। তিনি নিজেও বেশ কয়েকটি ভাষায় কতাহ বলতে পারতেন। পরে তিনি রোমের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক করে তার রাজ্যের প্রভআব বিস্তার করেন। এবং তখনকার রোম সেনাপতি “জুলিয়াস সীজার” এর সাথে মিলে  তার ভাইকে হটিয়ে তার একার রাজত্ব কায়েম করেন। এর মাধ্যমে রোম এবং মিসর মিলে এক বিশাল শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই দুই সম্রাজ্যের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কারণে জুলিয়াস সীজার বেশ কয়েকবারই মিসরে যাতায়াত করেন এবং জুলিয়াস সীজার এবং ক্লিওপেট্রা’র মধ্যে একটা প্রেমের সম্পর্ক তৈরী হয়। কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পরে তা আরো ঘনিষ্ট হতে থাকে । কিন্তু তাদের এই সম্পর্কের কথা যখন পুরো রোম এবং মিশরে ছড়িয়ে পরে তখন রোমান সিনেট সদস্যদের কাছে এটা মোটেও ভালো মনে হচ্ছিল না। সিনেট সদস্যরা তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সফল হন নি। একসময় জুলিয়াস সীজার আনুষ্ঠানিক ভাবে মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা কে বিয়ে করার ঘোষণা দেন।আর এতে পুরো ইউরোপ এবং আফ্রিকা জুড়ে আলোড়ন ছড়িয়ে পরে। জুলিয়াস সীজার তার কথামত মিসরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় রাণী ক্লিওপেট্রা’র রাজমহলে রাণী ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করেন।এতে রোমান সিনেট সদস্যরা ব্যাপক সমালোচনায় লিপ্ত হন। রাণী ল্কিওপেটড়া যখন অন্তঃসত্ত্বা তখন সম্রাটজুলিয়াস সীজার আবার রোমে ফিরে আসেন। এবং তার শাসন কার্যক্রম যথাযথ পরিচালনা করতে থাকেন। কিছুদিন পরেই  জুলিয়াস সীজার আর রাণী ক্লিওপেট্রা’র ঘরে একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন। জুলিয়াস সীজারের নাম অনুসারেতার সন্তানের নাম রাখা হয় ”সীজারিওন”। পুত্রসন্তানের সংবাদে খুশিতে আত্মহারা হরেন পরেন  জুলিয়াস সীজার। এভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েকটি বছর। সীজারিওন এখন ৮ বছরের বালক।ভবিষ্যৎ মিশরের সম্রাট।  জুলিয়াস সীজার তার স্ত্রী রাণী ক্লিওপেট্রা এবং তাদের একমাত্র পুত্র সীজারিওনকে  রোমে আসার আমন্ত্রণ জানান। রাণী ক্লিওপেট্রাও তার নিমন্ত্রনকে স্বাদরে গ্রহণ করেন। এবং তার প্রমোদতরী নিয়ে রোমের দিকে যাত্রা শুরু করেন।  সে এক জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে রাণী ক্লিওপেট্রা এবং রাজপুত্র সীজারিওনকে বরণ করা হয়। বলা হয় এমন জমকালো আয়োজন আগে কখনো রোমানরা দেখেনি। আর এটাই সিনেট সদস্য আর আবাকি রাণীদের চোখের কাল হয়ে যায়। জুলিয়াস সীজার এখন শুধুই তার প্রিয়তমা স্ত্রী আর পুত্রকে নিয়ে ব্যস্ত। আর তার পিঠপিছে চলছে  জুলিয়াস সীজার কে হত্যার পরিকল্পনা। জুলিয়াস সীজারকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী তারই ভাতিজা এবং সিনেট সদস্যরা। জুলিয়াস সীজারের খুব কাছের লোক ছিলেন সেনাপতি মার্ক এন্টোনি। যিনি সবসময়ই  জুলিয়াস সীজারের সাথেই থাকতেন এবং সম্রাটের অনুপস্থিতিতে রাজ্য পরিচালনা করতেন। কিছুদিন পরেই খবর আসে সিনেট সদস্যরা সম্রাট জুলিয়াস সীজারকে বিশেষভাবে সম্মানী দিতে চান এবং তাকে সিনেটে আসার আমন্ত্রণ জানান।জুলিয়াস সীজার এতে বেশ খুশী হন এবং তার প্রিয়তমা স্ত্রী রাণী ক্লিওপেট্রা কে বলতে থাকেন যে, কাল সিনেট সদস্যরা আমাকে বিশেষ সমান প্রদান করবেন। এদিকে সিনেট সদস্যরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী যখন জুলিয়াস সীজার সিনেটে উপস্থিত হন তখনই  কোন একজন মার্ক এন্টোনিকে সরিয়ে নেন। আর সিনেট হলের ভেতরেই সিনেট সদস্যরা মিলে নির্মম ভাবে  হত্যা করে জুলিয়াস সীজারকে। এবং তারা তাদের আনন্দ উৎসব পালন করেন। ঐ রাতেই মার্ক এন্টোনির বিশেষ সহযোগীতায় রাণী ক্লিওপেট্রা আর তার সন্তান সীজারিওন রোম ত্যাগ করে তাদের জন্মভূমি মিশরে চলে যান।   এবং জুলিয়াস সীজারের ভালোবাসার অবসান হয়। বিদায়কালে মার্ক এন্টোনি রাণী ক্লিওপেট্রার প্রেমে পরে যান।

জুলিয়াস সীজারের ভাতিজার মৃত্যুর পরে মার্ক এন্টোনি সেনাপতির দায়িত্ব পান। দায়ীত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই মার্ক এন্টোনি আবার রাণী ক্লিওপেট্রা কে রোমে আসার আমন্ত্রণ জানান এবং রাণী ক্লিওপেট্রা তার নিমন্ত্রণ ফিরিয়ে দেন। রোমান দূতকে আরো বলেন যে তিনি আর কখনোই রোমের মাটিতে পা রাখবেন না। তিনিও মনে মনে মার্ক এন্টোনিকে পছন্দ করতেন। পরে রাণী ক্লিওপেট্রা তার কথামত প্রমোদতরী নিয়ে রোমে যান ঠিকই কিন্তু তিনি তার প্রমোদতরী থেকে নামেন নি। ভূমধ্যসাগরে তার নৌকাতেই তিনি অবস্থান করেছেন এবং মার্ক এন্টোনিকে ডেকে পাঠিয়েছেন।এবং ভালোবাসার টানে মার্ক এন্টোনি সব ভুলে গিয়ে রাণী ক্লিওপেট্রার প্রমোদতরীতে যান রানীর সাথে দেখা করতে।নাচগান, ফুল-ফল আর নানান রকমের খাবারের মাধ্যমে রাণী ক্লিওপেট্রা তার নৌকায় মার্ক এন্টোনি কে স্বাগত জানান। “অবশেষে আপনি রোমে আসলেন” এমন কথার জবাবে রাণী ক্লিওপেট্রা মার্ক এন্টোনিকে আবার মনে করিয়ে দেন যে তিনি বলেছিলেন তিনি আর রোমের মাটীতে পা রাখবেন না। এবং নানা রকমের আলাপচারীতার মাধ্যমে তাদের মাঝে সম্পর্ক আরো গভীর হয়। মার্ক এন্টোনিও জুলিয়াস সীজারের মতন  মিশরে বেশকিছুদিন অবস্থান করেন। এবং তার মিশরে যাতায়াত বেড়ে যায়।এতে আবার সে সিনেট সদস্যরা ভ্রুকুন্ঠিত করে। এবং সিনেত দুটি দলে বভক্ত হয়। একদল মার্ক এন্টোনির পক্ষে আরেকদল বিপক্ষে। কিন্তু এসব  নিয়ে মোটেও মাথা ঘামান নি মার্ক এন্টোনি। তিনি এখন শুধু তার প্রিয়তমা রাণী ক্লিওপেট্রা কে নিয়েই ব্যস্ত।এদিকে মার্ক এন্টোনি যখন রোমে অবস্থান করেন তখন তাকে সরাসরি কেউ কিছু না বললেও তার পিঠপিছে কমবেশি সবাই আলোচনা করত। একসময় মার্ক এন্টোনি বেশকিছু সময়ই মিশরে অবস্থান করেছিলেন। এসময় সিনেটে তার বিপক্ষের একজন একটি হুইল প্রকাশ করেন যাতে লেখা ছিলো ” আমার মৃত্যুর পরে আমাকে মিশরের আলেক্সান্ড্রিয়ায় কবর দিও –মার্ক এন্টোনি” এমন খবর প্রকাশ পাওয়ায় আম্ররক এন্টোনির পক্ষের সিনেট সদস্যরাও তার বিপক্ষে অবস্থান করেন এবং মিশরের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করে যুদ্ধ ঘোষণা করে। দু পক্ষেরই এই যুদ্ধে সম্মতী ছিলো এবং পানিপথে রোম আর মিশরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে মিশেরর হয়ে নিজ রাজ্যে রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন মার্ক এন্টোনি। এবং এই যুদ্ধে তাদের বেশিরভাগ রণতরী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। মার্ক এন্টোনিও আহত হন। এতে করে ভীষণ ভাবে ভেঙ্গে পরেন মার্ক এন্টোনি এবং রাণী ক্লিওপেট্রা। তার কিছুদিন পরেই আবার রোমানরা স্থলপথে মিশর আক্রমণ করে। তখন পুরো ইউরোপে রোমানদের দাপট থাকায় তুলনামূলকভাবে মিশর কম শক্তিশালী ছিলো। সেই স্থলপথের আক্রমণেই মিশর রোমানদের কাছে তাদের পরাজয় স্বীকার করে। কিন্তু রাণী ক্লিওপেট্রা আর মার্ক এন্টোনি এখনো পরাজয় মেনে নেন নি। যদিও তারা পরাজয় নিশ্চিত জানত। তারা তাদের রাজমহলের সব সদস্যদের মুক্ত করে দেন এবং রাণী ক্লিওপেট্রার পুত্র সীজারিওনকে এক বিশ্বস্ত দাসীর সাথে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেন। কিন্তু শেষ রেহাই হয়নাই তার পুত্রের। রোমানদের কাছে প্রাণ হারায় মাত্র ১১ বছর বয়াসী সীজারিওন। যদিও তার মা রাণী ক্লিওপেট্রা আদৌ জানতে পারেন নি যে তার পুত্র আর জীবিত নেই।(বিশেজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী) হারের ক্ষোভে রাণী ক্লিওপেট্রার মহলেই আত্নহত্যা করেন মার্ক এন্টোনি।এবং তার ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে আর পরাজয়ের দুঃখে রাণী ক্লিওপেট্রা এবং তার দুই ঘনিষ্ঠ দাসী/সহযোগী মিশরীয় গোখরা সাপের দংশনে ১২ই আগস্ট ৩০ খৃষ্টপূর্বাব্দ একই মহলে পৃথক স্থানে আত্মহত্যা করেন কিংবদন্তী রূপসী নারী মহারাণী “ক্লিওপেট্রা”।আর এরই মাধ্যমে শেষ হয় ফারাওদের বংশ। কিন্তু তাদের সমাধি আজ পর্যন্ত কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

About The Author
Tanveer ahmad Munna
Tanveer ahmad Munna
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment