Now Reading
ম্যানস্ পার্লার!



ম্যানস্ পার্লার!

(শুরুতেই বলে রাখি, এটি নিতান্তই একটি কাল্পনিক গল্প, কোনো বিশেষ ব্যাক্তি বা গোষ্ঠিকে লক্ষ্য করে এ লেখা নয়)
সুমনের তাড়ায় মা কুলসুম বেগম প্রায় দিশেহারা বোধ করছেন। বাবাহারা ছেলে, তার এহেন পরিস্থিতিতে তিনি কি করবেন কার কাছে যাবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছেননা!
গেলো দুদিন কোনোরকমে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রেখেছেন ছেলেটাও চুপচাপ ছিলো। আজ আবার কি হলো যে দশটার আগেই কোর্টে যেতে হবে বলে বারবার তাগাদা দিচ্ছে তাকে! রুটি সেঁকা শেষে টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে সুৃমনের পাশে বসলেন কুলসুম।
– বাবা, কি হয়েছে বলবি একটু?
-কোর্টে যেতে হবে মা, থানা থেকে কল দিয়ে বললো আজকে শুনানি হবে।
-শুনানি! কিসের?
-তোমাকে তো বলেছিলাম মা, আমি ওদের নামে মামলা করেছি!
 “ম্যানস্ পার্লারের” নামে যা তা করে বেড়াবে আর আমরা এসব সহ্য করে যাবো? নূন্যতম সেল্ফরেসপেক্ট নেই নাকি দেশটায় কারো!
ছেলের কথায় কুলসুম বেগম আৎকে উঠলেন একটু। এতক্ষনে যেনো মাথাটা পরিষ্কার হলো তার!
   “সুখনীড় ম্যানস্ পার্লার”।
নিচে ছোট ছোট করে পার্লারে কি কি সার্ভিস দেয়া হয় তার সারসংক্ষেপ দেয়া।
“চুল ছাঁটাই”
“শেভিং ও ফেসিয়াল”
“বডি ম্যাসেজ ও বডি ওয়াক্সিং”
“ফুল বডি ক্লিনিং”
       এরকম আরো অনেক কিছু।
 টানা এক মাস পরীক্ষা আর চাকুরী করে সুমন চুল ছাঁটার সময়ই পাচ্ছিলো না। শেষে সন্ধ্যারাতে মা কুলসুম বেগম একপ্রকার জোর করেই পাঠালো ওকে চুলগুলো কেটে আসার জন্য। এক ঘন্টাবাদে ফিরে এলো সুমন, চোখমুখ টকটকা লাল হয়ে আছে ছেলেটার! কুলসুম বেগম তো অবাক। এরইমাঝে কি এমন হলো বাইরে!
অনেক জিজ্ঞেস করেও কোনো জবাব নেই ছেলের মুখে। নিরাশ হয়ে নিজের ঘরে ফিরে যাবেন তখনই মাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সুমন! জন্মাবধি এতটা বিস্মিত আর ভীত হননি কুলসুম বেগম।
সুখনীড় ম্যানস্ পার্লার টা পরিচালনা করে মূলত জনাকয়েক হিজরা। প্রায় দুবছর হলো পার্লারটা শুরু হয়েছে। সেক্টর সমিতির কাছে হিজরাদের একটা দল এসে নিজেরাই প্রস্তাব দেয় যে ওরা কিছু করতে চায়! অনুমতি পেলে সেক্টরের ভেতর একটা সেলুন কাম পার্লার দেবে।
নিজেরাই চালাবে ওটা। সবাই বরং খুশিই হয়েছিলো,ভেবেছিলো
   “যাক এদের সুমতি হয়েছে তবে! অযথা চাঁদা চেয়ে সেক্টরের মানুষদের আর হয়রানি করবেনা।”
কোর্ট প্রাঙ্গনে ঢুকেই তব্দা খেয়ে গেলো কুলসুম বেগম। পুরো মাঠ জুড়ে হিজরার দল গিজগিজ করছে! সুমনও এসব দেখে চুপ মেরে গেছে একেবারে।
মাকে নিয়ে সোজা কোর্টের হলরুমের দিকে হাটছে সুৃমন। চারপাশের সবাই সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছে ওদের। সবার চোখে কৌতুহলী দৃষ্টি। কাছাকাছি কোনো ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজলো।
বড় হলঘরটায় কোর্টের শুনানি শুরু। পুরো হলরুমটায় মানুষ ভর্তি। কিছু টুকটাক কাজের পর মামলার বাদী সুমনের ডাক পড়লো কাঠগড়ায়। উকিল সাহেব জেরা করতে শুরু করলেন,
– আপনিই তো মামলার বাদী..?
-জি আমিই…..
-আচ্ছা, একটু বিস্তারিত বলুন জাজ কে।
সামনের সীটে বসা মার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করলো সুমন,তারপর বললো,
-ওরা,, আমাকে মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি হ্যারেজমেন্ট করার চেষ্টা করছিলো…
– ওখানে কি শুধু আপনিই ছিলেন?
– না আরো দুজন ছিলেন, একজন কে আমি ঢুকতেই ঝগরা করতে করতে বেরিয়ে যেতে দেখেছিলাম…
-আচ্ছা! তো আপনার সাথে ঠিক কি হয়েছিলো বলুন,
ইতস্তত করছে সুমন, লোকটা ঠিক কি জানতে চাইছে বুঝতে পারছেনা ও, মামলার বিবরনিতে তো দিয়েছেই সব!
-বললাম তো হ্যারেজমেন্ট…..
-এভাবে বললে তো হবেনা মি. সুমন! আরো একটু ডিটেইল…… আর একটু বিস্তারিত….একটু খুলে খুলে… বলুন..?
প্রশ্নটা শুনেই হলভর্তি মানুষ সব হো হো করে হেসে উঠলো। বেশ একটা রসিকতা হলো যেনো এইমাত্র!
উকিলের চোখে মিচকে হাসিটা স্পষ্ট দেখতে পেলো সুমন। এবং লোকটার মতলব বুঝতে পেরেই স্তব্ধ হয়ে ভাবলো, “এই অপমানের নরকের ভেতর মাকে এনে ভুল করলাম!”
আরো টুকটাক কথার পর সাতদিনের জন্য মুলতবি হলো শুনানি। মাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো সুমন।
পেছন থেকে হাহা হিহি হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছে ক্রমাগত, সেই সাথে টিটকিরির সুর…
– “কি করেছিলো ওরা…!
– “কি কি হয়েছিলো রে তোর সাথে…..?
– “কি কি করলো একটু খুলে বলনারে জাদু…আমরাও শুনি একটু…..”
লজ্জায় না কার উপর অযথা রাগে টলতে টলতে কোর্টের গেইট দিয়ে প্রায় পালিয়ে এলো মা ছেলে।
বাসার সামনে আসতেই দেখে দরজা জুড়ে পাঁচ ছয় জন হিজরা বসে আছে! এদেরকে চেনে ওরা, এলাকায় চাঁন্দা নেয় নিয়মিত। ওরা এখানে কেনো এখন!
কাজল নামে হিজরাটা এগিয়ে এলো।
– কি রে সুমনদা, একেবারেই কোর্টে গিয়ে উঠতে হলো? আমরা কি ছিলামনা নাকি?
ছেলে কিছু বলার আগেই কুলসিম বেগম এগিয়ে গেলেন।
– কাজল এসোনা ভেতরে এসে বসো। কি হতে কি হয়েছে ছাড়ো ওসব। আমরা মামলা তুলে নেবো কালই…
– মা!
ধমকে উঠলো সুমন। এত কিছুর পর কিসের মামলা তুলে নেবে বলছো তুমি?
বক কাটা চুলের হিজরাটা এগিয়ে এলো। হাতে একটা পাখির পালক, ওটা দিয়ে অনবরত কান খুঁচাচ্ছে!
এগিয়ে এসে সুমনের থুতনিতে হাত বুলিয়ে দিলো বব কাট। আস্তে আস্তে গলার দিকে নামলো হাতটা,
– “শুনো বেবি, অযথা বিপদ বাড়িওনা। নিজেও ভালো থাকো, আমাদেরও আমাদের কাজ করে ভালো থাকতে দাও।”
হাতটা এখনো সুমনের গায়ে হাতিয়ে বেড়াচ্ছে। গা ঘিনঘিন করে উঠলো সুমনের,ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো হাতটা।
হেসে উঠলো অন্যরা। বব কাটের অপমানে মজা পেয়েছে ওরা। বব কাট ঝট করে ফিরলো কুলসুম বেগমের দিকে, “দেখো মেয়ে, ছেলেকে সামলে রাখ্, বিপদ বাড়াইসনা।”
কথাটা বলেই গটমট করে চলে গেলো ওরা। কুলসুম বেগম কি করবেন কাকে থামাবেন বুঝে উঠতে পারছেননা যেনো।
সাতদিন পর।
কোর্টের শুনানি আবার আজ।  এর মাঝে যথেষ্ট খেটেছে সুমন। লুকিয়ে পার্লারের কাষ্টোমারদের রেজিষ্ট্রী খাতা জোগার করেছে। ওতে সবার নামধাম আর নম্বর ধরে ধরে কল দিয়েছে, আরো জোরালো প্রমান দরকার, স্বাক্ষীও লাগবে ওর জন্য।
অনেক কষ্টে দুজন লোককে রাজী করিয়েছে কোর্টে স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য। “হিজরাদের বিরূদ্ধে লাগতে যাওয়া ঠিক না” বলে অনেকেই বুঝাতে চেয়েছে সুমনকে। সবাই ভয় পায় ওদের!
মা কে রেডী হতে দেখে নিষেধ করলো সুমন। মাকে ওভাবে অপমানিত হতে দেখতে ভালো লাগবেনা আবারো।
– তুই পারবি একা যেতে?
আমি আসিনা সাথে….. মায়ের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো সুমন।
– পারবো মা, টেনশান করোনা। আমি পৌছে কল দেবো।
সুমন বেরিয়ে গেলে দরজাটা লাগিয়ে প্লেইটগুলো গুছিয়ে ফেলবে ভেবে ডাইনিংরুমে পা বাড়াতেই বাইরের রাস্তায় ভীষণ শব্দে চমকে উঠলো কুলসুম বেগম।
দৌড়ে গিয়ে দেখলেন,
      “ট্যাক্সিটাকে একদম পিষে ফেলেছে কার্গো গাড়িটা!!”
ঢং ঢং করে দশটা বাজার বেল পড়লো কোর্টের অফিসে।
আজ শুনানির দ্বিতীয় দিন।
উকিল,জাজ সবাই মামলার বাদীর জন্য অপেক্ষা করছেন।
এক পক্ষের শুনানির পরও যখন বাদী পৌছলোনা, জাজ দ্বিতীয় দিনের মতো মুলতবি ঘোষনা করে উঠে পড়ছেন তখনই রক্তাক্ত শাড়িতে টলতে টলতে এ্যম্বুলেন্স থেকে নেমে এসে ভেতরে ঢুকলেন কুলসুম বেগম।
উকিলের দিকে তাকিয়ে ছলছল চোখে বললেন,
               ” ফিজিক্যালি হ্যারেজমেন্টের প্রমান চাচ্ছিলেন, নিন নিয়ে এসেছি এ্যাম্বুলেন্সে করে, হাঁড়গোর গুড়িয়ে দিয়েছে একেবারে,
নিন আপনাদের জন্য জ্বলজ্যান্ত প্রমান নিয়ে এসেছি এইবার!”
About The Author
Maksuda Akter
1 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment