নারী শক্তি ও অধিকার

কোর্ট ম্যারিজ কতটুকু বৈধ? প্রতারিত হচ্ছে নারী!!

ঘটনা-১
সীমা এবং আনিস (ছদ্মনাম) এর ফোনে পরিচয়, পরিচয় থেকে প্রেম। পরিবার কে না জানিয়ে নোটারী পাবলিকের কার্যালয়ে গিয়ে কোর্ট ম্যারিজ করে। কিন্তু ছেলেটির পরিবার কোন ভাবেই বিয়েটা মেনে নেয় না। কিছুদিন পরেই আনিস পরিবারের চাপে বিয়েটি অস্বীকার করে। সীমা তার অধিকার দাবি করলে, ছেলেটির পরিবার থেকে বলা হয় , সীমা আর তার পরিবার নাকি ভয় দেখিয়ে জোর করে এই বিয়ে দিয়েছেন। ঘটনা তখন আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

ঘটনা-২
মতিন সাহেবের বড় পরিবার। টানাটানির সংসার। বড় মেয়ের বয়স ১৫ বছর।এলাকার এক লোকের পরামর্শে, আর পরিবারের টানাটানির কথা চিন্তা করে, পাশের গ্রামের ময়না মিয়ার ছেলের সাথে কোর্ট ম্যারিজের মাধ্যমে মেয়ের বিয়ে দেন। ৬ মাস যেতে না যেতেই ছোট মেয়েটাকে মেরে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয় শ্বশুর বাড়ির লোকজন।রাগে ক্ষোভে মতিন মিয়া চিন্তা করেন পুলিশ কেস করবেন। কিন্তু বিয়ে রেজিস্ট্রি না থাকাতে এবং নাবালিকা মেয়ে বিয়ে দেওয়ার কারণে পুলিশে কে জানাতেও ভয় পাচ্ছেন,যদি উল্টো ফেঁসে যান।

কোর্ট ম্যারিজ আসলে কি?

এভাবে কোর্ট ম্যারিজের কারণে অনেক নারী তার দাম্পত্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আসলে বাংলাদেশের আইনে কোর্ট ম্যারিজের কোন বৈধতা তো নেই, এমন কি অস্তিত্ব ও নেই। অথচ, অনেকেরই ধারনা কাবিন রেজিস্ট্রি র চাইতে কোর্ট ম্যারিজ অধিক শক্তিশালী। অথচ এটা সম্পূর্ণই ভুল ধারনা।
আসলে হলফ-নামার মাধ্যমে বিয়ের একটা ঘোষণা দেয়াই হচ্ছে কোর্ট ম্যারিজ। এর মধ্যে দেন মোহর, স্বামী স্ত্রীর অধিকার, সাক্ষী সম্পর্কে কোন উল্লেখ থাকে না।

আসলে বাংলাদেশের আইনে কোর্ট ম্যারিজের কোন বৈধতা তো নেই, এমন কি অস্তিত্ব ও নেই।

 

কারা করায় এই কোর্ট ম্যারিজ?

অনেকের মধ্যে কোর্ট ম্যারিজ করার প্রবণতা বেশি। সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেকে মনে করে কোর্ট ম্যারিজের মাধ্যমে বিয়ে করলে বিয়ের বন্ধন শক্ত হবে।
আইনের ছদ্মবেশে এক শ্রেণীর নোটারী পাবলিক এই অবৈধ কাজে সহযোগীটা করে। অনেকে আবার কোর্ট ম্যারিজের জন্য উকিলের কাছে যায়। কিছু উকিল টাকার লোভে সাহায্য প্রার্থীদের সম্পূর্ণ বিষয়টা সম্পর্কে কোন ধারণ দেন না। শুধু মাত্র একটি হলফ নামায় বিয়ের ঘোষণা দেন।

 

নারীরা কিভাবে প্রতারিত হয়?

কাজি অফিসে বিয়ের জন্য একটা বড় অংকের ফিস দিতে হয়। সেটা থেকে বাচার জন্য ও অনেকে কোর্ট ম্যারিজ করে।
আবার যাদের মধ্যে অসৎ উদ্দেশ্য থাকে তারাও এই পথটি বেছে নেয়। যেমন, একাধিক বিয়ের কথা গোপন করার জন্য, বা মেয়ের অভিভাবক কে জিম্মি করে টাকা আদায়ের জন্য, অথবা সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য।

এই দলিল করা খুবই সহজ। অনেক সময় হলফ-নামা প্রার্থী কে উপস্থিত থাকার প্রয়োজন হয় না। ফলে ১৮ বছরের নিচে অর্থাৎ দেশিও আইনে নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়। আবার নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা থেকে বাচার জন্য ও অনেকে কোর্ট ম্যারিজ করে।অনেক সময় বিয়ে বাতিল করার জন্য ছেলে পক্ষ এই কারণ দেখায় যে মেয়ে পক্ষ জোর করে দলিলে স্বাক্ষর নিয়েছে।

এই দলিলে কোন দেনমোহর উল্লেখ থাকে না। ফলে আবেগের বশবর্তী হয়ে নারী বিয়ে তো করে ,কিন্তু তার প্রাপ্য দেনমোহর থেকে বঞ্চিত হয়।
যেহেতু, আইনে কোর্ট ম্যারিজের কোন বৈধতা নেই, সেক্ষেত্রে নারী প্রতারিত হবার পর যখন আদালতে তার অধিকার আদায়ের জন্য যায়, তখন তাকে তার বিয়ে টা প্রমাণ করাই কষ্টকর হয়। অনেক সময় সাক্ষী না থাকাতে বিয়েও প্রমাণ করতে পারে না।

আর ছেলে পক্ষ যদি প্রভাবশালী হয় সেক্ষেত্রে মেয়েটার পক্ষে বিয়ে প্রমাণ করা আরও কষ্টকর হয়ে যায়।  অনেক সময় সন্তানের পিতৃ-পরিচয় অস্বীকার করে পুরুষ। তখনও নারীর পক্ষে সন্তানের বাবার অধিকার আদায় করা কঠিন হয়ে যায়।

 

আইনে কি বলা হয়েছে?

আইন অনুসারে বিয়ে তখনই বৈধ হবে যখন বিয়ে কাবিন রেজিস্ট্রি হবে। কাজি বাসায় ডেকে এনে অথবা কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ের রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়। আইন অনুযায়ী কাবিন রেজিস্ট্রি ও আকদ সম্পন্ন করেই একমাত্র ঘোষণার জন্য এফিডেভিট করা যাবে। অনেকেই এ বিষয় এ জানে না।

আইন অনুযায়ী বিয়ের আসরেই কাবিন রেজিস্ট্রি করতে হয়। বিয়ের আসরে সম্ভব না হলে বিয়ে হবার ১৫ দিনের মধ্যেই বিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।

মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ বিধি ১৯৭৫ এর ১৯(৩) ধারা অনুযায়ী নিকাহ রেজিস্টার ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তি যদি বিবাহ পড়ান, তবে সেই ব্যক্তিকে ১৫ দিনের মধ্যে অত্র এলাকার নিকাহ রেজিস্টারের নিকট অবহিত করতে হবে।

আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী বিয়ে রেজিস্ট্রেশন না করা কিন্তু একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৭৪ এর ধারা ৫(২) অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রেশন না করার শাস্তি (তিন) মাসের কারাদণ্ড, অথবা ৫০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবার বিধান রয়েছ।

কাবিন নিবন্ধন করা থাকলে সুবিধা কি?

যদিও কাজীর কাছে বিয়ে নিবন্ধন করতে কিছু খরচ হয়, তবুও নিবন্ধন করাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ বিয়ে নিবন্ধনের কিছু সুবিধা রয়েছে-

১। বিয়ে নিবন্ধন করা থাকলে তালাকের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা সহজ হয়। তখন মেয়েটা সহজেই তার নিজের, সন্তানের খোরপোষ দাবি করতে পারবে।

২। স্ত্রীর দেনমোহর ও ভরণপোষণ আদায়ের জন্য কাবিননামার প্রয়োজন হয়।

৩।সন্তানের বৈধ পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কাবিননামার প্রয়োজন হয়।

৪। কাবিননামা ছাড়া শুধু বিয়ের হলফ-নামা সম্পন্ন করা হলে বৈবাহিক অধিকার আদায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।

 

সুতরাং, কোর্ট ম্যারিজ শব্দটি মুখে মুখে বহুল প্রচলিত হলেও, আসলে বাংলাদেশের আইনে এর কোন ভিত্তি নেই। এজন্য আবেগের বশবর্তী হয়ে, বা ঝামেলা এড়ানোর জন্য কখনই এর দ্বারস্থ হবেন না। তাহলে খুব সহজেই হতে পারেন প্রতারণার স্বীকার ।

বিয়ের কাবিন রেজিস্ট্রি করুন। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকুন।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

উপহার যখন গলার কাঁটা হয়ে বিধে

Rajib Rudra

তবু ও জেগে থাকে অভিমান

Sk Mizan

নারী কে কি সমান অধিকার দেয়া উচিত?

Mrinmoyi Jahan

1 comment


Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208

Warning: trim() expects parameter 1 to be string, object given in /nfs/c12/h08/mnt/215533/domains/footprint.press/html/wp-includes/class-wp-user.php on line 208
Footprint Police October 23, 2017 at 1:08 am

Spelling Error. Please transfer into unpaid category.

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: