Now Reading
বাঙ্গালীর হুজুগেপনাঃ ব্লু হোয়েল



বাঙ্গালীর হুজুগেপনাঃ ব্লু হোয়েল

পৃথিবী যতই অগ্রসর হচ্ছে সামনের দিকে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবন ততই কঠিন হয়ে পড়ছে।  যান্ত্রিকতার গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হয়ে আমরা প্রতিদিনের জীবন কাটাতেই হিমশিম খাচ্ছি।  এতে করে আমাদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন , প্রতিবেশী ,সহকর্মী সহ চেনা জানা মানুষগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।  মানুষের সাথে মানুষের এই দূরত্ব কমিয়ে আনতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এর উৎপত্তি হয়েছিল।  আদিকালে পাখি এবং বার্তা প্রেরক এর মাধ্যমে মানুষ যোগাযোগ রক্ষা করতো।  এরপর একে একে এলো চিঠি , টেলিফোন।  প্রযুক্তি আরো উন্নত হবার পর এলো ইমেইল। আর এখন ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট এর মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো আমাদের ব্যস্ত জীবনে আরো গতি এনে দিয়েছে।

এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ব্যবহৃত সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুক।  সারা বিশ্বে প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষ ফেইসবুক ব্যবহার করে।  প্রতিমাসে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন নতুন করে ফেইসবুকে জয়েন করছে।  বাংলাদেশ এ ফেইসবুকের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আছে। প্রায় ৩ মিলিয়ন ফেইসবুক ব্যাবহারকারী আছেন বাংলাদেশে যেখানে ঢাকাতেই প্রায় ২ মিলিয়নের মত।  সমীক্ষায় দেখা গেছে একটিভ ব্যবহারকারী হিসেবে ঢাকা বিশ্ব র‍্যাংকিং এ ২য় অবস্থান এ আছে।

লেখাটির মূল লক্ষ্য আপনাদের সমীক্ষা দেয়া নয়।  দেশে ফেইসবুক ব্যবহার করে শুধু যোগাযোগ রক্ষা ই না, হচ্ছে অনেক উপকারমূলক কাজও।  ফেইসবুকে অনেক গ্রুপ এবং পেইজের মাধ্যমে অনেকে অনেক ধরনের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন যার মাঝে রক্ত সংগ্রহ, কেনা বেচা করা, তথ্য প্রদান করা সহ অনেক কাজ হচ্ছে। দুঃখের সাথে বলছি – খারাপ কাজেও ফেইসবুক বেশ সহযোগী ভূমিকা পালন করছে। প্রশ্ন ফাঁস, সাইবার বুলিং, পরকীয়া, আর্থিক জালিয়াতি সহ নানান অপকর্মমূলক কাজ হচ্ছে।

উন্নত বিশ্বে মানুষগুলোর উন্নত চিন্তা-ধারার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরী করা এসব সোশ্যাল সাইট আমরা নানা ধরনের অপরাধজনক কাজে ব্যাবহার করে কি নিজেদের সাথেই ধোঁকাবাজি করছি না? অনলাইন হলো এমন একটি স্থান যেখানে খবর মুহুর্তের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।  আমরা এই সুযোগের ফায়দা নিচ্ছি নানান ভাবে।  মানুষের গোপন তথ্য ফাস করে দিচ্ছি, ফেলনা বিষয় নিয়ে হুজুগে মেতে অনলাইন কাঁপাচ্ছি।  যার ফলে সে সময়ে ঘটে যাওয়া অনেক ভাল কাজ যেগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত সেগুলো হারিয়ে যাচ্ছে , তেমনি অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলে সময় এবং মেধা দুটোই নষ্ট করছি।

সাম্প্রতিক  কালে ব্লু –হোয়েল গেইমটি নিয়ে যে পরিমান হাইপ সৃষ্টি হয়েছিল তা নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় ছিল।  খামারবাড়ীতে আত্মহত্যা করা মেয়েটিকে ব্লু – হোয়েলের শিকার বলে চালানো হচ্ছে যেখানে তার পরিবার থেকেই বলা হচ্ছে ডেড বডিতে কোন কাটা-ছেড়া ছিলনা।  মিরপুরের যে ছেলেটি ব্লু  – হোয়েল এর শিকার বলে নিজেকে ভিকটিম প্রমাণ করে মিডিয়ার সমবেদনা নিয়েছে, সেও আসলে ব্লু – হোয়েল এর শিকার ছিলনা।  সদরঘাটের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়া ছেলেটাও হয়ত এই গেইমের জন্য মারা যায়নি।  

আচ্ছা, আসেন আমরা ঘটনার সম্ভাব্য একটা পোস্ট মর্টেম করি।  মিরপুরের ছেলেটি বেশ কিছু ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিজেকে ব্লু  – হোয়েলের শিকার বলছে।  বাস্তবে গেইমের কোন টাস্ক এমন ছিলনা যেখানে বলা হয়েছে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কথা।  টিনেজ-প্রেম এর কারনে এমন হতে পারে বলে কি আপনার কখনো এটাকে মনে হয়নি? নাহ, হয়নি কারন অনলাইনে কিছু বিচার-বুদ্ধিহীন এবং বিবেকহীন লোকের জন্য আপনি চারিদিকে ব্লু  – হোয়েল শুনে শুনে ঘরের রান্না করা ইলিশ বা রুই মাছটিকেও ব্লু – হোয়েল ভাবা শুরু করেছিলেন।  সদরঘাটের ছাদ থেকে পড়ে মারা যাওয়া ছেলেটার ব্যাপারে যদি আসি, তাহলে আমি বলব আমাদের দেশের অপরাধীরা কি অনলাইন এর এই মিথ্যা গেইমের ফায়দা নিয়ে কাউকে মেরে সেই গেইমের শিকার বলে চালায়নি বা চালাতে চাচ্ছেনা – এমন কি গ্যারান্টি আপনি দিতে পারেন? গেইমের শেষ টাস্ক হলো ছাদ থেকে পড়ে আত্মহত্যা করা।  সেই অনুযায়ী কাউকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে গেইমের শিকার বললে ব্যাপারটা খুন থেকে সরিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানো যাবে – সিম্পল। 

ব্লু  – হোয়েল এর সার্ভার এবং এডমিন ২০১৩ সালেই ক্লোজড। রাশিয়ান গেইম এটা, স্বাভাবিক ভাবেই এডমিনদের প্রভাব রাশিয়াতেই বেশি হবার কথা।  টাস্ক কমপ্লিট না করলে পরিবার কে মেরে ফেলার হুমকি রাশিয়ানদের দিলে  সেটা যুক্তিতে টিকে যায়। মানলাম আমেরিকা তেও তাদের প্রভাব আছে যদিও আমেরিকান ভিক্টিম গুলো মারা গেছে কেবলমাত্র ভয়ের কারনে।  তাদের পরিবারকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হত গেইম টাস্ক না শেষ করলে আর প্রমাণস্বরূপ বাবা-মার লোকেশন বলে জানিয়ে দিত আর বলত যে তারা গেইম এডমিনের নজরদারিতেই আছে।  হতাশাগ্রস্থ একটা মানুষ ভাবতে পারতোনা – তার ফোন থেকে কন্টাক্ট কালেক্ট করে ফোন ট্র্যাকিং এর মাধ্যমে তার বাবা  – মার অবস্থান জানা হ্যাকারদের জন্য স্বাভাবিক কাজ ছিল।  কিন্তু কিসের জন্য তারা সুদূর রাশিয়া ছেড়ে বাংলাদেশে এসে প্লেয়ারদের পরিবারকে মেরে যাবে – এটা তো কোন যুক্তিতেই টিকে না। 

আর ডার্ক ওয়েবে ঢুকার মত জ্ঞান বাংলাদেশের খুব কম মানুষেরই আছে। যারা ব্লু – হোয়েল এর জন্য ফেইসবুকে লিংক চেয়ে পোস্ট দেয়, প্লে – স্টোরে গেইম খুজে আর শেষ চেস্টা হিসেবে গুগল তোলপাড় করে তারা লিন্যাক্স বা ক্যালিম্যাক্স দিয়ে ডিপ ওয়েবে কি ঢুকবে , এসব অপারেটিং সিস্টেম এর নামই অনেকে জানেনা। এদের কাছে ডিপ ওয়েব বলতে টর ব্রাউজার।

এতো গেল একটা হুজুগেপনা।  আপনারা যদি চান সিরিজ-আকারে আরো হুজুগেপনার পোস্ট মর্টেম করি তাহলে কমেন্টে জানাবেন।

 

ধন্যবাদ।

About The Author
Kazi Mohammad Arafat Rahaman
পড়াশোনা - ব্যাচেলর করছি কম্পিউটার সায়েন্সে। ভাল লাগা - গান, ফুটবল আর বই। খারাপ লাগা - নাই। খারাপ লাগেনা। অনুভূতিহীন। শখ - অনেক আছে। লক্ষ্য - ইন্টারপ্রেনার হতে চাই।