সাহিত্য কথা

সাইকো গল্প: গুপ্তঘাতক!

“এই ছাড়ো এখন, অফিসে যাবেনা নাকি আজ! নাস্তা বানাতে হবে তো।”
    সুহাস কে সরিয়ে দিয়ে বিছানায় উঠে বসলো প্রীতু। চুলগুলো পেছনে টেনে নিয়ে খোঁপা করে শাড়িটা ঠিক করে নিবে তখনই আবার প্রীতুকে নিজের দিকে টানলো সুহাস।
 
“থাকুকনা, আজ নাস্তাটা ক্যান্টিনেই করে নেবো। আর একটু থাক।”
 
“হু, বাইরে থেকে খেয়ে খেয়ে আবার গ্যাষ্ট্রিক বাঁধাতে হবেনা তোমার। যাও গোসলে যাও,আমি এক্ষুনি চট করে নাস্তাটা বানিয়ে নিই।” সুহাসকে গায়ের উপর থেকে সরিয়ে দিলো প্রীতু। জানলা দিয়ে সূর্যালোক ঢুকছে অল্পস্বল্প, তারই ফাঁকে পাশের বাসার ঝুমা আন্টির ফুলের টব টা দেখতে পেলো প্রীতু। তখনই একটা কথা মনে পড়লো ওর, “এই জানো, ঝুমা আন্টির সাথে কথা হচ্ছিলো কাল। আহারে! কি কষ্ট মহিলাটার। লোকটা নাকি প্রতিদিন ড্রিংকস করে আসে!
আমি নিজেও তো দেখলাম সেদিন লোকটার নজরও ভালোনা, কেমন নোংরা চোখে তাকাচ্ছিলো!”
 
প্রীতুর কথা শুনতেই একটু শক্ত হলো সুহাসের চোয়াল।
“ওই হোৎকা টা কিছু বলেছে নাকি তোকে? ওর চামড়া ছিলে নেবো একদম আমি!”
 
“না না আমাকে কি বলবে, আমিই তো ওনাকে বারান্দায় দেখলে ভেতরে চলে আসি। যা দু একবার দেখেছি তাতেই বুঝেছি নোংরা লোক। এমন কুৎসিতভাবে তাকিয়ে ছিলোনা!”
 
“হুম, এরপর থেকে আরো সাবধানে থাকিস।”
 
রেডি হয়ে প্রীতুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলো সুহাস।
 
” বারান্দায় কম যাস একটু। আমি অফিসে যাচ্ছি এখন।”
 
 
সন্ধ্যায় ফেরার পথে রিক্সা থেকে নেমে কি ভেবে আবার পিছিয়ে হেটে গেলো আবার সুহাস। পাঁচটা লাল গোলাপ কিনলো। “অনেকদিন ফুল দেয়া হয়না প্রীতুকে।”
 
সুহাস আসার সময় হয়েছে। আসলে তো আর কাজে হাত ই দিতে দেবেনা, তাই রান্না শেষ করে চট করে কফির কাপটা বসিয়ে দিলো প্রীতু।  বেডরুমটা গোছাতে এসে শব্দটা শুনলো।
 
ঠুক ঠুক ঠুক!
জানলায় কেও টোকা দিচ্ছে!
“হেই প্রীতু, জানলাটা খোল।”
 
দৌড়ে গেলো ওদিকে অবাক প্রীতু। “তুমি এদিক দিয়ে কেনো?”
 
“বিয়ের আগে তো অনেকবার উঠেছি পাইপ বেঁয়ে,  আজ আবার ভাবলাম একটু ঝালাই করে নিই। নিত্যনতুন পদ্ধতিতে ভালোবাসা অটুট থাকুক প্রতিদিন। হা হা হা।”
 
মনে মনে খুশি হলেও একটা ধমক দিলো প্রীতু।
“হয়েছে এখন নিচে নেমে সিড়ি বেঁয়ে এসো। এই বয়সে আর সুপারম্যান সেজে কাজ নেই।”
     “ফুলগুলো নে, আমি আসছি।”
 
 
খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লো দুজন। সুহাস শুয়েই ঘুম! বেচারা সারাটাদিন অফিসে কত খাটাখুটি করতে হয়।
    প্রীতু সুহাসকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। পাশের ফ্ল্যাটের ঝুমা আন্টির মৃদু সুরে কান্না শুনতে পাচ্ছে। “বেচারি! কত কষ্টেই না আছে।”
 
 
 
সকালে নাস্তা রেডি করে বারান্দা থেকে সুহাসের প্যান্ট টা আনতে গিয়ে পাশের বাসার খোলা বারান্দা দিয়ে চোখ গেলো প্রীতুর। ভেতরে মানুষ,পুলিশ সব গিজগিজ করছে!
 
     “ঝুমা আন্টির বর সুইসাইড করেছে! কাল রাতেও ড্রিংক করে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। মাঝ রাতে উঠে ঝুমা আন্টি দেখেন লোকটা রক্ত বমি করছে অনবরত। মেঝেতে বিষের বোতল গড়াচ্ছে!”
 
 
লোকটার মৃত্যুর খবর শুনে আড়মোরা ভেঙে উঠে বসলো সুহাস। “এত হাইপার হচ্ছিস কেনো! দেখ গিয়ে তোর ঝুমা আন্টিই হয়তো আর সহ্য করতে না পেরে বিষ দিয়ে মেরে ফেলেছে!”
 
প্রীতুও ভাবলো, হুম স্বামী এমন হলে জীবনটা আসলেই দূঃসহ হয়ে যায়। কত আর সহ্য করবে মহিলাটা!
 
“যাগ্গে, যেভাবেই মরুক মরতে তো হতোই একদিন। তাইনা?”
 
অফিস যাওয়ার আগে প্রীতুর গালে ঠোট ছোঁয়ালো সুহাস। “পাশাপাশি বারান্দায় একটা বদ লোকের কাছে বউকে রেখে যেতে টেনশান করতে ভালো লাগতো নাকি প্রতিদিন আমার? এরচে মরে গিয়ে নিজে উদ্ধার পেয়েছে, নিজের বউটাকেও শান্তি দিলো, সাথে আমিও।”
  হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলো সুহাস। ওর রসিকতায় প্রীতুরও হাসি পেলো।
 
 
বিকেলে সুহাসকে কল দিয়ে জানিয়ে দিলো অফিস থেকে ফেরার পথে প্রীতুকে যেনো শপিং থেকে নিয়ে যায় ও। এরমাঝে কেনাকাটা সেরে নিলো প্রীতু।
 
বাইকে করে ফিরছে। কলোনীর এই মোড়টায় সবসময় একটু জ্যাম। গাড়ি,রিক্সা এসবের। এরই মাঝে ছোট্ট গোল চত্ত্বরটায় ছেলেগুলো বসে থাকে। এই বাসাটায় আসার পর থেকেই এদের দেখে আসছে প্রীতুরা। বাইকটা ওদের কাছাকাছি আসতেই একজন চিৎকার করে ওঠলো, ভাবীজান, সবসময় জামাইর বাইকে বসলেই হইবো? দেবরদের দিকেও নজর দিয়েন একটু।” সবকটা হো হো করে হেসে ওঠলো!
 
 প্রীতু বাইকের পেছনে আরোও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে, বাইকটা ঘুরিয়ে দিতে গেলো ওদের দিকে ভয়ে ফিসফিস করে প্রীতু বললো, সুহাস প্লিজ! জলদি চলো এখান থেকে!”
 
 
বাসায় ফিরেও অনেক্ষন থম মেরে থাকলো সুহাস। অনেকটা সময় লাগলো প্রীতুর ওকে স্বাভাবিক করতে।
 
 
পরদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরছে সুহাস। মোড়ে এসে রিক্সা থামিয়ে হেটে চললো। আবছা আলোছায়ায় হাটছে।
মোড় পেরুনোর সময় দেখলো একজন পিছু পিছু আসছে ওর।
 
আগের দিনের ওই বখাটেটা, হাতে আধ খালি মদের বোতল টা হাটার তালে তালে আগুপিছু করছে।
 
  মাথাটা হালকা ঝুকে আছে ছেলেটার,
 সামনে ঝাকড়া চুলগুলো চোখ দুটোকে ঢেকে দিচ্ছে বার বার!
 
মাতাল নাকি ছোকরা!
হাটতে হাটতে পেছনে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো সুহাস। আগের রাতে এই ছেলেটাই টিজ করেছিলো প্রীতুকে। মনে হতেই রাগে শক্ত হয়ে গেলো সুহাসের হাতের মুঠো।
হাটতে হাটতেই আবার পেছনে তাকালো ও।
 
 
 
বাসায় ফিরতেই অবশ্য মনটা খুশিতে নেচে ওঠলো সুহাসের। সব ওর পছন্দের খাবার রান্না করেছে প্রীতু! মেয়েটাকে এজন্যই এত ভালোবাসে ও।
 
 
খেয়েদেয়ে শুয়ে আছে দুজন। প্রীতুকে কাছে টানলো সুহাস।
 
– আচ্ছা প্রীতু, মানুষের মৃত্যু সর্বোচ্চ কতটা দ্রুত হতে পারে বলে তোর মনে হয়?
 
– আমি কি করে বলবো! কিভাবে মরছে তার উপর হয়তো নির্ভর করবে।
 
– আচ্ছা, মনে কর একটা মাতাল পানিতে পড়ে গেলো পা পিছলে, বোতলটা আগে পানি দিয়ে ভরবে নাকি মাতালটার পেট?
 
     অনেক আগে আমাদের গ্রামে একবার এমন হয়েছিলো বুঝলি। সকালে সবার এটা নিয়ে সে কি জল্পনা কল্পনা! হাহ হাহ হাহ…
 
– আহ রাত দুপুরে মৃত্যু নিয়ে এমন রসিকতা করোনা তো!
       বিরক্ত হলো প্রীতু। যেনো ভয়েই আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে।
 
 
 
তীব্র কলিংবেলের শব্দে ধড়মড় করে ওঠে বসলো সুহাস। এত সকালে আবার কে এলো!
 
দরজা খুলে দেখে একজন সামনে দাড়িয়ে। গায়ে পুলিশের পোশাক।
 
-কি ব্যাপার?
 
– আপনি সুহাস ভৌমিক?
 
-জ্বি! কেনো?
      একটু অবাক হলো ও। ওর কাছে এদের কি কাজ!
 
– আপনার সাথে কিছু কথা ছিলো। গত সন্ধ্যায় কোথায় ছিলেন আপনি?
 
– ছয়টা নাগাদ অফিস থেকে বাসায় ফিরেছি! কেনো কি ব্যাপার?
 
– কেও পিছু নিয়েছিলো আপনার?
 
– জানিনা! আমার বাসায় ফেরার তাড়া ছিলো।
 
– গতরাতে একজন মারা গেছে।
পুকুরে ডুবিয়ে মারা হয়েছে তাকে। তার সাথের সঙ্গীরা সর্বশেষ আপনার পিছু পিছু যেতে দেখেছিলো ওকে, ওরা সবাই বয়ান দিয়েছে।
 
আপনাকে আমার সাথে একটু থানায় যেতে হবে এখুনি….
 
– “কি হয়েছে! ও কেনো থানায় যাবে?”
            কথাবার্তার শব্দে প্রীতু উঠে এসেছে ততক্ষনে। অফিসারের শেষ কথাগুলো কানে গিয়েছে ওর।
 
– আপনি? মিসেস সুহাস…?
 
-জ্বি, কি করেছে আমার হাসব্যান্ড!
 
– হয়তো তেমন কিছুই না। আপনি কোনো চিন্তা করবেননা, এটা একটা রুটিন ওয়ার্ক ভেবে নিন।
     “আর তাছাড়া…..”
            প্রীতুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলালো অফিসার,তেলতেলে হাসি দিলো একটা।
                “আমরা তো আছিই, চিন্তার কিছু নেই,জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আমিই আবার উনাকে পৌছে দেবো।” প্রীতু অজানা একটা ভয়ে থমকে গেলো একদম।
 
 
অফিসার তখন সুহাসের দিকে ফিরেলো,
 
– আমি গাড়িতে বসছি, আপনি একটু জলদি আসুন।
 
অফিসার সরে যেতেই প্রীতু জড়িয়ে ধরলো সুহাসকে। কেঁদে ফেললো ভয়ে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো সুহাস,
 
– লোকটা কেমন বাজে ইঙ্গিত করে গেলো তোকে!
 
তুই একটুও ভাবিসনা আমি যাবো আর আসবো। তোর দিকে যে বাজে নজর দিলো শেষ করে দিয়ে আসবো একদম।
 
– মানে!
       প্রীতুর পানিমাখা চোখে অবিশ্বাস।
 
-হুম, তোকে ভালোবাসি আমি। তুই শুধু আমার। অন্য যেই হোক সে, তোর দিকে খারাপ নজর দিলে মরতেই হবে। তুই কি ভেবেছিস এমনি এমনি পাইপ বেয়ে উঠতাম আমি? প্র্যাক্টিসটা ঝালাই করে নিচ্ছিলাম আসলে, দোতলা বেয়ে ওই হোৎকা টার মদে বিষ মিশিয়ে আসা মোটেও কঠিন ব্যাপার ছিলোনা।
 
 জানিস তো, তোর জন্য সব করতে পারি আমি প্রীতু!
 
   এখন থাক, এই শালাকেও শেষ করে আসি। চিন্তা করিসনা,
  কোনো প্রমাণ থাকবেনা এটায়ও। ফিরে এসে ওই ছোকড়াকে কিভাবে খুন করলাম সেই গল্পটা বলবো…।
 
 
 
 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

প্রতিশোধ -পর্বঃ ৪

Tondra Bilashi

পুরানো তিমির [১ম পর্ব]

Ikram Jahir

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৪)

Prashanta Deb

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy