অন্যান্য (U P)

জীবন ছায়াহ্ন

” একসময় দশ গ্রামের মধ্যে খুব নাম ডাক ছিল আমাদের। কিন্তু ৭০ সালের বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। এমনকি নাম ডাকও। তবু ভেঙে পড়িনি আবার উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছি। অভাবী সংসার তার উপর পাঁচ সন্তানের ভরণ পোষণ অসম্ভব হয়ে পড়ল বাবার পক্ষে। এতগুলো মানুষের দুবেলা খাবার জোগাড় করাই কষ্টসাধ্য হয়ে গেল। বাবা তখন স্কুল শিক্ষক ছিলেন কিন্তু খুব সামান্য কিছু টাকাই পেতেন বেতন হিসেবে। আমিই ছিলাম বড়। আমি মেট্রিক পরিক্ষা দিয়েছি আর কলেজে পড়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলাম। কিন্তু স্বপ্ন ভেঙে যায় যখন দেখতাম মা ছেড়া শাড়ি পরে কাজ করছেন, সবাইকে খাওয়ানোর পরে শুধু পেয়াজ মরিচ টিপে ভাত খাচ্ছেন আর বাবাও হতাশ হয়ে ভেঙে পড়ছেন দিনে দিনে। আমি ভুলে গেলাম কলেজে যাওয়ার স্বপ্ন। একরকম জোর করে টিউশনি শুরু করি। দূর দূরান্তে টিউশনি করে বেড়াতাম তারপর লজিং থাকা শুরু করলাম। নিজের কোনরকম চলার খরচ রেখে বাকী টাকা বাড়িতে দিয়ে আসতাম। আর বাড়ি থেকে বিদায় নেবার সময় মায়ের আমায় জড়িয়ে সে কি কান্না ! আমার ছোট্ট মুখখানা ছুঁয়ে কত আদর… আর কত উপদেশ দিতেন ! বাবা খুব শক্ত আর গুরুগম্ভীর মানুষ ছিলেন তবু আমাকে বিদায় দিতে চোখ কেমন ছলছল করে উঠত তবু বাঁধা দিতেননা।

টিউশনি করাতে গিয়ে আস্তে আস্তে লোকের ভালবাসা অর্জন করলাম তারপর অনেক কষ্টে এবং চেষ্টায় প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলাম কিন্তু বেতন ছিল কম। একটি মাত্র চটি, দুটি পাজামা, দুটি পাঞ্জাবী আর একটি লুঙ্গি এই ছিল আমার কাপড়। তাও সেলাই করে করে পড়তাম। গ্রাম থেকে অনেক দূরে ছিল আমার স্কুল। সপ্তাহে একদিন করে আসতাম বাড়ি… চটি হাতে নিয়ে পাঁয়ে হেঁটে আসতাম। চটি শুধু স্কুলে পড়ে যেতাম আর দরকার না হলে পড়তাম না। খালি পাঁয়েই হাঁটতাম কারণ চটি ছিড়ে গেলে কেনার সামর্থ্য ছিলনা আমার। দেখতে দেখতে সময় পার হতে লাগল কিন্তু সংসার ভালভাবে চালানো তবু মুশকিল। কারণ ভাই বোনগুলোর পড়ালেখার খরচ, বাবাও চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছেন ! বয়স বাড়ছে শরীরে কুলাচ্ছিলনা বলে। উপায় না পেয়ে আমি আরো জোরে দৌড় শুরু করলাম ! অভাব জয় করতে পাগলা ঘোড়ার দৌড় !

একটি সরকারী চাকরীতে ছোট পোষ্টে জয়েন করলাম আর অফিস শেষে আবারও টিউশনি করাতাম। নিজের দিকে তাঁকাতে সুযোগই পাইনি আমি ! আস্তে আস্তে অভাব দূর হতে লাগলো বোনদের বিয়ে দিলাম ভাইদের শিক্ষিত করলাম। তাঁরা এখন নিজেরাই বড় বড় চাকরী পেয়ে দূরে চলে গেছে….। এর মাঝে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে জীবনের !

একাকীত্বের জীবনে সঙ্গী করলাম গ্রামের সরল এক মেয়েকে, বাবার বন্ধুর মেয়ে সে। বাবার ইচ্ছে ছিল তাই তাঁর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলাম। আর সত্যিই এই সরল মেয়েটিই একমাত্র আমায় আগলে রেখেছে, আমায় ছেড়ে যায়নি কষ্ট দেয়নি ! শত কষ্ট ঝড় ঝাপ্টায়ও সে পাশে থেকেছে আমার !

বাবার ভিটেমাটি, বাবার বাড়ি ছেড়ে থাকতে পারবোনা বলে চাকরী থেকে অবসর নিয়ে এখানেই কাটাচ্ছি জীবন। সাথে শুধু আমার স্ত্রী। আর দুই মেয়েকে কাছাকাছিই বিয়ে দিয়েছি। ভালো আছে ওরা।

কিন্তু আমি ভাবতাম অন্যকিছু। হয়ত আমার ভাবনাতেই ছিল ভুল ! নিজের মত করে সারা দুনিয়াকে বিচার করেছিলাম কিন্তু সেটাই ভুল আমার !

আমি নিজেকে মানুষ নয় একটি যন্ত্রের মতন পরিচালনা করেছি। এই ভেবে জীবনে বিশ্রাম অথবা আরাম আয়েশের চিন্তাও করিনি যে, আমি বেলা শেষে খেঁটে খেঁটে ক্লান্ত হয়ে একদিন আমার সুখের বাড়ি ফিরে আসবো ! তখন আমার সন্তানতূল্য ভাইবোনগুলো আমায় জোর করে আরামের কেদারায় বসাবে। বাপ দাদার সেই কেদারায় সারাদিন বসে বসে আমি আরাম করব আর ভাইবোনগুলোর হৈ হুল্লোড় দেখে সুখের হাসি হাসবো.. ব্যাস ! কিন্তু আমার পুরো বাড়ি আজ ফাঁকা, শূণ্য আমার আঙিনা ! কোথায় গেল আমাদের শৈশব? সবার খুশিই তো আমার খুশি ছিল তবু আমার খুশি বুঝি অন্য কারোর নয় ! হয়ত আমারই ভুল অভিমান আর ভুল অহংকার !

বাবা মা চলে গেছেন এখন হয়ত আমার যাবার পালা। কোন আফসোস নেই, কষ্ট নেই কিন্তু শুধু একটাই চিন্তা ! আমার সরল টুকটুকে বউটিকে কার কাছে রেখে যাবো..? ও যে এখনও আমি ছাড়া একদমই অচল !”

 

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

এরিয়া ৫১ঃ যার পুরোটাই রহস্য

Kazi Mohammad Arafat Rahaman

নারী ছলনাময়ী না সাবধানীঃ নারী দিবস ২০১৮

Kazi Mohammad Arafat Rahaman

ভয়ঙ্কর সুন্দর গ্রাম ! শুধু গল্প নয় বাস্তবতাও বটে !

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy