Now Reading
সাইকো গল্প: কথোপকথন



সাইকো গল্প: কথোপকথন

চোখ খুলেই টকটকা লাল ফ্রেমের দেয়াল ঘড়িটায় নজর গেলো আমার।
রাত তিনটে পঁচিশ।।
অবশ্য ঘড়ির দিকে না তাকালেও সময়টা একদম হুবহু বলে দিতে পারতাম।
গত একটা বছর ধরে যে একই ব্যাপারে পূনরাবৃত্তি হয়ে আসছে!
পাশ ফিরে আস্তে করে ওকে ধাক্কা দিলাম।
 -এই শুনছো, এই! একটু উঠোনা, ঘুম ভেঙে গেছে আমার।
জানি, মাঝ রাতে এমন করে ডেকে তুললে রেগে কাঁই হয়ে যায় একদম ও। কিন্তু এত রাতে একা একা জেগে থেকে আমিই বা করবো কি? তারচে বরং ওর ঘুম ঘুম চোখের দিকে তাকিয়ে গল্প করতে যে বড্ড ভালো লাগে আমার!
-হ্যা গো!
তোমার সেই ছোট্টবেলার কথা মনে আছে? আমারতো বেশ মনে আছে। প্রথম যেদিন তুমি স্কুলে এলে লাল টকটকে একটা টি শার্ট আর আটশাট জিন্স পরে, জানো সেদিনই তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। ছেলে মানুষ এত ফর্সা হয় তোমাকে না দেখলে জানতামই না!
আমরা তো ভেবেছিলাম তুমি বুঝি বিদেশ থেকে এসেছিলে!
উহ, তোমার সেকি দেমাগ ছিলো প্রথম কয়েকটা মাস!  পরে যখন দেখলে স্কুলের কেওই তেমন আগ বাড়িয়ে মিশছে না তোমার সাথে তখন তুমিও নরম হলে একটু একটু।
জানো, প্রথম যখন রিমোর সাথে হেসে হেসে কথা বলতে দেখেছিলাম কি যে রাগ লেগেছিলো আমার! তখনও বুঝিনি ওটাই প্রেম! অবশ্য ক্লাস টেন পড়ুয়া একটা মেয়ের এসব বুঝার বয়সই বা কি করে হবে তখন।”
কথা বলতে বলতে ওর দিকে তাকালাম। চোখ দুটো খুলে রেখেছে কিন্তু কেমন যেনো প্রাণহীন!
বেচারা চোখ খুলেই ঘুমিয়ে পড়েছে আবার! আস্তে করে ওর কপালে হাত রাখলাম,
– “এই ঘুমিয়ে পড়েছো আবার? একটু জেগে থাকোনা প্লিজ! এতটা রাত একলা জেগে জেগে কি করবো আমি!”
মানুষটা হা করে আবার বেঘোরে ঘুমুচ্ছে!
ওর মুখের দিকে তাকিয়ে
মনে পুরনো স্মৃতিগুলো ভেসে ভেসে আসছে আমার।
– “এই শুনো!
কলেজে একদিন প্রচন্ড বৃষ্টিতে কেমন পাগলামো করেছিলে তুমি, মনে আছে তোমার?
  বৃষ্টিতে ভিজে, কোথা থেকে যে সাদা পাঁচটা বেলির মালা নিয়ে এসেছিলে!
ইশ!
কেমন রোমান্টিক ছিলে গো তুমি!
ভাবলে এই এখনো বুড়ো বয়সেও লজ্জা পেয়ে যাই জানো!
সত্যি!
এমন নির্জলা ভালোবাসা সবাই পায়না কিন্তু। কলেজে তো সব মেয়েরা তোমাকে নিয়ে আমায় কত হিংসা করতো তুমি যদি বুঝতে!
আমারতো তখন প্রতিদিনই মনে হতো বুঝি ঈদ!
ও শুনো, সেদিন বাজারে গিয়ে নীলার সাথে দেখা হলো।
ওকে মনে আছে তোমার? ওইযে, ম্যাথ প্রাইভেটে প্রতিদিন খাতার ভেতর একটা করে চিঠি পেতে যে তুমি। এই নীলাই করতো এসব।
ন্যাকা একটা!
এতদিন পরও যেমন তেমনই রয়ে গেছে একদম।
     খুব করে চাইছিলো তোমার সাথে দেখা করতে, আমিই নিষেধ করেছি। বলেছি তুমি বাসায় নেই।
 বলা যায়না বাবা,
 তখন তো শুধু চিঠি লিখতো এখন আসলে হয়তো আর যেতেই চাইবেনা।
     লাস্যময়ী বুড়ি বদমাশ একটা!!
আর ওকেই বা দোষ দিয়ে কি হবে, তুমি নিজেও কি কম যাও? গত বছরের কথা ভুলে গেছি ভেবেছো?
ভার্সিটির স্টুডেন্ট, থিসিস করছে, হেল্প লাগবে, হ্যানো ত্যানো বলে বাসায় নিয়ে আসতে যে মেয়েটাকে ভেবোনা ভুলে গেছি সেসব।
দুতলার স্টাডিরুমে বসে যে কিসব নিয়ে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করতে আর হাহাহিহি করতে দেখলাম তো কয়টা মাস।
বজ্জাত মেয়েছেলে!
একেতো টিচার তায় আবার বাপের বয়সী লোক, তার সাথেও মাখামাখি করতে হবে তোদের?
   এই এখন নাক ডেকে ঘুমুনো হচ্ছে না? একদম ঘুমাবেনা বলে দিলাম, শুনতেই হবে এসব।
সারাটা জীবন হাড় কালি করে দিয়েছো আমার, এখন আমার সময়। সব শুনতে হবে মুখ বুজে।”
ঘড়ির দিকে তাকালাম, চারটে দশ। ওর দিকে তাকিয়েও চারটে দশের রেশটা লেগে থাকলো যেনো আমার মনে!
ওর একটা কথা মনে পড়ে গেলো,
    “তোমার সাইকোলজি বুঝা একেবারেই অসম্ভব মুক্তা। তোমার উচিত একবার ডঃ সিফাতের সাথে দেখা করা।”
হতচ্ছাড়া বদমাশ লোকটা।
সময়ে সময়ে সিফাতের কথা তুলে আমাকে খোঁচা না মারলেই নয় যেনো। অথচ এই সিফাতের সাথেই উপরে উপরে নিজের কেমন ভালো সম্পর্ক! পুরুষ মানুষগুলো বুঝি এমনই হয়!
আর ওই বদমাশটা!
জানতো ওর সাথে সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিলোনা আমার, সেই সুযোগটাই নিলো। দুজন মিলে ঘুরতে যাওয়ার নাম করে পাবনা নিয়ে গেলো,তারপর হেমায়েতপুর! কিছুই ভুলিনি আমি।
তবে হ্যা, প্রাকৃতিক পরিবেশের দিক থেকে হলেও জায়গাটা অসাধারন!
এত সুন্দর জায়গা অথচ আমাকে কিনা আটকে রাখলো ওরা!
মনে পড়তেই আবারো পুরনো রাগটা বুকের ভেতরটায় খাঁমচে ধরলো আমার। জোরে ধাক্কা মারলাম ওকে,
 – “ওঠ্। নিজের কুকাজ গুলোর ফিরিস্তি শুনবিনা? কি কি করেছিস এই জীবনে?
ভালোবাসার মানুষটাকে সিজোফ্রেনিয়ার রোগী বলে আমারই পুরনো প্রেমিকের সাথে হাত মিলিয়ে রেখে এসেছিলি! একটুও লজ্জা করেনি তোর?
ছিহ! ভাবলেই কেমন ঘেন্না ধরে যায় গায়ে।
 এই তোর জন্যই কিনা বাবা-মা, ভাই-বোন সব ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলাম আমি!
 ভেবেছিলি তোদের মতলব বুঝিনি আমি? প্রতিশোধ নিচ্ছিলি আমার উপর? তোর সন্তান না হওয়ার প্রতিশোধ আর সিফাতের সাথে ঘর বাঁধার পরও ছেড়ে আসার প্রতিশোধ!
 আমায় শত্রু বানিয়ে তোরা দুজন হয়ে গেলি গলায় গলায় ভাবের ভাই!
কি আশ্চর্য পুরুষ মানুষ রে তোরা!
ভেবেছিলি কিছুই বুঝিনি?
তোদের এই ধারনাটাই ভুল ছিলো। আমি ঠিক জানতাম আমায় কি করতে হবে। পুরুষকে টেক্কা দেয়ার জন্যই নারীর সৃষ্টি জানিস না?
 ঠিক ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় স্বসম্মানে ফিরে এলাম আমি। ওখানে যখন ২২৫ নম্বর রুমটায় অন্ধকার নেমে আসতো বসে বসে ছক কাটতাম আমি। তারা গুনে গুনে অযথাই সময় কাটানোর মতো বোকা মেয়েমানুষ আমি নই। ঠিক জানতাম আমাকে সবার সামনে কেমন ব্যবহার করতে হবে।
ভার্সিটিতে তোর থিয়েটারে আমিও কাজ করেছিলাম ভুলে গিয়েছিলি নাকি?
একটু আধটু অভিনয় করা, ভার্সিটির চব্বিশ ব্যাচের এই সেরা অভিনেত্রীর কাছে তো ডাল-ভাত!
আর হেমায়েতপুরের ওই পাগল ডাক্তারগুলোর তিন বেলার ওসব গরুর টেবলেটের আসল জায়গা যে জানলার পাশের ডোবা টা তা বুঝে নেয়া পাগলের পক্ষেও অসম্ভব নয়!
 আর আমি তো একেবারে সুস্থ্য মানুষ।
 তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তোদের দুটোকে দেখে নেবো আমি।
  ফিরে এসে সিফাতকে হাত করা এমন কঠিন কিছুই ছিলোনা। এমনিই তো ফিদা ছিলো আমার প্রতি, হেসে দুটো মিষ্টি বোল ছাড়তেই গলে গেলো! তোদের পুরুষ মানুষের জাতটাই বুঝি এমন!
বয়স দেখিসনা, রঙ্গ দেখলেই মজে যেতে হবে।”
রাগটা কোনোভাবেই কমছেনা আমার। এত কিছু বললাম লোকটার কোনো সাড়া শব্দই নেই! চোখ দুটো খুলে রেখেই সমানে ঘুমিয়ে যাচ্ছে!
– “আজ তোমাকে কথা বলতেই হবে। গত একটা বছর ধরে একই আচরন করে যাচ্ছো আমার সাথে! কি পেয়েছোটা কি তুমি? আজ সব কিছুর জবাব চাই আমার!”
পাশ ফিরে ওর মুখের উপর ঝুকে বসলাম।
 হাত বাড়িয়ে ওর মাথার পাশ থেকে ছুরির বাট টা ধরলাম চোখের সামনে।
লালচে রঙের মরিচা জমাট বেঁধে আছে ওটার সারা গায়ে। উল্টো করে ধরে খোঁচা মারার মতো লাগালাম ছোরা টা ওর বাহুতে, ঠুন ঠুন শব্দ হলো।
হাঁড়ে হাঁড়ে বাড়ি লাগলো যেনো!
মাথাটা একদম ঝুকে ওর মুখের কাছে নিয়ে গেলাম। খুব খুউ–ব কাছে। চোখের কোটর দুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি এখন।ফিসফিসিয়ে বললাম,
     – “এত নিশ্চিন্তে কি করে ঘুমাও বলো আমাকে! আসলেই কি আর ভালোবাসোনা আমাকে তুমি?
বলো?”
      তবুও নিশ্চুপ পাষাণ রইলো মানুষটা!
রাগে চিৎকার করলাম আমি-
– “কি হলো! বলো…..?”
অকষ্মাৎ চিৎকারেই কিনা একটু নড়ে উঠলো ওর শরীরটা। জবাবের অপেক্ষায় মুখটা আরোও ঝুকে ওর চোখে চোখ রাখলাম আমি।
 খস খস করে একটা লাল পিঁপড়া বেরিয়ে এলো ওর চোখের কোটর থেকে!
ও আগের মতোই রইলো,
চুপচাপ,
অঘোরে ঘুমিয়ে!!
আমি আবারো অনুভব করলাম,
ভালোবাসা!
তুই বড্ড নিষ্ঠুর!!!
About The Author
Maksuda Akter
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment