পুরানো তিমির [৯ম পর্ব]

Please log in or register to like posts.
News

খুব সকালে বিছানা ছেড়ে উঠলাম।বাইরে কাঁকডাকা ভোর।আবছা অন্ধকারের ধার বেঁয়ে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের ডাল।কালো কালো মেঘ গুলো এদিক সেদিক ভেসে বেড়াচ্ছে।আজ মনে হয় বৃষ্টি হবে।এমন মেঘলা সকালে আমি ঘুম থেকে উঠেই বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।বৃষ্টির গুটি গুটি ফোঁটা শরীরে নরম পরশ বুলাচ্ছে।আশার বাড়িতে গিয়ে কোন লাভ হবে না জানি।কাল রাতেই খোঁজ করে দেখেছি কেউ নেই।তবু একবার গেলাম।মানুষের পরিকল্পনা গুলো যখন অগোছালো থাকে তখন মানুষ খুব বেশি উদ্দেশ্যহীন কাজ করে।আমারও তাই হচ্ছে।আশা মেয়েটাকে কোথায় খুঁজবো,কোত্থেকে খোঁজা শুরু করব কিছুই জানি না।জানলে না হয় কিছু একটা পরিকল্পনা সাজান যেত।শুধু জানি মেয়েটাকে খুঁজে পেতে হবে।যে ভাবেই হোক পেতে হবে।উদ্দেশ্যহীন ভাবে,যখন যেখানে মন চাচ্ছে খুঁজছি।ভাগ্যে থাকলে হয়ত পেয়েও যেতে পারি___মনের ভিতর এমন একটা সম্ভাবনা।নিজের মায়ের জন্যে একটা মেয়েকে খুঁজে বের করতে পারব না,এমন পরাজয় মেনে নেয়া কঠিন।

আশার বাড়ির সামনে গিয়ে ভিতরের দিকে উঁকি দিলাম।উঁকি দিয়ে মোটামুটি চমকে উঠলাম।আজ আশার ঘরের দরজাটা খোলা।কোন তালা ঝুলান নেই।আমি মনে মনে কেমন একটা প্রশান্তি অনুভব করছি।গভীর সন্তর্পনে,নতুন একটা আশায় নিশ্চুপে বাড়ির ভিতরে পা দিলাম।দরজায় কড়া নাড়তেই আজিজুর রহমান সাহেব দরজা খুলে বেরিয়ে আসলেন।মুখখানা বিমর্ষ,তবু আমাকে দেখে মুচকি হাসার চেষ্টা করলেন।সৌজন্য সূচক ভদ্র হাসি।আমিও মুচকি হাসলাম।এসব হাসির কোন অর্থ নেই।তবু হাসতে হয়,এটাই নিয়ম।

নাকের ডগায় ঝুলে থাকা চশমাটা ঠিক করতে করতে আজিজুর রহমান বললেন, “আরে…ভাইসাব কেমন আছেন? আপনার টাকা পেয়েছেন?”

উনার প্রশ্ন শুনে একটা ধাক্কা খেলাম।সামান্য একদিনের কিছুক্ষণের আলাপচারিতায় এই লোকটা আমাকে মনে রেখেছে!তার স্মরণশক্তি এত তীক্ষ্ণ!এত স্পষ্ট!

আমি আবার মুচকি হেসে ধাক্কাটা সামলে নিলাম।তারপর হাসি মুখে বললাম, “জ্বি পেয়েছি।আজ সকালে টাকা নিতে এখানে এসেছি।ভাবলাম আপনার সাথে একবার দেখা করে যাই।সাথে টাকা পাওয়ার খবরটাও দেয়া হল।“

তিনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন।তার প্রমান মুখের হাসি।মুখে একটু আগের বিমর্ষ ভাবটা আর নেই।প্রাণ চঞ্চল,যেন জেল্লা ফিরে এসেছে।আমাকে নিয়ে তিনি ভিতরে ঢুকলেন।সোফার দিকে ইশারা করে বসতে বললেন।

আমি বসলাম।

আজিজুর রহমান ভিতরে চলে গেলেন।ফিরলেন অনেকক্ষণ পর।হাতে এক গ্লাস বেলের শরবত।তাতে দুই টুকরো বরফ কুচি দেয়া।আমার দিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,”আপনি জার্নি করে এসেছেন,নিন ঠান্ডা শরবত খান।ভালো লাগবে।“

আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম।লজ্জিত কণ্ঠে বললাম,”আমার জন্যে এত কষ্ট করছেন কেন?”

তিনি চওড়া একটা হাসি দিয়ে বললেন,”এক গ্লাস শরবত বানাতে হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয় না ভাই।“

“এইটুকুই বা করবেন কেন?অপরিচিত লোক,কোথাকার কে……”

আজিজুর রহমান শান্ত কণ্ঠে বললেন, “মানুষকে ভালোবাসলে অতৃপ্ত প্রাণে তৃপ্তি আসে।“

 

দার্শনিকদের মত একটা বাণী দিয়ে ভদ্রলোক আবার ভিতরে চলে গেলেন।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম।সুন্দর একটা উক্তি____মানুষকে ভালোবাসলে অতৃপ্ত প্রাণে তৃপ্তি আসে।কথাটা শুনে মুগ্ধ হলাম।তারমানে যে ভালোবাসতে জানে তার মনে কোনদিন অতৃপ্তি,অশান্তি আসবে না।যে ভালোবাসতে জানে তার মন চির প্রশান্ত।

 

ভদ্রলোককে যত কাছ থেকে দেখছি ততই অবাক হচ্ছি।তার অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হচ্ছি বারবার।অথচ এই লোকটাই রাত হলে বউ পিটায়।নিজ চোখে না দেখে কেউ কি একথা বিশ্বাস করবে?করবে না।মানুষের রাগ উঠলে মানুষ হিংস্র হায়না হয়ে যায়।রূপ বদলে যায় মুহূর্তে।এই পৃথিবী কত বিচিত্র……কত ভারসাম্যহীন!

 

ভদ্রলোক দ্বিতীয়বার ফিরে আসলেন দুই কাপ চা হাতে।একটা কাপ আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন, “নিজে বানাতে হয়েছে তো তাই আসতে একটু দেরি হল।আপনাকে একা বসিয়ে রাখলাম।কিছু মনে করবেন না।“

আমি মুচকি হেসে বললাম,” না না কিছু মনে করব কেন?………আপনি চা বানালেন……আপনার স্ত্রী বাসায় নেই?”

“না নেই”,লোকটা একটা ভারী নিশ্বাস ফেললেন।

আমি মনে মনে দুঃখিত হলাম।এবারও তাহলে আশাকে পাওয়া যাচ্ছে না।শুরুতে মনে একটা ক্ষীণ আশা জন্মেছিল,হয়ত এবার পেয়ে যাব।পেলাম না।

আমি মুখে কৃত্রিম হাসি টেনে বললাম, “বাবার বাড়ি বেড়াতে গেছে না কি?”

লোকটা গম্ভীর মুখে জবাব দিলেন, “না…”

কিছুক্ষণ দু’জনেই নিরব ছিলাম।চা শেষ করে ভদ্রলোক শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আমার বউ বাবার বাড়ি যায় নি।অন্যকোন আত্মীয় স্বজনের বাড়িও যায় নি।এমন পরিস্থিতিতে আপনি হলে কি বলতেন? আমার বউ উদাও হয়ে গেছে____এমন কিছু?”

ভদ্রলোকের প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গেলাম।কি উত্তর দিব বুঝতে পারছি না।আশা মেয়েটা তাহলে কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে?ভেবেছিলাম কথার ছলে আজিজুর রহমানের কাছ থেকে শশুর বাড়ির ঠিকানা জেনে নিব।এখন সেই ঠিকানাও বেশি কাজে আসবে না।ভদ্রলোক নিজেই তার বউ কে খুঁজে পাচ্ছেন না।

 

আমাকে চুপ থাকতে দেখে ভদ্রলোক রসিকতা করে বললেন, “কি?এই উত্তর আপনারও জানা নেই?হা হা হা…পৃথিবীতে সব উওর মানুষের জানতে হয় না।সবকিছু জেনে গেলে বাঁচার আগ্রহ হারিয়ে যায়।“

 

ভদ্রলোক অনবরত একটার পর একটা দার্শনিক টাইপ ভাব-গম্ভীর কথা বলে যাচ্ছেন,আর আমি মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে শুনছি।শেষমেশ একটু আগ্রহ নিয়ে প্রশ্ন করে বসলাম,”আপনাদের মাঝে কোন ঝগড়া হয়েছে নাকি?……দুঃখিত,ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম।রাগ করেন নি তো আবার!”

“না…রাগ করব কেন?কোন সংসারে ঝগড়া হয় না বলুন তো!কিন্তু ঝগড়া হলেই তো বউ নিরুদ্দেশ হয় না।নিরুদ্দেশ হওয়ার জন্যে বড় ধরনের ঝামেলা হতে হয়।“

 

আমি তাকিয়ে আছি আজিজুর রহমানের দিকে।তাদের মাঝে কি বড় ঝামেলা হয়েছে,সে প্রশ্ন করব কি না ভাবছি।নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন করা চরম অভদ্রতা।

তিনি শান্ত স্বরে বললেন,”ভাইসাব আমি মানুষ ভালো না।খুবই বদলোক।বউ পিটাই।বউ পেটান মানুষ কোনদিন ভালো হয় না।“

 

ভদ্রলোকের শেষ কথায় আমি পুরো হতভম্ভ হয়ে গেলাম।চুপচাপ বসে আছি।ভদ্রলোককে বুঝতে আমার কষ্ট হচ্ছে।আমি তার নিতান্ত একজন অপরিচিত মানুষ।আর তিনি আমার কাছে হর হর করে নিজের দোষ-ত্রুটি,সংসারের ঝামেলা সবকিছু বলে দিচ্ছেন!লোকটা সামান্য হলেও অগোছালো,নির্বোধ এই কথা ভাবা খুব বেশি ভুল হবে না।

 

আমি বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম,”অনেকক্ষণ সময় কাটান হল।ভাই এবার যেতে হবে।আপনার সাথে কথা বলে ভালো লাগলো।আসি…”

বলতে বলতে আমি বাইরে বেরিয়ে পড়লাম।ভদ্রলোক আমার সাথে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন।আমি যখন বাড়ির গেইট দিয়ে বের হব তখন,তিনি পেছন থেকে ডাক দিলেন,”ভাইসাব…”

আমি ফিরে তাকালাম।ভদ্রলোক করুণ গলায় বললেন,”বউ কে পিটাই বলে যে ভালোবাসি না এমনটা নয়।পাষাণের মনেও ভালোবাসা লুকিয়ে।“

 

কথাটা শুনে এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে গেলাম।ভালোবাসা কি এই পৃথিবীর সব চেয়ে রহস্যময় শব্দ?আবেগ উতলে উঠা উত্তাল ঘূর্ণিঝড়!বাইরে মেঘলা আকাশ,আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি,আজিজুর রহমানের চোখ ছলছল করছে____করুণ রোদনের বৃষ্টির মত।

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?