পুরানো তিমির [১০ম পাঠ]

Please log in or register to like posts.
News

 

আজিজুর রহমানের বাড়ি থেকে সোজা ক্লিনিকে ফিরে এলাম।মায়ের ঘুম ভেঙ্গেছে।তিনি হেলান দিয়ে বসে আছেন বিছানায়।মাথার কাছে শেফা দাঁড়িয়ে আছে পায়সের বাটি নিয়ে।আমাকে দেখে মা একটু বিরক্ত হলেন।আমি এখনো এখান থেকে যাচ্ছি না কেন,এটাই সেই রাগের কারণ।মা’র সাথে কোন কথা না বলে চলে এলাম বারান্দায়।বাবা বসে আছেন শেফার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে।বাবার সাথে আশাকে নিয়ে কথা বলার সাহস কোনদিন হয় নি।তবু আজ কথা বলার সাহস নিয়ে সামনে গিয়ে বসলাম।বাবা আমার দিকে খেয়ালও করলেন না।এক মনে বারান্দার ফাঁকে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছেন।ডুবে আছেন একটা চিন্তার ঘোরে।আমি কাছে ঘেঁষে কোমল গলায় ডাক দিলাম।

“বাবা…”

“হু…”

বাবা আমার দিকে তাকালেন।শান্ত,নিমীলিত স্থির চোখ।দেখলে মায়া লাগে।

“নাস্তা করেছ বাবা?”

বাবা মুখ দিয়ে কিছু বললেন না।শুধু না সূচক মাথা নাড়লেন।আমি বললাম,“বেলা অনেক হয়েছে।কিছু খেয়ে নাও বাবা?”

বাবার ভাবের কোন পরিবর্তন হল না।তিনি আগের মতই বসে আছেন।আমি আশার কথাটা বলতে গিয়েও বললাম না।গলায় কেমন যেন আটকে গেল।এমন ভারসাম্যহীন মানসিক অবস্থায় কথাটা তুলতে বিবেকে বাঁধা দিচ্ছে।আমি উঠে দাঁড়ালাম।বারান্দার দরজায় দিয়ে যখন বের হব তখন বাবা খুব ক্ষীণ স্বরে ডাক দিলেন, “আহাদ……”

আমি ফিরে তাকালাম।বাবা আহত কণ্ঠে বললেন,”আশার কোন খোঁজ পেয়েছিস?”

আমি চমকে উঠলাম।আমি যে আশাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি এই কথা কাউকে বলি নি।এমন কি শেফাকেও না।বাবা টের পেলেন কিভাবে সেটা নিয়ে একটু ভাবলাম।পিতামাতাদের কাছে কি স্রষ্টা ঐশ্বরিক কোন ক্ষমতা দিয়ে রাখেন?উনারা কেমন করে জানি সন্তানের মনের অবস্থা বুঝে যান।আমি যখন বাবা হব,তখন আমিও কি সন্তানের মন এমন করে বুঝে যাব?

 

বাবার দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি।বাবা দ্বিতীয় বারের মত প্রশ্ন করলেন, “কোন খবর পাস নি?”

“না বাবা।তুমি কিছু জানো?”

“না…” বলতে গিয়ে বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।আমি সোজা বেরিয়ে গেলাম।আসার সময় শেফাকে বলে আসলাম, “বাবাকে কিছু খাইয়ে দিস।“

 

আকাশে মেঘ গুলো আরও বেশি জমাট বদ্ধ হয়েছে।কালো মেঘে ঢেকে গেছে পুরো আকাশ।হয়ত ঝুম বৃষ্টি নামবে।আমি ফুটপাত ধরে হাঁটা ধরলাম।উদ্দেশ্যহীন পথ চলা।যার কোন গন্তব্য নেই।মানুষের মন খারাপের সময় গুলো কেমন অদ্ভুত! মন যখন অশান্ত হয়ে পড়ে,মানুষ তখন উদ্দেশ্যহীন কাজে সান্ত্বনা খুঁজে পায়।

 

হাটতে হাটতে একটা খোলা মাঠ পেলাম।ছোট্ট।তেমন বেশি বড় না।এক কোণায় সারি করে লাগানো কয়েকটা গাছ।সেগুলো ছায়া ছড়াচ্ছে।সেই শীতল ছায়ার পরশে গাছ তলায় কয়েকটা বেঞ্চ দেয়া।আমি একটা তে গিয়ে বসলাম।ঘড়িতে তখন বেলা বারোটার মত বাজে।হাতে কোন কাজ নেই।কি করা যায় ভাবছি।মানুষের কাছে ব্যস্ততা যেমন অসহ্যকর,দম ফেলার সুযোগ থাকে না; তেমনি নিরানন্দ অবসরও অসহ্যকর।একটা বিচ্ছিরি অস্বস্তিতে দিন কাটছে আমার।একবার ভাবলাম ঢাকায় ফিরে যাই।এদিকে যা হবার হবে।আশা মেয়েটাকে যখন খুঁজে পাচ্ছি না,তখন এখানে বসে থেকে কি লাভ?

পরক্ষণেই আবার মন মানে না।মাকে এমন অবস্থায় রেখে যাই কি করে! কিছু একটা বিহিত করতেই হবে।

খুব বড় ভুল করে ফেলেছি।আশার স্বামী থেকে তার সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে আসা উচিত ছিল।আসল নামটা পর্যন্ত জানলাম না।মেয়েটার স্বভাব সম্পর্কে জানলে কিছু একটা অনুমান করতে পারতাম।

 

এসব ভাবতে ভাবতে আমার কি হয়েছে জানি না।চোখ মেলে দেখি সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।চারপাশে আবছা অন্ধকার নেমেছে।মনে করার চেষ্টা করলাম দুপুরে ভাবতে ভাবতে আমি এখানে ঘুমিয়ে পড়েছি।

 

ফুটপাত ধরে পুনরায় ক্লিনিকের দিকে হাঁটা দিলাম।সারাদিন আকাশে মেঘ গুলো গড়াগড়ি খেলে এতক্ষণে বৃষ্টি নামলো।ঝুম বৃষ্টি।আমি বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে হাঁটছি।বৃষ্টির শীতল পরশে কেমন একটা স্বস্তির অনুভূতি আছে।

খেয়াল করলাম,আমার সাথে আরও একজন মানুষ হাঁটছে।পাশাপাশি না।একটু পিছনে।অন্ধকার নেমে এল,তার উপর আবার এমন বৃষ্টি,তাই ভালো করে লোকটার মুখ দেখতে পারছি না।

 

“আজকের এই বৃষ্টি করুণ রোদনের বৃষ্টি…” লোকটা জোর গলায় কথা বলে উঠলো,”এই বৃষ্টিতে মনের অবহেলিত স্মৃতি মনে পড়বে।কান্না পাবে খুব।“

পেছন ফিরে লোকটাকে ভালো করে দেখলাম।আজিজুর রহমান।ভিজে চুপসে আছেন।আমি হাসি মুখে বললাম,”আরে…ভাই কেমন আছেন?বৃষ্টিতে এমন ভিজছেন কেন?অসুখ করবে তো!”

“আপনার অসুখ করবে না?”

“হা হা হা……এদিকে কোথায় যাচ্ছেন?”

“কোথাও না।এমনি হাঁটছি।এমন বৃষ্টি সব সময় হয় না।তাই সুযোগ পেয়ে ভিজে নিচ্ছি।মজা লুটে নেয়ার এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে নেই।“

“ও…আচ্ছা।“

“এখনও ঢাকায় ফিরে যান নি?”

“না,কিছুদিন এখানে থাকব।ভালো লাগছে পরিবেশটা।“

“আপনার কি কাঁদতে ইচ্ছে করছে?ইচ্ছে করলে কেঁদে ফেলুন।“

আমি হকচকিয়ে গেলাম,“কাঁদছে ইচ্ছে করবে কেন?!”

“এমনি…আমার ইচ্ছে করছে,তাই আপনারও ইচ্ছে করছে কি না জানতে চাইলাম।সাধারণ অবস্থায় কাঁদলে মানুষ নানান প্রশ্ন করে।কেন কাঁদছি,কি হয়েছে…হেনতেন।বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কাঁদলে কারও চোখে পড়বে না।তাই বৃষ্টি হলেই আমার কান্না পায়।“

মনের অজান্তে বিড়বিড় করে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল,”অদ্ভুত…!!”

“এই পৃথিবীতে সবকিছুই অদ্ভুত ভাই।“

“আপনি অকারণে কাঁদবেন কেন?”

“সবকিছুর কারণ কি আর আমাদের জানা থাকে বলুন!”

 

আমি চুপ মেরে গেলাম।লোকটার সাথে কথায় পেরে উঠা মুশকিল।কথাটা একেবারে মিথ্যাও না।পৃথিবীর সব ঘটনার ব্যাখ্যা কি আমরা দিতে পারি?সবকিছুর কারণ আমাদের জানা থাকে কি? থাকে না।“

 

আমি আজিজুর রহমানের দিকে হা করে তাকিয়ে রইলাম।তিনি লজ্জিত কণ্ঠে বললেন,”দুঃখিত ভাই,আমি ভুল বলেছি।চোখের জল কোনদিন লুকান যায় না।“

আমি দেখে অবাক হলাম।এই ঝুম বৃষ্টিতেও আজিজুর রহমানের চোখ বেয়ে পড়া অশ্রু আলাদা করে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।কান্নার কি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য!কি বেহায়া!

 

হাঁটতে হাঁটতে ক্লিনিকের সামনে চলে আসলাম।আমি বললাম,”ভাই,গেলাম।আমার এক আত্মীয় অসুস্থ।এখানে ভর্তি করেছি।আমি এখানে আজ রাতটা থাকব।“

আজিজ সাহেব কোন কথা বাড়ালেন না।মুচকি হেসে সায় দিলেন।আমি বললাম,”বেঁচে থাকলে হয়ত আবারও দেখা হবে।ভালো থাকবেন।“

“হয়ত আর দেখাই হবে না।“

আমি মুচকি হেসে ক্লিনিকের দিকে হাঁটা দিলাম।গেইট দিয়ে ঢুকতে যাব এমন সময় আজিজুর রহমান পেছন থেকে ডাক দিলেন।আমি ফিরে তাকালাম।তিনি নির্ভীক কণ্ঠে বললেন,”আজ রাতে এই পৃথিবী বদলে যাবে…”

আমি কথাটার অর্থ বুঝার চেষ্টা করছি।আজিজ সাহেব সোজা সামনের দিকে হাঁটা দিলেন।সাহসী সৈনিকের মত উদ্দীপ্ত পদক্ষেপ।

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?