Now Reading
সো মিডলক্লাস…



সো মিডলক্লাস…

দৃশ্য ১

“দোস্ত, তোরা যা এবার। আমি পরেরবার যাবো।” রাকিনের এমন না সূচক অভিব্যক্তিতে বন্ধুরা আরো জোর করা শুরু করলো বান্দরবন ট্রিপ এ যাওয়ার জন্য। “আরেহ! চিল ম্যান! সমস্যা কি কওতো?” নাহ রাফি ভাইয়ের এরকম প্রশ্নের জবাবেও চুপ রাকিন। শুধু একটু হাসি দিলো। তবুও সবাই জোর করেই যাচ্ছে। “একটু ক্রাইসিস এ আছি ভাই। নেক্সট টাইম শিউর,” কণ্ঠের নিলিপ্ততা ঢেকে দিয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো রাকিন।

সামি, আরফান, ফারজাদ সবাই সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নিলো রাকিনের লুকায়িত অভিব্যক্তি। “নো ওয়ারিজ, ব্রো। পরেরবার শুধু আমি আর তুই জামুনে! এইগুলার একটারেও নিবোনা” রাফি ভাইয়ের এমন কথায় হেসে দিলো সবাই। হাসতে হাসতে হঠাৎ নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালো রাকিন। বিকাল ৪.৩০ বাজে। এক্ষনি যেতে হবে অরনীকে পড়াতে। সামনেই কোরবানির ঈদ। এবারও যদি আন্টি বেতনটা কেটে রাখেন তখন বেশ মুশকিল হয়ে যাবে! আন্টি যে কেন এমন করেন? আঙ্কেল এর এতো ভালো জব তবুও কিপ্টেমি! এসব ভাবতে ভাবতেই সামির ডাকে ঘর কাটে রাকিনের। “দোস্ত, চা।” সামির হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে কোনোমতোন দুই-তিন ঢোক চুমুক দিয়েই সামির ফ্ল্যাট থেকে বের হয় সে।

দৃশ্য ২

“ধুরর! আম্মু নিশ্চয়ই ফ্যানটা অফ করে গেছে। কিন্তু আরেকটু ঘুমাতে হবেই স্যার আসার আগে!,”বালিশে মাথা গুঁজে বিড়বিড় করে বলে অরণী। “কি আশ্চর্য! এখনও ঘুমাবি নাকি ওঠ!” অত্যন্ত রাগান্বিত স্বরে বললেন অরণীর মা মিসেস ওয়ালিদ। মায়ের ঝাড়ি শুনে তাড়াহুড়ো করে ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে খাট থেকে পরে নতুন কেনা ফোনের স্ক্রিনে ফাটল ধরে। “ড্যাম!” ফোনটা হাতে নিয়ে বোকা বনে গেলো অরণী। নিজের ভাগ্যকেও এরকম ফাটল ধরা মনে হলো তার! সাইন্স নিয়ে পড়ছে অরণী কিন্তু এমন একটা সময় বাবার চাকরিটা চলে গেলো যখন তার দরকার ছিল ভালো কোচিং এ এটেন্ড করা অথবা এটলিস্ট ভালো একজন প্রফেসর এর গাইডেন্স যেমন গাইডেন্স ফারিন আর জেরিনরা পাচ্ছে।

“অরণী….এই মেয়েকে নিয়ে আর পারিনা!” মায়ের ডাকে কপালে ভাঁজ পড়লো অরণীর। মন চাচ্ছিলো হাতের ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলতে কিন্তু কি ভেবে যেন ফোনটা টেবিলের উপর রাখলো অরণী।

দৃশ্য ৩

অরনীকে পড়াচ্ছে রাকিন। আজকে অরণী পড়ায় বেশ মনোযোগী। মুহূর্তেই অঙ্ক শেষ করে ফেলছে। আর কথাও একদম কম বলছে অন্যদিনের চেয়ে। “অরণী, তোমার কি মন খারাপ?”, বললো রাকিন। “নাহ, স্যার,” অরণী বললো। “আচ্ছা, স্যার। আমি কি জিপিএ ৫ পাবো, স্যার? আমিতো কোনো কোচিং এ করছিনা ফারিনদের মতো?” অরণীর এমন প্রশ্নে কপালে ভাঁজ পড়লো রাকিনের। অরণীর মতো কনফিডেন্ট শিক্ষার্থীর  এমন কথা বলার কথা নয়। “টেক্সট বুক পড়ো। ক্লাস লেকচার পড়লে আর টেক্সট বুক পড়লেই হবে। আর আমিতো আছি। প্রশ্ন থাকলে করবে আমাকে।” ইতিমধ্যে, নাস্তার ট্রে হাতে মিসেস ওয়ালিদের আগমন।  “বাবা রাকিন, আসলে কিভাবে বলবো বুঝতে পারছিনা। গত দুই মাস ধরে তোমাকে বেতন দিতে পারছিনা ঠিকমতো। এই নাও খামটা রাখো। তোমার ঈদ এর সালামী,” বেশ বিব্রতবোধ নিয়ে বললেন মিসেস ওয়ালিদ।

“ইটস ওকে আন্টি। এভাবে বলবেন না প্লিজ,” মিসেস ওয়ালিদের চোখের নিচের পড়া কালী জানান দিচ্ছে তাদের পারিবারিক ক্রাইসিস এর।

দৃশ্য ৪

বাসায় এসে রাকিন খামটা খুললো। অরণীর টিউশনের এই ৭০০০ টাকা থেকে সিঁথির ৪০০০ টাকা স্কুলের বেতন আর টিউশন ফি দিতে হয় প্রতি মাসে। এবার মিস ওয়ালিদ দিয়েছেন মাত্র ১০০০ টাকা। বাকি টাকা জোগাড় হবে কিভাবে ভাবতেই নিজের আউটসোর্সিং এর আইডিতে লগ ইন করলো রাকিন।  নাহ, ব্যালান্স নেই তেমন। “ওহ, গত মাসেই তো টাকা উঠিয়েছি বাড়ি ভাড়া দেয়ার জন্য। কিন্তু সিঁথির টিউশন ফিও দিতে হবে,” একাই একাই হিসেবে করে যাচ্ছে রাকিন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সব শুনলো সিঁথি। “আচ্ছা, ভাইয়া। একটা কাজ করলে কেমন হয়? আমি শাখাওয়াত সাহেবের ছেলেকে বিয়ের জন্য ‘হ্যাঁ’ বলে দেই। এত্ত পড়া লাগবেনা আমার,” খিল খিল করে হেসে বলে উঠলো সিঁথি। ওর মিডলক্লাস হাসি শুনে রাকিনের দিনের সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো একদম। “শাকচুন্নি, তোর বিয়ে করা লাগবে না! আর তোর টিউশনও পড়া লাগবে না।  আমি আছি কি করতে?!” রাকিন নিজেও জানেনা কথাগুলো বললো কিভাবে। মিডলক্লাস ভাইরা মনে হয় এভাবেই আশ্বাস দেয়।

দৃশ্য ৫

ড্রয়ার থেকে ক্রোচেট এর কাজ করা বাচ্চাদের ড্রেসগুলো বের করলো সিঁথি। বান্ধবী ফারিনের দেয়া আইডিয়া অনুযায়ী শখের বশে হ্যান্ডিক্রাফটস করা ড্রেসগুলোর পিক আপলোড করলো একটা জনপ্রিয় মেয়েদের ফেসবুক গ্রুপ এ। একরকম অবদমিত উত্তেজনা নিয়ে পিক আপলোড করেই লগ আউট করে দিলো। শয্যাশায়ী মায়ের ডায়ালাইসিস করার খরচ জোগাতে গিয়ে বাবার রেখে যাওয়া কিছু নামমাত্র ব্যাংক-ব্যালান্স ও শেষ। সিঁথি বুঝতে পারছে না কিভাবে ভাইয়া এই মাসে মায়ের ডায়ালাইসিস করাবে। “সিঁথি, আম্মু যা পড়তে বস।” সিঁথির মাও জানেন এবার হয়তো ডায়ালিসিস করা হবে না তার। হঠাৎ কমদামি এন্ড্রোইড ফোনটায় লাইট জ্বলে উঠলো। ডাটা ডিসকানেক্ট হয়ে যাওয়ায় ফেইসবুক লগ ইনই ছিল। নোটিফিকেশন প্যানেল এ তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলো সিঁথি! সবাই ওর হ্যান্ডিক্রাফটস এর আপলোডেড পিকগুলোর নিচে প্রাইস জানতে চেয়েছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে হাতড়ে একটু আলো খুঁজে পেলো সিঁথি।”এক্ষুনি, ফারিনকে ফোনে জানাতে হবে!” কিন্তু, পরক্ষনেই মনে পড়লো ফোনে ব্যালান্স নেই। আপন মনেই বলে উঠলো সিঁথি, “ফোনে রিচার্জ করার জন্য ভাইয়া যে টাকা দিয়েছিলো সেটা জমিয়েই নীলক্ষেতে গিয়ে বই কিনলাম কাল। থাক কাল ফারিনের সাথে দেখা করেই কথা বলবো।”

আমাদের সমাজে এমন রাকিন, সিঁথি, মিসেস ওয়ালিদ, অরণীর মতো অনেকেই আছেন যারা কথাও বলেন মিডল ক্লাস দাড়িপাল্লায় মেপে মেপে। কখন ধনী বন্ধুটি বান্দরবন এ ট্রিপ যাবার অফার করে বসে, এই চিন্তায় রাকিনের মতো ছেলেরা মেইনটেইন করতে পারেনা কোনো সার্কেল । বাড়ি ভাড়া, মায়ের চিকিৎসা খরচ, বোনের পড়ালেখার খরচ জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয় এদের। মোমবাতির মতো নিজেকে জ্বালিয়ে পরিবারের সবাইকে আলো দিয়ে  একা থাকতেই এরা বেশি পছন্দ করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দেয়ার সময় এদের নেই। সময় নেই কারো আনন্দমুখর ট্রিপ এর গল্প শোনার। অন্যদিকে, মিসেস ওয়ালিদরাও কঠিন সংকটে ক্লাস মেইনটেইন করার সো মিডল ক্লাস তাড়নায় আক্রান্ত হয়। অরণীরাও ভেঙে যাওয়া ফোন স্ক্রিন ঠিক করার ডিআইওয়াই দেখে। এতসব সঙ্কটের মাঝেও মুখে সো মিডল ক্লাস হাসি নিয়ে থাকতে জানে সিঁথির মতো সৃষ্টিশীল মানুষগুলো।

 

 

About The Author
Sadia Meherin
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment