Now Reading
পুরানো তিমির [১২তম পর্ব]



পুরানো তিমির [১২তম পর্ব]

দিনটা ছিল সুন্দর।দখিনের হালকা বাতাস গা দুলাচ্ছে।এমন সুন্দর একটা সন্ধ্যায় আমি বারান্দায় বসে আশাকে কল দিলাম।অনেকক্ষণ রিং হল।প্রথমবারে কেউ ফোন রিসিভ করলো না।দ্বিতীয়বার চেষ্টা করলাম।তাও কেউ ধরলো না।আরও একবার।এবারও ফলাফল শূন্য।এক এক করে কম না হলেও দশবারের মত চেষ্টা করলাম।কোন লাভ হল না।শেষে বিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিলাম।মেয়েটার স্বামী মারা গেছে বেশিদিন হয় নি।নিজেদের মধ্যে যতই ঝামেলা থাকুক স্বামীর প্রতি বাঙ্গালি মেয়েদের একটু অন্য রকম টান থাকে।এই সময়ে মেয়েটাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না।মেয়েটাকে দোষ দিতে পারছি না।বিয়ের ব্যপারটা আমার পিতামাতা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।মেয়েটা নিশ্চয় নির্লজ্জ বেহায়ার মত মাকে গিয়ে বলে নি যে_____আমি আপনার ছেলেকে বিয়ে করতে চাই।

 

শেফাকে ফোন দিলাম,মেয়েটা বিয়ের বিষয়ে কিছু জানে কি না সে কথা জানার জন্যে।শেফা জানাল মেয়েটা এখনো কিছুই জানে না।অথচ বাবা মার সাথে এটা নিয়ে আমার কয়েকবার হাঙ্গামাও হয়ে গেল।এখন আমার দায়িত্ব হচ্ছে মেয়েটাকে ভালো ভাবে বিষয়টা বুঝিয়ে বলা।যেন সে নিজ থেকেই ধীরে ধীরে মার থেকে দূরে সরে যায়।

 

রাতের খাবার শেষ করে আশার নাম্বারে আবার চেষ্টা করলাম।লাভ হল না।আমি আর চেষ্টা না করে মোবাইলটা একপাশে ফেলে রাখলাম।স্বামী মৃত্যুর শোক কিছুটা কমুক,আরও কিছুদিন যাক,তারপর এসব নিয়ে কথা বলা যাবে।

সারাদিন অফিসে আজ বেশ খাটুনি গেছে।শরীর বেশ ক্লান্ত।ঘুম পাচ্ছে।বাতি নিভিয়ে আজ অনেক তাড়াতাড়িই শুয়ে গেলাম।চোখ দুটো সবে বুঝে আসলো,এমন সময় মোবাইলটা চিৎকার দিয়ে উঠলো।হাতে নিয়ে দেখলাম আশার নাম্বার থেকে কল এসেছে।বিছানায় উঠে বসলাম।মানসিক ভাবে নিজেকে একটু প্রস্তুত হওয়ার সময় দিলাম কয়েক সেকেন্ড।কিভাবে কি বলব তাও মনে মনে একবার ভেবে নিলাম।

তারপর……কলটা রিসিভ করে কানে ঠেকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললাম,”হ্যালো।“

ওপাশ থেকে কোন সাড়া শব্দ নেই।আমি দ্বিতীয়বারের মত বললাম,”হ্যালো…”

ওপাশে এখনও নিরবতা।আমি অনেকক্ষণ হ্যালো হ্যালো চালিয়ে গেলাম।তবু কেউ উত্তর দিল না।শেষে হ্যালো শব্দটার সাথে আরেকটু বাড়িয়ে নিজের পরিচয় দিলাম,”হ্যালো…আমার নাম আহাদ।আপনি রোজ বিকেলে যে মহিলার সাথে বাসায় গিয়ে আড্ডা দেন,আয়েশা হক,আমি তাঁর ছেলে।“

 

ভেবেছিলাম পরিচয় পেয়ে হয়ত ওপাশ থেকে কেউ মুখ খুলবে।কিন্তু কেউ খুলল না।শেষেমেশ বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দিলাম।নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে,হয়ত কলটা ভুলে এসেছে।এমনটা হয়।আমাদের অজান্তেই অনেক সময় মোবাইলে হাত লেগে অনেক জায়গায় কল চলে যায়।মোবাইলটা বালিশের পাশে রেখে আবার ঘুমের প্রস্তুতি নিলাম।ঘুম আসবে আসবে এমন সময় মোবাইলে আবার শব্দ হল।এবার কল আসে নি,একটা টেক্সট মেসেজ।মোবাইলটা হাতে নিয়ে মেসেজটা পড়লাম।আশার নাম্বার থেকে এসেছে।মেসেজে যা লেখা ছিল তা এই রকম,

“আমি আপনার সাথে ফোনে কথা বলতে পারব না।আপনার যা বলার আপনি কল দিয়ে বলে যান,আমি মনোযোগ দিয়ে শুনবো।যদি কিছু উত্তর দিতে হয়,তাহলে এভাবে মেসেজ করে জানিয়ে দিব।“

 

আমি একটু অবাক হলাম।মেয়েটা আমার সাথে ভালোই ভেলকিবাজি শুরু করেছে।আমার সাথে ফোনে কথা বললে তার সমস্যা কি?আমি তো আর তাকে প্রেম নিবেদন করছি না কিংবা অন্যায় কোন আবদারও না।নিশ্চয় তার মনে অসৎ উদ্দেশ্য আছে।

আমি ফিরতি একটা মেসেজ পাঠালাম,”আমার সাথে কথা বললে আপনার সমস্যা কি?”

মেসেজের উওর আসলো,”সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।আমি আপনার সাথে মুখ দিয়ে কোন কথা বলতে চাচ্ছি না।আপনার কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন।আমি তো আর আপনাকে বলতে নিষেধ করি নি।আমার কথা আমি মেসেজ করে জানিয়ে দিব।“

 

এভাবে মেসেজ মেসেজ খেলা আমার আর ভালো লাগছে না।পুনরায় কল দিলাম।এবার একবার রিং হতেই ফোনটা রিসিভ হল।আমি বলিষ্ঠ বক্তার মত নিজের বক্তৃতা শুরু করলাম,”দেখুন আপনি আমার সাথে কেন কথা বলতে চাচ্ছেন না আমি জানি না।তবে আপনাকে কিছু কথা জানানো জুরুরী।আমার মা চাচ্ছেন আমার সাথে আপনার বিয়ে হোক।কিন্তু আমি এমন কিছু ভাবতে চাচ্ছি না।এবং আমি জানি আপনিও চান না।মা আমার কথা শুনবেন না।এখন আপনি যদি নিজ থেকে শক্ত ভাবে নিষেধ করেন তাহলে বিষয়টা আর সামনে এগুবে না।আপনার কাছে হয়ত কথা গুলো খুব অবাক করার মত মনে হচ্ছে,তবে এটাই সত্যি।আমাদের বাসায় এই নিয়ে কথা হচ্ছে।আপনাকে হয়ত এখনো জানান হয় নি,তবে কিছুদিনের মধ্যেই জানান হবে।আপনার এমন শোকাতর সময়ে এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলছি বলে দুঃখিত।আমার হাতে এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই।“

 

কথা শেষ করে ফোন রেখে দিলাম।মেয়েটার মেসেজের জন্যে অপেক্ষা করছি।সে মেসেজ পাঠাচ্ছে না।তার মনে হয় কিছুই বলার নেই।অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে গেলাম নিজেই জানি না।চোখ মেলে দেখি সকাল হয়ে গেল।মোবাইলটা হাতে নিয়ে মেয়েটার মেসেজ দেখলাম।

“আমাকে বিয়ে করতে আপনার আপত্তি কোথায় সেটা কি জানতে পারি?”

মেসেজটা পড়ে আমার কাছে বেশ বিরক্ত লাগলো।রাগে মাথাটা ঝিনঝিন করছে।বেহায়া নির্লজ্জ মেয়ে।তারমানে মেয়েটাও মন মনে রাজি।আমার গলায় সুযোগ পেলেই ঝুলে যাবে।ইচ্ছে করছে ফোন করে কিছুক্ষণ গালাগালি করি মেয়েটাকে।কিন্তু তা করলাম না।ভদ্রভাবে বললাম,”দেখুন আমি আপনাকে কোনদিন দেখি নি।তাছাড়া আপনার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই।দয়াকরে আর সামনে এগুবেন না।আমি অনুরোধ করছি।আমি চাচ্ছি না আপনার সাথে আমার বিয়েটা হোক।আপনি যতই রূপবতী বা গুণবতী হোন না কেন।“

আমি ফোন কেটে দেয়ার পর মেয়েটা মেসেজ দিল, “আপনি এখন হয়ত আমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না,কিন্তু আমি নিশ্চিত আমাকে দেখার পর আপনি নিজেই উঠে পড়ে লাগবেন যেন বিয়েটা হোক।তবে আপনি যখন বলছেন,তখন আমি বিয়েটা হতে দিব না।নিশ্চিত থাকুন।“

মেসেজটা পড়ে শেষ করে যখন কল দিলাম,তখন অপারেটর অফিস থেকে জানালো____নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।

About The Author
Ikram Jahir
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment