Now Reading
পুরানো তিমির [১৩তম পর্ব]



পুরানো তিমির [১৩তম পর্ব]

খারাপ লাগছে।মেয়েটা এভাবে অহংকার দেখালো! তার মাঝে কি এমন আছে যে আমি তাকে দেখলে বিয়ের জন্যে ব্যাকুল হয়ে যাব? কথাটায় কেমন যেন একটা অপমান বোধ করছি।ওকে কিছু একটা বলতে পারলে হয়ত মনে একটু শান্তি পেতাম।মেয়েটা এ কাজটা ইচ্ছা করেই করেছে।না হলে এখন মোবাইল বন্ধ করে দিত না।সে জানে এই কথা শোনার পর আমি রেগে যাব,আর যতক্ষণ রাগ মেটাতে পারব না ততক্ষণ আমার কষ্ট হবে।আমাকে কষ্ট দেয়ার জন্যই হয়ত তার এই সূক্ষ্ম পরিকল্পনা।

 

দুপুরের দিকে শেফা ফোন করে বলল মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।অবস্থা খুব বেশি ভালো না।স্থানীয় কোন ক্লিনিকে রাখতে চাচ্ছে না।ঢাকায় পাঠাতে হবে।আমি ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করলাম ঘণ্টা খানেকের  মধ্যে।মা ঢাকা এসে পৌঁছলেন বিকেল পাঁচটার দিকে।বার্ডেম হাসপাতালে সুন্দর দেখে একটা কামরা নিলাম।মার সমস্যাটা খুব বেশি শারীরিক না।ডাক্তার বলেছেন,মানসিক ভাবে উনাকে সুস্থ রাখতে পারলে শারীরিক ভাবেও সুস্থ রাখা যাবে।মানসিক দিক থেকে চিন্তামুক্ত করতে পারলেই প্রেশার কন্ট্রোলে  চলে আসবে।

 

মার চিন্তার কারণটা আমি জানি।আশার সাথে আমার বিয়ে নিয়েই যত সব চিন্তার সৃষ্টি।

মানুষের জীবনে অপ্রত্যাশিত অনেককিছুই ঘটে।মানিয়ে নিতে হয়।আমিও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।মানুষের প্রাণশক্তি খুব বেশি প্রখর।এই প্রাণীরা যে কোন কঠিন পরিস্থিতির সাথে অনায়াসে মানিয়ে নিতে পারে।প্রিয়জনদের জন্যে নিজের আশা আকাঙ্ক্ষা অনেককিছুই বিসর্জন দিতে হয়।পিতামাতার চেয়ে বেশি আপন পৃথিবীতে কোন সন্তানের জন্য আর কেউ হতে পারে না।

মার সাথে এত খারাপ সময় আমার আর কখনো যায় নি।মা অনেক কষ্ট পেয়েছেন।সন্ধ্যা বেলায় মার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হল।আমি তাঁর মাথার কাছে গিয়ে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম,”তুমি যা চাও তাই হবে মা।আমি বিয়েতে রাজি।আশাকেই বিয়ে করব।তুমি কথা বল।“

মা আমার দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকালেন।চোখে কষ্ট আর ব্যর্থতার ছাপ সুস্পষ্ট।ক্লান্ত স্বরে তিনি বললেন,”আশা বিয়েতে রাজি না।সে তোকে বিয়ে করতে চাচ্ছে না।“

“এখন উপায়?”

“আমি অনেক বুঝিয়েছি।কিছুই বুঝতে চায় না।আমাকে বলল,সে নাকি বাসা বদলাবে।সামনের মাসে নাকি গ্রামের বাড়ি চলে যাবে।কাল এসেছিল শেষ দেখা করতে।“

“আর এই জন্যেই তুমি এমন অসুস্থ হয়ে পড়েছ তাই না!”

মা কিছু বললেন না।চুপ করে শুয়ে আছেন।তাঁকে এখন অবুঝ শিশুর মত মনে হচ্ছে।আমি মায়ের আরও কাছে গিয়ে বসলাম।বললাম,”মা…মেয়েটা যেহেতু বিয়ে করতে চাচ্ছে না,আমাদের তো জোর করা উচিত হবে না।সে ছাড়াও তো দুনিয়ায় আরও অনেক ভালো ভালো মেয়ে আছে।তুমি অন্য কাউকে দেখ।“

মা যেন কিছুটা বিচলিত হলেন।তবে মুখ দিয়ে কিছু বললেন না।আমি পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালাম।দরজা দিয়ে বেরুতে যাব এমন সময় মা খুব শান্ত কোমল গলায় বললেন,”মেয়েটা খুব ভালো রে আহাদ…অনেক লক্ষ্মী।আমার এত ভালো লাগে ওকে…!”

কিছুক্ষণ মায়ের দিকে চেয়ে রইলাম।তাঁর উজ্জ্বল চোখ দুটি এখন কেমন ম্লান হয়ে আছে।দুঃখিত,শোকাহত।

 

আমি মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম নিঃশব্দে।হাসপাতালের করিডোরের শেষ মাথায় খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।বাইরে বিশাল আকাশ,তারা গুলো এদিক সেদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে ছড়িয়ে আছে চারদিকে।আশা মেয়েটার প্রতি একধরনের সম্মান বোধ হচ্ছে।মেয়েটা তার কথা রেখেছে।নিজ থেকে সরে পড়েছে।অথচ আমি মেয়েটাকে নিয়ে কি সব আজেবাজে চিন্তা আর ধারনা মনের মাঝে পুষে রেখেছি।ওকে একটা ধন্যবাদ দেয়া দরকার।মোবাইলটা হাতে নিয়ে কল দিলাম।ধরলো না।কয়েকবার চেষ্টা করলাম।লাভ হল না।কিছুক্ষণ পর সে আমাকে একটা মেসেজ দিল।

“আমি আপনাদের পরিবার থেকে সরে এসেছি।আবার কেন যোগাযোগ করতে চাচ্ছেন?আমি আপনার সাথে কোন যোগাযোগ করতে চাচ্ছি না।“

আমি আর কল না দিয়ে একটা ফিরতি মেসেজ পাঠালাম,”আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে কল দিয়েছিলাম।“

পুনরায় মেসেজ,”ধন্যবাদ পেয়েছি আমি।আর কল দিবেন না।“

“আচ্ছা” বলে একটা মেসেজ পাঠাতে গিয়ে দেখি মোবাইল বন্ধ।মেয়েটা আমার আচরণে খুব কষ্ট পেয়েছে।যাই হোক,সে যেহেতু চাচ্ছে না,আমি আর যোগাযোগ করব না।

 

রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে গেলাম।শেফা এসে বলল,”তোকে মা ডাকছেন।“

আমি মায়ের কাছে গেলাম।মা আমাকে আজ অনেক আদরে খুব কাছে নিয়ে বসালেন।আমি বললাম,”কি হয়েছে মা?কিছু বলবে?”

মা কিছুক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন।আমার কাছে কেমন যেন লাগলো।মা এভাবে কোনদিন চেয়ে থাকেন নি।আমি বললাম,”এভাবে চেয়ে আছ যে মা!”

তিনি ক্ষীণ স্বরে বললেন,”তুই আশাকে বলেছিস বিয়েতে যেন রাজি না হয়,তাই না?তুই ওকে খুব শাসিয়েছিস।“

আমি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলাম।মা এমনটা টের পেলেন কিভাবে!আশা কি তবে মাকে কিছু বলেছে!আমি বললাম,”এমন কথা কেন মা?আমি ওকে কোথায় পাব?ওর সাথে তো আমার কোনদিন দেখা হয় নি।“

“তুই ওর নাম্বারটা আসার সময় নিয়ে এসেছিলি আমি জানি।কাউকে কিছু বলতে হলে এখন আর দেখা করতে হয় না।“

শেফা মাকে বলে দিয়েছে আমি যে আশার নাম্বার নিয়ে এসেছি।শেফার দিকে তাকালাম।সে আমার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে অন্যদিকে ফিরে গেল।আমি মায়ের দিকে ফিরলাম,”হ্যাঁ মা,আমি ওকে একবার নিষেধ করেছিলাম।তবে এখন আর নিষেধ করব না।আমি প্রথমে মেয়েটাকে বুঝতে পারি নি।আমি এখন রাজি।ও যদি চায় তবে……”

মা কিছু বললেন না।চুপ করে আছেন।আমি আরও কিছুক্ষণ বসে থাকলাম।মা কিছু বলছেন না দেখে আমি বললাম,”রাত অনেক হয়েছে।ঘুমিয়ে যাও মা।“

কথা শেষ করে আমি চলে এলাম।আসার সময় করিডোরে দাঁড়িয়ে শেফাকে বললাম,”মাকে কথাটা না বললেও পারতি।“

“মেয়েটা অনেক ভালো।ওর সাথে বিয়ে হলে তুই সুখেই থাকবি।“

“তাহলে ওর আগের স্বামীটা সুখে থাকে নি কেন?কেন বেচারা কষ্টে পিষ্ট হয়ে স্ট্রোক করলো?”

“আগের স্বামীটা একটু পাগলাটে ছিল।একঘুয়ে।মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল তার।“

“আমি লোকটাকে জানি।খুব ভালো মানুষ ছিলেন তিনি।মেয়েটাকে অনেক ভালোবাসতেন।“

“ভালো মানুষ কখনো বউ পেটায়?”

“রাগ উঠলে মানুষ বদলে যায়।হয়ত উনার রাগ একটু বেশিই ছিল।মেয়েটা নিশ্চয় এমন আচরণ করতো যে লোকটা অনেক রেগে যেত।“

 

শেফা কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল।আমি হেঁটে চলে আসলাম।কথা বলতে ভালো লাগছে না।

About The Author
Ikram Jahir
Ikram Jahir
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment