Now Reading
পুরানো তিমির [১৫তম এবং শেষ পর্ব]



পুরানো তিমির [১৫তম এবং শেষ পর্ব]

অফিস থেকে সপ্তাহ খানেকের ছুটি নিয়ে বাড়ি এলাম।কাল মেয়ে দেখতে যাব।আশার নাম্বারটা আজ পনের দিন ধরে বন্ধ।তার সাথে কিছুতেই যোগাযোগ করতে পারছি না।

মা বেশ হাসিখুশি আছেন।বাবাও মনে মনে অনেক ফুরফুরা মেজাজে আছেন।শেফার সাজগোজ আর শপিং দেখে বুঝা যাচ্ছে সেও মহানন্দে আছে।ঘরের মধ্যে চিন্তিত ব্যক্তি শুধু আমি।যার মনে কোন আনন্দ এখন পর্যন্ত দোলা দিতে পারলো না।অথচ বিয়ে আমার,সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথাও আমার।সবাই এতই ব্যস্ত যে আমি যে সারাদিন মনমরা হয়ে বসে থাকি সে দিকে কারও খেয়ালই নেই।শেফাকে জিজ্ঞেস করলাম,”প্রতিদিন এতকিছু কি কিনিস?শাড়ি আর কয়টা কিনবি?গয়নাগাটি কিনতে কিনতে তো আলমিরা জ্যাম করে ফেলেছিস!”

শেফা ছোট বাচ্চাদের মত মুখ বাঁকা করে বলল,”আমার কি চার পাঁচটা ভাই আছে যে বছর বছর কিনতে পারব?ভাই একটা,বিয়েও একটা,তাই যত আনন্দ করার করে নিই।এটাই শেষ সুযোগ।“

বাহ্‌! সবাই খুব আনন্দে আছে,আর আমি বসে আছি বিরস মুখে।

শুক্রবার সকালে আমরা মেয়ের বাড়িতে গিয়ে উঠলাম।বাড়িঘর ভালো।দেখে বিত্তশালী,মান-মর্যাদা সম্পন্ন মনে হয়।আমাদেরকে বড় একটা ঘরে বসতে দেয়া হল।আমরা বসলাম।খাওয়া দাওয়া করলাম।ঘণ্টা খানেক পরে মেয়েকে আনা হল আনুষ্ঠানিক ভাবে।সবাই দেখে নিল যার যার মত করে।আমি দেখে থ মেরে গেলাম।এমন একটা দৃশ্য দেখার জন্যে আগে থেকে প্রস্তুত ছিলাম না।কল্পনাও করি নি ভুলে।আশা যখন আমাকে মেসেজ করে বলেছিল,আমার জন্যে অপ্রত্যাশিত কিছু একটা অপেক্ষা করছে তখন আমি সেই অপ্রত্যাশিত বিষয়টা কি হতে পারে এ নিয়ে অনেক ভেবেছি।কিন্তু এখন চোখের সামনে যা দেখছি তা একবারও ভেবে দেখি নি।হা করে তাকিয়ে আছি চোখ বড় বড় করে।চেয়ে আছি অবাক দৃষ্টিতে।অনেক চেষ্টা করছি স্বাভাবিক থাকতে, কিন্তু পারছি না।আমার অবস্থা দেখে মুরুব্বীরা কানাঘুষা করছেন।মুখ টিপে হাসছেন।সব চেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন মা।তিনি খুব সন্তুষ্ট।ছেলে বউ দেখতে এসে মেয়ের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছে না, হয়ত এটাই সেই আনন্দের উৎস।তাদের ধারনা মেয়েকে আমার খুব পছন্দ হয়ে গেছে।কনে পক্ষের একজন গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলো, “আমাদের মনে হয় ছেলে আর মেয়েকে একান্তে একটু সময় দেয়া উচিত।ওরা নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে নিক।“

কথা শেষ করার দেরি সবাই উঠে চলে যেতে দেরি নাই।মুহূর্তে সবাই ঘর খালি করে বেরিয়ে গেল।এখন আমি আর মেয়েটা ঘরে একা।কেউ কিছু বলছি না।কি দিয়ে কথা শুরু করবো তাও বুঝতে পারছি না।শেষে আমিই কথা শুরু করলাম, “কেমন আছ মিনা?”

মিনা নিশ্চুপ।সোফায় কুঁজো হয়ে মাথা নিচু করে বসে আছে।আমি আবার বললাম,”কিছু বলছ না যে মিনা!”

কিছুক্ষণ পর কান্নার শব্দ পেলাম হালকা।মিনা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।আমি বললাম,”কাঁদছ কেন মিনা?আমার কিছু করার ছিল না সেদিন।তখন মাত্র ইন্টারমেডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি।তুমি সেদিন হঠাৎ করে এসে বললে তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে।এতটুকু বয়সে একটা মেয়েকে নিয়ে পালাব এমন সাহস হয় নি।তাছাড়া তোমাকে নিয়ে যাব কোথায় তাও ভেবে পাই নি।“

“প্লিজ আমি এসব নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না।“ মিনা গর্জে উঠলো, “সেদিনের কথা আজ এত বছর পর আবার টেনে এনে পুনরায় কথা বাড়াতে চাই না।“

আমি চুপ করে গেলাম।জীবনটা যেন এখানে এসে হুট করে থেমে গেছে।স্তব্ধ হয়ে গেছে মহাকাল।পেছনে ফেলে আসা সময় গুলো যেন আজ আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অজানা দুঃসাহসে।তখন সবে মাত্র কলেজে উঠলাম।কলেজের পেছনে ছোট একটা বালিকা বিদ্যালয়।মিনা তখন নবম শ্রেণীতে পড়ে।হাঁটার পথে ওকে একদিন দেখে খুব ভালো লাগলো।বন্ধুরা মিলে দুষ্টামি করে কয়দিন পেছন পেছন ঘুরলাম।প্রেম নিবেদন করলাম।মিনাও কি বুঝে রাজি হয়ে গেল।দেখতে দেখতে আবেগ জমে গেল পাথরের মত।এক সময় মনে হল ওকে ছাড়া পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।আবেগ কি সেটা হয়ত তখন ভালো করে বুঝতামও না।তবে অজানা আবেগের টানে যে ভালোবাসা মনে বাসা বেঁধেছিল তাতে একবিন্দু খাদ ছিল না।নির্ভেজাল সত্যের মত বিশুদ্ধ ভালোবাসা।

তারপর একদিন…… মিনা তখন দশম শ্রেণীর শেষের দিকে।কিছুদিন পরই এসএসসি পরীক্ষা দিবে।বেশকিছু দিন ধরে সে বলছিল,বাড়ি থেকে বিয়ে দেয়ার জন্য চেষ্টা চলছে খুব।ভালো ভালো প্রস্তাব আসছে দেখে তার বাবা মা লোভ সামলাতে পারছে না।একদিন সকাল বেলা এসে মিনা বলল,”চল আমরা পালিয়ে যাই।“

আমার সেদিন সাহস হয় নি।পিতামাতা,সমাজ পরিবার সবকিছুর মুখের উপর আঙুল তুলে মিনাকে নিয়ে নিজের পৃথিবী সাজানো সম্ভব হয় নি।তারপর থেকে মিনা উদাও।আর কোন খোঁজ খবর পাই নি।কিছুদিন পর তার বান্ধবীদের সাথে কথা বলে জানতে পারি,ওর বিয়ে হয়ে গেছে।তারপর থেকে মনে হারানো ভালোবাসার বিশ্রী ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছি।আজ…… এতদিন পর তাকে আবার এভাবে খুঁজে পাব এমনটা কখনো ভাবি নি।

মিনা আমি দুজনেই চুপচাপ বসে আছি।আমি নিরবতা ভাঙ্তে বললাম, “কিছু তো বল।এভাবে চুপ করে বসে আছ কেন?”

“কি বলব?”

“এতদিন পর দেখা হল,কিছুই বলার নেই?”

“দেখা না হলেই মনে হয় ভালো হত।“

“এমন কথা কেন মিনা?”

“কেমন কথা? এখন তো তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি তাই না? অথচ আজ সকালে ঘুম থেকে উঠার সময়ও তুমি এই বিয়েতে রাজি ছিলে না।“

“তখন তো আমি জানতাম না যে তুমিই আশা।“

“জানাতে আমিও চাই নি।যেদিন আমাকে ফোন করেছিলে সেদিন তোমার কণ্ঠ শুনেই চিনেছিলাম।ভয়ে আর কথা বলি নি,যদি চিনে যাও।“

“চিনে গেলে কি হত?”

“কিছু হত না।করুণা দেখিয়ে আমাকে বিয়ে করতে।এখন যেমন করুণা দেখিয়ে বিয়ে করবে ঠিক তেমন,”

“এভাবে কেন বলছ মিনা?করুণা হবে কেন?”

“নয়ত কি?অন্য কোন মেয়ে হলে বিয়ে করতে?হয়ত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বিয়ে করতে,কিন্তু এখন যেমন নিজের সদিচ্ছায় আগ্রহ নিয়ে বিয়ে করবে তখন এমনটা করতে? বল! উত্তর দাও!”

আমি নির্বাক মুখে বসে আছি।বলতে বলতে মিনা কেঁদে দিল।কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে উঠে চলে গেল ভিতর ঘরে।আমরা সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে চলে আসলাম।ভালো করে খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম,মিনার আগের স্বামীর মাথায় কিছুটা সমস্যা ছিল।রাত হলেই কিছুটা পাগলাটে আচরণ করতো।তাছাড়া ভদ্রলোক প্রজননে অক্ষম ছিলেন।বিয়ের এত বছর পরও তাদের কোন সন্তান হয় নি।এই নিয়েও ভদ্রলোক ভীষণ বিষন্নতায় ভুগতেন।

তার কিছুদিন পর মুরুব্বীরা বসে বিয়ের দিন ক্ষণ ঠিক করলেন।সব আয়োজন ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছে।মানুষের এই বিচিত্র জীবন বড় অদ্ভুত রহস্যের ভান্ডার।কখন কিভাবে বদলে যায় কেউ আগে থেকে বলতে পারে না।আমার জীবনও হঠাৎ করে বদলে গেছে।

About The Author
Ikram Jahir
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment