Now Reading
মায়া মশা



মায়া মশা

কোন এক দুরপ্রান্তে মেডিকেল কলেজের হলে(হোলে বলাই ভালো।বেশ চিপাচিপি অবস্থা)থাকে হাসিব নামের এক সিঙ্গাপুরী তরুণ।রুমটা বেশ পুরনো ধাঁচের,দেয়াল জুড়ে শ্যাওলার নকশা।গাদাগাদি করেই সেখানে থাকে ছয়জন।শোয়ার জন্য চারপায়া আর চেয়ার টেবিল রাখার পর জায়গা থাকে সামান্যই।কঙ্কালটাকে বাধ্য হয়ে দেয়ালে ঝুলাতে হয় হ্যাঙ্গারের মত করে।যাদের আক্কেল আছে তারা ড্রিল দিয়ে করোটির পিছনে ফুটো করে নেয় পেরেকে ঝোলাতে।হাসিব প্রথম প্রথম দড়ি টরি দিয়ে বেঁধে রাখত।কিন্ত একদিন রাতে ঘুমোবার সময় দেয়াল থেকে বাঁধন খসে খুলিটা এসে পড়ে ওর মাথার উপর।খুলির সাথের খুলির টকাশ করে বাড়ি খেয়ে আলু গজানোর সাথে সাথে বুদ্ধিটাও গজায় তার।হাড়গুলো পার্ট পার্ট খুলে খাটের নিচে রেখে দেয় সে।তবে এর ঝামেলাও আছে।ছুটি থেকে ফিরে একবার কঙ্কালটাকে সে পায় শ্যাওলায় মাখামাখি অবস্থায়।বেচারাকে সারাদিন ঘষে ঘষে সেসব তুলতে হয়।তাও পরীক্ষার দিন হাতে হাড়ের সবুজ সবুজ ভাব দেখে স্যার বাঁকা হাসিতে মন্তব্য করেছিলেন,এইটা কি বৃক্ষ মানবের কংকাল আনসো বাবা?লজ্জায় তার লালচে মুখ বেগুনী হয়ে যায়। যাহোক,এভাবেই যাচ্ছিল দিনকাল।বাসায় এক লম্বা ছুটি কাটিয়ে ফিরে এল হাসিব।এসে দেখল মানুষজনের সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে কমে গিয়েছে।সাথে নতুন রুমমেট শুধু।নাম কফিলুদ্দিন তরফদার।এমনিতে ভালোই,তবে কেমন জানি আজব ধরণের।একদম চুপচাপ।দিনের বেলা কেমন জানি মনমরা হয়ে থাকে।আবার রাত এলেই তার চোখেমুখে অন্যরকম আনন্দ খেলা করে।এদিকে হাসিবের অনেক হোমসিক লাগছে।কয়দিন ধরে মিস করছে সবাইকে।তাই কফিলের পরিবর্তন তার চোখে পড়ে না অতটা। নিশুতি রাত।শীত শেষ।হালকা হালকা গরম পড়তে শুরু করেছে।শীতনিদ্রায় থাকা মশার দল ঘুম ভেঙ্গেই সদলবলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।প্রতি রাতে রক্তে হাত রঞ্জিত না করে ঘুম হয়না ওর।আজও তেমনি যাচ্ছে।তবে একটু অন্যরকম কিছুও ঘটল।ঘুমের ঘোরেও মশা তাড়াল সে।পরদিন সকাল।অনেক বেলা করে ঘুম ভাঙল হাসিবের।মোবাইলে টাইমটা দেখে তাড়াতাড়ি উঠতে যাবে,এমন সময় মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।বসে পড়ল আবার।শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে।চিন্তিত ভঙ্গিতে ধীরেসুস্থে উঠে নাস্তা খেতে গেল।ভাবল সাময়িক দুর্বলতা।হাতের দিকে চোখ যেতেই দেখল কব্জির ঠিক উপরে শিরার উপর লাল হয়ে ফুলে আছে একটু।মশার কামড় বলে পাত্তা দিল না। কিন্তু দিন দিন তার অবস্থা খারাপের দিকে যেতে লাগলো।ইদানিং বিছানা থেকে উঠতেই কষ্ট হয়।এদিকে রুমমেট কফিল আবার সকাল সকাল কোথায় জানি হাওয়া হয়ে যায়।আবার রাত করে ফেরে রুমে।তাই তার সাথে কথাবার্তা হয়না তেমন।মাঝরাতে একদিন দেখল মশারির কাছাকাছি কিসের যেন ছায়া।ক্রমেই তার দিকে ঝুঁকছে।ঘুমের ঘোরে পাত্তা দিল না অতটা।দেয়ার শক্তিও ছিল না। এদিকে হাসিবের অবস্থা খুবই খারাপ।লাল টুকটুকে চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে একদম।এই ক’দিনে শুকিয়ে আমসত্ত্ব হয়ে গেছে।হলের পরিচিত ডাক্তার দেখাতেই উনি আঁতকে উঠলেন দেখে।হাসিবকে ভর্তি করা হল আইসিইউতে।কয়েক ব্যাগ রক্ত দেয়া হল।তারপর স্যালাইন চলতে থাকল।ডাক্তাররা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানালেন ভয়াবহ রক্ত স্বল্পতায় ভুগছে সে।তবে এর কোন ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না তারা।আইসিইউ থেকে ছাড়া পাবার পর তাকে বেশ কিছুদিন বেডে রেখে দেয়া হল পর্যবেক্ষণের জন্য।বেডে শুয়ে থেকে কোন কাজ নাই তার।তাই মাথা খাটানো শুরু করল।তার মনে একটা ভয়ানক সন্দেহ উঁকি দিতে শুরু করেছে।ইন্টারনেট ঘেঁটে কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলল।তবে রহস্য সমাধানের জন্য ফিরতে হবে রুমে।তার জন্যে আরও কিছুদিন অপেক্ষা। শরীরের অবস্থা মোটামুটি ভালো হওয়ার পর তাকে রিলিজ দেয়া হল।সবকিছু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে সে।প্রথমেই খাটের নিচ থেকে হাড়গোড়গুলো বের করে সরিষার তেল দিয়ে ঘষে চকচকে বানিয়ে ফেলল।ফিমার টা আলাদা করে রেখে দিল।সে এখন জানে তার সাথে কিছু একটা ঘটছে।এবং তা রাতে।তাই খুব সাবধানে থাকতে হবে।যথারীতি কফিল রাতে রুমে এল।হাসিব তাকে কিছুই বলল না এ ব্যাপারে।তবে খেয়াল করল কফিল অদ্ভুত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।সে দৃষ্টিতে প্রবল তৃষ্ণা।গা শিরশির করে উঠল হাসিবের।রাত প্রায় সারারাত জেগে কাটালো সে বালিশের নিচে তেল চকচকে ফিমারটা নিয়ে।দেহের সবচেয়ে বড় আর শক্ত এই হাড়ের এক বাড়ি খেলে আর দেখতে হবে না।শেষ রাতের দিকে একটু ঝিমুনি মত এসেছিল।তখুনি ব্যাপারটা ঘটল।একটা ছায়া তার মশারির কাছে এসে ঝুঁকল।আলতো করে মশারিটা তুলে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।তারপরই ডান পায়ে তীক্ষ্ণ ব্যাথা ছড়িয়ে পড়ল।সম্বিৎ ফিরে পেয়ে পা ঝাড়া দিতেই কি যেন একটা সরে গেল।তাড়াতাড়ি বাতি জ্বালাতেই দেখে পায়ের গোড়ালির ঠিক উপরে ছোট্ট একটা লাল দাগ।সেখান থেকে একটু রক্ত বেরোচ্ছে।আরেকটা জিনিস দেখে হৃদপিণ্ড একটা বিট মিস করল।কফিলের বিছানা খালি!ভালো করে খুঁজে দেখল পুরো রুম,কোথাও তার চিহ্নমাত্র নেই।চিন্তার বিষয়।ভোরের আলো ফুটতেই সে বেরিয়ে চলে গেল লাইব্রেরির দিকে,কিছু বই ঘাঁটতে হবে। অনেক বই ঘাঁটার পরও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা মিলল না।মেডিকেল সাইন্সে ভ্যাম্পায়ারিজম বলে একটা জিনিস আছে।এরা রক্ত খেতে ভালোবাসে।কফিল কি তাদের ই একজন?তবে কিভাবে যে দুষ্কর্মটি করছে তা বোঝা যাচ্ছে না। সেদিন রাতে ছিল ফাল্গুনি পূর্ণিমা।জানালা খোলা থাকায় চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে ঘর।মাঝরাতের কিছুটা পরে কফিলের খাটে নড়াচড়া দেখা গেল।তবে কি সে ফিরে এসেছে?ঘুমের ভান করে পড়ে থেকে চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগল।তারপর যা ঘটল তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।খাটে কফিলের ছায়াটা যেন কিছুর সাথে ধস্তাধস্তি করছে এমন মনে হচ্ছে।সড়সড় করে ছায়াটা জানালার কাছাকাছি হামাগুড়ি দিয়ে গেল।তারপর চাঁদের আলোতে কফিলকে দেখতে পেল।একদম ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে ওকে।হাত পা কুঁকড়ে আছে অদ্ভুতভাবে। হাসিবের ঘাড়ের লোমগুলো সরসর করে দাঁড়িয়ে গেল এই দৃশ্য দেখে।বালিশের তলা থেকে তেল চকচকে ফিমারটা বের করে হাতে নিল।প্রয়োজন দেখলে দু’ঘা বসিয়ে দিতে পারবে।তবে তার আর দরকার হল না। কফিলের শরীরটা যেন কুঁকড়ে ছোট হয়ে যেতে লাগল।শেষ একবার মাথা তুলে তাকাল ওর দিকে,যেন দেখতে পেয়েছে।হলদে চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে।তারপরই যেন বেমালুম গায়েব হয়ে গেল।খাট থেকে নেমে এসে মেঝেতে তাকিয়ে শুধু ওর কাপড়চোপড় ই দেখতে পেল।শক্ত করে ফিমারটা ধরল গদার মত করে।চারদিকে নজর।এমন সময় কনুইয়ের কাছে সেই তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা।হাত ঝাড়া দিতেই পিন পিন শব্দে কালো কি যেন একটা উড়ে গেল।মশা! সিরিয়াস!ভাবল হাসিব।এত কিছু থাকতে মশা ক্যান?কই ভাবলাম ভ্যাম্পায়ার…ধুরর। যাহোক,আপাতত এই থ্রেটকে তো নির্মূল করা প্রয়োজন।হাতের গদা দিয়ে মশা মারার চেষ্টা করা আর মশা মারতে কামান দাগা একই কথা।দুই চার জায়গায় আরও কয়েকটা কামড় খাওয়ার পর মশারির ভেতরে রিট্রিট করল হাসিব।গালে হাত দিয়ে ভাবল কি করা যায়।এদিকে বড়সড় কি যেন একটা মশারির বাইরে ডানা ঝাঁপটাচ্ছে।হঠাতই মাথায় আইডিয়াটা এল।কফিল আগে মানুষ হলেও এখনও গায়ে গতরে মশা ই আছে।তাকে মারার জন্য ব্রহ্মাস্ত্রখানা এই মুহূর্তে তার খাটের তলায় ট্রাঙ্কের ভিতরে।সাহস করে মশারি থেকে বের হয়ে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে তালা খুলল কাঁপা কাঁপা হাতে।তারপর অস্ত্রটা নিয়ে সুড়ুত করে ঢুকল আবার নিরাপদ আশ্রয়ে।নেড়েচেড়ে দেখল,নাহ ঠিকই আছে জিনিসটা।সুইচ ঠেলে বোতামটা চাপ দিতেই লাল আলো জ্বলে উঠে জানান দিল সেটা।ব্যাডমিন্টন র‍্যাকেটের মত অস্ত্রটা এখন আক্রমণে প্রস্তুত।রুমের সবকটা বাতি জ্বেলে দিল প্রথমে।কামড় খেলেও পাত্তা দিল না। এবার খেল দেখানোর পালা।একটুকরো ক্রুর হাসি ফুটে উঠল হাসিবের ঠোঁটে।এবার ফাঁদ পাতার পালা।মশারির কানা খানিকটা উঁচু করে দিল যাতে রক্তের লোভে কফিলরুপী মশা ঢুকতে পারে।সে জানে,লোভ এড়াতে পারবে না।কিছুক্ষণ পরই পিন পিন করতে করতে একদল মশা ঢুকে গেল।ও হো,হাসিবের রুমে এমনিতেই কোটি কোটি মশা।একটু বিভ্রান্ত হলেও সামলে নিল সে।মাল্টিপল টার্গেট কোন ব্যাপারই না।বোতামে চাপ দিতেই সচল হল কিলার ব্যাট।ইয়া আলি বলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মশা নিধনে।কিছুক্ষণ শুধু পট পটাশ আওয়াজ আর নীল বিদ্যুত ঝলকানি দেখা গেল।কফিল পড়েছে বিপদে।কোথায় এসেছিল মহানন্দে রক্ত চুষবে বলে।আর এখন কোনমতে জান বাঁচিয়ে উড়তে হচ্ছে।ছোট্ট মশারি নামক খাঁচায় পালিয়ে বাঁচবার উপায় নেই।বাকিদের খতম করে হাসিবের চোখ গেল এক কোণে ঘাপটি মেরে বসে থাকা মশাটার দিকে।অন্যদের চেয়ে কালো আর বড় আকারের।শিকারী এবার পরিণত হয়েছে শিকারে।তোর শয়তানি শেষ রে কফিল!বলে ব্যাট চালাল।পরমুহূর্তেই বিকট ঠুস ঠাস শব্দ আর অপার্থিব চিৎকার জানিয়ে দিল কফিলের পরিণতি।একসময় রুমে নীরবতা নেমে এল।মাংস পোড়ার উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে রয়েছে ঘরময়।উঠে গিয়ে সবগুলি জানালা খুলে দিল হাসিব।ঝামেলা দূর হওয়ায় স্বস্তি লাগছে।বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগল,এই ঘটনা কেউ বিশ্বাস করবে শুনলে?পূর্ণিমার রাতে মায়া নেকড়ের গল্প শুনেছে সে,কিন্তু মায়া মশা?শেক্সপিয়ারের সে বিখ্যাত উক্তি আউড়াল,“জগতে কত কিই না আছে!”বহুদিন বাদে শান্তির ঘুম হল তার। এক মাস পরের কথা।ভরা পূর্ণিমা আজ।চাঁদের আলো এসে পড়ছে হাসিবের খাটের কিনারায়।এপাশ ওপাশ করেও ঘুম আসছে না কেন জানি।বাঁ হাতের কব্জির উপরটা কেন যেন চুলকাচ্ছে।মনে পড়ল,ঠিক এখানটাতেই প্রথম কামড় বসিয়েছিল মায়া মশাটা।ঘটনাটার কথা চিন্তা করেই নিজের অজান্তেই শিউরে উঠল একবার। ঘুমের মধ্যে এক ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখল সেদিন।দেখল, সে মশা হয়ে গেছে।রুমে নিশ্চিন্তে ঘুমন্ত পাঁচটি দেহের দিকে তাকিয়ে ওর শুড় লকলক করে উঠল।তৃষ্ণা পেয়েছে তার, ভীষণ তৃষ্ণা…।

About The Author
Mirza Md Razwan
Mirza Md Razwan
I'm really passionate about the Article writings in my vacation time and always thinking creatively about my own work ,of course I'm searching the unique place and things.
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment