Now Reading
১৯৭১ এ বাংলাদেশের বিদেশী বন্ধু



১৯৭১ এ বাংলাদেশের বিদেশী বন্ধু

মাতৃভূমি রক্ষার্থে লড়াই করা বিরাট গৌরবের ব্যাপার। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলার আপামর জনতার অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে সেই গৌরব অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ হয়েছিল হাজার হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার। এই গৌরব অর্জনের এক বড় অংশীদার হচ্ছে বিদেশিরা। তাদের একান্ত সহযোগিতায় যুদ্ধ জয় ত্বরান্বিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বাঙালিদের পাশাপাশি কিছু মানুষ ছিলেন যারা এই দেশের না হয়েও মানবতার টানে এই গৌরবময় জয়ে রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। তাই স্বাধীনতা অর্জনে বিদেশিদের অবদান কোনোদিন ভোলার নয়। বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিনই সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে ভারতের অবদানের কথা।

বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রামে শুরু থেকেই বহির্বিশ্বের নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হত্যা, নির্যাতন এবং একপেশে যুদ্ধের খবর কেউ পৌঁছে দিয়েছিলেন কলম হাতে, কেউ ক্যামেরা হাতে। বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছিলেন নিজের কবিতায়, কেউবা গান গেয়ে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশিদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানো কজন বন্ধুকে নিয়েই আজকের আলোচনা।

ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী অবদান রাখার জন্য বীরপ্রতীকপ্রাপ্ত ওডারল্যান্ড ছিলেন একজন ডাচ-অস্ট্রেলিয়ান কমান্ডো অফিসার। ঢাকায় বাটা স্যু কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে ওডারল্যান্ড ১৯৭০ সালের শেষ দিকে প্রথম ঢাকায় আসেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই কোম্পানি-ম্যানেজার ওডারল্যান্ড যেন নিজের মধ্যে আবিষ্কার করেন নতুন এক যুদ্ধের মুখোমুখি প্রাক্তন-সৈনিক ওডারল্যান্ডকে। অপারেশন সার্চলাইটের সময় তিনি লুকিয়ে সে রাতের ভয়াবহতার কিছু ছবি তুলে পাঠান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। এভাবেই তিনি বাংলাদেশিদের প্রাণের বন্ধু হয়ে ওঠেন। শুধু এ দেশের স্বাধীনতার জন্য আর নিরীহ মানুষকে হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে নিজের মানবিক তাড়নাতেই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে লড়তে থাকেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে।

আগস্ট মাসের দিকে তিনি টঙ্গীতে বাটা কোম্পানির ভিতরে গেরিলা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য-ওষুধ এবং আশ্রয় দিয়েও তিনি সাহায্য করেছিলেন। টঙ্গী ও এর আশপাশ এলাকায় বেশ কয়েকটি সফল গেরিলা হামলার আয়োজকও ছিলেন তিনি। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি মুক্তিযুদ্ধে এ বীরোচিত ভূমিকার জন্য বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।

এডওয়ার্ড কেনেডি

১৯৭১-এ বাংলাদেশ যখন স্বাধীনতার জন্য লড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় রিপাবলিকান পার্টি।  রিপাবলিকানদের সমর্থন ছিল পাকিস্তানের দিকে। এর মধ্যেই বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন সিনেটর এডওয়ার্ড।

বিশ্বের মানবতাবাদী মানুষ বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন। তাদেরই একজন মহান ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশিদের অকৃত্রিম বন্ধু আমেরিকার সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি।

অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকে গণহত্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। পাকিস্তান বাহিনীর পাশবিকতা থেকে বাঁচার জন্য মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এক কোটি শরণার্থীর দুর্দশা স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করে ফিরে এসে কেনেডি সিনেট জুডিশিয়ালি কমিটির কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট করেছিলেন ‘ক্রাইসিস ইন সাউথ এশিয়া’। ইতিহাসে এই রিপোর্টটির গুরুত্ব অনেক। এ রিপোর্টে কেনেডি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যার কথা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন মার্কিন প্রশাসনের সামনে।

আমেরিকা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য সাহায্য চেয়েছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে অ্যাডওয়ার্ড কেনেডি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশে আসেন। এখানে তিনি একটি শোভাযাত্রায় অংশ নেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষণ দেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে কাজ করে গেছেন জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত।

মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা বিশ্ববাসীর দৃষ্টিতে এনেছিলেন এডওয়ার্ড কেনেডি। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের শরণার্থীদের দুর্দশা নিজের চোখে দেখে এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে মর্মস্পর্শী একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছিলেন তিনি।

অ্যান্থনি মাস্কারেনহাস

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস জন্মসূত্রে ভারতীয় গোয়ানীজ খ্রিস্টান এবং বসবাস সূত্রে পাকিস্তানি। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছুকাল এদেশে সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সেই সময়কার ঘটনাগুলো তুলে ধরার বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

করাচী থেকে প্রকাশিত দ্য মর্নিং নিউজ-এর প্রধান সংবাদদাতা এবং পরবর্তীতে সহ-সম্পাদক পদে কর্মরত ছিলেন ১৯৬১ থেকে ১৯৭১ সনের মে মাস পর্যন্ত। একাত্তর সালের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে এসে গণহত্যার তথ্যাদি সংগ্রহ করেন। এরপর বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে গিয়ে লন্ডনের সানডে টাইম্‌স পত্রিকায় গণহত্যার তথ্যাদি প্রকাশ করেন। এজন্য তিনি স্বয়ং ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। পত্রিকাটির ১৯৭১ সনের জুন ১৩ সংখ্যায় এ সকল তথ্যাদি প্রকাশিত হয়। এতে বিশ্ব বিবেক অনেকাংশেই জাগ্রত হয় এবং বিশ্ববাসী বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্বন্ধে জানতে পারে। তিনি উপমহাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাবলী অন্তরঙ্গ আলোকে প্রত্যক্ষ করে সংবাদিকসুলভ ভঙ্গিতে তা বর্ণনা করেছেন। তার লেখা বই হচ্ছে “দা রেইপ অব বাংলাদেশ” এবং “বাংলাদেশের রক্তের ঋণ”।

তার দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ গ্রন্থটি ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয়। বইটির সেই প্রাথমিক সংস্করণে শেষের দিকে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল সম্বন্ধে আশা প্রকাশ করে বলেছিলেন-

আমরা সবেমাত্র একটি নতুন অন্ধকারের রাজ্যে প্রবেশ করেছি। অন্ধকারময় সুড়ঙ্গপথের শেষ প্রান্তে যেখানে আলোর রাজ্য শুরু, সেখানে পৌঁছতে আমাদের দীর্ঘ সময় লাগবে।

অবশ্য খুব বেশি সময় আমাদের লাগেনি। আমরা আর কয়েকমাস পরেই পেয়ে যাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

সায়মন ড্রিং

কলম আর ক্যামেরা হাতে নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে নিরীহ বাংলাদেশিদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। একাত্তর সালে সাইমন ড্রিংয়ের বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। তিনি তখন নামকরা পত্রিকা ডেইলি টেলিগ্রাফের একজন সাংবাদিক। অন্যদিকে তখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তানি সামরিক সরকার ২৫ মার্চ বিশ্বের বড় বড় সংবাদ মাধ্যমগুলোর ৪০ সাংবাদিককে বাংলাদেশে আসার অনুমতি দিয়েছে।

সেই সুযোগে টেলিগ্রাফের সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে আসেন সায়মন ড্রিং। পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের চিত্র তিনি তুলে ধরেন বিশ্ববাসীর সামনে। একসময় সাংবাদিকদের জন্য অবস্থা প্রতিকূলে চলে গেলে তিনি দেশত্যাগ না করে লুকিয়ে থাকেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। তিনি ২৭ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে আসেন শহরে। ঢাকার বুকে তখন হত্যা, ধ্বংস আর লুটপাটের চিহ্ন। পর্যাপ্ত ছবি আর প্রত্যক্ষ ছবিগুলো নিয়ে তিনি পালিয়ে চলে গেলেন ব্যাংককে।

সেখান থেকে প্রকাশ করলেন ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’। বিশ্ববাসীর সামনে তিনি তুলে ধরলেন নির্মম বাস্তবতাকে। তার পাঠানো খবরেই নড়েচড়ে বসল পুরো বিশ্ব।

সিডনি শ্যানবার্গ

সিডনি শ্যানবার্গ ছিলেন দি নিউইয়র্ক টাইমস-এর একজন সাংবাদিক। তিনি ১৯৩৪ সালের ১৭ই জানুয়ারি আমেরিকার ক্লিনটন মাসাচুয়েটস -এ জন্মগ্রহন করেন । ১৯৫৯ সালে তিনি দি নিউইয়র্ক টাইমস এ যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ-এর হত্যাকাণ্ড তিনি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন। সেসময় তিনি ছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। হোটেলের জানালা দিয়ে তিনি দেখেন ইতিহাসের এক ভয়ানক হত্যাকাণ্ড।

তিনি পুরো যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ওপর অসংখ্য খণ্ড খণ্ড প্রতিবেদন পাঠান যার অধিকাংশ ছিল শরণার্থী বিষয়ক। তার প্রতিবেদনে পুরো বিশ্ব জানতে পারে পাক বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং ভারতে অবস্থিত শরণার্থীদের অবস্থা। তার অসংখ্য প্রতিবেদনের একটি নির্বাচিত সংকলন প্রকাশ করেছে ঢাকার সাহিত্য প্রকাশ। সংকলনটির নাম ডেটলাইন বাংলাদেশ-নাইন্টিন সেভেন্টিন ওয়ান। যা অনুবাদ ও সংকলন করেছেন মফিদুল হক।

জে এফ আর জ্যাকব

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশি বন্ধুদের মধ্যে ভারতের লে. জেনারেল (অব.) জে এফ আর জ্যাকব হচ্ছেন বাংলাদেশের অন্যতম একজন বন্ধু। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের জন্যে আমাদের বিজয় হয়েছিল তরান্বিত। একাত্তরে তিনি ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ, তখন তার পদমর্যাদা ছিল মেজর জেনারেল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রেখেছিলেন অসামান্য অবদান। মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য আর এক্ষেত্রে জেনারেল জ্যাকবের বিশাল ভূমিকা ছিল। সীমান্ত এলাকায় মুক্তিবাহিনীদের জন্য ক্যাম্প স্থাপন, মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পগুলোর পুনর্গঠন, তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া, অস্ত্র-রসদ জোগান দেয়াসহ মুক্তিবাহিনীর সাথে যৌথ অভিযানে এসে বাংলাদেশকে কাঙ্ক্ষিত জয়ে অসামান্য অবদান রাখে ভারতীয় বাহিনী।

 

ইন্দিরা গান্ধী

স্বাধীনতা যুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর অবদান অপরিহার্য। ইন্দিরা গান্ধীর জন্ম ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী, ঐতিহ্যবাহী নেহেরু পরিবারে। বাবা পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু এবং মা কমলা দেবী। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ বছর ভারত শাসন করেছেন ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৩৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন।

১৯৬৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনি রাজ্যসভার সদস্য হন। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর কেবিনেটে তথ্য ও যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন।

ইন্দিরা গান্ধীকে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ২০১১ সালের ২৫ জুলাই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘স্বাধীনতার সম্মাননা’ দেওয়া হয়। ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন তার পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধী।

 

কনসার্ট ফর বাংলাদেশ

রবিশঙ্কর আর জর্জ হ্যারিসন। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের কথা সুরের মূর্ছনায় বিশ্ববাসীকে প্রথম জানান দিয়েছিলেন তারাই। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ থেকেই বিশ্ববাসীকে আবেগী নাড়া দেয়। নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞ বাস্তবে উপস্থাপন করেন তারা।

একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের পৈশাচিকতা দেখে ভারতের সেতারসম্রাট বিখ্যাত শিল্পী রবিশঙ্কর ঠিক করলেন, কিছু করতে হবে তাকে। তার বন্ধু বিখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য জর্জ হ্যারিসনও এতে সায় দেন।

১ আগস্ট ১৯৭১ নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে বসল পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় এক ঐতিহাসিক কনসার্ট। সেখানেই বাংলাদেশের জন্য বাজালেন সেতারসম্রাট রবিশঙ্কর, সরোদসম্রাট ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, তবলার কিংবদন্তি শিল্পী আল্লারাখা খাঁ।

তারপর একে একে গান গাইলেন বিটলসের জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টার, লিওন রাসেল, বিলি প্রিস্টন আর কিংবদন্তি গায়ক বব ডিলান। কিংবদন্তি গিটারিস্ট এরিক ক্ল্যাপটনও গিটার বাজিয়েছিলেন কনসার্টটিতে। সবশেষে জর্জ হ্যারিসন গাইলেন তার সেই বিখ্যাত গান ‘বাংলাদেশ’।

জোসেফ ও’কনেল

মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত বন্ধু জোসেফ ও’কনেল টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম গবেষণা বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক ছিলেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের বশে তিনি ও তার সহধর্মিণী ক্যাথলিন ও’কনেল দীর্ঘদিন ধরে বাংলা চর্চা করেছেন।

জোসেফ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন। বিদেশে যে কয়জন বন্ধু বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ভাষার প্রতি সত্যিকারে দরদ দেখিয়েছিলেন তাদের একজন তিনি।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় জনমত তৈরি করেন।

অ্যালেন গিন্সবার্গ

কবি এবং কাব্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আলোড়ন তুলেছিল। সেই কবির নাম অ্যালেন গিন্সবার্গ। তিনি একজন মার্কিন কবি। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ওপর তিনি লিখেছিলেন একটি দীর্ঘ কবিতা।

কবিতাটির নাম ছিল- ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। তার কবিতাটি ছুঁয়ে যায় হাজারও মানুষের হৃদয়। নিপীড়িত মানুষের হাহাকার মেশানো, যুদ্ধের বাস্তবচিত্র কবিতার অক্ষরে অক্ষরে জানান দিয়ে যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য। তার কবিতা শুনে ও পড়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়েন হাজারও মানুষ। বাংলাদেশের পক্ষে একাত্ম হয়ে ওঠেন বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অগণিত সাহিত্যপ্রেমিক।

তার কবিতাটির কয়েকটি লাইন এখনো অনেকের মুখে মুখে চলে আসে। ‘মিলিয়নস অব সোলস নাইন্টিন সেভেন্টিওয়ান, হোমলেস অন যশোর রোড আন্ডার গ্রেসান, আ মিলিয়ন আর ডেড, দ্য মিলিয়নস হু ক্যান, ওয়াক টুওয়ার্ড ক্যালকাটা ফ্রম ইস্ট পাকিস্তান’। কবিতার ইস্ট পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তানই হলো বর্তমান বাংলাদেশ।

তার এ কবিতার সূত্র ধরেই বিখ্যাত বাঙালি গায়িকা মৌসুমী ভৌমিক কবিতাটির কিছু অংশ বাংলায় অনুবাদ করে তৈরি করেছেন তার ‘যশোর রোড’ গানটি।

পল কনেট দম্পতি

লন্ডনে বাংলাদেশের নিরীহ জনমানুষের ওপর অস্ত্র ব্যবহারে নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছিল পল কনেট দম্পতি। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে এ খবরে তারা আর চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন, বাংলাদেশের খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধপথ্য পাঠানোর জন্য তিনি ‘অপারেশন ওমেগা’ নামে একটি সংস্থা করেন।

লন্ডনের ক্যামডেন এলাকায় তারা ‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’ নামে একটি কার্যালয় খোলেন। পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জনমত গঠন করতে ১ আগস্ট লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে বিশাল জনসভার আয়োজন করেন তারা।

এ ছাড়া বাংলাদেশে ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে পল নিজেই চলে আসেন। পলের সঙ্গে তার স্ত্রী এলেন কনেটও বাংলাদেশে এসেছিলেন। ট্রাফালগার স্কয়ারে বিশাল জমায়েত শেষে একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ভারতে আসেন। সেখান থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢোকেন বাংলাদেশে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। পরে পাকিস্তানের সামরিক আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি মুক্তি পান।

 

লেয়ার লেভিন

পাকিস্তানি সেনাদের বর্বরতার কাহিনী বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেবেন— এ মন্ত্রেই ’৭১ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন ‘মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র সঙ্গে। তারা একটি ট্রাকে ঘুরে বেড়াতেন ভারতের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে।

সুযোগ পেলে দেশের ভিতরের মুক্তাঞ্চলেও চলে আসতেন। সেখানে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলাদের দেশাত্মবোধক গান শুনিয়ে, পুতুলনাচ দেখিয়ে উজ্জীবিত করতেন। প্রায় ২০ ঘণ্টার ক্যামেরা ফুটেজ তৈরি করলেন তিনি। তারপর ফিরে গেলেন আমেরিকায়। শুরু করলেন ডকুমেন্টারিটি তৈরির কাজ। কিন্তু টাকার অভাবে শেষ করতে পারলেন না ডকুমেন্টারিটি।

পরে অবশ্য আমাদের দেশের আরেকজন বিখ্যাত পরিচালক তারেক মাসুদ আর তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ লেভিনের কাছ থেকে ফুটেজগুলো নিয়ে তৈরি করেন ‘মুক্তির গান’।

About The Author
Kazi Mohammad Arafat Rahaman
পড়াশোনা - ব্যাচেলর করছি কম্পিউটার সায়েন্সে। ভাল লাগা - গান, ফুটবল আর বই। খারাপ লাগা - নাই। খারাপ লাগেনা। অনুভূতিহীন। শখ - অনেক আছে। লক্ষ্য - ইন্টারপ্রেনার হতে চাই।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment