Now Reading
কাগজের প্লেনঃ পর্ব ১



কাগজের প্লেনঃ পর্ব ১

১.সোমালিয়ার আবির্ভাব

 

সাবিত গত কয়েকদিন যাবত টেনশনে আছে।টেনশনটা মেয়েসংক্রান্ত।একজনকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে।কিন্তু তার নাম ধাম কিছুই জানে না সে।ধরা যাক মেয়েটার নাম সোমালিয়া।দেখতে খারাপ না।গায়ের বর্ণ ইট চাপা পড়া ঘাসের মত,ধানি মরিচের মত চিকনচাকন আর মাথায় সবসময় কালো কাপড়ে ঢাকা।তাদের প্রথম দেখা অডিটরিয়ামের সামনে।সোমালিয়া তখন হেলে দুলে আসছিলো।আর হাসছিলো কিচকিচ করে।সেই হাসি দেখে সাবিতের মনে কুক কু রুক কু করে উঠলো।সে চুইঙ্গাম চিবানো বাদ দিয়ে হা করে তাকিয়ে ছিল তার দিকে।দিবাস্বপ্ন দেখা শুরু করল,সরিষা ক্ষেতের মধ্যে দিয়া হাঁটছে তারা দুইজন।ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে হিমেশ রেশামিয়ার গান। এমন সময় রুবেল নামক তার এক দুষ্টু বন্ধু বেরসিকের মত এসে মই দিল তার পাকা ধানে।পিছন থেকে ধুপ করে থাবা বসাল তার পিঠে।অতর্কিতে থাবড়া খেয়ে তব্দা ছুটল সাবিতের।পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে ফিরে চলল সে।মাথার মধ্যে খালি ঘুরছে সোমালিয়া আর সোমালিয়া…

 

২. তব্দা খাওয়ার দিন কয়েক পর…

তখন থেকেই ভালবাসার পুস্কুনিতে ঢেউ ওঠা শুরু হইলো।পুরা হাবভাব ই পাল্টে গেল সাবিতের।লালচে চুলে ফিরে আসে রঙ এবং টিভির অ্যান্টেনার মত খাড়া হয়ে গেল ঢং।আয়নার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রূপচর্চা নিয়ে থাকে সে।আর কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে ‘ ইশক ওয়ালা লাভ’-শুনে সারাদিন।মনের মধ্যে চিক্কুর পাড়ে -‘সোমালিয়া তুমি কডে’…।

টিফিন টাইম এ সাবিত ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে এক নজর দেখতে।সোমালিয়া বান্ধবী নিয়ে যায় ক্যান্টিনে।সেও যায় পিছে পিছে।সিঙ্গারা কিনে বাট খেতে ভাল লাগে না তার।আফসার সেইটা কপাকপ খেয়ে নেয়।ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজে-দিন যায় আমার প্রেম যায় বেড়ে। ফেসবুকে সার্চ দিয়েও সোমালিয়া নামে কাউকে পাওয়া যায়না।চলে আবারো খোঁজ দা সার্চ…

#oh YEs! বলে বিছানায় দুইটা ডিগবাজি খেল সাবিত।এবং টান খেয়ে তার লুঙ্গির গিট্টু খুলে গেল।কোনরকমে সেটা সামলে দৌড়ে গেল বাথরুমে।অবশেষে সোমালিয়াকে পাওয়া গেছে।”লতানো পুঁইশাক” নামে আইডি চালায় সে।প্রোফাইলে ঢুকে ওর ছবি দেখে সাবিতের ভিতরে ধুক্কুর ধুক্কুর করতে লাগলো।সেই রাতে আর ঘুম হলো না আর।

পরদিন বিনা কারণেই সাবিতকে বেশ খুশি দেখা গেলো।সারাদিন সুরেলা গলায় ভাওয়াইয়া গান গাইলো।সুজিত সারের ওজনদার ধমক খেয়েও সেই গান থামলো না।চমৎকার গানের জন্য একন অফ চিটাগং উপাধি দেয়া হইলো তাকে।

 

৩. টুকরা হইলো দিল

 

রিইউনিয়নের দিন আবারো দুই পেয়ারা পঙ্খী(মানে লাভ বার্ড)এর দেখা হইলো।মুন্তাসির তার ২২নম্বর কফি শেষ করে সূপের স্টলের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো সাবিতকে।অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিলো সে।হঠাত ইয়া হু!বলে চিৎকার দিল সাবিত।নিচে তাকিয়ে দেখে একটা জুতার পেন্সিল হিল দিয়ে তার পা পিষে দিয়েছে একটা পা।উপস! সরি বলে মেয়েটা চলে গেলো।ভোঁতা মুখ করে পা ডলতে বসল সে।এমন সময় তার চোখ পড়ল একটা মেয়ের দিকে।আরে!এ যে সোমালিয়া!পায়ের ব্যাথা ভুলে তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো সাবিত।কয়েকবার ওর চারপাশে চক্কর দিয়ে এলো।ভাবলো পরিচিত হওয়া যাক। এইবার দৃশ্যপটে আগমন ধনু চৌধুরীর।সাবিত দেখল লম্বা স্যুটেড ছেলেটা সোমালিয়ার হাত ধরে কথা বলছে।সে ভাবল হয়তো বন্ধু টন্ধু হবে।এমন টাইমে স্পিকারে গান বাজা শুরু হল।যে যার মত নাচছে।রোমান্টিক গান শুরু হতেই ধনু আর সোমালিয়ার হাতে হাত,ঠেঙ্গে ঠেং রেখে ট্যাংগো নাচের দৃশ্য দেখে সাবিতের কইলজায় যেন ঠাডা পড়ল।মুখটা হুতোম প্যাঁচার মত করে সেখান থেকে চলে এল সাবিত।রাতে মুখ বেজার করে বসে থাকলো। তার প্রিয় রেসলিং ও দেখলো না।ফেসবুকে সোমালিয়ার প্রোফাইলে ঢুকেই দেখল ধনুর সাথে ওর গালে গাল লাগিয়ে ছবি দেয়া।নিচে ক্যাপশন দেয়া-উইথ মাই জান্টুস।ভীষণ রাগ উঠলো সাবিতের।এক টানে পরনের সিল্কের লুঙ্গিটা ছিঁড়ে ফেললো।তারপর বেজার মুখে লুঙ্গি কাঁধে নিয়ে চলে গেলো বাথরুমে।সেইখানে বসে ধীরেসুস্থে সোমালিয়াকে ব্লক করলো প্রথমে,তারপর ধনু কে।এইবার শান্তিতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে উপুত হয়ে ঘুমিয়ে গেলো সে…

৪. সেদিনের ঘটনার পর…

অন্ধকার ঘরে কাগজের টুকরো ছিঁড়ে প্লেন বানিয়ে সময় কাটে সাবিতের।অনেকগুলা প্লেন জমা হলে সে ছাদে চলে যায়।এক এক করে সেগুলা ছেড়ে দেয় নিচে।এমনি একটা প্লেন ঘুরে ঘুরে এসে পড়ল সুইটির মাথায়।

ও,সুইটির পরিচয় দিইনাই তো!সুইটি হচ্ছে সাবিতের বিল্ডিং এর পাঁচ তলার বাসিন্দা।ক্লাস নাইন এ পড়ে।বিকেলে সাজুগুজু করে কোচিং এ যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিলো এমন সময় তার মাথায় এসে পড়ল প্লেনটা।চমকে উঠে উপরে তাকালো।দেখলো মায়াবি চেহারার একটা ছেলে ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে প্লেন ছাড়ছে।সুইটির অনেক দিনের স্বপ্ন ছিলো পাইলট ছেলের সাথে প্রেম করার।ছাদে দাঁড়ানো ছেলেটিকে তার পছন্দ হয়েছে।হোক না কাগজের প্লেনের পাইলট!সাবিত অবশ্য এইসব খেয়াল করে নি।সে ব্যাস্ত প্লেন উড়াতে।

ও,সুইটির পরিচয় দিইনাই তো!সুইটি হচ্ছে সাবিতের বিল্ডিং এর পাঁচ তলার বাসিন্দা।ক্লাস নাইন এ পড়ে।বিকেলে সাজুগুজু করে কোচিং এ যাওয়ার জন্য বের হচ্ছিলো এমন সময় তার মাথায় এসে পড়ল প্লেনটা।চমকে উঠে উপরে তাকালো।দেখলো মায়াবি চেহারার একটা ছেলে ছাদের কিনারে দাঁড়িয়ে প্লেন ছাড়ছে।সুইটির অনেক দিনের স্বপ্ন ছিলো পাইলট ছেলের সাথে প্রেম করার।ছাদে দাঁড়ানো ছেলেটিকে তার পছন্দ হয়েছে।হোক না কাগজের প্লেনের পাইলট!সাবিত অবশ্য এইসব খেয়াল করে নি।সে ব্যাস্ত প্লেন উড়াতে।

দিন কয়েক পর।দুপুরে বিছানায় শুয়ে তিন গোয়েন্দা পড়ছে সাবিত।বাসায় কেউ নেই।এমন সময় কলিংবেল বাজলো।উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো।দেখলো মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ে দাঁড়ানো।

-ভাইয়া আমি সুইটি।পাঁচতলায় থাকি।

-ও

-আম্মু আন্টিকে আমাদের ঘরের চাবি দিয়ে গেছে?

-আম্মা তো বাসায় নেই।দাঁড়াও দেখছি।

বলে ভেতরে চলে গেলো সাবিত।খানিক বাদে ফিরে এলো চাবি নিয়ে।

-আচ্ছা আপনার নাম্বারটা দিতে পারবেন?যদি কোন দরকার হয়।

মিষ্টি করে হাসলো সুইটি।

-নাম্বার দিয়ে কি করবে?আচ্ছা নাও।নাম্বার দিলো সাবিত

-থ্যাংক ইয়ু ভাইয়া।আচ্ছা,আমি আসি।বলে চলে গেলো। দরজা আটকে দিলো সাবিত।

সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ভাবছে সুইটি,ছেলেটা এই বাসায় থাকে তাহলে।ভাগ্যিস বুদ্ধি করে নাম্বার নিয়ে নিয়েছি। রাতে সাবিতের মোবাইলে ছোট্ট একটা মেসেজ আসে।তাতে লেখা-আই লাভ ইউ।প্রেরক অপরিচিত। সাবিত ভাবে কে তাকে এই টাইপ মেসেজ দিবে!হয়তো বন্ধুরা কেউ হবে আরকি! পরদিন বিকেলে যথারীতি ছাদে গেলো সে।মই বেয়ে পানির টাঙ্কির উপর উঠে পা ঝুলিয়ে বসলো।এত উপরে বসলে বহুদূর পর্যন্ত বেশ ভালই দেখা যায়।বাতাসটাও বেশ চমৎকার।

-আজ প্লেইন উড়াবেন না?

ভীষণ চমকে নিচে তাকালো সাবিত।সুইটি দাঁড়িয়ে আছে।হাতে একগাদা কাগজের প্লেন।

-নাহ।আমি প্রতিদিন উড়াই না। মই বেয়ে উঠে এলো সুইটি।সাবিতের পাশে বসলো।সাবিত আস্তে করে একটু দূরে সরে গেলো।

-তাহলে কখন উড়ান?

-যেদিন মন খারাপ থাকে।আজ মন ভালো।বাতাস খাচ্ছি।

-বাতাস খাওয়া যায় বুঝি?হেসে দিলো সুইটি।

জবাব দিলো না সাবিত।তার মাথায় অন্য একটা চিন্তা এসেছে।

-কি হলো?আমার সাথে কথা বলতে ভাল্লাগছে না বুঝি?

-না,কিছু হয়নি।

-গতকালের মেসেজের রিপ্লাই দিলেন না যে?

সাবিত ভাবছে,তার সন্দেহ ই ঠিক।

-এগুলা কি লিখেছো তুমি?

-আমি আপনাকে ভালবাসি।

-কোন ক্লাসে পড়?

-ক্লাস নাইনে

এইটুকুন মেয়ে কি বলছে এসব? মহা মুসিবতে ফেলে দেবে দেখছি।সাবিত চিন্তিত।

-দেখ তুমি হয়তো ভুল করছো,এসব বোঝার ক্ষেত্রে তোমার বয়স অনেক কম …

-আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি।

-তুমি বুঝতে চাইছো না।তোমার পড়াশোনার ক্ষতি হবে।

-পড়াশোনা একদিকে আর ভালবাসা একদিকে।

-উহু।।তাছাড়া আমি তোমাকে ভালবাসি না।

-অন্য কাউকে ভালবাসেন?

সাবিত নিশ্চুপ।

-আচ্ছা আমাকে চিনো তুমি ভালো করে?

-চিনে নেবো নাহয়।

-আমার সম্পর্কে কিচ্ছু জানো না তুমি।

-জানতে চাই বলেই তো এসেছি।আর এসেছি জানাতে।

-আমার ইচ্ছে নেই।

-আমি কি এতই খারাপ?

-না সুইটি,তুমি অত্যন্ত চমৎকার একজন মানুষ।you deserve better than me.আই এম সরি। সুইটির চোখে টলমল করছে অশ্রু।নাকের ডগা লাল হয়ে গেছে।গাল কাঁপছে।মনে হয় এক্ষুনি কেঁদে ফেলবে।

-চলো নেমে যাই।বলে সাবিত নিচে নেমে হাত বাড়াল।অবশ্য সুইটি নিজে নিজেই নেমে এলো।তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে চলে গেলো।

সাবিতের ইচ্ছে হলো ওকে ডেকে বলে- হে রূপবতী বালিকা,হৃদয় যা ভাঙ্গার,তাতো ভেঙ্গেই দিয়েছে একজন।ভাঙ্গার মত তার ভেতর আর কিছুই নেই।ভালবাসবারও ইচ্ছেটুকু নেই আমার মধ্যে।ভালো থেকো রূপবতী বালিকা, ভালো থেকো।

বিকেল ফুরিয়ে এসেছে প্রায়।রেলিং এ হেলান দিয়ে সূর্যাস্ত দেখছে সে।টকটকে কমলা রঙা সূর্যটা অবসরে যাচ্ছে।সাবিতের হাতে সুইটির ফেলে যাওয়া কাগজের প্লেনগুলো।একটা একটা করে সেগুলোকে ছেড়ে দিচ্ছে নিচে।উজ্জ্বল কমলা রঙের আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে ওগুলোকে।আজ একটা হৃদয় ভেঙেছে সে।

হৃদয় ভাঙ্গার কষ্ট বড়ই সাংঘাতিক।

 

৫.দরজির মেয়ে সালেকা

এলাকার কিছু দুষ্টু ছেলেপিলে ইদানিং সাবিতের পিছে ঘুরছে।ওর কানে নানান আজব গুজব গুঁজে দেয়াই তাদের কাজ।এই বদের দল কানে কানে রটিয়ে দিল এলাকার আগুনে সুন্দরী সালেকা তাকে মনে মনে চায়।অবুঝ সাবিত তা সরল মনে বিশ্বাস করে।”সত্যি বলছিস তো?”

“হ্যাঁ,বাইয়া আই নিজের খানে শুনি আইদ্দি”,তারা বলে।

শুকিয়ে যাওয়া আবেগের নদী ফিরসে পূর্ণ যৌবনে বইতে থাকে,প্রবল ঢেউয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যায় একূল ওকূল।সালেকার জন্যে গলির মোড়ে বাসার নিচে সাবিতকে দেখা যায় নিয়মিত।মাঝেমধ্যে সালেকা আসে বারান্দায়,চেহারা বাঁকিয়ে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে হাসি দিয়ে যায়।আকারে ইঙ্গিতে নানা ইশারা দেয়।একা পেলে ছুঁয়ে দিতে চায়। এভাবেই কাটে দিন।কিন্তু পেছনের সত্যটা জানা ছিল না তার।চাটুকারের দল তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ট্রিট আদায় করতে লাগল নিয়মিত।এদিকে সালেকার অতীত থেকে বেরিয়ে এল অপ্রিয় সত্য।এলাকার এক ছেলের মুখেই শোনা গেল চাঞ্চল্যকর সে ঘটনা।কিভাবে সালেকা তার রুপের ফাঁদে ফেলে শেষে ব্ল্যাকমেল করত।সাবিতকে নিয়েও ছিনিমিনি খেলার ইচ্ছে ছিল তার।প্লেন ভেস্তে যাওয়ায় বুরুন্ডির ভিসা নিয়ে পালিয়ে গেল সালেকা।যাওয়ার আগে সাবিতের মনে লাঙল চালিয়ে গেল।চষা মন নিয়ে সাবিত মনমরা হয়ে বসে থাকে গলির মোড়ে।চাটুকারের দলও গায়েব হয়ে গেছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে গুরু আজম খানের গান বাজে-‘ওরে সালেকা,ওরে মালেকা ওরে ফুলবানু পারলি না বাঁচাতে…’।

 

 

 

 

About The Author
Mirza Md Razwan
Mirza Md Razwan
I'm really passionate about the Article writings in my vacation time and always thinking creatively about my own work ,of course I'm searching the unique place and things.
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment