Now Reading
পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (১ম পর্ব)



পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (১ম পর্ব)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কারো কাছে এটি অহংকার আর গর্বের নাম, কারো কাছে তীব্র আক্ষেপের নাম, আবার কারো কাছে না জানা একটি নাম। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজীতে মাস্টার্সে পড়ে একজন। তার নাম হলো, না থাক তার নাম বলার উপযুক্ত সময় এখনো হয়নি। (পাঠক মহোদয়, নাম না বলার জন্য ক্ষমা করবেন তবে উপযুক্ত সময়েই তার নামটা জানতে পারবেন)। তবে আপাতত তাকে “ছেলেটি” বলেই পরিচয় করানো হলো। ছেলেটি থাকে জগন্নাথ হলে। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। সাহিত্যে পড়ার কারণে তার মনে রসবোধ আছে অনেক। প্রতিদিনের মতো একদিন শীতের সকালে মন্দিরের পাশ দিয়ে হাটতে ছিলো। হটাৎ সকালের ঘন কুয়াশার ভিতর থেকে নূপুরের নিক্বণ শব্দ শুনতে পায়। শব্দটি তার মস্তিষ্ক থেকে হৃতপিণ্ডে যেতে বেশি একটা সময় নেয় নি। চারদিকে খুজতে থাকলো তবুও নূপুরানীর দেখা পেলোনা। অনেক খোজার পর মন্দিরের ভিতর তার দেখা পেল। সে দেখতে পেল কোনো এক রমনীর পৃষ্ঠদেশ। সুদীর্ঘ ঘনকৃষ্ণ কেশগুলো তার মধ্যমা পর্যন্ত অবস্থান করিতেছে। ছেলেটি তা একনয়নে দেখছে। তখন তার মনের ভিতর কী খেলা করতেছে তা জানা নিতান্তই অসম্ভব। আর ঐ দিকে মেয়েটি একঠায় দাড়িয়ে গভীর সাধনায় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছে। কিছুক্ষন পরে মেয়টি প্রার্থনা শেষ করে মন্দির থেকে বের হলো। এতো সময় তাহার পৃষ্ঠদেশ দেখা গেছে। এখন তার অগ্রভাগ দেখার সৌভাগ্য হলো। তার কাজল মিশ্রিত দুটো হরিণির চোখ যা দেখলে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়, হালকা লম্বা মুখমন্ডলে বাকা ঠোট যেন তার সৌন্দর্যকে আরো বিকশিত করেছে। ঠোটের উপরে কালো ছোট্ট তিলটা আরো সৌন্দর্য যোগ করেছে, ছিপছিপে গড়নের দৈহিক আকৃতি, সব মিলিয়ে সে “অনন্য”।

ছেলেটি একটু লুকিয়ে থেকে তাকে যেতে দিলো। রমনী যখন হাটতেছিল তাহার নূপুরের ধ্বনিতে শুধু ছেলেটি কেনো, মন্দিরের ভিতরে থাকা দূর্গাও নিশ্চয়ই খুশি হয়ে আশীর্বাদ দিচ্ছে। সবশেষে বালিকা রিকসা করে তার গন্তব্যে চলে গেল। ছেলেটি পিছন পিছন গেলো কিন্তু হারিয়ে ফেলে। তারপর হলে ফিরে আসলো। রুমে এসে তার রুম মেইট এবং খুব কাছের বন্ধু আদিত্যের কাছে সব কিছু বলে। সেইদিন মেয়েটিকে নিয়েই ভাবতে ভাবতে তার দিন চলে গেলো। এভাবে মেয়েটিকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই কয়েকদিন চলে গেলো। একদিন সকালে আদিত্য বললো চারুকলায় আজ বসন্ত উৎসব হবে চল যাই। ছেলেটি বললো ঠিক আছে চল। প্রস্তূতি শেষে দুজনে চারুকলায় গেলো। মঞ্চের অতি নিকটে তারা অবস্থান করছিলো। আকস্মিক কে যেন ছেলেটির পাশ দিয়ে দ্রূতগতিতে ছুটলো। ছেলেটি এদিক সেদিক তাকালো তারপর সে যাকে দেখলো তা হয়তো কল্পনাও করেনি। এই সেই প্রভাত বালিকা। মেয়েটি মঞ্চের দিকে যাচ্ছে। পরনে বসন্ত রঙের শাড়ি, অলক মধ্যে ফুলের গুচ্ছ। একটু পর ছেলেটি বুঝতে পারলো নৃত্য করবার জন্য বালিকার আগমন ঘটেছে। ছেলেটির ভাব দেখে আদিত্য বিষয়টা বুঝতে পারছে। সে জিজ্ঞেস করল এই সে মেয়ে? ছেলেটি বলল হুম এই সেই মেয়ে যে এক পলক দেখা দিয়ে হারিয়ে গিয়েছিলো। আদিত্য বলল আজকে কথা বলতে হবে তার সাথে। ছেলেটি বলল এতো তাড়াতাড়ি আগানো কি ঠিক হবে?? আদিত্য বলল বন্ধু তাড়াতাড়ি না করলে তো আবার হারিয়ে ফেলবে। পরে ছেলেটিও রাজি হলো কথা বলতে। তারপর তারা দুজনেই মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলো। মেয়েটি তখন মাত্র নাচ শেষ করে মঞ্চ থেকে নামছে। আদিত্য ছেলেটিকে বলছে এখন কথা বলার সুযোগ আছে। ছেলেটির অনেক ভয় লাগছে। এই ভয়টা যেন সব পুরুষের মাঝেই বিদ্যমান। সে যেইহোক, যুদ্ধের ময়দানের সাহসী সৈনিক হোক কিংবা শত শত মানুষকে হত্যকারী ফাঁসির দন্ড পাওয়া আসামী হোক নারীর সামনে সবাইকেই আগে “ভয়” নামক শব্দটির সাথে পরিচিত হতে হয়। যাইহোক সেই ভয় কে দূরে ঠেলে দিয়ে ছেলেটি মেয়েটিকে বললো “এই যে শুনছেন আপনার সাথে কিছু সময় কথা বলার সুযোগ পেতে পারি কি?” এই বলে ছেলেটি মেয়েটির সামনে এসে দাড়ালো।
মেয়েটি– কিছু বলবেন কি?
ছেলেটি— আপনার নামটা জানতে পারি কি?
হূঁম! পারেন, আমি নিলীমা। আপনি?
(এতো সময় অপেক্ষা করার জন্য পাঠকদের কাছে কৃতজ্ঞ)
ছেলেটি— আমার নাম প্রদীপ! কোথায় পড়াশুনা করেন?
নিলীমা— চারুকলায় ১ম বর্ষে, আপনি?
প্রদীপ— ইংরেজীতে মাস্টার্স করছি।
নিলীমা— হুঁম! এখন যেতে হবে। ভালো থাকবেন।
এই বলেই নিলীমা হাঁটা ধরল।
প্রদীপ চিৎকার করে বললো— বালিকার দেখা আর কি কখনো পাওয়া যাবে?
নিলীমাও চিৎকার করে বললো— মনে বিশ্বাস রাখুন। হলেও হতে পারে (হাসি)।

অবশেষে প্রদীপ আর আদিত্য হলে ফিরে আসলো। পরেরদিন প্রদীপ একাই চারুকলার দিকে গেলো। অনেক সময় খোজাখুজির পরও নিলীমার দেখা পেলো না। এভাবে দুই, তিনদিন খোজার পর একদিন টিএসসি তে তার দেখা পেলো।
প্রদীপ— এই যে শুনছেন?
নিলীমা— হায় আপনি যে! আমাকে খুজছিলেন নিশ্চয়ই?
প্রদীপ— কিছুটা, একটু সময় হবে কি?
নিলীমা—হুম! হবে, তবে এখন না। বিকেলে আমি এখানেই থাকব। আপনি চলে আইসেন।
প্রদীপ— ঠিক আছে।

বিকেলে প্রদীপ কথামতো টিসএসসি তে গেলো। একটু পরে নিলীমাও আসলো।

প্রদীপ— কেমন আছেন?
নিলীমা— ভালো। আপনি?
প্রদীপ— ভালো। চলেন সামনে হেঁটে হেঁটে কথা বলি।
নিলীমা— চলেন।
প্রদীপ— আচ্ছা আপনার দেশের বাড়ি কোথায়?
নিলীমা— ফরিদপুর। আপনার?
প্রদীপ— গোপালগঞ্জ।
নিলীমা— ফরিদপুর আসছেন কখনো?
প্রদীপ— অনেক আগে একবার গিয়েছিলাম। আমার কাকাবাবু ওখানে চাকরি করে, তার বাসায়।
নিলীমা— আচ্ছা, আপনি আমার পিছু নিচ্ছেন কেনো?
প্রদীপ— কেন বেশি অপরাধ করে ফেললাম? সময় হোক জানতে পারেন।
নিলীমা— তা না, তবে অজানা লোকের সাথে কথা বলতে একটু অস্বস্তি লাগছে আর কি!
প্রদীপ— কেনো পরিচয়তো দিলাম!
নিলীমা— পরিচয় দিয়ে একজনকে চেনা যায় কিন্তু জানা যায় না।
প্রদীপ— বাহ! আপনি তো খুব ভালোভাবে কথা বলেন।
নিলীমা— (হাসি)। আজ যেতে হবে।
প্রদীপ— কাল কি দেখা হতে পারে?
নিলীমা— হুম! হতে পারে (হাসি)।
প্রদীপ— আচ্ছা, এখন আসি।
নিলীমা— ঠিক আছে।

তারপর দুজনে যার যার গন্তব্যে চলে এলো। এভাবে তাদের মধ্যে কয়েকদিন দেখা হলো, কথা হলো, দুজন দুজনকে জানাশোনা হলো। একদিন প্রদীপ ভাবলো নিলীমা কে সে ভালবাসার কথাটা বলেই দিবে। এতো দিন ধরে হৃদয়ের গহীন কোণে একটু একটু যেই অনুভূতিগুলো জমা হয়েছে সেগুলো প্রকাশ করার উপযুক্ত সময় হয়েছে। প্রতিদিনের মতো প্রদীপ নিলীমার সাথে দেখা করতে গেলো।
প্রদীপ— আপনার সাথে কিছু বিশেষ কথা ছিলো।
নিলীমা— হুম, বলেন (হাসি)।
প্রদীপ— আজ না, কাল বলবো।
নিলীমা— ঠিক আছে।
প্রদীপ— কাল বিকেল ৪ টায় কার্জন হল এলাকার পুকুর পাড়ের দিকে দেখা হবে।
নিলীমা— হুম! (হাসি)
প্রদীপ— আচ্ছা, আজ আসি। কাল সময় মতো দেখা হবে।
নিলীমা—- ঠিক আছে।
পরের দিন যথাসময়ে প্রদীপ সেই স্থানে পৌছালো। কিছু সময় অপেক্ষার পর নিলীমা আসলো। আজ নিলীমাকে দেখে প্রদীপ একটু অবাকই হয়েছে কারণ সেদিন সকালে তাকে যেমন দেখাচ্ছিলো আজ ঠিক তেমনই দেখাচ্ছে। সেই পোশাক, সেই সাজসজ্জা। সব থেকে বড় বিষয় হচ্ছে সেই নূপুর। আজ সে নূপুর পড়েছে।
প্রদীপ— অপরুপা আপনাকে স্বাগতম!
নিলীমা— (হাসি)!
প্রদীপ— চলেন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাক।
নিলীমা— আপনার বিশেষ কথা কি এখন শুনতে পারি?
প্রদীপ— নিশ্চয়ই। জানি না আপনি কিভাবে নিবেন। তারপরও বলছি। কারণ কিছু অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে নেই।
নিলীমা— ঠিক বলছেন। লুকিয়ে রাখলে অনুভূতিগুলো মনের ভিতর খেলা করে। তাতে কষ্ট বাড়ে। বলেন কোন ভয় নেই।
প্রদীপ— সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে হয়তো আমি তোমারি জন্য ১০১টি নীলপদ্ম আনিতে পারিবো না, রুপকথার রাজকুমারের মতো হয়তো তোমাকে আমার রাজকুমারী করে রাখতে পারিবো না। তবে হ্যা, এই পৃথিবীতে যতটুকু ভালবাসার অস্তিত্ত আছে তার সবটুকু দিয়ে তোমাকে ভালবাসিতে পারিবো। ও আমার হৃদয় হরণী প্রথম দর্শনেই আমার অজান্তে আমার হৃদয়, তোমাকে তার স্থানের অধিকারী করে দিয়েছে. এই অতি নগন্য ব্যক্তির স্থান কি তোমার হৃদয়পটে হবে?
চলবে————-
( পাঠক মহাদয় অপ্রত্যাশিতভাবে এখানে শেষ করার জন্য ক্ষমা করবেন। অতিশীঘ্রই ২য় পর্ব দেয়া হবে।)

ছবিসূত্র: Prothom-alo

About The Author
Ryan Rakib
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment