Now Reading
পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (২য় পর্ব)



পুরোনো দিনগুলোর প্রেম। (২য় পর্ব)

১ম পর্ব।

১ম পর্বের পর।

প্রদীপ— সাত সাগর তের নদী পাড়ি দিয়ে হয়তো আমি তোমার জন্য ১০১টি নীলপদ্ম আনিতে পারিবো না, রুপকথার রাজকুমারের মতো হয়তো তোমাকে আমার রাজকুমারী করে রাখতে পারিবো না। তবে হ্যা, এই পৃথিবীতে যতটুকু ভালবাসার অস্তিত্ত আছে তার সবটুকু দিয়ে তোমাকে ভালবাসিতে পারিবো। ও আমার হৃদয় হরণী প্রথম দর্শনেই আমার অজান্তে আমার হৃদয়, তোমাকে তার স্থানের অধিকারী করে দিয়েছে. এই অতি নগন্য ব্যক্তির স্থান কি তোমার হৃদয়পটে হবে?

নিলীমা— (অবিরাম হাসি)।
প্রদীপ— ঠাট্টা ভাবছেন?
নিলীমা— কেন? সব হাসি কি ঠাট্টার হয়?
প্রদীপ— হাসি অনেক রহস্যময় বস্তু। তা বোঝা বড় দায়।
নিলীমা— আচ্ছা ঠিক আছে আর হাসবো না।
প্রদীপ— আমার কথার তো কোন প্রতুত্তর পেলাম না।
নিলীমা— আজকে আমার সাজ দেখে আপনি নিশ্চয়ই ভেবেছেন এটা কাকতালীয়। না, ইহা ইচ্ছাকৃত। আপনি এমন কিছু বলবেন সেটা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। সেদিন আমি যখন মন্দির থেকে বের হই তখন দেখি আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখছেন। বুঝতে দেইনি যে আমি আপনাকে দেখেছি। আজ বুঝতে পারছি সেদিন এমন কেনো করেছিলেন। আপনি যদি সম্মতি দেন আর সময়ক্ষেপন নয় এখনই আমার হৃদয়ের সবস্থানটুকু আপনাকে প্রদান করিলাম। আপনার ইচ্ছা মতো অবস্থান করুন।

প্রদীপ— বালিকার এতো সহজে সম্মতি দেয়ার যথাযথ কারন আছে কি? অতি সহজে পাওয়া কিছু বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
নিলীমা— ভালবাসা বস্তুটি স্বয়ং ঈশ্বরের দান সে কখন যে কাহাকে দিতে বলে তাহা বুঝা নিতান্তই অসাধ্য। এটা মন ও মস্তিষ্ক থেকে আসে।
প্রদীপ—- তোমার নামের মতোই তোমার মনের বিশালতা অসীম।
নিলীমা— আপনিও প্রদীপের আলোর মতো ভালবাসার আলো দিয়ে আমাকে আলোকিত করে রাখবেন আশা করি।
প্রদীপ আর কিছু না বলে অতিদুঃসাহসে নিলীমার হাত ধরে হাঁটা শুরু করলো। তারপর তারা কি কথা বলতে ছিলো তা অজানাই থাক। (পাঠক মহাদয় ক্ষমা করবেন এই সময় তাদের মাঝে আমার না যাওয়াটাই শ্রেয়। তারা তাদের মত করে সময় কাটাক। তাদের এখনের অনুভূতিগুলো লেখায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব।)

তারপর দুজনে যার যার গন্তব্যে চলে এলো। পরের দিন ক্লাস ফাকি দিয়ে আবার দুজনে দেখা করলো। এই সময়টায় যেনো পৃথিবীর সবকিছুই তুচ্ছ মনে হয়, শুধু দুজন দুজনের পাশে থাকার প্রচেষ্টা।

প্রদীপ— বহুগুণী রমনী তোমার ঐ সুরেলা কন্ঠে একটি গান শোনার সৌভাগ্য কী আমার হবে?
নিলীমা— সবকিছুর অধিকার তো আপনাকে দিয়েছি তাহলে কেন এত সংশয়।
প্রদীপ— তারপরও সব কিছুতে তাড়াহুড়া করতে নেই।
নিলীমা কিছু না বলে গান গাইতে শুরু করলো—

তুমি সন্ধ্যারো মেঘমালা, তুমি আমারও সাধেরো সাধনা,
মম শূন্যগগনবিহারী।
আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা–
তুমি আমারি, তুমি আমারি,
মম অসীমগগনবিহারী ——

গান শেষ করে নিলীমা বললো এখন আপনার সময়। আমি জানি আপনি খুব ভালো আবৃত্তি করেন।
প্রদীপ— আজ না অন্য একদিন।
নিলীমা— কিছু কাজ সময় মতো না করলে পরে সেটার মূল্য কমে যায়।
প্রদীপ—ঠিক আছে করছি—
আমরা দুজনে ভাসিয়া এসেছি
যুগল প্রেমের স্রোতে
অনাদিকালের হৃদয়-উৎস হতে।
আমরা দুজনে করিয়াছি খেলা
কোটি প্রেমিকের মাঝে
বিরহবিধুর নয়নসলিলে,
মিলনমধুর লাজে—
পুরাতন প্রেম নিত্যনূতন সাজে।

এভাবে তাদের দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিলো! এটা এমন একটা সময় যে এই সময় সবাই ভালো থাকে। হঠাৎ একদিন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হয়েছে। আজকের মধ্যেই হলত্যাগ করতে হবে। এটা শুনে প্রদীপ ছুটে নিলীমার হলের দিকে গেলো। কিন্তু হলে প্রবেশ করতে পারলো না। পাগলের মতো চারপাশে ঘুরতে ছিলো। হটাৎ দেখলো নিলীমা তার বাবার সাথে হল থেকে বের হচ্ছে। কিন্তু কথা বলার কোন সুযোগ পেলো না। তারপর হলে ফিরে সবকিছু গুছিয়ে বাড়িতে চলে আসলো। বাড়িতে এসে প্রদীপ একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। কারো সাথে তেমন কথা বলে না। একা একা থাকে। কিছুদিন এভাবেই কাটলো। হঠাৎ একদিন প্রদীপের বাবা প্রদীপকে বললো রাতে আমার ঘরে এসো তোমার সাথে কিছু কথা আছে। প্রদীপ বললো ঠিক আছে। রাতে প্রদীপ বাবার ঘরে গেলো।
প্রদীপ— আদাব বাবা! কিছু বলবেন?
বাবা— হুম, বসো। তোমার পড়াশুনা কেমন চলছে?
প্রদীপ— জ্বী, ভালো।
বাবা— ভার্সিটি খুলবে কবে?
প্রদীপ— জানি না বাবা, অনেক ঝামেলা চলছে।
বাবা— দেখো বাবা,আমার শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না। আমি চাচ্ছি তুমি এখন বিয়ে করো।
প্রদীপ— কি বলেন বাবা! আমার পড়াশুনা এখনো তো শেষ হয় নি। তাছাড়া আমি এখনো কিছু করছি না। সামনে মাস্টার্স ফাইনাল এক্সাম। তার পর বিসিএস এর প্রস্তুতি। এই সময় বিয়ে!
বাবা— সমস্যা কি? বিয়ের পড়ে পড়বে। তাছাড়া মেয়েও ঢাকায় পড়াশোনা করে বিয়ের পর দুজনে এক সাথে পড়বে। তুমি আমার এক মাত্র সন্তান। আমার যা কিছু আছে তা তোমার জন্য যথেষ্ট। চাকরি ততটা জরুরী না।
প্রদীপ— তারপরও বাবা।
বাবা— আমি কিছু শুনতে চাই না। তোমার কাকা তার বন্ধু কে কথা দিয়েছে। আমিও গিয়েছিলাম তার মেয়েকে দেখতে। তোমার সাথে ভালো মানাবে। এই নাও মেয়ের ছবি আশা করি তোমারও ভালো লাগবে। তুমি এখন আসতে পারো।
তারপর প্রদীপ চলে আসলো। বাবার কথার বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস প্রদীপের হলো না। শুধু প্রদীপ কেনো এই সমাজে সকল সন্তানই বাবার কাছে অসহায়। বাবাদের কথার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস খুব কম সন্তানেরই আছে। প্রদীপ ছবিটি না দেখে ফেলে দিলো। অন্যদিকে নিলীমা কেমন আছে তা নিয়ে প্রদীপ অনেক চিন্তায় আছে। প্রদীপের অনিচ্ছা সত্বেও বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অবশেষে বিবাহের দিন এসে পড়লো। সবাই কনের বাড়ির দিকে যাত্রা করলো। দীর্ঘসময়পর সবাই গন্তব্যে পৌছালো। সেখানে সানাইয়ের প্রতিটা সুর প্রদীপের কাছে ভায়োলিনের করুন সুর মনে হচ্ছিলো। বিবাহের লগ্ন অতিনিকটে। সবাই উদগ্রীব শুধু প্রদীপ ব্যতীত। প্রদীপের মনের অবস্থা বুঝে আদিত্য বললো তোকে স্বান্তনা দেয়ার মতো ভাষা আমার কাছে নেই।
প্রদীপ– নিজের প্রতি খুব ঘৃণা হচ্ছে। স্বার্থপরের মতো আমি তাকে ত্যাগ করে দিতেছি।
এরই মধ্যে বিবাহ কনে এসে প্রদীপের সামনে উপস্থিত। পুরোহিত মশাই বিবাহ কার্যক্রম শুরু করলো। শুভ দৃষ্টিক্ষনে প্রদীপ যা দেখলো তা সে কল্পনাও করে নি। এই তার সেই প্রভাত কন্যা। শুভ দৃষ্টি শুরুর পূর্বেই নিলীমার আঁখি চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। প্রদীপ উঠে ধরার পূর্বেই নিলীমা মাটিতে লুটায়ে পড়ে। বিষ পানে তার শ্বেত মুখখানি নীল হয়ে গেছে। প্রদীপ চিৎকার করে বললো আমার জন্য তুমি এতো কিছু করলে! আমি অনেক স্বার্থপর। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও, আমার ভালবাসার আলো দিয়ে তোমার জীবনকে আলোকিত করতে পারলাম না।

শীতের সকালে ঘন কুয়াশার ভিতর হালকা রোদের আলোয় যার দেখা হয়েছিলো, বিমর্ষ রাতের অন্ধকারে সে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলো।

(পাঠক মহোদয়, পুরো গল্পটি লেখা হয়েছে অনেক আগের প্রেক্ষাপটে, তাই বর্তমানের সাথে এর অনেক কিছুই মিলবে না। আর এটা শুধুই একটা কল্পিত গল্প। ধন্যবাদ।)

গান ও কবিতা সূত্র: কবি গুরু।
ছবি সূত্র: prothom-alo

About The Author
Ryan Rakib
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment